পৌষ মাসের শেষ দিন এলেই একসময় পুরান ঢাকার আকাশজুড়ে দেখা যেত ঘুড়ির রাজত্ব। রঙিন ঘুড়িতে ছেয়ে যেত ছাদ থেকে ছাদ, অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়ত উৎসবের আমেজ। তবে এ বছর সাকরাইন এলেও সেই চিরচেনা দৃশ্য আর চোখে পড়েনি। ঘুড়ির সংখ্যা যেমন কম ছিল, তেমনি উৎসবের সামগ্রিক আবহও ছিল অনেকটাই ম্লান।
আজ বুধবার পুরান ঢাকায় পালিত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী সাকরাইন উৎসব। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা প্রচারণা, স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের বিরোধিতা এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগের কারণে এ বছর উৎসবের আয়োজন তুলনামূলকভাবে কম।
সকালে ঘুড়ি, সন্ধ্যায় ডিজের দাপট
আজ সকাল থেকে কিছু এলাকায় সীমিত পরিসরে ছাদে ঘুড়ি ওড়াতে দেখা যায়। সূর্যের আলো ছড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আকাশে ভাসে কিছু রঙিন ঘুড়ি। তবে দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই আমেজ ক্রমেই ফিকে হয়ে আসে। সন্ধ্যার পর পটকা, আতশবাজি ও উচ্চশব্দের ডিজে গানের দাপটে ঘুড়ি উৎসবের ঐতিহ্যবাহী রূপ অনেকটাই চাপা পড়ে যায়।
সরেজমিনে শাঁখারীবাজার, সূত্রাপুর, গেন্ডারিয়া, নারিন্দা, কাগজীটোলা ও লক্ষ্মীবাজার ঘুরে দেখা যায়, ঘুড়ির দোকানগুলোতে পণ্য থাকলেও ক্রেতার উপস্থিতি কম। শাঁখারীবাজারের ঘুড়ি বিক্রেতা জিতু রায় বলেন, বিভিন্ন কারণে এবার ঘুড়ি বিক্রি আগের তুলনায় অনেক কম।
লক্ষ্মীবাজারের বিক্রেতা সন্তোষ বলেন, আগে জায়গায় জায়গায় দোকান বসত, মানুষের ভিড় থাকত। এবার তা নেই। সাকরাইনের আগের আমেজ আর দেখা যাচ্ছে না।
পুরান ঢাকার প্রবীণ বাসিন্দারাও উৎসবের বদলে যাওয়া রূপ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন। পুরান ঢাকার সূত্রাপুরের স্থানীয় বাসিন্দা আজিজুল হক বলেন, আগে সাকরাইনে আকাশ ঘুড়িতে ভরে যেত। এখন ঘুড়ি ওড়ানো কমে গেছে, সাকরাইন মানে হয়ে দাঁড়িয়েছে ডিজে পার্টি ও আতশবাজি। উৎসবের আসল রূপে ফিরে না গেলে একসময় ঘুড়ি ওড়ানোই হারিয়ে যাবে।
কলতাবাজারের বাসিন্দা রাফেজা বেগম বলেন, আগে বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ সাকরাইনের আনন্দে অংশ নিতে আসত, যা এখন আর দেখা যায় না। বর্তমানে উচ্চস্বরে সাউন্ড বক্স ও আতশবাজিই উৎসবের মূল আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। এতে ধীরে ধীরে সাকরাইনের ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিরোধিতা করছে কারা
প্রতিবছর সাকরাইন ঘিরে পুরান ঢাকায় বিশেষ আয়োজন থাকলেও ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর উৎসবটি নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি মহলের বিরোধিতা সামনে এসেছে। ফলে শতবর্ষী এই উৎসবের আয়োজন ও নিরাপত্তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা গেছে, নারিন্দা, গেন্ডারিয়া ও সূত্রাপুর এলাকার একাধিক মসজিদ থেকে কিছু মানুষ সাকরাইনের বিরুদ্ধে মিছিল করেছেন। পাশাপাশি শব্দদূষণ ও ধর্মীয় অনুশাসনের পরিপন্থী দাবি করে এলাকাবাসীর মধ্যে লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে। এর আগের বছরও ‘অশ্লীলতা ও অসামাজিক কার্যকলাপ’ বন্ধের দাবিতে সাকরাইনবিরোধী বিক্ষোভ দেখা যায়।
এ বিষয়ে আদি ঢাকা সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি মানস বোস বলেন, কেউ কেউ এই উৎসব বন্ধ করার চেষ্টা করছে, এলাকাবাসীর মধ্যে লিফলেট দিচ্ছে। তবে উৎসব বন্ধ করা যায় না, বরং উৎসবের নামে অশ্লীলতা ও অনিয়ম বন্ধ করা উচিত।
পুরান ঢাকার আলেম-ওলামাদের একটি অংশ সাকরাইনকে ধর্মীয় অনুশাসনের পরিপন্থী বলে মনে করছে। তাদের মতে, ঘুড়ি ওড়ানোর পাশাপাশি নাচ-গান, বাদ্যযন্ত্র ও উচ্চশব্দের আয়োজন আপত্তিকর।
তবে গবেষক ও বিশ্লেষকদের মতে, যার যার ধর্মীয় জায়গা থেকে উৎসবকে উৎসবের মতোই পালন করতে দেওয়া উচিত। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সানজিদা ফারহানা বলেন, ‘প্রতিটি ধর্মের নিজস্ব উৎসব রয়েছে। যে যার ধর্ম অনুসরণ করে, সে তার উৎসব পালন করবেই। আমরা যা পালন করি, সেটাই আমাদের সংস্কৃতি। তবে কোনো কিছু করতে গিয়ে যেন অন্যের কষ্ট না হয়, কারও ওপর যেন অত্যাচার না হয়, সেদিকে আমাদের সচেতন থাকতে হবে। ভিন্ন ধর্মের মানুষের প্রতি সহনশীলতা ও সম্মান বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। সমাজে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য সবার মাঝে পারস্পরিক সহনশীলতা থাকা প্রয়োজন।’
এদিকে সাকরাইন ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে নেওয়া হয়েছে বাড়তি সতর্কতা। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সাকরাইনে ঘুড়ি ওড়ানো অনুমোদিত হলেও ডিজে গান, ফানুস ও আতশবাজি নিষিদ্ধ।
সাকরাইনের সার্বিক নিরাপত্তা বিষয়ে কোতোয়ালি থানার উপপুলিশ কমিশনার ফজলুল হক বলেন, ঘুড়ি ওড়ানোয় পুলিশের কোনো আপত্তি নেই। তবে রাতে ডিজে পার্টি, ফানুস ও আতশবাজি বন্ধ রাখতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিকবার আলোচনা করা হয়েছে। সার্বক্ষণিক পুলিশ টহলও রয়েছে।