প্রতিবছর কোরবানির ঈদ ঘিরে সারা দেশ থেকে সংগৃহীত চামড়া আসে সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে। একসঙ্গে এই বিপুল পরিমাণ চামড়া প্রবেশ করায় তার সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত কার্যক্রমে সরাসরি কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) ব্যবস্থাপনায় তৈরি হয় অতিরিক্ত চাপ। সেই বাস্তবতা মাথায় রেখেই এ বছরের ব্যবস্থাপনায় নিয়ন্ত্রণমূলক একাধিক সমন্বিত কৌশল যোগ করা হয়েছে।
রিস্থিতি সামাল দেওয়ার প্রধান কৌশল হিসেবে কোরবানির পরপরই চামড়ার অবাধ চলাচলে সারা দেশে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। এর ফলে ঈদের পর প্রথম ১০ দিন ঢাকার বাইরের কোনো কাঁচা চামড়া এই শিল্পনগরীতে ঢুকতে পারবে না। কেবল পরিস্থিতি বুঝেই সংগৃহীত চামড়ার ধাপে ধাপে প্রবেশের অনুমতি মিলবে।
পুরো প্রক্রিয়ায় চাপ কমাতে চামড়া সংরক্ষণব্যবস্থায়ও বিশেষ নির্দেশনা এসেছে। প্রতিটি কাঁচা চামড়া ভালোভাবে রক্ত ও মাংস পরিষ্কার করে ৮ থেকে ১০ কেজি লবণ ব্যবহার করে সংরক্ষণ করতে বলা হয়েছে। এতে চামড়া তিন মাস পর্যন্ত ভালো থাকবে, ফলে দ্রুত ট্যানারিতে পাঠানোর চাপও কমবে এবং সিইটিপির ওপর তাৎক্ষণিক অতিরিক্ত চাপ নিয়ন্ত্রিত হবে।
অন্যদিকে চামড়াশিল্পে উৎপন্ন কঠিন ও তরল বর্জ্য রিসাইকেল করে জেলাটিন, ক্যাপসুল কভার ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রোটিন পাউডারের মতো পণ্য তৈরি করে বিদেশে রপ্তানির উদ্যোগও জোরদার করা হয়েছে।
সিইটিপি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শিল্পনগরের ১৪৭টি কারখানা থেকে উৎপন্ন রাসায়নিক মিশ্রিত তরল বর্জ্যের একটি অংশ প্রতিটি কারখানার নিজস্ব প্রাথমিক শোধনাগারে পরিশোধিত হয়, যা মোট বর্জ্যের প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ। বাকি অংশ আসে কেন্দ্রীয় শোধনাগারে। চামড়া শিল্পনগরে বছরে প্রায় ৯০ হাজার টন কঠিন বর্জ্য তৈরি হয়। এর মধ্যে ১৬ হাজার টন কাঁচা চামড়ার টুকরা, যা রিসাইকেল করে রপ্তানিযোগ্য পণ্য তৈরি হচ্ছে।
ঈদের পর পরিস্থিতি আরও চ্যালেঞ্জিং হয়ে ওঠে। প্রতিদিন প্রায় ৪৫ হাজার ঘনমিটার তরল বর্জ্য শোধনের প্রয়োজন হয়, অথচ বর্তমান সক্ষমতা দৈনিক ১৪ থেকে ১৮ হাজার ঘনমিটার। এটি ২০ থেকে ২২ হাজার ঘনমিটারে উন্নীত করার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি রেশনিং পদ্ধতিতে ট্যানারি চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে, যাতে একসঙ্গে অতিরিক্ত বর্জ্য সৃষ্টি না হয়।
তবে এই পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন ট্যানারির মালিকেরা। একে লেদার কমপ্লেক্সের প্রধান চামড়া প্রকৌশলী সৈয়দ রুবেল হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, কাঁচা চামড়া ‘ওয়েট ব্লু’ অবস্থায় নিতে ৭২ ঘণ্টা সময় লাগে, এরপর ‘ক্রাস্ট’ পর্যায়ে যেতে আরও ২৪ ঘণ্টা প্রয়োজন হয়। পুরো প্রক্রিয়ার জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ অপরিহার্য। কিন্তু বর্তমানে দৈনিক ৮ থেকে ৯ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। এর ফলে জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত প্রায় আড়াই কোটি টাকার চামড়া নষ্ট হয়েছে।
সৈয়দ রুবেল হোসেন মনে করেন, সক্ষমতা না বাড়িয়ে রেশনিং পদ্ধতিতে উৎপাদন চালু রাখার সিদ্ধান্ত বাস্তবসম্মত হবে না।
আজমির লেদারের মালিক মো. শহীদুল্লাহও একই উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, কোরবানির সময় রেশনিং ব্যবস্থা চালু হলে ক্ষতি আরও বাড়বে। কারণ বছরের সবচেয়ে বেশি চামড়া এ সময়ই আসে।
সিইটিপির ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম শাহনেওয়াজ বলেন, সারা বছরে যত চামড়া আসে, তার প্রায় অর্ধেকই আসে কোরবানির ঈদের পর। এ বাস্তবতায় কেন্দ্রীয় শোধনাগারের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বড় কারখানাগুলোকে নিজস্ব তরল বর্জ্য শোধনাগার স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে ছয়টি ট্যানারি এ অনুমোদন পেয়েছে। তিনি জানান, পর্যায়ক্রমে আরও বড় ট্যানারিকে এই ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে।