Alexa
শুক্রবার, ২১ জানুয়ারি ২০২২

সেকশন

epaper
 

পরিবহন: মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা

স্বাধীনতার ৫০ বছরেও বাংলাদেশের ঠিকাদারেরা বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণের যোগ্য হয়ে ওঠেননি। চীন, জাপান, কোরিয়ার লোকজন এসব কাজ করে থাকেন। স্বাধীনতার ৫০ বছরে আকাঙ্ক্ষাটাকে নামিয়েও আনি।

আপডেট : ০২ ডিসেম্বর ২০২১, ১৩:১০

মামুনুর রশীদ। দেশবিভাগের পর থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত দেশে সড়ক পরিবহনে একটা সীমিত আয়োজন ছিল। ষাটের দশকে কমলাপুর রেলস্টেশন এবং ঢাকার টঙ্গী ডাইভারশন রোড ছাড়া তেমন কোনো অবকাঠামোগত বড় কাজ হয়নি। ঢাকার জনসংখ্যাও ছিল কম। কতগুলো বিআরটিসির বাস এবং মুড়ির টিনের মতো ব্যক্তিমালিকানাধীন বাস ছাড়াও ছিল বেবিট্যাক্সি আর রিকশা। দূরপাল্লার বিআরটিসির বাস ছাড়া প্রাইভেট বাসগুলো ছিল খুবই অনুন্নত। রাস্তাঘাট যা ছিল তা খুবই অপরিসর, রেললাইনও তেমন একটা বাড়েনি। অথচ চট্টগ্রাম, পাকশী, সৈয়দপুরে বড় বড় রেলের কারখানা ছিল। এই কারখানাগুলো ব্রিটিশ আমলেই করা হয়েছিল। মানুষের চলাচলের প্রয়োজনও ছিল সীমিত।

ষাটের দশকে মানুষের মধ্যে যে আকাঙ্ক্ষার জন্ম নেয়, যার ফলে আসে মুক্তিযুদ্ধ, সেই মুক্তিযুদ্ধের পর মানুষের জীবনে নতুনতর একটা পর্যায় শুরু হয়। গ্রাম থেকে নতুন আশা নিয়ে হাজার হাজার মানুষ রাজধানী অভিমুখে যাত্রা করে। মুক্তিযুদ্ধের সময় কিছু কিছু গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ভেঙে পড়ে। সেগুলোর মেরামতের কাজও শুরু হয়। কিন্তু মানুষের আসা-যাওয়া বন্ধ হয় না। খুব ধীরগতিতে রাস্তাঘাটের অবকাঠামো নির্মাণকাজ শুরু হয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশে এটাই স্বাভাবিক। এর মধ্যেই বড় ধরনের একটি রাজনৈতিক পটপরিবর্তন দেশকে কিছুদিনের জন্য থমকে দেয়। সামরিক শাসকেরা নিজেদের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য ব্যস্ত থাকে। জবাবদিহিহীন এই সময়ে কোনো নতুন দীর্ঘস্থায়ী প্রকল্পের সূচনা হয়নি।

আশির দশকের মাঝামাঝি স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের আমলে কিছু বড় বড় প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। দুর্নীতিগ্রস্ত সেই সরকারের আমলে ঢাকা শহরে এবং উত্তরবঙ্গে বেশ কিছু রাস্তাঘাটের কাজ শুরু হয়। কিন্তু এই বিপুল জনগোষ্ঠীর চলাচলের জন্য পরবর্তীকালেও কোনো বড় পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি। যেসব দেশ জনবহুল, সেসব দেশে রেল মুখ্য পরিবহন হিসেবে কাজ করেছে।

এশিয়ায় ভারত, চীন, জাপান, হংকং তার একটি বড় উদাহরণ। জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত হয়ে অ্যাটম বোমার আঘাতে হিরোশিমা-নাগাসাকি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার মাত্র ২৯ বছর পর ১৯৬৪ সালে অলিম্পিকের আয়োজন করে ফেলে এবং যোগাযোগব্যবস্থাকে এমন একটি অবস্থায় নিয়ে আসে যে, সত্তরের দশকের শেষের দিকে বুলেট ট্রেন চালু করে ফেলে। এ রকম জনবহুল একটি দেশে রেল যোগাযোগের মাধ্যমে সারা দেশকে সংযুক্ত করে ফেলে। ভারত ১৯৪৭ সালের পর রেলের পরিবহনকে মুখ্য বিবেচনা করে সারা দেশে একটা অভাবিত পরিবহনব্যবস্থা তৈরি করে। ভারতের রেলওয়ে এখন বিশ্বের কাছে একটি বড় উদাহরণ। গত ২০ বছরে শুধু ওপর দিয়ে নয়, তারা পাতালট্রেনের ব্যবস্থা করে বিশাল জনগোষ্ঠীকে একটা স্বস্তির মধ্যে নিয়ে এসেছে।

অথচ বাংলাদেশের যতটুকু রেল ছিল, তা-ও কালক্রমে সীমিত হয়েছে। বড় বড় ওয়ার্কশপ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। বর্তমান সরকার অবশ্য রেলে নতুন অবকাঠামো সৃষ্টি করতে চাইছে এবং শুধু ঢাকা শহরে ফ্লাইওভার ও মেট্রোরেলের দ্বারা উন্নতি করতে চাইছে। এখানেও প্রয়োজন ছিল মাটির নিচে রেলের ব্যবস্থা। নিউইয়র্কে বা টোকিওতে অথবা প্যারিসে যদি পাতালট্রেনের ব্যবস্থা না থাকত, এত মানুষ রাস্তার ওপরে থাকত, তাহলে অবস্থাটি ঢাকার চেয়েও খারাপ হতো। জাপান এবং ভারত তাদের দেশে রেলের উন্নয়ন করেছে; কিন্তু বাংলাদেশে প্রচুর গাড়ি রপ্তানি করে তাদের ব্যবসা ফুলে ফেঁপে উঠেছে অথচ দেশের পরিবহনব্যবস্থার উন্নতি হয়নি। অটোমোবাইলগুলো রাস্তায় প্রবল যানজট সৃষ্টি করছে।

প্রযুক্তিবিদেরা দেশের জনসংখ্যাকে কোনো অবস্থায় বিবেচনায় আনেননি। উড়ালপথের রেল কতটা সমস্যার সমাধান করবে, তা নিয়ে চিন্তার অবকাশ আছে। এ কথা সত্যি, পরিবহনের অবকাঠামো তৈরি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। যে কাজটা শুরু করা উচিত ছিল আরও বহু আগে এবং ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীকে মাথায় রেখে সে কাজটি শুরু হলো অনেক পরে এবং ধীরগতিতে। আমি একবার চীনের একটি প্রদেশ কুনমিংয়ের রাস্তায় হাঁটছিলাম। সঙ্গে ছিল আমার এক চীনা বন্ধু। রাস্তাগুলো খুব বেশি প্রশস্ত। পার হতে গিয়ে অনেক উঁচুতে ফুটওভার ব্রিজের ওপরে উঠতে হচ্ছিল। রাস্তায় যানবাহনের সংখ্যাও তেমন ছিল না। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘এত বড় রাস্তার কী দরকার?’ তখন বন্ধুটি উত্তর দিল, ‘আজ থেকে ৫০ বা ১০০ বছর পর কী হবে, যখন জনসংখ্যা বেড়ে কয়েক গুণ হয়ে যাবে?’ দেশ স্বাধীন হওয়ার সময় জনগোষ্ঠী ছিল সাড়ে ৭ কোটি, এখন তা ১৮ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। সাড়ে ৭ কোটির হিসাবে যদি রাস্তাঘাট হয়ে থাকে, তাহলে যা দাঁড়ায় সেটা আজ আমরা অনুভব করতে পারছি।

ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর চাপে যেমন রাস্তাঘাট অপ্রতুল, সেখানে আবার রাজউক কোনো ভবিষ্যৎ বিবেচনা ছাড়াই বিশাল বিশাল দালানকোঠা নির্মাণের অনুমোদন দিয়ে যাচ্ছে। রাসেল স্কয়ার থেকে সোনারগাঁও মোড় পর্যন্ত একের পর এক হাসপাতাল, বিশাল বিপণিকেন্দ্র এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিশাল পানি ভবনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এসব জায়গায় প্রতিদিন কতগুলো গাড়ি আসে-যায়, তার হিসাব কর্তৃপক্ষ জানে না। ফলে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এই রাস্তা দিয়ে চলাচলকারীরা কী পরিমাণ যানজটে পড়ছেন! যানজটের এমনই অবস্থা, স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিস্টেম ভেঙে পড়েছে। সেই মান্ধাতার আমলেই ম্যানুয়াল সিস্টেমে ভিআইপিদের সুবিধা; কিন্তু সাধারণ জনগণ যানজটের নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে পড়ছে।

যে অবকাঠামো নির্মাণের যাত্রা শুরু হয়েছে, তা যেন সাধারণ মানুষের ব্যবহার উপযোগী হয়। ছবি: আজকের পত্রিকা শুধু ঢাকা শহর নয়, সব বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা শহরে আজকাল যানজট হচ্ছে। প্রযুক্তিবিদদের সঙ্গে শুধু আমলাদের সম্পর্ক থাকছে; কিন্তু সমাজবিজ্ঞানী, বিশেষজ্ঞ, রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করেই এই অবকাঠামোগুলো গড়ে উঠছে। ধরে নিলাম ঢাকা শহর একটি প্রাচীন নগরী; কলকাতাও প্রাচীন, নিউইয়র্কও প্রাচীন, হংকংও প্রাচীন। প্রাচীন শহরকেও যে বাসযোগ্য করা যায়, তার বহু নজির পৃথিবীতে আছে। যে কলকাতা শহরকে আজ থেকে ৪০ বছর আগে যানজটে বিধ্বস্ত দেখেছি, সেই শহরটি এখন অনেক বেশি চলাচলের উপযোগী শহর হয়ে উঠেছে। হংকং ছোট্ট একটি দ্বীপ; কিন্তু প্রতিনিয়ত আধুনিক উন্নয়ন-ভাবনা নিয়ে ফেরি ও রেলনির্ভর ব্যবস্থা দিয়ে উত্তরোত্তর সচল হয়ে উঠছে। আমেরিকার সবচেয়ে জনবহুল শহর নিউইয়র্ক এবং একটি বহুজাতিক নগরী, সেখানেও নানা ধরনের প্রযুক্তিগত ও বিজ্ঞানসম্মত কৌশল দিয়ে শহরকে বাসযোগ্য করে রেখেছে।

শুধু রাস্তা বড় করলেই হয় না, সেই রাস্তা সঠিকভাবে ব্যবহারের জন্য একটা সংস্কৃতিরও প্রয়োজন। সাভারের অদূরে নবীনগর থেকে চন্দ্রা পর্যন্ত বেশ প্রশস্ত চার লেনের রাস্তা। এই রাস্তার অর্ধেকটা দখল করে আছে বাস, ট্রাক, দোকানপাট, বাজার প্রভৃতি। যতটুকু রাস্তা পরিবহনের কাজে লাগে, ততটুকু আগের মতোই আছে। তাহলে কী লাভ হলো? বেআইনি দখলদারি বাংলাদেশে একটি চিরাচরিত প্রথা এবং রাজনৈতিক দলগুলোই আইনশৃঙ্খলা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগসাজশে এসব প্রথাকে বাঁচিয়ে রাখে। প্রতিবছর হাজার হাজার গাড়ি আমদানি করা হয়; কিন্তু দেশে একটি গাড়ি তৈরির কারখানাও নেই। যেটি ছিল সেটিও বন্ধ হয়ে গেছে। জাপান যদি সব কাঁচামাল নিয়ে এসে তা দিয়ে মোটরগাড়ি থেকে শুরু করে অসংখ্য ইলেকট্রনিক কারখানা গড়ে তুলতে পারে, আমরা পারি না কেন? বাংলাদেশের মেশিন টুলস ফ্যাক্টরিতে যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ করা সম্ভব ছিল। সেটিতে এখন কী উৎপাদিত হচ্ছে? বাংলাদেশে অনেক প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় আছে, সেখানে মিশুক তৈরির কৌশল আবিষ্কার হয়। ৫০ সিসি মোটরসাইকেলে পাঁচজন লোক বসিয়ে এই মিশুক তৈরি হয়েছে।

স্বাধীনতার ৫০ বছরেও বাংলাদেশের ঠিকাদারেরা বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণের যোগ্য হয়ে ওঠেননি। চীন, জাপান, কোরিয়ার লোকজন এসব কাজ করে থাকেন। স্বাধীনতার ৫০ বছরে আকাঙ্ক্ষাটাকে নামিয়েও আনি। যে অবকাঠামো নির্মাণের যাত্রা শুরু হয়েছে, তা যেন সাধারণ মানুষের ব্যবহার উপযোগী করে নির্মাণ করা হয়। চারদিক বিবেচনা করে মানুষের জন্য যে ভালো কাজ করা যায়, নিজস্ব ভাবনায় তার একটা বড় উদাহরণ হচ্ছে হাতিরঝিল প্রকল্প। যার ফলে শহরের কেন্দ্রস্থলে একটি ফুসফুস নির্মাণ করা সম্ভব হয়েছে। সবকিছুতে একটাই বিবেচনা থাকা উচিত আর তা হলো, নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনযাপনকে সচল রাখা। এটাই মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছরের আকাঙ্ক্ষা।

মামুনুর রশীদ, নাট্যব্যক্তিত্ব

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
 
    সব মন্তব্য

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    এলাকার খবর

     
     

    দোয়া সফলতার হাতিয়ার

    ফ্যাশনেবল ফিউশন

    নিরাপদ অভিবাসন নিয়ে কর্মশালা

    ঘাটাইলে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো ৩ অবৈধ ইটভাটা

    জরাজীর্ণ টিনের ঘরে ৩৮ বছর পাঠদান

    ৫ ইউপিতে আওয়ামী লীগের ৭ বিদ্রোহী

    ‘বাহে এবার জারোত থাকি মুই বাঁচিম বাবা’

    গৃহযুদ্ধের কিনারায় যুক্তরাষ্ট্র!

    দক্ষিণখানে নির্মাণাধীন ভবন থেকে পড়ে শ্রমিকের মৃত্যু

    সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন পরিচয়ে প্রতারণার অভিযোগে মেম্বর প্রার্থী গ্রেপ্তার 

    দক্ষিণখানে ধর্ষণের অভিযোগে যুবক গ্রেপ্তার

    রাবিতে সশরীরেই চলবে ক্লাস-পরীক্ষা