চাঁপাইনবাবগঞ্জে ‘অপহরণ ও গুমের’ শিকার এক গরু ব্যবসায়ীর লাশ পদ্মা নদীতে ভাসমান অবস্থায় পাওয়া গেছে। আজ মঙ্গলবার সদর উপজেলার আলাতুলি ইউনিয়নে পদ্মা নদীর মিডিল চর এলাকা থেকে লাশটি উদ্ধার করে পুলিশ। ওই স্থানটি রাজশাহীর গোদাগাড়ী থানা থেকে আনুমানিক ৫০০ গজ দূরে।
নিহত ব্যবসায়ীর নাম আহাদ আলী ওরফে কাজল ওরফে গোলকাজল (৩৪)। তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের চাকপাড়া গ্রামে বাসিন্দা মৃত আলতাফ হোসেনের ছেলে।
এর আগে দুপুরে গোদাগাড়ী থানার পাশে পদ্মা নদীতে আহাদের লাশ ভাসতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেন। পরে গোদাগাড়ী নৌ পুলিশ ফাঁড়ি ও গোদাগাড়ী থানা-পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান। কিন্তু ঘটনাস্থল চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হওয়ায় সেই থানা-পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পরে পুলিশ এসে লাশ উদ্ধার করে নিয়ে যায়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২ জানুয়ারি রাত থেকে নিখোঁজ ছিলেন আহাদ আলী। ৮ জানুয়ারি আহাদের স্ত্রী লিসা বেগম (৩০) বাদী হয়ে স্বামীকে অপহরণ ও গুমের অভিযোগে আটজনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাত আরও আটজনসহ মোট ১৬ জনের বিরুদ্ধে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর থানায় একটি মামলা করেন।
মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান ওমর আলী (৫২) ও জেলা তাঁতী লীগের সভাপতি নুরুল ইসলাম মেম্বার (৫০)।
এজাহারে বলা হয়, ১ জানুয়ারি সন্ধ্যা আনুমানিক ৬টার দিকে চরবাগডাঙ্গা বাজারে আলম ও নাজমুল হুদার সঙ্গে আহাদের কথা-কাটাকাটি হয়। পরদিন (২ জানুয়ারি) রাত সোয়া ৯টার দিকে আহাদের মোবাইলে একটি কল আসে। তাঁকে ডাকা হলে তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ জানিয়ে বাড়ি থেকে বের হতে চাননি।
কিছুক্ষণ পর হাসেম আলী নামের এক ব্যক্তি মোটরসাইকেল নিয়ে আহাদের বাড়ি আসেন। তিনি আহাদকে জানান, আগের দিন যে কথা-কাটাকাটি হয়েছে সেটা মীমাংসা করা হবে।
ঘটনাটি মীমাংসার জন্য ওমর আলী ও নুরুল ইসলাম মেম্বারসহ কয়েকজন আলমের বাড়িতে অপেক্ষা করছেন। হাসেমের পীড়াপীড়িতে শেষ পর্যন্ত আহাদ তাঁর মোটরসাইকেলের পেছনে বসে রওনা দেন। এরপর আহাদ আর বাড়ি ফেরেননি।
এদিকে মামলাটি দায়েরের পর আসামিপক্ষ মামলা প্রত্যাহার এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করে। তারা দাবি করে, ৩ জানুয়ারি গভীর রাতে চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের নাড়ুখাকি এলাকায় পদ্মা নদীতে একটি নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে। এতে আহাদ আলী নিখোঁজ হন। কিন্তু তদন্ত ছাড়াই থানা-পুলিশ অপহরণ ও গুমের মামলা নিয়েছে।
আসামিপক্ষের অভিযোগের পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে এবং তদন্ত ছাড়া মামলা গ্রহণ করার অভিযোগে সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নূরে আলমকে শোকজ করে জেলা পুলিশ। ওসি ইতিমধ্যে শোকজের জবাব দিয়েছেন।
নিহতের ভাই শওকত আলী দাবি করেন, তাঁর ভাইকে বাড়ি থেকে নিয়ে গিয়ে গুম করা হয়েছিল। তাঁকে হত্যার পর লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, লাশের সুরতহাল প্রস্তুতের সময় শরীরের কয়েকটি স্থানে আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে। এ ছাড়া আহাদের দাঁত ভাঙা ছিল বলেও তাঁরা জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নূরে আলম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমরা সুরতহালে কী পেলাম তা পরে জানানো হবে। এখনই কোনো মন্তব্য করছি না।’
ওসি বলেন, ‘তদন্ত চলবে। এখন লাশ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হবে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট আসার পরে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হবে।’
তিনি আরও বলেন, আহাদকে গুমের মামলায় তাঁরা ইতিমধ্যে কামরুজ্জামান বাচ্চু নামের একজনকে গ্রেপ্তার করেছেন। ওই আসামি বর্তমানে কারাগারে আছেন। আর তদন্ত ছাড়াই এ মামলা গ্রহণের ব্যাপারে তাঁকে জেলা পুলিশ যে শোকজ করেছিল, তিনি জবাব দিয়েছেন।