দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (স্কুল-কলেজ) সব ধরনের ফি ও অন্যান্য আয় আদায়ে নগদ লেনদেন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এখন থেকে শিক্ষার্থীদের ফি পরিশোধ করতে হবে সরকারি ব্যাংকের অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি সংক্রান্ত নীতিমালা, ২০২৬’-এ থেকে এসব তথ্য জানা যায়। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের উপসচিব (বেসরকারি মাধ্যমিক-৩) সাইয়েদ এ জেড মোরশেদ আলী স্বাক্ষরিত এ নীতিমালা ৯ ফেব্রুয়ারি জারি করা হয়েছে।
নগদ লেনদেন নিষিদ্ধের বিষয়ে নীতিমালায় বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের সব ধরনের ফি ও প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় আয় সোনালি পেমেন্ট গেটওয়ে (এসপিজি) বা সরকারি ব্যাংকের অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে আদায় করতে হবে। জরুরি প্রয়োজন বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাড়া কোনো অবস্থাতেই নগদ টাকা গ্রহণ করা যাবে না। যদি নগদ টাকা গ্রহণ করা হয়, তবে তা পরবর্তী দুই কর্মদিবসের মধ্যে ব্যাংক হিসাবে জমা দিতে হবে।
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৪ শীর্ষক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, বর্তমানে দেশে ২২ হাজার ৬৫৭টি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (স্কুল-কলেজ) রয়েছে। এর মধ্যে ১৮ হাজার ৪৮৬টি বিদ্যালয়, স্কুল-কলেজ ১ হাজার ৪৫১টি এবং কলেজ ২ হাজার ৭২০টি। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী রয়েছে প্রায় এক কোটি।
সার্বিক বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (মাধ্যমিক-২) আজ শনিবার মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিতে সব ধরনের নগদ লেনদেন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আশা করছি, এতে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে।’
নীতিমালায় একবার ভর্তিকৃত কোনো শিক্ষার্থীর কাছ থেকে পরবর্তী শ্রেণিতে ওঠার সময় ‘পুনঃ ভর্তি ফি’ নেওয়া যাবে না উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগেও পুনঃ ভর্তির বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে একই ধরনের নির্দেশনা জারি হয়েছিল। গত বছরের ১৯ নভেম্বর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীন স্বাক্ষরিত বেসরকারি স্কুল, স্কুল অ্যান্ড কলেজ (মাধ্যমিক, নিম্ন মাধ্যমিক ও সংযুক্ত প্রাথমিক স্তর) শিক্ষার্থী ভর্তি নীতিমালাতেও বলা হয়েছিল, একই প্রতিষ্ঠানে এক শ্রেণি থেকে অন্য শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হলে পুনঃ ভর্তি ফি নেওয়া যাবে না; কেবল সেশন চার্জ নেওয়া যাবে। কিন্তু বাস্তবে বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এ নির্দেশনা মানেনি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যেকোনো আর্থিক অনিয়মের জন্য পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও প্রতিষ্ঠানপ্রধান (অধ্যক্ষ বা প্রধান শিক্ষক) যৌথভাবে দায়ী থাকবেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, যেকোনো আর্থিক অনিয়মের জন্য পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও প্রতিষ্ঠানপ্রধান (অধ্যক্ষ বা প্রধান শিক্ষক) যৌথভাবে দায়ী থাকবেন। এমনকি দায়িত্ব ছাড়ার পরেও ওই সময়ের কোনো অনিয়ম ধরা পড়লে তাঁদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো শিক্ষক বা কর্মকর্তা আর্থিক বিধি লঙ্ঘন করলে তা ‘অসদাচরণ’ হিসেবে গণ্য হবে এবং এর ফলে তাঁদের এমপিও স্থগিত বা বরখাস্ত পর্যন্ত করা হতে পারে। এ ছাড়া অনিয়মের দায়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটিও বাতিল করতে পারবে সরকার।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ইমপ্রেস্ট ফান্ড বা খুচরা নগদ তহবিলের ঊর্ধ্বসীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে নীতিমালায়। বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানের ধরন ও শিক্ষার্থীসংখ্যার ভিত্তিতে প্রতি মাসে ১০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত নগদ খরচ করা যাবে। তবে একক কোনো ভাউচারে ২৫ হাজার টাকার বেশি নগদ খরচ করা যাবে না। এর অতিরিক্ত যেকোনো ব্যয় অবশ্যই ক্রস চেকের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ছয়টি উপকমিটি করার কথা বলা হয়েছে নীতিমালায়। কমিটিগুলো হলো—অর্থ, ক্রয়, উন্নয়ন, টিউশন ফি ও সেশন চার্জ আদায়, অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা কার্যক্রম মূল্যায়ন এবং অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা কমিটি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সব ভাউচার ই-ক্যাশ বুকে এন্ট্রি করতে হবে বলেও নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, পরিবীক্ষণ ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) একটি অনলাইন ভিত্তিক ‘ই-ক্যাশ বুক’ সিস্টেম তৈরি করবে। প্রতিষ্ঠানের সব ভাউচার এই সিস্টেমে এন্ট্রি করতে হবে। এ ছাড়া শিক্ষক-কর্মচারীদের মানবিক প্রয়োজনে (চিকিৎসা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ) সর্বোচ্চ ছয় মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ টাকা অগ্রিম বা ঋণ হিসাবে দেওয়া যাবে, যা পরে কিস্তিতে বেতন থেকে সমন্বয় করা হবে।