হাওরের ফসল
সুনামগঞ্জের হাওরগুলোতে গেল বর্ষায় প্রচণ্ড পানিস্বল্পতা ছিল। পানি কম থাকায় অক্ষত রয়েছে অধিকাংশ ফসল রক্ষা বাঁধ। বিগত সময়ের তুলনায় ক্লোজারও (বড় ভাঙন) কমেছে সম্ভাব্য বাঁধগুলোতে। কিন্তু যেনতেন প্রাক্কলন, মনগড়া জরিপের মাধ্যমে বাড়ানো হয়েছে বরাদ্দ। হাওর সচেতন মানুষের অভিযোগ, বরাদ্দ বাড়িয়ে সরকারি অর্থ লুটপাটের ক্ষেত্র তৈরি করা হয়েছে। বেশ কয়েকটি হাওরের অর্ধশতাধিক প্রকল্প এলাকা ঘুরে অভিযোগের সত্যতাও মিলেছে।
সম্প্রতি হাওর ঘুরে দেখা যায়, তাহিরপুরের শনির হাওরের বিপজ্জনক ক্লোজার (ভাঙন) হিসেবে পরিচিত লালুরগোয়ালা এখন সড়কসদৃশ রাস্তা। এ হাওরের নান্টুখালি বাঁধ ও স্লুইচগেটসংলগ্ন (যেখানে গত বছর বিশাল ভাঙন ছিল) বৈজ্ঞানিক বাঁধ এলাকা পুরোপুরি অক্ষত। তবে এ হাওরের দুই-এক জায়গায় ভাঙনের দেখা পেলেও অন্যান্য বছরের তুলনায় তা কম। জামালগঞ্জের হালি হাওরের বদরপুর-হাওড়িয়া আলীপুরের মধ্যস্থলে গেল মৌসুমের ঘনিয়ার কাড়া অংশের বিপজ্জনক ক্লোজারটি এ বছর নেই। তৎসংলগ্ন রাজধরপুর থেকে রামজীবনপুর, পৈন্ডুব হয়ে মামুদপুর, দুর্গাপুর, মদনাকান্দি পর্যন্ত বাঁধের তেমন ক্ষতি হয়নি। এ ছাড়া আছানপুর, হরিপুর, সুন্দরপুর হয়ে উলুকান্দি-যতীন্দ্রপুর গ্রামের আশপাশের প্রায় ১০ কিলোমিটার বাঁধে বড় ধরনের কোনো ভাঙন নেই। তবে নেতুয়ার কাড়া এলাকায় ছোটখাটো একটি ভাঙন আছে। গেল মৌসুমেও তার আশপাশে এর চেয়ে বড় একটি ভাঙন ছিল বলে জানা গেছে।
ধর্মপাশা উপজেলার সোনামড়ল হাওরের একাংশ এবং দিরাই ও শাল্লা উপজেলার বরাম হাওর ও ছায়ার হাওরের সম্ভাব্য বাঁধের একাংশ ঘুরে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাড়তি বরাদ্দের বিষয়টি প্রতীয়মান হয়েছে। এ ছাড়া স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বললে কেউ কেউ বাঁধে বেশি বরাদ্দের ব্যাপারে সহমত পোষণ করেছেন।
পরিচয়ে অনিচ্ছুক শাল্লা উপজেলার ছায়ার হাওরপারের এক কৃষক বলেন, গত বছরের ১২ লাখ টাকার প্রকল্পে এবার ২৩ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। এ রকম বরাদ্দ বেড়েছে অনেক প্রকল্পেই। এই বরাদ্দ কৃষকের স্বার্থে না, লুটপাটের জন্য দেওয়া হয়েছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৭২৭টি প্রকল্পে ৫২০ কিলোমিটার বাঁধে বরাদ্দ ছিল ১২১ কোটি টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১ হাজার ৭৬টি প্রকল্পে বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়ায় ২০৫ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫৯১ কিলোমিটার বাঁধে ৭৩৪টি প্রকল্পের বিপরীতে বরাদ্দ ১৩০ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১২ উপজেলার ৫৩টি হাওরে ৬৮৭ প্রকল্পে বাঁধের কাজ হয়েছিল। যার প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ১২৭ কোটি টাকা।
চলতি বছরে অনেক বাঁধ অক্ষত এবং ক্লোজার কম থাকার পরও বরাদ্দ বেড়েছে ১৭ কোটি টাকা। এ বছর ১২ উপজেলার ৭০৩টি প্রকল্পে প্রাক্কলিত ব্যয় ১৪৪ কোটি টাকা বলে জানিয়েছে সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
জামালগঞ্জের মহালিয়া হাওরপারের গতবারের এক প্রকল্প সভাপতি জানিয়েছেন, গত বছর ক্লোজার ছিল, এ বছর মহালিয়া হাওরে ক্লোজার নেই। বরাদ্দ বেশি কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, বরাদ্দ অবশ্যই বেশি। এখানে পার্সেন্টিজের বিষয় আছে।
শান্তিগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সোহেল তালুকদার বলেন, বেশির ভাগ বাঁধ অক্ষত আছে। ক্লোজারও কম। তবু দুই থেকে তিন গুণ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। যেন পুরোনো আদলে লুটপাটের মহোৎসব। যাচাই-বাছাই করে ভুয়া প্রাক্কলনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সভাপতি রাজু আহমেদ বলেন, এ বছর বরাদ্দ অনেক বেড়েছে। বাড়তি বরাদ্দের বিষয়টিতে মাঠ প্রশাসন ও পাউবো একে অন্যের ওপর দায় চাপাচ্ছে। বাঁধে বরাদ্দ বাড়ার ব্যাপারে পতিত সরকারের আমলে হয়তো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছিল। কিন্তু এখন বরাদ্দ বাড়িয়ে সরকারি অর্থ অপচয় কার স্বার্থে।
সুনামগঞ্জ জেলা কাবিটা মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, ‘বাঁধে বাড়তি বরাদ্দের বিষয়টি তদন্ত করে বেশি মনে হলে আমরা ব্যবস্থা নেব। আগামী সভায় বিষয়টি তোলা হবে।’