Alexa
মঙ্গলবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২২

সেকশন

epaper
 

বিজয়ের ৫০ বছর: সম্প্রীতি কতটুকু সংহত

সম্প্রীতি ধারণ করতে হয় মানুষের হৃদয়ে, চেতনায়। বাঙালি সংস্কৃতির শক্তি দুর্নিবার। শক্তিশালী সেই সংস্কৃতিকে মাঠে-ময়দানে ফিরিয়ে আনতে পারলে মানুষ হিসেবে পরস্পরের প্রতি মমত্ববোধ প্রগাঢ় হবে। 

আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০২১, ১৩:০২

বিজয়ের ৫০ বছর: সম্প্রীতি কতটুকু সংহত বিজয়ের ৫০ বছর উদযাপনের প্রাক্কালে দেশের ধর্মীয় বিশ্বাসে সংখ্যায় কম জনগোষ্ঠী এবং প্রগতিশীল গণতন্ত্রমনা মানুষেরা খানিকটা উদ্বিগ্ন সময় পার করছেন। আজকের প্রেক্ষাপটে হঠাৎ ঘটে যাওয়া বা অস্বাভাবিক কোনো বিষয় নয়। ধর্মের নামে স্বাধীন বাংলাদেশে মানুষে মানুষে হিংসা ও হিংস্রতা ছড়ানোর যে রাজনীতি, এ তারই বহিঃপ্রকাশ। তবে এ বছর হিন্দুধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজায় ঘটে যাওয়া হামলা মাত্রাগত বিচারে অন্য যেকোনো সময়ের সাম্প্রদায়িক হামলার চেয়ে গভীর ও পরিকল্পিত, সে কথা নিশ্চিত করেই বলা যায়।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত দেশের রাজনীতি সোজা পথে এগোলে দেশটি হতে পারত শান্তি ও সহাবস্থানের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। লাখ লাখ মুক্তিযোদ্ধার স্বপ্ন ছিল ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক, বৈষম্যহীন জাতিরাষ্ট্রের। ধর্মীয় বিভেদ তা হতে দেয়নি, দিচ্ছে না। বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতেই হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছে, একে অপরকে রক্ষা করেছে। বাঙালি সংস্কৃতির নিজস্ব উৎসব নববর্ষ, মেলা, যাত্রাপালা, কবিগান, জারিগান, নবান্ন, পৌষপার্বণসহ অঞ্চলভেদে আরও কত উৎসব একসঙ্গে উদযাপন করেছে। এসব ক্ষেত্রে ধর্ম কখনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। ফলে নিজেদের মধ্যে ধর্মীয় বিবাদ সৃষ্টির সুযোগ হয়নি।

একটি সাজানো ঘটনাকে কেন্দ্র করে এবারের দুর্গাপূজায় নজিরবিহীন সাম্প্রদায়িক পরিকল্পিত যে হামলা টানা সপ্তাহজুড়ে চলল এবং যার রেশ এখনো বর্তমান, এমন তাণ্ডব ও ধ্বংসযজ্ঞ এর আগে এ দেশ প্রত্যক্ষ করেনি। মূলত স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে কোনো দাঙ্গা হয়নি, যা হয়েছে তা একচেটিয়া এবং এ পর্যন্ত হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি মুসলিম সম্প্রদায় কর্তৃক যত আক্রমণ সংঘটিত হয়েছে, সবই পূর্বপরিকল্পিত। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ওপর যেসব হামলার ঘটনা ঘটেছে বা গির্জায় হামলা হয়েছে, এমনকি পাহাড়ি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে উচ্ছেদের উদ্দেশ্যে যত ঘটনা ঘটেছে, অধিকাংশ ঘটনায় দেখা গেছে প্রভাবশালী ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠরা অন্য সম্প্রদায়কে উৎখাত করে তাদের জায়গা-জমি দখল করতে ধর্মীয় উগ্রবাদীদের ব্যবহার করেছে। গত ৫০ বছরে ক্ষমতাসীনদের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় ধর্মীয় উগ্রবাদ শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে গেছে, তা অস্বীকার করার মতো বাস্তবতা আজ আর সমাজে বিদ্যমান নেই।

বিচারহীনতা অপরাধীকে নতুন অপরাধ সংঘটিত করতে উৎসাহিত করে। গত এক দশকে নাসিরনগর, শাল্লা, রামু, সাঁথিয়া, খুলনার শিয়ালী এবং এ বছর কুমিল্লা থেকে শুরু করে ধারাবাহিকভাবে দেশের ২২টি জেলায় যেখানেই ধর্মীয় কারণে আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে, সেখানেই কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতাসীন দলের যুক্ততা ও প্রশাসনের প্রচ্ছন্ন সহযোগিতা বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে নীরব ভূমিকার কথা উঠে আসছে। একটি ঘটনারও বিচার না হওয়া এবং ঘটনা শেষে সরকারের পক্ষ থেকে পুরো ঘটনা অস্বীকার করা বা ঘটনাকে বছরের পর বছর বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি সংকটকে আরও গভীর করে তুলছে।

১৯৭১ সালে পাকিস্তানিদের নির্যাতন-নিপীড়নের প্রধান টার্গেট ছিল এ দেশের হিন্দু জনগোষ্ঠী। স্বাধীন বাংলাদেশে স্বাধীনতার ৫০ বছর পরেও আক্রমণ-নির্যাতনের প্রধান টার্গেট হিন্দুধর্মাবলম্বী মানুষ। ১৯৯২ সালে ভারতে বাবরি মসজিদ ভাঙার জেরে বাংলাদেশে খুন-ধর্ষণের শিকার হয় হিন্দুধর্মাবলম্বীরা। হিন্দু সম্প্রদায়ের ৮২৮টি ঘর পোড়ানো হয়। ২০০১ থেকে ২০০২-এর মার্চ পর্যন্ত বহু হিন্দু পরিবারকে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়। ১২৮টি উপজেলায় লুটপাট করা হয়। ১৬২টি বাড়ি ধ্বংস করা হয়। এই সব হামলায় ১৭ জন নিহত, ৬১ জন ধর্ষণের শিকার হয়, ৬৬৬ জন আহত এবং অপহরণ করা হয় ১৩ জনকে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, ২০১৩ সাল থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৮ বছর ৯ মাসে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর ৩,৬৭৯টি হামলা হয়েছে। এ সময়কালে ১,৫৫৯টি বাড়িঘর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। হামলা, ভাঙচুর ও আগুন দেওয়া হয়েছে ৪৪২টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে। প্রতিমা, পূজামণ্ডপ, মন্দিরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে ১,৬৭৮টি।

এ অবস্থার জন্য রাষ্ট্র-রাজনীতি যেমন দায়ী, সঙ্গে সঙ্গে এ দেশের প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিকর্মী, কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, শিক্ষক কেউই এর দায় এড়াতে পারেন না।

সুতপা বেদজ্ঞ। সম্প্রদায় হিসেবে হিন্দুদের দায়ও কম নয়। আজ পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক কোনো ঘটনায় হিন্দু সম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মাঠে নামতে দেখা যায়নি; বরং একটি রাজনৈতিক দলের ভোটব্যাংক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে এবং দলদাসের মতো আচরণের মধ্যেই মুক্তি খুঁজেছে। নিজের দেশের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা না করে ভারতে পালিয়ে গেছে, এখনো যাচ্ছে। নিজেদের মধ্যে বর্ণ-গোত্র-উঁচু-নিচু প্রভেদ ছেড়ে তারা এককাতারে দাঁড়াতে পারেনি। নিজ সম্প্রদায়ের ভাই বা প্রতিবেশীর বিপদে প্রয়োজনমতো এগিয়ে আসেনি। বর্তমান হামলার ঘটনার পরে এ কথা অনেককেই বলতে শোনা গেছে, পূজামণ্ডপে যত ভক্ত এসেছিলেন, তার এক-তৃতীয়াংশ রাস্তায় নামলে বাংলাদেশ অচল হয়ে যেত। এখনো বাংলাদেশে ১ কোটি ২৪ লাখ হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করে। কিন্তু না, তা হয়নি। এমনকি হিন্দু সম্প্রদায়ের যাঁরা জাতীয় সংসদে বসে আছেন, তাঁদেরও রা করতে শোনা যায়নি।

গত ৫০ বছরে এ দেশের শাসকগোষ্ঠী সাম্প্রদায়িকতাকে শুধু পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, প্রত্যক্ষভাবে তার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করেছে। এরই ফলে এ দেশের শিশু-কিশোর, তরুণেরা ভয়ংকরভাবে অন্য ধর্মের মানুষকে ঘৃণা করতে শিখছে। শুধু তা-ই নয়, এরা মহান মুক্তিযুদ্ধকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে পাকিস্তানকে মনেপ্রাণে সমর্থন করছে। সম্প্রতি দেশের মাটিতে অনুষ্ঠিত ক্রিকেট ম্যাচে বাংলাদেশি কিছু তরুণের পাকিস্তানের প্রতি সমর্থন তারই নিদর্শন। এটা যে শুধু ভালো খেলার কারণে নয়, এর সঙ্গে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি ও পাকিস্তানপ্রীতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তা বুঝতে নিশ্চয়ই কারও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। তালেবান যেদিন আফগানিস্তানে ক্ষমতা দখল করল, সেদিনও এ দেশে বহু মানুষকে উল্লাস করতে দেখা গেছে।

এই বাস্তবতা অস্বীকার করে কখনোই সমস্যার সমাধান করা যাবে না। কেন তরুণদের একাংশ অন্য ধর্মের প্রতি হিংসাত্মক আচরণ করছে, বিজ্ঞানমনস্কতার বদলে ধর্মান্ধ হয়ে উঠছে সমাজ, কেন আমরা আমাদের নতুন প্রজন্মকে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দীক্ষিত করতে পারলাম না, কেন একটি বিরাটসংখ্যক মানুষ দেশের জল-হাওয়ায় বড় হয়েও নিজের দেশ ও জাতিকে ভালোবাসতে পারছে না—এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু ক্ষমতাসীনদের কাছে চাইলেই হবে না, নিজেদেরও আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি হতে হবে।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এক দিন বা দুই দিন শোভাযাত্রা করে অর্জন করার বিষয় নয়। সম্প্রীতি ধারণ করতে হয় মানুষের হৃদয়ে, চেতনায়। বাঙালি সংস্কৃতির শক্তি দুর্নিবার। শক্তিশালী সেই সংস্কৃতিকে মাঠে-ময়দানে ফিরিয়ে আনতে পারলে মানুষ হিসেবে পরস্পরের প্রতি মমত্ববোধ প্রগাঢ় হবে। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হওয়া খুব জরুরি। সুস্থ রাজনৈতিক চর্চা ছাড়া তা করা কঠিনও বটে। দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে যাঁরা পরিবর্তনকামী আলোর যাত্রী রয়েছেন, এ কাজে তাঁদের আত্মনিয়োগ এখন সময়ের কর্তব্য।

সুতপা বেদজ্ঞ
কলামিস্ট ও নারীমুক্তি আন্দোলনের নেত্রী

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
 
    সব মন্তব্য

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    এলাকার খবর

     
     

    সন্ত্রাস-নাশকতা বড় গুনাহের কাজ

    প্রশাসনের দিকে অভিযোগের তির নৌকার ১০ প্রার্থীর

    আইভীতেই আস্থা অটুট

    সৌন্দর্য উপভোগ করতে এসে ফসলের ক্ষতি

    হুইলচেয়ারে এসে দিলেন ভোট

    শক্তিবর্ধক পানীয়ের দেদার বিক্রি

    উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ফের আগুন

    মেসিকে টপকে টানা দ্বিতীয়বার ফিফার বর্ষসেরা খেলোয়াড় হলেন লেভানডফস্কি

    করোনার সঙ্গে ইনফ্লুয়েঞ্জা ইউরোপে ‘টুইন্ডেমিক’

    অভিনয়শিল্পী শিমুর বস্তাবন্দী লাশ উদ্ধার

    চীনের নজর মধ্যপ্রাচ্যে বড় চ্যালেঞ্জ যুক্তরাষ্ট্র

    নীলফামারীতে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রীকে দলবদ্ধ ধর্ষণ, যুবক আটক