লিগ শিরোপার নিষ্পত্তি ঘটেছে গত সপ্তাহেই, গতকাল বসুন্ধরা কিংসের দিনটি ছিল শুধুই উদ্যাপনের। এমন দিনে কেই-বা পা হড়কাতে চাইবে। ফকিরেরপুল ইয়ংমেন্স ক্লাবকে ৪-১ গোলে হারিয়ে শিরোপা উৎসবে কোনো কমতি রাখেনি তারা। তিন দিন আগেও ফেডারেশন কাপ জিতে এনেছিল উৎসবের উপলক্ষ। পারিশ্রমিক ইস্যুতে মালিকপক্ষের প্রতি ক্ষোভ জানিয়ে সেদিন ক্যামেরার সামনে কিছুই করেনি।
গতকাল অবশ্য কিংসের সবাই ছিল উৎসবের আমেজে। ডিফেন্ডার বিশ্বনাথ ঘোষের লুঙ্গি পরে উদ্যাপন যোগ করেছে ভিন্নমাত্রা। এভাবেই ইতি টেনেছে ঘরোয়া ফুটবলের ২০২৫-২৬ মৌসুমে। কঠিন এক মৌসুমেও কিংস নিজেদের নিয়ে গেছে শ্রেষ্ঠত্বের চূড়ায়। ফিরে পেয়েছে হারানো মুকুট। কিন্তু সামগ্রিকভাবে বিচার করলে এবারের লিগকে আলাদা করে তুলে ধরার মতো উপাদান খুব কমই আছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেড়েছে বটে, পয়েন্ট টেবিল দেখলেও তা চোখে পড়বে। কিন্তু সেটাও নেতিবাচকতা দিয়ে আড়াল করে দেওয়াটা কঠিন কিছু নয়।
লিগের শুরুটাই হয় বিতর্ক দিয়ে। ক্রিকেটে বিপিএলের মতো শোনায় বলে প্রিমিয়ার শব্দটি ছেঁটে ফেলে শুধু ফুটবল লিগ নাম দেওয়া হয়। সেপ্টেম্বরে শুরু হওয়া লিগের দুই রাউন্ড পরও জানা যায়নি পৃষ্ঠপোষকের নাম। সেই জায়গায় শুরুতে মালয়েশিয়ার কোম্পানি পেট্রোনাসকে যুক্ত করলেও বিতর্কের মুখে ইউনাইটেড হেলথকেয়ারের নাম যুক্ত করতে বাধ্য হয়।
এবারের লিগে চমক কাড়ে মানিকগঞ্জের শহীদ মিরাজ-তপন স্টেডিয়াম। আয়তনে ছোট হলেও প্রথম পর্বে ম্যাচগুলোতে দর্শক ছিল পরিপূর্ণ। কিন্তু অন্য চার ভেন্যু আগের মতোই জরাজীর্ণ। মাঠ ভালো ছিল না খুব একটা। এর মধ্যে হয়েছে দেশের ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর।
এমন বেহাল মাঠের সরাসরি প্রভাব পড়েছে ফুটবলের মানে। পয়েন্ট টেবিলের দিকে তাকালে দলগুলোর মধ্যে পয়েন্টের ব্যবধান কম মনে হতে পারে, রেলিগেশন বা মাঝারি সারির লড়াইয়ে হয়তো রোমাঞ্চ ছিল। কিন্তু সেই লড়াইয়ে ট্যাকটিক্যাল উৎকর্ষের চেয়ে শারীরিক শক্তির মহড়াই বেশি চোখে পড়েছে। এলোপাতাড়ি লং বল আর ভুল পাসের ছড়াছড়িতে আধুনিক ফুটবলের সৌন্দর্য খুঁজে পাওয়া গেছে খুব কম ম্যাচেই।
বড় আক্ষেপ হয়ে থেকেছে দেশি খেলোয়াড়দের বিবর্ণ পারফরম্যান্স। ক্লাবগুলোর পারিশ্রমিক নিয়ে গড়িমসিও প্রভাব ফেলেছে পারফরম্যান্সে। লিগজুড়ে বিদেশি ফরোয়ার্ডদের একচ্ছত্র দাপটে স্থানীয় স্ট্রাইকাররা নিজেদের মেলে ধরার সুযোগ পেয়েছেন সামান্যই। গোলদাতার তালিকায় শীর্ষ নামগুলো যথারীতি বিদেশিদেরই দখলে। ১৯ গোল নিয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন কিংসের দোরিয়েলতন গোমেস। স্থানীয়দের মধ্যে সর্বোচ্চ ছয়টি করে গোল আবাহনীর শেখ মোরসালিন ও কিংসের ফয়সাল আহমেদ ফাহিমের।
রেফারিং বিতর্ক এবারের লিগের যেন সমার্থক শব্দই হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ম্যাচ অফিশিয়ালদের প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষোভ ঝেড়েছে দলগুলো। কখনো কখনো মাঠের বাইরের এই অব্যবস্থাপনা এবং টুর্নামেন্ট কমিটির পেশাদারির অভাব মাঠের আসল খেলাকেও ছাপিয়ে গেছে। থ্রো ইনের থেকে গোলের অদ্ভুত সিদ্ধান্তেরও দেখা মিলেছে। আবার বদলি খেলোয়াড় বিতর্কে খেলা বন্ধ থেকেছে এক ঘণ্টার বেশি।
আরামবাগ ও ফকিরেরপুলের অবনমিত হয়েছে এবার। তাদের জায়গায় আগামী মৌসুমে খেলবে চট্টগ্রাম সিটি ও সিটি ক্লাব। সব মিলিয়ে বসুন্ধরা কিংসের কাছে মৌসুমটি আনন্দ আর হারানো মুকুট পুনরুদ্ধারের হলেও দেশের সামগ্রিক ফুটবলের জন্য এবারের লিগও খুব বেশি আশার আলো দেখাতে পারেনি। বাফুফে যেভাবে জাতীয় দল নিয়ে উৎসাহ দেখিয়েছে, ঘরোয়া ফুটবলের বেলায় তা একেবারেই উল্টো রথ। জাতীয় দলের পাইপলাইন শক্ত করতে হলে শুধু কাগুজে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, লিগের গুণগত মান, রেফারিং এবং মাঠের সুবিধা বাড়ানোর দিকে সংশ্লিষ্টদের নজর দিতে হবে। তা না হলে এই উদ্যাপনের রং শুধু গুটিকয়েক ক্লাবের তাঁবুতেই সীমাবদ্ধ থাকবে, দেশের ফুটবলে দীর্ঘমেয়াদি কোনো উন্নতি বয়ে আনবে না।