Ajker Patrika

রাজধানীর ফুটপাত: ভাগাভাগিতে বাদ পুরোনো হকার

  • হকারদের পুনর্বাসনের জন্য করা তালিকায় বেশির ভাগ নতুন নাম
  • তালিকায় নেতা, পুলিশ, কর্মচারীদের প্রভাব খাটানোর অভিযোগ
  • ফুটপাতে বরাদ্দ পেয়ে কেউ কেউ অন্যের কাছে ভাড়াও দিয়েছেন
  • পুনর্বাসনের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করার দাবি হকার্স ইউনিয়নের নেতাদের।
 শাহরিয়ার হাসান, ঢাকারাসেল মাহমুদ, ঢাকা
রাজধানীর ফুটপাত: ভাগাভাগিতে বাদ পুরোনো হকার
ফুটপাত হকারমুক্ত করতে গত এপ্রিলের প্রথমার্ধে উচ্ছেদ অভিযান চালায় পুলিশ। এক মাসের ব্যবধানে আবার আগের অবস্থা ফুটপাতের। সঙ্গে রাস্তায়ও দখল করে ফেলেছেন হকাররা। গতকাল রাজধানীর গুলিস্তানে। ছবি: মেহেদী হাসান

রাজধানীর গুলিস্তানের মসজিদ মার্কেটের সামনের ফুটপাতে কাপড়ের পসরা সাজিয়েছেন আতিকুর রহমান সুজন। দখলমুক্ত ফুটপাতে আবার হকার বসার সুযোগে তিনিও দোকান সাজিয়েছেন। কথা বলে জানা গেল, হকারিতে তিনি নতুন, সাত দিন ধরে শুরু করেছেন। এর আগে পাঁচ বছর মুদিদোকানে কাজ করেছেন।

সুজন বলেছেন, সরকারি দলের শ্রমিক সংগঠনের স্থানীয় এক নেতা তাঁকে জায়গাটি পাইয়ে দিয়েছেন। তাঁর পাশে পসরা সাজানো হাফিজুর রহমানও নতুন হকার। তিনি বরাদ্দ পেয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) এক কর্মচারীর আত্মীয়ের বদৌলতে।

শুধু সুজন ও হাফিজুর নন, গত এপ্রিলের প্রথমার্ধে উচ্ছেদের পর আবার গুলিস্তানে ফুটপাতে জায়গা পাওয়া হকারদের বেশির ভাগই নতুন। ফার্মগেট, নিউমার্কেট, মিরপুর ১০ নম্বরসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থানের ফুটপাতে একই চিত্র। হকারদের সঙ্গে কথা বলে ও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হকার পুনর্বাসনে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে পুলিশের করা তালিকায় পুরোনো হকারদের বড় অংশই বাদ পড়েছেন। সেখানে ঠাঁই পেয়েছে নতুন মুখ।

অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, পুলিশ, হকার নেতা ও সিটি করপোরেশনের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী নিজেদের মধ্যে ফুটপাত ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন। ‘পছন্দের লোকদের’ তালিকাভুক্ত করে সেসব জায়গা বরাদ্দ দিচ্ছেন। বরাদ্দ পাওয়া কেউ কেউ আবার সেই জায়গা ভাড়াও দিয়েছেন। এ নিয়ে অসন্তোষ তৈরি এই ‘ভাগাভাগি’তে ফুটপাত আর সড়কে সেই পুরোনো বিশৃঙ্খলা ফিরে আসছে। পথচারী ও যানবাহন চলাচলের পথ সংকুচিত হচ্ছে।

রাজধানীতে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ফুটপাত ও সড়ক দখল করে বসা হকারদের বিরুদ্ধে এপ্রিলের শুরু থেকে উচ্ছেদ অভিযান চালায় ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। উচ্ছেদ হওয়া হকারদের পুনর্বাসন কার্যক্রম চলছে। সম্প্রতি স্থানীয় সরকার বিভাগ নতুন হকার নীতিমালাও অনুমোদন করেছে। সেই নীতিমালার আওতায় নিবন্ধনের মাধ্যমে হকারদের তালিকা প্রণয়ন, বসার স্থান নির্ধারণ এবং স্মার্ট কার্ড দেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ইতিমধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) প্রায় ৮৩০ জন এবং ডিএসসিসিতে প্রায় ২ হাজার ৭০ জন হকারের তালিকা করা হয়েছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে হকারদের মধ্যে। হকারদের অভিযোগ, তালিকায় নাম তুলতে রাজনৈতিক নেতাদের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও পুলিশি প্রভাব খাটানো হচ্ছে। আবার অর্থ লেনদেনও হচ্ছে।

গুলিস্তানের এক হকার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘যাগো নেতা আছে, তারা আবেদন করছে। আমাগো নেতা নাই, তাই আমরা জায়গা পাই নাই।’ শরিফ উদ্দিন নামে আরেকজন বলেন, তিনি নিজে আবেদন করেননি। তাঁদের ‘মুরব্বি’ সব তথ্য সংগ্রহ করে আবেদন জমা দিয়েছেন। যে পুলিশ তালিকা করছেন, তিনিই সব ব্যবস্থা করে দেবেন।

এপ্রিলে উদ্ধার অভিযানের পরপরই এ রকম চিত্র ছিল গুলিস্তানের। ফাইল ছবি
এপ্রিলে উদ্ধার অভিযানের পরপরই এ রকম চিত্র ছিল গুলিস্তানের। ফাইল ছবি

বঙ্গবাজারের সামনে ফুটপাতে কাপড় বিক্রেতা আব্দুল মোতালেব বলেন, ‘তালিকায় নতুন নতুন হকারের নাম উঠছে, যারা কোনো দিন এই ব্যবসা করে নাই। পুলিশ আর সিটি করপোরেশনের কিছু লোক নিজেদের আত্মীয়স্বজনের নাম দিছে। এখন তাদের কাছ থেকে আমাদের জায়গা ভাড়া নিতে বলা হচ্ছে।’ সেই আত্মীয় কারা, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নাম বললে পরে জায়গাও ভাড়া পামু না।’

তবে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন নজরুল ইসলাম বলেন, সিটি করপোরেশনের সহযোগিতায় পুলিশের বিভাগগুলো এলাকাভিত্তিক হকারদের তালিকা করেছে। সেই তালিকা যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত করছে সিটি করপোরেশন। স্থানীয় হকার প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বসেই তালিকা করা হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ফার্মগেট পদচারী-সেতুর পশ্চিম পাশ থেকে তেজগাঁও কলেজ পর্যন্ত ফুটপাতে শতাধিক দোকান। ১ এপ্রিল এই এলাকায় হকার উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছিল।

হকাররা অভিযোগ করেন, পুলিশের তেজগাঁও ট্রাফিক বিভাগের করা এই এলাকার তালিকায় অনেক পুরোনো হকারের নাম নেই। ফার্মভিউ সুপার মার্কেটের সামনে ২০ বছর ধরে হকারি করা মিজানুর রহমান বলেন, ‘তথ্য নিয়েছে, কিন্তু এখনো কার্ড পাইনি। অন্যরা পেয়েছে শুনেছি। কার্ড না পাইলেও পেটের দায়ে বসতে হবে।’

ফুটপাতে জুতা বিক্রি করা মেহেদী হাসান বলেন, ‘আমার তথ্যই নেয়নি। পরে অন্যের কাছ থেকে জায়গা ভাড়া নিয়ে বসতে বলা হয়েছে। রাজনীতি করা একজনের সঙ্গে কথা হয়েছে। তাঁর বরাদ্দ আমাকে দেবেন।’

অভিযোগ অস্বীকার করে ফার্মগেট ট্রাফিক পুলিশ বক্সের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, তথ্য সংগ্রহ করে তালিকা সিটি করপোরেশনে পাঠানো হবে। কারা বসবেন, সেই সিদ্ধান্ত নেবে সিটি করপোরেশন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিউমার্কেট এলাকার এক হকার বলেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত অনেক হকারের নাম তালিকায় রাখা হয়নি। তাঁদের বদলে সরকারি দলের স্থানীয় নেতাদের ঘনিষ্ঠদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গুলিস্তানের ফুটপাতে বই বিক্রি করা রায়হানও পুরোনোদের নাম বাদ দিয়ে নতুনদের তালিকায় যুক্ত করার অভিযোগ করেন।

সার্বিক বিষয়ে বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সেকেন্দার হায়াৎ বলেন, ‘আমরা আগে থেকেই বলে আসছি, পুনর্বাসনের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হতে হবে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই অর্থ লেনদেনের অভিযোগ শুনছি। প্রকৃত হকারদের বাদ দিয়ে নতুন লোক ঢোকানো হলে এই উদ্যোগ ব্যর্থ হবে।’

যেভাবে হবে হকার ব্যবস্থাপনা

স্থানীয় সরকার বিভাগের নতুন হকার নীতিমালা অনুযায়ী, সিটি করপোরেশনে নিবন্ধিত হকাররাই শুধু দৈনিক চাঁদার পরিবর্তে মাসে ১০০ টাকা বা বছরে এক হাজার টাকা ফি দিয়ে রাজধানীর ফুটপাতে ব্যবসা করতে পারবেন। হকার হতে ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রত্যেককে কিউআর কোডসংবলিত স্মার্ট কার্ড বা লাইসেন্স দেওয়া হবে। সেখানে কোথায়, কী ধরনের এবং কোন সময়ে ব্যবসা করবেন—এসব তথ্য সংরক্ষিত থাকবে।

নীতিমালা অনুযায়ী, একটি পরিবার থেকে একজনের বেশি নিবন্ধন করতে পারবেন না। ব্যবসার সময় পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখতে হবে এবং নির্ধারিত স্থানে কেবল নিবন্ধিত ব্যক্তিই বসতে পারবেন। নারী, প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের (হিজড়া) ব্যক্তিদের জন্য ৩০ শতাংশ কোটা রাখার কথাও বলা হয়েছে।

নীতিমালায় রয়েছে, ফুটপাতে অন্তত পাঁচ ফুট জায়গা পথচারীদের চলাচলের জন্য খালি রাখতে হবে। মেট্রো স্টেশন, বাস টার্মিনাল ও গুরুত্বপূর্ণ মোড় থেকে অন্তত ৩০ ফুট দূরে হকার বসতে পারবেন। বাণিজ্যিক এলাকায় সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ব্যবসার সুযোগ থাকবে। নিয়ম ভঙ্গ করলে লাইসেন্স বাতিলের ক্ষমতা থাকবে কর্তৃপক্ষের হাতে।

ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম বলেন, আগে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ফুটপাত দখল করে জনভোগান্তি তৈরি হতো। এখন নির্ধারিত স্থানে ও নির্দিষ্ট সময়ে হকার বসার সুযোগ দেওয়া হবে। এতে শৃঙ্খলা ফিরবে।

পুনর্বাসনের মার্কেটেও পুরোনো হকার কম

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের অধীনে বর্তমানে ১২৯টি মার্কেট রয়েছে। এর মধ্যে ডিএসিসির ৯১টি এবং ডিএনসিসির ৩৮টি। এসব মার্কেটের বড় অংশই অতীতে হকার পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে মার্কেটগুলোতে প্রকৃত হকাররা দোকান বরাদ্দ পেয়েছিলেন কম।

গুলিস্তানের ঢাকা ট্রেড সেন্টার (উত্তর) ঘুরে অন্তত ১৫ জন দোকানমালিকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁদের মধ্যে মাত্র দুজন আগে ফুটপাতে ব্যবসা করতেন। বাকিরা ভাড়া বা অন্যভাবে দোকান নিয়ে ব্যবসা করছেন।

ওই মার্কেটের দোকানমালিক আব্দুল মালেক আহাম্মদ বলেন, ‘২৫-৩০ বছর আগে ফুটপাতে ছিট কাপড় বিক্রি করতাম। পরে মার্কেটে দোকান পাই। কিন্তু এখানে প্রকৃত হকার খুব কম, বেশির ভাগই বড় ব্যবসায়ী।’

আরেক দোকানি ফয়েজ বলেন, তিনি মাসে ৩৫ হাজার টাকা ভাড়ায় দোকান নিয়েছেন। ওই দোকানের মালিক কখনো হকার ছিলেন না।

সংশ্লিষ্টদের মতে, অনেক হকার ফুটপাত ছেড়ে মার্কেটে যেতে চাননি। আবার অনেকে বরাদ্দ পাওয়া দোকান বিক্রি করে দিয়েছেন। ফলে হকারদের জন্য নির্মিত অনেক মার্কেট প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও রাজনীতিকদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।

বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সেকেন্দার হায়াৎ বলেন, মার্কেটে মাত্র ৫-১০ শতাংশ প্রকৃত হকার জায়গা পেয়েছেন। স্বচ্ছতা না থাকলে প্রকৃত হকাররা কখনোই উপকৃত হবেন না।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত