হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

ইরান যুদ্ধ: ইতিহাসে ট্রাম্প নায়ক হবেন, নাকি খলনায়ক

রাজিউল হাসান

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মজুত যেন ফুরাতেই চাইছে না। ছবি: এএফপি

ইরান যুদ্ধের এক মাস পার হয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত এই যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি বোঝা যাচ্ছে না। দিন যত যাচ্ছে, পরিস্থিতি তত জটিল হচ্ছে। জ্বালানি সরবরাহ বিপর্যস্ত হয়ে বিশ্ববাজার অস্থির। খোদ মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোই জানিয়েছে, ইরানের সরকারের চেয়ে দেশটির তেলে নজর বেশি ট্রাম্পের। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল আরেকটু এগিয়ে বলেছে, ইরানের ইউরেনিয়ামও চান মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এর জন্য তিনি প্রয়োজন হলে স্থল অভিযানও চালাবেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ট্রাম্প ইরান যুদ্ধ থেকে যা অর্জন করতে চান, তা কি আসলে পাবেন?

ইরাকে মার্কিন অভিযান পরিচালনার আগে ‘উইপন অব মাস ডেস্ট্রাকশন (গণবিধ্বংসী অস্ত্র)’ তত্ত্ব বেশ জোরেশোরে প্রচার হয়েছিল। মার্কিন গণমাধ্যমগুলো সে সময় এই তত্ত্বের বৈশ্বিক প্রচারের দায়িত্ব নিয়েছিল। তারপর ইরাকে চলল ব্যাপক অভিযান। গদিচ্যুত হলেন একনায়ক সাদ্দাম হোসেন। ফাঁসিকাষ্ঠেও ঝুলতে হলো তাঁকে। কিন্তু সেই গণবিধ্বংসী অস্ত্রের খোঁজ আজও পাওয়া যায়নি। বরং পরবর্তী সময়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোই আবার বলেছে, ইরাকে কোনোকালে এমন কিছু ছিল না।

সেই অভিযানের আগে-পরে কী ঘটেছে, অভিযানের পরিণতি কী হয়েছে, বিশ্ববাসী জানে। সেই ইরাকেই জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) জন্ম হয়। ছড়িয়ে পড়ে ইরাকের আশপাশের দেশগুলোয়ও। দিনে দিনে এই জঙ্গিগোষ্ঠী বৈশ্বিক আতঙ্কে রূপ নিয়েছিল। অতিসম্প্রতি অবশ্য তাদের দৌরাত্ম্য কমে এসেছে। কিন্তু ইরাকে আজও শান্তি ফেরেনি। এখনো সেখানে বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠী নানা তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।

আমি একনায়ককে সমর্থন করি না। কিন্তু সাদ্দাম হোসেনের পতন যেভাবে হয়েছে, তা কাম্য নয়। সেই ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে যে দগদগে ঘা তৈরি হয়েছে, তা আজও সারানো যায়নি। এর মধ্যেই ইরানে হামলা চালিয়ে বসেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এতে এই অঞ্চলের ঘা আরও বড় হবে, ক্রমান্বয়ে তা বিশ্ববাসীর জন্য ‘ক্যানসার’-এর রূপও নিতে পারে।

এখন ফেরা যাক, ট্রাম্প কি আসলেই ইরানের তেল ও ইউরেনিয়াম আহরণ করতে পারবেন? গায়ের জোরে এরই মধ্যে ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার পদচ্যুত প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে তাঁদেরই দেশ থেকে ‘ঘাড় ধরে’ নিজের দেশের কারাগারে পুরেছেন। ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টাও তিনি করেছেন। কিন্তু তাতে রাজি হয়নি বড় কোম্পানিগুলো। কারণ? ভেনেজুয়েলার তেল আহরণ করতে অবকাঠামোগত যে উন্নয়ন করতে হবে, তার খরচ বহন করে কোম্পানিগুলোর জন্য মুনাফা পাওয়া কঠিন হবে। ট্রাম্পের মুখের ওপর খোদ মার্কিন তেল কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তারা প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেছেন।

ভেনেজুয়েলার পর ট্রাম্পের মনোযোগ এখন ইরানের দিকে। হামলার প্রথম দিনেই মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী ইরানের সদ্যপ্রয়াত শীর্ষ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করেছে। মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন ইরানের আরও অনেক শীর্ষ কর্মকর্তা। কিন্তু এই দেশটির ক্ষেত্রে অদ্ভুত এক ঘটনা ঘটছে। শীর্ষ পর্যায়ের একজন নিহত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর জায়গায় চলে আসছেন অন্য একজন। ফলে শীর্ষ পদটি শূন্য থাকছে না, নেতৃত্বেও সংকট হচ্ছে না।

অন্যদিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মজুত যেন ফুরাতেই চাইছে না। তাদের হামলায় এরই মধ্যে বাহরাইনে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অ্যালুমিনিয়াম কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইসরায়েলের শিল্পাঞ্চলে হামলায় সফল হয়েছে তারা। অর্থাৎ এটুকু স্পষ্ট যে ইসরায়েলের বিশ্বখ্যাত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আর আগের মতো কাজ করছে না।

ইরান যুদ্ধের প্রথম পর্যায়েই বিশ্বের জ্বালানি পরিবহনের ‘লাইফলাইন’ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেছে। বিকল্প যে পথটি ছিল, সেটাও এখন হুমকিতে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা জড়িয়ে পড়ায়। তারা লোহিতসাগরকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে চাইছে বহু আগে থেকেই। ইরান যুদ্ধ তাদের জন্য বড় সুযোগ নিয়ে এসেছে।

সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বোমায় ইরান হয়তো অবকাঠামোগতভাবে পর্যুদস্ত হয়ে পড়েছে। কিন্তু তার জবাবে ইরান ও তার মিত্ররা যা করেছে, তাতে হুমকিতে পড়েছে গোটা বৈশ্বিক অর্থনীতি। ধরে নেওয়া যাক, এই যুদ্ধে ট্রাম্প বিজয়ী হলেন এবং তিনি ইরানের তেল ও ইউরেনিয়ামের মজুত দখলে নিলেন। কিন্তু সেই খনিজ সম্পদ কি তিনি আমেরিকান স্বার্থে ব্যবহার করতে পারবেন?

তেলসম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে দুর্নীতিতে ডুবে যাওয়া ভেনেজুয়েলার অবকাঠামোগত উন্নয়ন যদি কোম্পানিগুলোর কাছে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে মার্কিন বোমায় ধুলায় মিশে যাওয়া ইরান কতটা মুনাফা এনে দিতে পারবে তাদের? ইরাক যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, ইরান যুদ্ধের পর তা যে আরও বিস্তৃত হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এই অবস্থায় এই অঞ্চলে তেলসমৃদ্ধ মার্কিন মিত্ররা কতটা নিরাপদে তেল সরবরাহ করতে পারবে? বরং গোটা মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল-গ্যাসের সরবরাহ আরও বেশি বিপর্যস্ত হবে। ধসে পড়বে বিশ্ব অর্থনীতি।

যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেলের দাম গত মঙ্গলবার ব্যারেলপ্রতি ১১৫ মার্কিন ডলারে ঠেকেছে। অবিলম্বে জ্বালানি সরবরাহ ঠিক করা না গেলে এই দাম যে আরও বাড়বে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এরই মধ্যে খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই তেলের দাম ঊর্ধ্বগামী হয়েছে। ইউরোপ, এশিয়াসহ সমগ্র বিশ্ববাজারই অস্থির। ফলে নিঃসন্দেহে বলা যায়, ইরান যুদ্ধের প্রভাব এখন বিশ্বের প্রতিটা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে পড়তে শুরু করেছে। এভাবে পুরো বিশ্বকে ভুগিয়ে ট্রাম্প তাঁর দেশকে কতটা ‘মহান’ করতে পারবেন?

নির্বাচনের সময় ট্রাম্পের প্রচারের স্লোগান ছিল, ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন (আমেরিকাকে আবারও মহান কর)’। কিন্তু ইরান যুদ্ধে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের বোমায় যত মানুষ মরছে, মার্কিন মদদে ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে যেভাবে মানুষ মরছে, বাস্তুচ্যুত হচ্ছে, তাতে কি এই যুদ্ধে জিতলেও আমেরিকা মহান থাকবে বা হতে পারবে? এমনিতেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রশ্রয়ে ইসরায়েল যেভাবে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে মানুষ মারছে, মানবিক বিপর্যয় ঘটাচ্ছে, তা নিয়ে মার্কিন প্রশাসন প্রশ্নবিদ্ধ। তার সঙ্গে এভাবে রক্তের দাগ হাতে মেখে ট্রাম্পইবা কতটা মহান হতে পারবেন?

ডোনাল্ড ট্রাম্প এবার দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায়। তাঁর এ মেয়াদ শেষ হবে ২০২৯ সালের ১০ জানুয়ারি। মার্কিন সংবিধান অনুসারে এরপর তাঁর আর ক্ষমতায় ফেরার সুযোগ নেই। সে হিসাবে তিনি ক্ষমতায় আছেন আর দুই বছর ১০ মাস। দ্বিতীয় মেয়াদের ক্ষমতার প্রথম বছরেই তিনি যা যা করে ফেলেছেন, তাতেই বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি অনেকটা ক্ষুণ্ন হয়েছে। আমেরিকাকে মহান করতে গিয়ে তিনি তাঁর দেশকে অনেক উদার নীতি থেকে সরিয়ে এনেছেন। জড়িয়েছেন যুদ্ধে। ক্ষমতার বাকি সময়টা জুড়েও যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে, তাহলে প্রচলিত বিশ্বব্যবস্থা যে একেবারে ভেঙে পড়বে, তা অনেকটাই স্পষ্ট। আর সেই ভেঙে পড়া বিশ্বব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র কতটা মহান থাকতে পারবে, তা-ও এখনই ভেবে দেখা দরকার।

রাজিউল হাসান, উপ বার্তা সম্পাদক আজকের পত্রিকা

নতুন এক যুগের সূচনা

অবৈধ পথে ইউরোপযাত্রা

পুরুষের মতো নয়, মানুষের মতো

হাসান হাফিজুর রহমানের সাহিত্য-প্রচেষ্টা

একাত্তরে গণহত্যা: মার্কিন কংগ্রেসে প্রস্তাব বাংলাদেশের কূটনৈতিক অর্জন

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ কোথায় গিয়ে দাঁড়াল

বাসাভাড়া ২৪ ঘণ্টার, গেট কেন রাত ১১টার পর বন্ধ

নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকিতে শিক্ষার্থীরা

দাহকাল উতরানো কতটা সহজ

অটুট মনোবল অটুট স্বাধীনতা