Ajker Patrika

বাংলা, ইতিহাস ও দর্শনের অনার্স কোর্স বাতিলের দাবিটি গুজব

ফ্যাক্টচেক ডেস্ক
বাংলা, ইতিহাস ও দর্শনের অনার্স কোর্স বাতিলের দাবিটি গুজব
বাংলা, ইতিহাস ও দর্শনসহ ৬টি বিষয়ের অনার্স কোর্স বাতিল হচ্ছে দাবিতে পোস্ট। ছবি: স্ক্রিনশট

দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও কর্মমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক করতে বড় ধরনের সংস্কারের অংশ হিসেবে বাংলা, ইতিহাস ও দর্শনের অনার্স কোর্স বাতিল হচ্ছে—এমন দাবিতে মূলধারার গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি সংবাদ ছড়িয়ে পড়েছে, যা মুহূর্তের মধ্যেই দেশজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও আলোচনার সৃষ্টি করেছে।

ছড়িয়ে পড়া সংবাদে দাবি করা হচ্ছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নতুন খসড়া মডেল অনুযায়ী বাংলা, ইতিহাস, দর্শনসহ প্রায় ছয়টি বিষয়ে অনার্স কোর্স পুনর্গঠন বা বাতিল করে সেগুলো অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে সমন্বয়ের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

জাতীয় দৈনিক কালের কণ্ঠ ‘বাতিল হচ্ছে বাংলাসহ ৬ বিষয়ের অনার্স কোর্স, প্রযুক্তিনির্ভর বিষয়ে গুরুত্ব’ এবং দৈনিক ইত্তেফাক ‘বাংলা, ইতিহাস ও দর্শনের অনার্স কোর্স বাতিল হচ্ছে’ এমন শিরোনামে আজ ৯ জুন সকালে সংবাদ প্রকাশ করলে তা দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়।

আলোচিত দাবিতে পোস্ট। ছবি: স্ক্রিনশট
আলোচিত দাবিতে পোস্ট। ছবি: স্ক্রিনশট

এমন তথ্য সামনে আসার পর থেকেই নেটিজেন ও শিক্ষাবিদরা সামাজিক মাধ্যমে নিজেদের উদ্বেগ ও মিশ্র মতামত শেয়ার করতে শুরু করেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য সালেহ হাসান নকীব নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে এমন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে একে ‘অত্যন্ত আশঙ্কাজনক’ এবং ‘হাতুড়ে শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের তথ্য-উপাত্তহীন কথাবার্তা’ বলে উল্লেখ করেন। অন্যদিকে, ‘Jabbar Al Nayeem’ নামের একজন ব্যবহারকারীও দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এমন পরিবর্তন নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন।

আজকের পত্রিকার অনুসন্ধান

আলোচিত দাবির সত্যতা যাচাইয়ে আজকের পত্রিকার ফ্যাক্টচেক টিম অনুসন্ধান শুরু করে। অনুসন্ধানে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, যায়যায়দিন, আরটিভি সহ দেশের একাধিক দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে বলা হয়—অনার্স কোর্স থেকে বাংলা, ইতিহাস ও দর্শন বিষয় তুলে দেওয়া হচ্ছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবিটি সম্পূর্ণ ‘ভিত্তিহীন’।

আজ মঙ্গলবার (৯ জুন) শিক্ষামন্ত্রীর একান্ত কর্মকর্তা নূরুল আফসার দীপু এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, বাংলা, ইতিহাস ও দর্শন বিভাগ বা বিষয় বাতিলের বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কিংবা সংশ্লিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যা প্রচার করা হচ্ছে, তা সঠিক নয়।

নূরুল আফসার দীপু এই গুজবে বিভ্রান্ত না হয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সরকারের আনুষ্ঠানিক সূত্র থেকে তথ্য নেওয়ার জন্য সর্বসাধারণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন। ছবি: স্ক্রিনশট
বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন। ছবি: স্ক্রিনশট

বিষয়টি নিয়ে আরও অনুসন্ধানে জানা যায়, আজ মঙ্গলবার (৯ জুন) সচিবালয়ে একনেক সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে খোদ শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন অনার্স পর্যায় থেকে বাংলা, ইতিহাস ও দর্শন বিষয় বাদ দেওয়ার খবরটিকে সম্পূর্ণ ‘ভিত্তিহীন’ বলে নাকচ করে দিয়েছেন। বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল যমুনা টিভির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য তুলে ধরা হয়।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘কোনো বিষয় বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়নি। চাহিদা অনুযায়ী অনার্সে নতুন বিষয় যুক্ত করার পর্যালোচনাও চলছে।’ সেই সাথে মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে নেওয়া প্রকল্প নিয়ে একনেকে আলোচনা হওয়ার কথা জানান তিনি।

একই বিষয়ে আজ সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘অনার্স (স্নাতক সম্মান) পর্যায়ে বাংলা, ইতিহাস ও দর্শন বিভাগ থাকবে। তবে সব জায়গায় থাকবে কিনা তা নিয়ে আলোচনা চলছে। এসব বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি।’

যমুনা টিভির প্রতিবেদন। ছবি: স্ক্রিনশট
যমুনা টিভির প্রতিবেদন। ছবি: স্ক্রিনশট

উল্লেখ্য, শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্প্রতি ২০২৭ সালের শিক্ষাবর্ষের জন্য নতুন শিক্ষাক্রম সংস্কার এবং কয়েকটি নতুন বিষয় যুক্ত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। তবে ওই সংস্কার পরিকল্পনার কোথাও অনার্স পর্যায়ে বাংলা, ইতিহাস বা দর্শন বিষয় বাতিলের কোনো ঘোষণা বা প্রস্তাব দেওয়া হয়নি। এই খসড়া পর্যালোচনার মাঝেই হুট করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়গুলো পুরোপুরি বাদ দেওয়া হচ্ছে বলে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়, যা পরবর্তীতে কিছু গণমাধ্যমেও সংবাদের শিরোনাম হয়েছে।

সিদ্ধান্ত

অনার্স (স্নাতক সম্মান) পর্যায় থেকে বাংলা, ইতিহাস ও দর্শনসহ ছয়টি মৌলিক বিষয় বাদ বা বাতিল করার দাবিটি সম্পূর্ণ গুজব। শিক্ষামন্ত্রী ও তথ্য উপদেষ্টার বক্তব্য অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষা সংস্কারের আলোচনা চললেও এসব বিষয় বাতিলের কোনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত নেওয়া হয়নি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদমাধ্যম বা যেকোনো মাধ্যমে প্রচারিত কোনো ছবি, ভিডিও বা তথ্য বিভ্রান্তিকর মনে হলে তার স্ক্রিনশট বা লিংক কিংবা সে সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য আমাদের ই-মেইল করুন। আমাদের ই-মেইল ঠিকানা [email protected]
Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত