বাবাকে না পেয়ে আওয়ামী লীগ নেতার শিশুসন্তানকে পানিতে ছুড়ে ফেলে হত্যার দৃশ্য দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে, যা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়।
একই দাবিতে পোস্ট আছে এখানে, এখানে , এখানে এবং এখানে ।
‘Khan Shaheb’ নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে ৪ জুন রাত ১০টা ২১ মিনিটে একটি পোস্ট শেয়ার করা হয়, যা আলোচিত দাবিতে সম্ভাব্য সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে। শেয়ার করা ওই ভিডিওটি ৯ জুন বেলা ১১টা ৪৪ মিনিট পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজারবারের বেশি দেখা হয়েছে। পোস্টটিতে ২ হাজার ১০০টি রিঅ্যাকশন ও ২৯৭ কমেন্ট রয়েছে। এ ছাড়া পোস্টটি ১ হাজার ৭০০ বার শেয়ার করা হয়েছে।
শেয়ার করা এসব পোস্টের কমেন্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বেশির ভাগ ব্যবহারকারী ঘটনাটিকে সত্য মনে করে ক্ষোভ উগড়ে দিচ্ছেন।
আলোচিত দাবির সত্যতা যাচাইয়ে প্রথমেই ১৯ সেকেন্ডের ভাইরাল ভিডিওটি পর্যবেক্ষণ করা হয়। ভিডিওটিতে দেখা যায়, এক ব্যক্তি একটি শিশুর গেঞ্জির কলার ধরে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছেন। এরপর ওই শিশুকে সড়কের পাশে শানবাঁধানো ঘাটে আছাড় মারা হয় এবং সেখানে তাকে মারধর করা হয়। এ সময় কয়েকজনকে পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। এ ছাড়া ভিডিওর ভেতরের টেক্সটে ‘৪ জুন’, ‘শাসনগাছা, কুমিল্লা’ ইত্যাদি লেখা রয়েছে।
তবে ‘পিতাকে না পেয়ে আওয়ামী লীগ নেতার সন্তানকে পানিতে ফেলে হত্যা’—এমন স্পর্শকাতর দাবিতে ভিডিওটি ছড়ানো হলেও সংশ্লিষ্ট কি-ওয়ার্ড নিয়ে অনুসন্ধানে জাতীয় কোনো মূলধারার গণমাধ্যমে এই দাবির পক্ষে কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।
পরে ভিডিওটির কয়েকটি কি-ফ্রেম ধরে রিভার্স ইমেজ অনুসন্ধান করা হয়। অনুসন্ধানে ‘Cumilla Gazette’ নামের একটি ইউটিউব চ্যানেলে ৪ জুন শেয়ার করা একটি শর্টস ভিডিও খুঁজে পাওয়া যায়। ‘কুমিল্লার শাসনগাছায় শিশুর ওপর নির্যাতনের অভিযোগ, সুষ্ঠু বিচারের দাবি’ শিরোনামে প্রকাশিত ওই ভিডিওর দৃশ্যের সঙ্গে ভাইরাল ভিডিওর হুবহু মিল পাওয়া যায়।
বিষয়টি নিয়ে আরও অনুসন্ধানে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এনটিভি নিউজের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। ‘লিচুগাছের ডাল ভাঙায় শিশুকে নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল’ শিরোনামে ৫ জুন প্রকাশিত ওই প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, কুমিল্লা শহরতলির শাসনগাছা এলাকায় লিচুগাছের ডাল ভাঙার অভিযোগে এক শিশুকে আছাড় মেরে নির্মম নির্যাতন করা হয়েছে। এই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরদিন (৫ জুন) বিকেলে কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি মামলা করা হয়।
কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি তৌহিদুল আনোয়ার স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্ধৃতি দিয়ে গণমাধ্যমকে জানান, অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম অমি (৩০)। তিনি শাসনগাছা বড় বাড়ি এলাকার আবুল হোসেনের ছেলে। প্রতিবেশী মো. হাসানের শিশুসন্তান তাঁদের একটি লিচুগাছের ডাল ভেঙে ফেলে—এমন অভিযোগ তুলে ৪ জুন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় শিশুটির ওপর এই অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়। এই ঘটনায় ভুক্তভোগী শিশুর বাবা বাদী হয়ে মামলা করেছেন এবং ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত অমি পলাতক রয়েছে।
জাতীয় দৈনিক যুগান্তর এবং টাইমস অব বাংলাদেশের প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকেও একই তথ্য ও ছবি পাওয়া যায়।
মূলধারার গণমাধ্যমে প্রকাশিত এসব প্রতিবেদনের কোথাও কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার উল্লেখ নেই। এ ছাড়া ছেলেটিও মারা যায়নি। মূলত লিচুর ডাল ভাঙার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঘটা শিশু নির্যাতনের ভিডিওকে রাজনৈতিক গল্প সাজিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানো হয়েছে।
চলতি বছরের জুনে কুমিল্লার শাসনগাছায় লিচুর ডাল ভাঙার অভিযোগে এক প্রতিবেশীর হাতে শিশু নির্যাতনের ভিডিওকে সম্প্রতি ‘পিতাকে না পেয়ে আওয়ামী লীগ নেতার শিশুকে পানিতে ফেলে হত্যা করা হয়েছে’ দাবি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে, যা বিভ্রান্তিকর।