Alexa
শুক্রবার, ২১ জানুয়ারি ২০২২

সেকশন

epaper
 

পার্বত্য চুক্তির উদ্দেশ্য কী ছিল, পেলাম কী?

এখন চুক্তি বাস্তবায়নের কথা বললে সরকারের পক্ষ থেকে গাণিতিক হিসাব দেওয়া হচ্ছে। এটি তো গাণিতিক হিসাবের বিষয় নয়। কথা হলো, যে উদ্দেশ্যে চুক্তি করা হয়েছে, সেটি পূরণ হয়েছে কি না?

আপডেট : ০২ ডিসেম্বর ২০২১, ১২:৫৯

২৪ বছর পরেও পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের কাজ এগোচ্ছে না। ছবি: সংগৃহীত ১৯৯৭ সালে যখন পার্বত্য চুক্তি সম্পাদন হচ্ছিল তখন আমরা বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না, এত বড় রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান হতে চলেছে। পার্বত্য চুক্তির মধ্য দিয়ে এ সংঘাতের অবসানও হলো। তা সম্ভব হয়েছে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতা ও সদিচ্ছার কারণে।

এ চুক্তি দেশে ও বহির্বিশ্বে ‘শান্তিচুক্তি’ হিসেবে পরিচিতি পায়। পাহাড়ে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে শান্তিবাহিনীর অস্ত্রের গর্জন কমেছে। এ কমার মধ্যেই যদি আমরা চুক্তিটি সীমাবদ্ধ রাখি, তাহলে হবে না। কারণ, শান্তি শব্দটি আরও ব্যাপক। শান্তি মানে এলাকার রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক সর্বোপরি সব মানুষের অন্তরে শান্তি বিরাজ করবে—সেটাই শান্তি। এই শান্তি আমরা চুক্তির মাধ্যমে প্রত্যাশা করেছিলাম।

এ চুক্তি নিয়ে আমাদের প্রত্যাশা অনেক। এ প্রত্যাশার হিসাব যদি ২৪ বছরে এসে মিলাই তবে দেখি, প্রাপ্তির অংশটা একেবারে কম। পার্বত্য চুক্তির আগে পাহাড়ে মানুষের মাঝে কেন অসন্তোষ ছিল? এগুলো ভেবেদেখতে হবে।

চুক্তির অনেক আগে থেকে আমাদের ওপর অনেক ঝড়-ঝাপটা বয়ে গেছে। আমাদের প্রতি অনেক অন্যায়-অবিচার করা হয়েছে।

পাকিস্তান আমলে এখানে কাপ্তাই বাঁধ হয়েছে। এ বাঁধের বিদ্যুৎ সারা দেশ আলোকিত করেছে। কিন্তু আমরা কী পেয়েছি? বাঁধের কারণে আমাদের যে ক্ষতি, সেটা তো পূরণ হওয়ার কথা নয়। আমরা চেয়েছিলাম, আমাদের ন্যূনতম পুনর্বাসন করা হোক। সেটি করা হয়নি।

সে জন্য মানুষের অসন্তোষ ছিল। বিভিন্ন অন্যায়-অবিচারের মুক্তি চেয়ে এখানকার মানুষ অনিচ্ছা সত্ত্বেও বিরাট একটি সশস্ত্র সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।

পার্বত্য চুক্তির মাধ্যমে এ সংঘাতের অবসান হয়। চুক্তির মূল বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম একটি বিষয় ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামটি উপজাতীয়-অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত হবে। এখানকার জনগোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্য রক্ষা করা হবে। কথা ছিল, সরকার এখানে এমন একটি ব্যবস্থা করবে, যেখানে বাঙালিসহ ১৩টি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে তিন (রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি) পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠন হবে।

এখানে সব সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব থাকবে। পরিষদে জনগোষ্ঠীদের প্রতিনিধিত্ব বণ্টনের যে কথা বলা হয়েছে, সেখানে হয়তো ত্রুটি থাকতে পারে। সরকার চাইলে সেটি সংশোধন করতে পারে। এ তিনটি জেলা পরিষদের ওপর গঠন করা হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ। এর ওপরে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়।

এখন চুক্তি বাস্তবায়নের কথা বললে সরকারের পক্ষ থেকে গাণিতিক হিসাব দেওয়া হচ্ছে। এটি তো গাণিতিক হিসাবের বিষয় নয়। কথা হলো, যে উদ্দেশ্যে চুক্তি করা হয়েছে, সেটি পূরণ হয়েছে কি না?

চুক্তির মধ্যে বলা হয়েছে তিন জেলা পরিষদ পরিচালিত হবে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি দিয়ে। কিন্তু ২৪ বছরেও এর কোনোটির নির্বাচন হয়নি। নির্বাচনের যে প্রস্তুতি, সেটিও নেই। জেলা পরিষদের জন্য আলাদা ভোটার তালিকা হওয়ার কথা, সেটিও হয়নি। এটি খুব হতাশার বিষয়।

এত বড় পরিষদ চলছে মনোনীত ব্যক্তি দিয়ে। জনগণের কাছে পরিষদের সদস্যদের কোনো জবাবদিহি নেই। তাঁদের পরিচয় কী? তাঁদের পরিচয় তাঁরা কোনো একটি দলের লোক।

এটা হওয়ার কারণে তাঁদের জনগণের চেয়ে দলের প্রাধান্য বেশি। ফলে জেলা পরিষদ থেকে মানুষ যা প্রত্যাশা করে, তা পান না। পরিষদগুলোর নির্বাচন না-হওয়া একটি বড় দুর্বলতা।

চুক্তি একেবারে বাস্তবায়ন হয়নি, তা নয়। অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

এখানে অন্যতম সমস্যা ভূমিবিরোধ। চুক্তির পর আমরা চেয়েছিলাম পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি করতে সরকার উদ্যোগ নেবে। চুক্তি হলো। আইন হলো। ভূমি কমিশনও করা হলো। কমিশনের কাজ ছিল ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি করা। কমিশনের যাঁরা সদস্য, তাঁরা সবাই প্রতিষ্ঠানের শীর্ষকর্তা।

ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন করা হলো। এর বয়স ২৪ বছর। কিন্তু এ আইনটি কার্যকর করতে এখনো বিধিমালা করা হয়নি। এখন প্রশ্ন থেকে যায়, যে চুক্তির জন্য এত ত্যাগ—তো, এ চুক্তি বাস্তবায়নে এত উদাসীনতা কেন? এত অবহেলা কেন? কেন চুক্তি বাস্তবায়নের কাজ এগোচ্ছে না? ২৪ বছর পর এ প্রশ্ন করতে হচ্ছে।

গৌতম দেওয়ান। ভূমি কমিশন আইন হলো। সংশোধন হলো। বিধিমালা হবে—এটাই তো কথা ছিল; কিন্তু গত ২৪ বছরে কমিশন তার কাজই করতে পারেনি। কবে হবে, তা-ও জানা নেই। বলা যায়, চুক্তিকে অকার্যকর করে রাখা হয়েছে। এসব কারণে মানুষ হতাশ হয়ে পড়ছে।

২৪ বছরের সংঘাতের ফলে হাজার হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উদ্বাস্তু হয়েছে। অনেকে দেশ ছেড়ে প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় নিয়েছেন। চুক্তির মাধ্যমে তাঁদের দেশে ফেরানো হলেও পুনর্বাসন করা হয়নি। এঁদের সমস্যা সমাধানের জন্য টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে; কিন্তু এই টাস্কফোর্স পুরোপুরি নিষ্ক্রিয়। তাদের কোনো কাজ নেই। নাম দেওয়া হয়েছে; কিন্তু তাদের অফিস-জনবল-বাজেট কোনো কিছু নেই। তারা কিছুই করতে পারছে না। তারা শুধু বসে আছে। এই বসে থাকা ২৪ বছর হয়ে গেল। এক ইঞ্চি জায়গাও টাস্কফোর্স নিষ্পত্তি করতে পারেনি। একই অবস্থা অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের। সংঘাতময় পরিস্থিতিতে তাঁরা নিজ জায়গা-জমি ছেড়ে দেশের ভেতর নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। অনেকে সংরক্ষিত বনে বসবাস করছেন। তাদের সংখ্যা ৯৩ হাজার পরিবার। তাদেরও পুনর্বাসন করা যায়নি।

তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের সমন্বয় ও তত্ত্বাবধান করার কথা আঞ্চলিক পরিষদের। কিন্তু এ পরিষদের এখনো কার্যবিধিমালা করেনি সরকার। আঞ্চলিক পরিষদকে অকার্যকর করে রাখা হয়েছে। তাহলে কীভাবে চুক্তি বাস্তবায়নের কাজ এগোবে। এগুলো বসিয়ে রাখা হয়েছে। ‘ঢাল নেই তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দার’ করে রাখা হয়েছে আঞ্চলিক পরিষদকে।

পাহাড়ের আইনশৃঙ্খলা ঠিক রাখার জন্য পার্বত্য পুলিশের কথা বলা হয়েছে। এ বিভাগটি জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তর করার কথা; কিন্তু করা হয়নি।

চুক্তির ২৪ বছর পর যদি পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতির কথা বলি, তাহলে বলতে হয়, যেন যুদ্ধাবহ পরিস্থিতির মধ্যে আছি। এটিকে সরকারের একটি অংশ থেকে এমনভাবে অপপ্রচার করে যেন এটি একটি সংঘাতপূর্ণ এলাকা। এখনো বিচ্ছিন্নতাবাদীরা সক্রিয়। মনে হয়, এটি দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। জম্বিল্যান্ড হয়ে যাবে। এভাবে প্রতিনিয়ত অপপ্রচার চলছে। এ অপপ্রচারের উদ্দেশ্য—পাহাড়িরা পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করতে চায়। এটি একটি সম্পূর্ণ অপপ্রচার।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ১৯০০ সালের শাসনবিধি বাতিলের অপচেষ্টা করা হচ্ছে। এটি বাতিল করা পার্বত্য চুক্তি বাতিল করার শামিল। কারণ, পার্বত্য চুক্তির আলোকে যেসব প্রতিষ্ঠান গঠন হয়েছে, এগুলো তো পার্বত্য চট্টগ্রাম ১৯০০ সালের শাসনবিধিকে ধরে করা হয়েছে। কিন্তু একটি অংশ এটি বাতিলের জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। এটি আমাদের রাষ্ট্রের জন্য খুবই দুঃখজনক।

গৌতম দেওয়ান
পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক কমিটির সভাপতি, রাঙামাটি পার্বত্য জেলার সাবেক চেয়ারম্যান

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
 
    সব মন্তব্য

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    এলাকার খবর

     
     

    দোয়া সফলতার হাতিয়ার

    ফ্যাশনেবল ফিউশন

    নিরাপদ অভিবাসন নিয়ে কর্মশালা

    ঘাটাইলে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো ৩ অবৈধ ইটভাটা

    জরাজীর্ণ টিনের ঘরে ৩৮ বছর পাঠদান

    ৫ ইউপিতে আওয়ামী লীগের ৭ বিদ্রোহী

    ‘বাহে এবার জারোত থাকি মুই বাঁচিম বাবা’

    গৃহযুদ্ধের কিনারায় যুক্তরাষ্ট্র!

    দক্ষিণখানে নির্মাণাধীন ভবন থেকে পড়ে শ্রমিকের মৃত্যু

    সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন পরিচয়ে প্রতারণার অভিযোগে মেম্বর প্রার্থী গ্রেপ্তার 

    দক্ষিণখানে ধর্ষণের অভিযোগে যুবক গ্রেপ্তার

    রাবিতে সশরীরেই চলবে ক্লাস-পরীক্ষা