Ajker Patrika

ইরানের সঙ্গে চুক্তি ‘মোটামুটি চূড়ান্ত’ বলছেন ট্রাম্প, উদ্বেগে ইসরায়েল

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ইরানের সঙ্গে চুক্তি ‘মোটামুটি চূড়ান্ত’ বলছেন ট্রাম্প, উদ্বেগে ইসরায়েল
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এএফপি

ইরানের সঙ্গে একটি বড় ধরনের চুক্তি ‘মোটামুটি চূড়ান্ত’ হয়েছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান কয়েক মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘাত অবসান এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয় এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকছে।

তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এই চুক্তির কিছু শর্ত, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ট্রাম্পের দাবির বিরোধিতা করেছে।

শনিবার নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ‘আমেরিকা, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দেশগুলোর চূড়ান্ত অনুমোদন সাপেক্ষে একটি চুক্তির বিষয়ে আলোচনা প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে।’

তবে ইরানের পক্ষ থেকে ট্রাম্পের এই দাবি পুরোপুরি মেনে নেওয়া হয়নি। ইরানের রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত বার্তা সংস্থা ‘ফার্স নিউজ’ জানিয়েছে, চুক্তির সর্বশেষ প্রস্তাব অনুযায়ী হরমুজ প্রণালি ইরানের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে। ট্রাম্পের দাবিকে ‘বাস্তবতাবিবর্জিত’ আখ্যা দিয়ে সংবাদ সংস্থাটি জানায়, যুদ্ধের আগের তুলনায় জাহাজ চলাচলের সংখ্যা বাড়াতে ইরান সম্মত হলেও তার অর্থ এই নয় যে যুদ্ধপূর্বকালের মতো সেখানে সম্পূর্ণ ‘অবাধ যাতায়াত’ নিশ্চিত করা হবে।

চুক্তির সম্ভাব্য শর্তগুলো কী?

সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’ জানিয়েছে, খসড়া চুক্তিটি মূলত ৬০ দিনের একটি যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর প্রস্তাব, যা পারস্পরিক সম্মতিতে আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে। চুক্তির মূল বিষয়গুলো হলো:

হরমুজ প্রণালি উন্মুক্তকরণ: আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান রুট হরমুজ প্রণালি ধাপে ধাপে পুনরায় উন্মুক্ত করা হবে।

নিষেধাজ্ঞা শিথিল ও তেল বিক্রি: ইরানের ওপর মার্কিন বন্দর অবরোধ তুলে নেওয়া হবে এবং ইরানকে মুক্তভাবে তেল বিক্রির সুযোগ দিতে ওয়াশিংটন কিছু ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করবে।

সম্পদ অবমুক্তি: বিদেশের বিভিন্ন ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের ফ্রিজ বা জব্দ করা বিপুল অর্থ ছাড় দেওয়া হবে।

পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা: ইরানের অতি-উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুতসহ পরমাণু কর্মসূচির অমীমাংসিত বিষয়গুলো সমাধানের জন্য অন্তত ৩০ দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া হবে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অবশ্য জানিয়েছেন, চুক্তির খুঁটিনাটি বিষয়গুলো নিয়ে এখনো আলোচনা চলছে এবং চূড়ান্ত স্বাক্ষরের আগে কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসতে পারে।

আঞ্চলিক কূটনীতি ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতা

এই ঐতিহাসিক সমঝোতার পেছনে পাকিস্তান ও কাতার গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে বলে জানা গেছে। গত শুক্র ও শনিবার তেহরানে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিবিড় বৈঠক করেন। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী এই আলোচনাকে ‘অত্যন্ত ফলপ্রসূ’ বলে বর্ণনা করেছে।

আজ রোববার সকালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে শান্তি প্রক্রিয়ায় তাঁর ‘অসাধারণ প্রচেষ্টার’ জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশ ও তুরস্কের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে ট্রাম্পের একটি ফলপ্রসূ ফোনালাপের কথা উল্লেখ করেন।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, ওই ফোনালাপে আঞ্চলিক নেতারা ট্রাম্পকে ইরানের সঙ্গে এই শান্তি প্রস্তাব বা সমঝোতা স্মারকটি (এমওইউ) গ্রহণ করার জন্য জোরালো তাগিদ দিয়েছেন।

ইসরায়েলের উদ্বেগ

এদিকে, এই সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গেও আলাদাভাবে ফোনালাপ করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্প এটিকে ‘অত্যন্ত ইতিবাচক’ বৈঠক বলে উল্লেখ করলেও তেল আবিবের মধ্যে এ নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

ইসরায়েলি সূত্রগুলোর মতে, তাদের মূল ভীতি হলো—এই অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির ফলে হরমুজ প্রণালি খুলে যাবে এবং ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবে, কিন্তু তেহরানের পরমাণু কর্মসূচি বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ধ্বংসের বিষয়ে কোনো স্থায়ী গ্যারান্টি থাকবে না। উদ্ভূত পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য শনিবার সন্ধ্যায় নেতানিয়াহু তাঁর মন্ত্রিসভার জ্যেষ্ঠ সদস্য ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসেছেন।

ওয়াশিংটনে রাজনৈতিক বিরোধ

চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার আগেই ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরে এ নিয়ে তীব্র বাদানুবাদ শুরু হয়েছে। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এই চুক্তির তীব্র সমালোচনা করে এটিকে বারাক ওবামার আমলের ইরান চুক্তির সঙ্গে তুলনা করেছেন এবং এটিকে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির পরিপন্থী বলে অভিহিত করেছেন।

পম্পেওর এই সমালোচনার জবাবে হোয়াইট হাউসের কমিউনিকেশন ডিরেক্টর স্টিভেন চিউং অত্যন্ত কড়া ও আক্রমণাত্মক ভাষায় এক্স-এ লেখেন, ‘মাইক পম্পেও কী বলছেন সে বিষয়ে তাঁর কোনো ধারণাই নেই। তাঁর মুখ বন্ধ রাখা উচিত এবং আসল কাজ পেশাদারদের করতে দেওয়া দরকার।’

অন্যদিকে, সিনেটের আর্মড সার্ভিসেস কমিটির চেয়ারম্যান রজার উইকার এবং সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের মতো প্রভাবশালী রিপাবলিকান ‘ইরান-হক’ (কট্টরপন্থী) নেতারাও ট্রাম্পকে সতর্ক করেছেন। তাঁদের মতে, ইরানের ইসলামি সরকারের কাছে কোনো নরম মনোভাব দেখালে তা ওয়াশিংটনের দুর্বলতা হিসেবে প্রকাশ পাবে এবং ভবিষ্যতে ইসরায়েলের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয় ডেকে আনবে।

ইরানের অনড় অবস্থান

ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ চুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হলেও সুর নরম করেননি। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘ইরান নিজের অধিকার থেকে এক চুলও নড়বে না, বিশেষ করে এমন এক পক্ষের সঙ্গে যার কোনো সততা নেই এবং যাকে বিশ্বাস করা যায় না।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘চলমান যুদ্ধবিরতির সুযোগে আমাদের সশস্ত্র বাহিনী নিজেদের এমনভাবে পুনর্গঠিত করেছে যে, ট্রাম্প যদি পুনরায় যুদ্ধ শুরু করার ভুল করেন, তবে তা আমেরিকার জন্য যুদ্ধের প্রথম দিনের চেয়েও অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক ও তিক্ত হবে।’

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, চুক্তির খসড়ায় ৩০ ও ৬০ দিনের সময়সীমার কথা উল্লেখ থাকলেও এটি এখনো চূড়ান্ত নয়। তবে হরমুজ প্রণালি নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত ইরান, ওমান ও এর সীমান্তবর্তী দেশগুলোর পারস্পরিক সম্মতিতে হওয়া উচিত এবং এতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘কোনো ভূমিকা নেই’ বলে তিনি সাফ জানিয়ে দেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত