মিয়ানমারে জান্তা সরকার আয়োজিত তথাকথিত জাতীয় নির্বাচন গত ২৮ ডিসেম্বর শেষ হয়েছে। এই নির্বাচনের পর দেশজুড়ে জান্তাবিরোধী হামলা নতুন করে বৃদ্ধি পেয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের সীমান্ত সংলগ্ন রাজ্য রাখাইনের রাজধানী সিতওয়ে এবং উপকূলীয় শহর কায়াকফিউতে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে।
স্থানীয় সূত্রগুলো থাইল্যান্ড থেকে প্রকাশিত মিয়ানমারের সংবাদমাধ্যম দ্য ইরাবতীকে জানিয়েছে, আরাকান আর্মি (এএ) এখন কায়াকফিউতে রক্ষণাত্মক অবস্থান থেকে আক্রমণাত্মক অভিযানে নেমেছে। এই শহরটি চীনের বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রকল্পের কেন্দ্রবিন্দু। আরাকান আর্মির সদস্যরা এখন শহরের আরও কাছাকাছি চলে আসছে এবং আশপাশের সামরিক চৌকিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে।
আরাকান আর্মির ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বলেছে, ‘লড়াই এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি তীব্র।’ কায়াকফিউতে ৩২ নম্বর পুলিশ ব্যাটালিয়ন এবং অন্যান্য সামরিক চৌকির কাছে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। বাসিন্দারা জানিয়েছেন, আরাকান আর্মি সেনাবাহিনীর যাতায়াতের পথ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে এবং জান্তা বাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কায়াকফিউ বন্দরে দানিয়াবতী নৌ সদর দপ্তর, ৩৪ পদাতিক ব্যাটালিয়ন, ৫৪২ ও ৫৪৩ হালকা পদাতিক ব্যাটালিয়ন এবং দুটি নৌঘাঁটিসহ বেশ কিছু সামরিক ইউনিট রয়েছে।
এই জাতিগত রাখাইন সশস্ত্র গোষ্ঠীটি ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে কায়াকফিউতে প্রথম অভিযান শুরু করেছিল। তখন তারা গ্রামাঞ্চলের অনেকটা অংশ দখল করে শহরের ৮ কিলোমিটারের মধ্যে চলে আসে। নভেম্বরে জান্তা বাহিনীর পাল্টা আক্রমণে আরাকান আর্মি কিছু অবস্থান থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল, কিন্তু ডিসেম্বরে তারা পাল্টা আঘাত হানে এবং এরপর থেকে হামলার তীব্রতা বাড়িয়েছে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কায়াকফিউতে ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এদিকে, সিতওয়ে এলাকায় গত রোববার তিনটি গ্রামের কাছে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। জনৈক বাসিন্দা মঙ্গলবার দ্য ইরাবতীকে বলেন, ‘৪ জানুয়ারি সকাল থেকে আমরা গুলির শব্দ শুনছি।’
সিতওয়ে শহরটি তিন দিকে পানি দিয়ে ঘেরা হওয়ায় এটি দখল করা বেশ কঠিন। সামরিক বাহিনী শহরের বাইরের সম্মুখ সারির চৌকিগুলোতে শক্তি বৃদ্ধি করেছে, মেশিনগানবাহী গাড়ি মোতায়েন করেছে এবং প্রতিদিন টহল দিচ্ছে। আরাকান আর্মির ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো দাবি করেছে যে, ড্রোন এবং ভারী অস্ত্র দিয়ে সাম্প্রতিক হামলায় জান্তা বাহিনীর ‘কয়েক ডজন’ সদস্য নিহত হয়েছে।
একই সময়ে জান্তা বাহিনীর গোলাবর্ষণ এবং বিমান হামলা পাওকতাও ও পোন্নাগ্যুন উপজেলার দূরবর্তী গ্রামগুলোতেও আঘাত হেনেছে। শহরের ভেতরে জান্তা সেনা এবং তাদের সহযোগী আরাকান লিবারেশন পার্টির (এএলপি) সদস্যরা সাধারণ মানুষের বাড়িতে তল্লাশি ও গ্রেপ্তার অভিযান চালাচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
সিতওয়ে হলো জান্তা শাসনের তথাকথিত রাজ্য প্রশাসনের কেন্দ্র। এখানে আঞ্চলিক অপারেশন কমান্ড, নৌ সদর দপ্তর এবং যুদ্ধ সহায়তাকারী ইউনিটসহ প্রায় ডজনখানেক সামরিক ইউনিট রয়েছে। এ ছাড়া আন্ন উপজেলা আরাকান আর্মির দখলে যাওয়ার পর সেখান থেকে পালিয়ে আসা ওয়েস্টার্ন কমান্ডের জান্তা সৈন্যরাও সিতওয়েতে এসে পুনরায় সমবেত হয়েছে।
গত ২৮ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর সংঘাতের এই তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে। জান্তার নিয়ন্ত্রণে থাকা ১০২টি উপজেলায় এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যা মধ্য মিয়ানমারেও নতুন করে প্রতিরোধের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। রাখাইনের ১৭টি উপজেলার মধ্যে মাত্র তিনটিতে—সিতওয়ে, কায়াকফিউ এবং জনবিরল মানাউং দ্বীপে—ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছিল, যার বেশির ভাগই ছিল সামরিক গ্যারিসনগুলোর ভেতরে। তবে জান্তা সরকারের অদ্ভুত মিশ্র নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে তারা পুরো রাজ্যের জন্য একটি আইনসভা গঠন করতে সক্ষম হয়েছে।
রাখাইন রাজ্য বিধানসভার ১৭টি আসনের মধ্যে জান্তার প্রক্সি দল ইউএসডিপি ৯টি আসনে জয়ী হয়েছে। বাকি ৮টি আসন ভাগ করে নিয়েছে তাদের অনুগত দুটি জাতিগত দল। উচ্চকক্ষের ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে, যেখানে রাখাইনের জন্য নির্ধারিত ৬টি আসনের মধ্যে ৩টি পেয়েছে ইউএসডিপি।
প্রবীণ রাখাইন রাজনীতিবিদ উ পে থান বলেন, এই নির্বাচনের ফলাফল কেবল একটি সামরিক আধিপত্যের আইনসভাই নিশ্চিত করবে। তিনি ইরাবতীকে বলেন, ‘রাখাইন পার্লামেন্টে রাখাইন জনগণের কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। এই সংসদ স্রেফ সামরিক বাহিনীর এজেন্ডা বাস্তবায়ন করবে। শেষ পর্যন্ত এই সংকটের সমাধান হবে যুদ্ধের ময়দানেই।’
আরাকান আর্মির লক্ষ্য এখন সিতওয়ে এবং কায়াকফিউয়ের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়া। জনৈক রাখাইন সামরিক পর্যবেক্ষক বলেন, ‘আরাকান আর্মি এই শহরগুলোকে জান্তার দখলে রেখে দেবে না, তাই একটি চূড়ান্ত লড়াই এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।’