অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাতিল হওয়া ২৭টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের মধ্যে ৬টি আবার ফেরত এনেছে সরকার। এ জন্য কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুতের ক্রয়মূল্য গড়ে আড়াই সেন্ট কমিয়ে (১০০ সেন্টে ১ ডলার) চুক্তি করা হয়েছে। পাশাপাশি নতুন ছয়টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। নতুন এই ১২টি প্রকল্পের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ৯১৮ মেগাওয়াট। প্রকল্পগুলো আগামী দুই বছরের মধ্যে চালু করতে হবে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিদ্যুৎ-জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ আইনের আওতায় অনুমোদিত ৩১টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করা হয়। সংশ্লিষ্ট বিতর্কিত আইনটি বাতিল হওয়াতেই নির্মাণের বিভিন্ন পর্যায়ে থাকা এসব প্রকল্প বাতিল করা হয় বলে অন্তর্বর্তী সরকার জানিয়েছিল। বাতিল হওয়া এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ২ হাজার ৭২৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার ২৭টি সৌর এবং চারটি বায়ু ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ছিল।
পিডিবির একজন কর্মকর্তা জানান, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত তারা ৫৫টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য ধাপে ধাপে দরপত্র আহ্বান করেছিলেন। এসব প্রকল্পের মোট সক্ষমতা ধরা হয়েছিল ৫ হাজার ২৩৮ মেগাওয়াট। ১২টি প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট দরদাতাদের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। এগুলোর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাতিল করা ৬টি প্রকল্প রয়েছে। বাকি ৬টি প্রকল্প নতুন।
আগের দরপত্র বাতিল করে নতুন দরপত্র করায় সরকারের জন্য ক্রয়মূল্যের ক্ষেত্রে কিছুটা সাশ্রয় হয়েছে। সূত্র জানায়, বাতিল হওয়া ৩১টি প্রকল্পের বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিট সর্বোচ্চ ৮ দশমিক ৩২ সেন্ট থেকে সর্বনিম্ন ৭ দশমিক ৪৯ সেন্টের মধ্যে ছিল। এসব প্রকল্পে বিদ্যুতের গড় মূল্য ছিল ৭ দশমিক ৯৩ সেন্ট। নতুন করে সই হওয়া ১২টি প্রকল্পে গড়ে ২ সেন্ট হারে ক্রয়মূল্য কমেছে।
এ বিষয়ে পিডিবির চেয়ারম্যান রেজাউল করিম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘সরকারের পরিকল্পনার ধারাবাহিকতায় বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন ধাপে ১২টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য আমরা চুক্তিবদ্ধ হয়েছি। আগে বাদ পড়া প্রকল্পের পাশাপাশি নতুন প্রকল্প এখানে রয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য পূরণে সামনে আরও কয়েকটি প্রকল্পের বিষয়ে আমরা দরপত্র প্রকাশ করব।’
পাবনার ঈশ্বরদীতে একটি ৭০ মেগাওয়াট কেন্দ্র স্থাপনে ২০২২ সালে দুটি কোরীয় কোম্পানি ও একটি স্থানীয় কোম্পানির অনুকূলে আগ্রহপত্র (এলওআই) ইস্যু করা হয়েছিল। এই প্রকল্পে বিদ্যুতের ইউনিট মূল্য ছিল ১০ দশমিক ১৫ সেন্ট। ২০২৫ সালের আগস্টে সেই এলওআই বাতিল করে কাজ দেওয়া হয় প্যারামাউন্ট হোল্ডিং ও প্যারামাউন্ট টেক্সটাইল জয়েন্ট ভেঞ্চারকে। এবার প্রতি ইউনিটের দাম ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৯০ সেন্ট।
নোয়াখালীর সুধারামে ১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে ইনফ্রেকো এশিয়া, গ্রিনসেল জিএমবিএইচ ও গ্লোবাল গ্রিনজেন নামের একটি কনসোর্টিয়ামকে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে কাজ দেওয়া হয়েছিল। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য ধরা হয়েছিল ৯ দশমিক ৯৭ সেন্ট। ২০২৫ সালের আগস্টে সেই চুক্তি বাতিল হওয়ার পর নতুন করে চুক্তি করা হয় মাহিন-বিদ্যুলংকা নামের একটি জয়েন্ট ভেঞ্চার কোম্পানিকে। এখানে বিদ্যুতের দাম ধরা হয়েছে প্রতি ইউনিট ৭ দশমিক ৪৯ সেন্ট।
নীলফামারীর জলঢাকায় ৫০ মেগাওয়াট কেন্দ্র তৈরির কাজ দেওয়া হয়েছিল এএসকে, এজে ও এনিটএন সল্যুশন নামের একটি কনসোর্টিয়ামকে। তাদের উৎপাদিত বিদ্যুতের মূল্য ধরা হয়েছিল প্রতি ইউনিট ৯ দশমিক ৯৮ সেন্ট। তবে নতুন দরপত্রে কনকর্ড-প্রগতি কনসোর্টিয়াম ৮ দশমিক ২৬ সেন্টে বিদ্যুৎ দিতে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে।
কক্সবাজারের মাচুয়াখালীতে ১০০ মেগাওয়াট কেন্দ্র স্থাপনের কাজ দেওয়া হয়েছিল ডেট্রোলিক এসএ ইন্টারন্যাশনাল ও পাওয়ারনেটিক এনার্জি নামের একটি কনসোর্টিয়ামকে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে ৯ দশমিক ৯৮ সেন্টে তাদের কাজ দেওয়া হলেও তেমন অগ্রগতি ছিল না। ২০২৫ সালের আগস্টে চুক্তি বাতিলের পর এখন ৮ দশমিক ০৯ সেন্টে কনফিডেন্স পাওয়ার বগুড়া ইউনিট-২ লিমিটেডকে কাজ দেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজার ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড সাবস্টেশনের কাছে আরেকটি ১০০ মেগাওয়াট কেন্দ্র স্থাপনের জন্য কাজ দেওয়া হয়েছিল কেএআই-আলটেক কনসোর্টিয়ামকে। প্রতি ইউনিটের দাম ধরা হয়েছিল ৯ দশমিক ৮৯ সেন্ট। ২০২৫ সালের অক্টোবরে চুক্তি বাতিলের পর নতুন করে চায়না নর্থইস্ট ইলেকট্রিক পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড সার্ভিস ও বিএম স্টার ট্রেডের জয়েন্ট ভেঞ্চারকে কাজ দেওয়া হয়। প্রতি ইউনিটের দাম ধরা হয় ৬ দশমিক ৫৩ সেন্ট।
বাগেরহাটের মোংলায় ১০০ মেগাওয়াট কেন্দ্র স্থাপন করতে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিত এশিয়ান এনটেক পাওয়ার করপোরেশন ও এজিয়ার কনসোর্টিয়ামকে কাজ দেওয়া হয়েছিল। প্রতি ইউনিটের দাম ধরা হয়েছিল ৯ দশমিক ৯৫ সেন্ট। সেই চুক্তি বাতিল করে কনফিডেন্স পাওয়ার বগুড়া ইউনিট-২ এবং এশিয়ান এনটেক পাওয়ার করপোরেশনের জয়েন্ট ভেঞ্চারকে নতুন করে কাজ দেওয়া হয়েছে। প্রতি ইউনিটের দাম ধরা হয়েছে ৮ টাকা ০৯ পয়সা।
চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে ১৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কাজ দেওয়া হয়েছে এফজিএল-এফএইচএল-জিবিবি কনসোর্টিয়ামকে। তাদের প্রতি ইউনিটের দাম ধরা হয়েছে ৮ দশমিক ৩২ সেন্ট।
চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে ৪৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে কর্ণফুলী-ইনফ্রাকো কনসোর্টিয়াম। প্রতি ইউনিটের দাম ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৭৭ সেন্ট। ফটিকছড়িতে ২০০ মেগাওয়াটের আরেকটি কেন্দ্র স্থাপন করছে কনফিডেন্স পাওয়ার হোল্ডিং। প্রতি ইউনিটের দাম ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৭৫ সেন্ট। মৌলভীবাজারে ২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে প্যারামাউন্ট হোল্ডিং ও প্যারামাউন্ট টেক্সটাইল জয়েন্ট ভেঞ্চার। প্রতি ইউনিটের দাম ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৬৬ সেন্ট।
হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে ৫০ মেগাওয়াট (নির্মাণাধীন) কেন্দ্রটি পেয়েছে প্যারামাউন্ট হোল্ডিং ও প্যারামাউন্ট টেক্সটাইল জয়েন্ট ভেঞ্চার। প্রতি ইউনিটের দাম ধরা হয়েছে ৮ দশমিক ১৩ সেন্ট।
এ ছাড়া পাবনায় ১৫০ মেগাওয়াটের একটি কেন্দ্র স্থাপন করছে প্যারামাউন্ট হোল্ডিং ও প্যারামাউন্ট টেক্সটাইল জয়েন্ট ভেঞ্চার। প্রতি ইউনিটের দাম ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৮৯ সেন্ট।
বিদ্যুৎ খাতের বিশেষজ্ঞ ইনস্টিটিউট অব এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) মুখ্য বিশ্লেষক শফিকুল আলম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘এই প্রকল্পগুলো যদি বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে তা ভবিষ্যতের জন্য একটা বেঞ্চমার্ক (মানদণ্ড) হতে পারে। সরকার নতুন টেন্ডারের মাধ্যমে দাম কমানোর যে উদ্যোগ নিল, তা-ও সফলতার মুখ দেখবে। নতুন এই ১২টি প্রকল্পের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের দিকটাও পরিষ্কার হলো। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ যে আরও কম দামে পাওয়া সম্ভব, সেটাও দেখা গেল।’