
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে নৈতিকতা এবং গবেষণার দ্বন্দ্ব চিরন্তন। কিন্তু যখন এই দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে অসহায় নবজাতক এবং ভৌগোলিক সীমারেখা হিসেবে বেছে নেওয়া হয় আফ্রিকার কোনো দরিদ্র জনপদকে, তখন প্রশ্ন ওঠে বিজ্ঞান কি সত্যিই মানবতার সেবায় নিয়োজিত, নাকি এটি নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠী বা উন্নত দেশের রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার? সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গিনি-বিসাউতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে পরিচালিত হেপাটাইটিস বি টিকার একটি ট্রায়াল ঠিক এই প্রশ্নগুলোকে আবারও বিশ্বদরবারের সামনে নিয়ে এসেছে।
গিনি-বিসাউতে পরিচালিত এই ট্রায়ালটির নেতৃত্বে রয়েছে ডেনমার্কের ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ডেনমার্কের ‘বান্ডিম হেলথ প্রজেক্ট’। প্রায় ১.৬ মিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্পে অর্থায়ন করেছে যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র বা সিডিসি। গবেষণার মূল উদ্দেশ্য হলো টিকার ‘নন-স্পেসিফিক ইফেক্টস’ বা মূল রোগের বাইরে অন্য কোনো সাধারণ স্বাস্থ্যগত প্রভাব বা মৃত্যুর হারের ওপর টিকার ভূমিকা পরীক্ষা করা। এই পরীক্ষার জন্য প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার নবজাতককে বেছে নেওয়া হয়েছে।
সমালোচনার মূল জায়গাটি হলো গবেষণার পদ্ধতি। শিশুদের দুটি গ্রুপে ভাগ করা হয়েছে; এক গ্রুপকে জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হেপাটাইটিস বি টিকা দেওয়া হচ্ছে, আর অন্য গ্রুপকে সেই জীবনরক্ষাকারী ডোজ থেকে বঞ্চিত করে রাখা হচ্ছে অন্তত ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই এই টিকা দেওয়া হলে তা মা থেকে শিশুতে সংক্রমণ প্রতিরোধে ৯০ শতাংশের বেশি কার্যকর। গিনি-বিসাউতে হেপাটাইটিস বি-এর প্রাদুর্ভাব অত্যন্ত বেশি, যা ১৮ থেকে ১৯ শতাংশ। এই পরিস্থিতিতে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পরিবর্তে তাদের একটি দলকে ‘কন্ট্রোল গ্রুপ’ হিসেবে ব্যবহার করে সুরক্ষা থেকে দূরে রাখা আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের ‘হেলসিংকি ঘোষণা’ বা নৈতিক মানদণ্ডের চরম লঙ্ঘন।
প্রজেক্টের প্রধান গবেষক ড. ক্রিস্টিন স্ট্যাবেল বেন এবং ড. পিটার অ্যাবি দাবি করেছেন যে যেহেতু গিনি-বিসাউ সরকার ২০২৭ সালের আগে জাতীয়ভাবে ‘বার্থ ডোজ’ বা জন্মের সময় টিকা দেওয়ার কার্যক্রম শুরু করবে না, তাই তারা মূলত কোনো শিশুকে তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে না। তারা একে একটি ‘ইউনিক উইন্ডো’ বা সুযোগ হিসেবে দেখছে। কিন্তু এই যুক্তি নৈতিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেখানে আন্তর্জাতিক অনুদান ও পর্যাপ্ত টিকার মজুত রয়েছে, সেখানে শিশুদের কেন সরকারি পরিকল্পনার দোহাই দিয়ে মৃত্যুর ঝুঁকিতে রাখা হবে?
বিখ্যাত টিকা বিশেষজ্ঞ ড. পল অফিট এই ট্রায়ালকে ‘অত্যন্ত অনৈতিক এবং নিষ্ঠুর’ বলে অভিহিত করেছেন। অভিযোগ উঠেছে যে এই গবেষণার পেছনে বিজ্ঞানের চেয়েও বেশি কাজ করছে বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। যুক্তরাষ্ট্রে রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়রের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের টিকা-বিরোধী বা সংশয়বাদী
অবস্থান বিশ্বজুড়ে জনস্বাস্থ্য নীতিতে প্রভাব ফেলছে। অনেকে মনে করছেন, আমেরিকার অভ্যন্তরীণ টিকা নীতি পরিবর্তনের ক্ষেত্র তৈরি করতেই আফ্রিকার শিশুদের ওপর এই পরীক্ষা চালানো হচ্ছে। অর্থাৎ, উন্নত বিশ্বের রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রমাণের জন্য দরিদ্র দেশের শিশুদের জীবনের ঝুঁকি নেওয়া হচ্ছে।
আফ্রিকান শিশুদের ‘গিনিপিগ’ হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ নতুন কিছু নয়। এই ঘটনার শিকড় অনেক গভীরে। ১৯৯৬ সালে নাইজেরিয়ার কানো রাজ্যে ফাইজারের ট্রোভাফ্লক্সাসিন (ট্রোভান) অ্যান্টিবায়োটিক ট্রায়ালের কথা আজও মানুষ ভোলেনি। সেই মেনিনজাইটিস ট্রায়ালে ১১টি শিশু মারা গিয়েছিল এবং অসংখ্য শিশু পঙ্গুত্ব বরণ করেছিল। অভিভাবকেরা জানতেনই না যে তাদের সন্তানেরা কোনো ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অংশ। একইভাবে, যুক্তরাষ্ট্রের টাসকিগি সিফিলিস স্টাডি, যেখানে কয়েক দশক ধরে কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষদের সিফিলিসের চিকিৎসা না দিয়ে কেবল পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল, তা পশ্চিমা চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর আফ্রিকানদের মনে এক গভীর ক্ষোভ ও অবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে।
গিনি-বিসাউর এই বর্তমান ট্রায়ালটি সেই পুরোনো ক্ষোভকেই উসকে দিয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে গবেষণার খরচ কম, আইনি জটিলতা কম এবং অংশগ্রহণকারী খুব সহজেই পাওয়া যায়। এই সুযোগটিই কি পশ্চিমা গবেষকেরা নিচ্ছেন? ধনী দেশগুলোতে যে নৈতিক প্রটোকল কঠোরভাবে পালন করা হয়, আফ্রিকার ক্ষেত্রে কেন সেই মানদণ্ড শিথিল করা হবে? এই দ্বিচারিতা প্রমাণ করে যে বিশ্ব জনস্বাস্থ্যে এখনো বর্ণবাদী ও ঔপনিবেশিক মানসিকতা রয়ে গেছে।
২০২৫ সালের শেষে এই ট্রায়াল শুরু হলেও দ্রুতই এটি বিশ্বজুড়ে সমালোচনার মুখে পড়ে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে গিনি-বিসাউর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নড়েচড়ে বসে। দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং ‘আফ্রিকা সিডিসি’-এর মধ্যকার এক জরুরি বৈঠকের পর এই বিতর্কিত ট্রায়ালটি স্থগিত বা বাতিল করার ঘোষণা দেওয়া হয়। জানানো হয়েছে যে এর নৈতিক দিকগুলো আরও গভীরভাবে পর্যালোচনার প্রয়োজন। এই স্থগিতাদেশ ইঙ্গিত দেয় যে আফ্রিকার দেশগুলো এখন তাদের নাগরিকদের সুরক্ষায় আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। তারা আর উন্নত বিশ্বের পরীক্ষাগারের বস্তু হতে রাজি নয়।
বিজ্ঞান সব সময়ই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে চলে, কিন্তু জনস্বাস্থ্য চলে আস্থার ওপর। এ ধরনের অনৈতিক ট্রায়াল মানুষের মধ্যে টিকার প্রতি ভীতি ও সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দেয়। যদি মানুষ মনে করে যে টিকা তাদের সুরক্ষার বদলে গবেষণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তবে সামগ্রিক টিকাদান কর্মসূচি মুখ থুবড়ে পড়বে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে সেই শিশুরাই, যাদের রক্ষা করার কথা বলে এই গবেষণাগুলো শুরু হয়।
গিনি-বিসাউর এই ঘটনা আমাদের একটি বড় শিক্ষা দেয়। গবেষণার ফলাফল যাই হোক না কেন, তা কখনোই মানুষের জীবনের বিনিময়ে হওয়া উচিত নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রতিটি পদক্ষেপ হতে হবে স্বচ্ছ, সমতাভিত্তিক এবং সম্পূর্ণ নৈতিক। আফ্রিকার শিশুদের জীবন কোনো গবেষণাগারের ডেটা বা পরিসংখ্যান নয়; তারা এক একটি অমূল্য প্রাণ। বিজ্ঞানের জয়গান গাইতে গিয়ে যেন আমরা মানবিকতার পরাজয় না ঘটাই।
লেখক: শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

মো. সাজ্জাদুজ্জামান সজলের কথা মনে আছে? ২০২৪ সালের কথা। কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের উখিয়া রেঞ্জের দোছড়ি বিটের বিট কর্মকর্তা মো. সাজ্জাদুজ্জামান সজল। সদ্য বাবা হয়েছিলেন। উখিয়ার পাহাড় ধ্বংসকারী চক্র তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে বলে সে সময় অভিযোগ করা হয়।
৬ ঘণ্টা আগে
‘তেলাপোকা’ বা ‘আরশোলা’ শব্দটি শুনলেই মানুষের মধ্যে একধরনের সহজাত বিরক্তি কাজ করে। কেউ মুখ বিকৃত করেন, কেউ ঝাঁটা হাতে নেন, কেউ আবার কীটনাশকের কথা ভাবেন। কিন্তু মজার বিষয় হলো, পৃথিবীর ইতিহাসে তেলাপোকারা মানুষের চেয়ে অনেক বেশি সফল জীব।
১৫ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ২ কোটি মানুষ প্রবীণ, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১১ শতাংশ। আগামী কয়েক দশকে এই সংখ্যা আরও বাড়বে। সাধারণত আমরা প্রবীণদের নিয়ে আলোচনা করি তাঁদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, আর্থিক সুরক্ষা কিংবা সামাজিক মর্যাদার বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে।
১৫ ঘণ্টা আগে
প্রতিবছর ঈদ উৎসবের সময় আমাদের দেশের সড়কগুলো মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির এক তথ্যমতে, এবারের ঈদুল আজহার সময় মাত্র ১৫ দিনে দেশজুড়ে ৩৯৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪০২ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, আর আহত হয়েছেন ১ হাজার ২৯৪ জন।
১৫ ঘণ্টা আগে