Alexa
বৃহস্পতিবার, ১১ আগস্ট ২০২২

সেকশন

epaper
 

মুক্তিযুদ্ধের সেই সব দিনগুলো

আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০২১, ১০:৫৭

মুক্তিযুদ্ধের সেই সব দিনগুলো মুক্তিযুদ্ধকালের কথা বলছি। একদিন গভীর রাতে ভারতের উদ্দেশে বাড়ি ছেড়েছিলাম মায়ের আঁচল থেকে। পথে চাঁদের রুপালি আলো ঢেউয়ের ওপর খেলা করছিল আর মনের গভীরে ছিল প্রচণ্ড আবেগ, মুক্ত করতে হবে দেশমাতাকে। তাই বুকে ছিল দুরন্ত সাহস।

নদী বেয়ে হাওর পেরিয়ে আমাদের নৌকা অবশেষে পৌঁছাল গিয়ে ভারতের মহেশখালীতে দুপুর বেলায়। সেখান থেকে হেঁটে পৌঁছালাম রংরা। দেখা হলো মৃণাল বিশ্বাস ও আলতাব আলীর সঙ্গে। তাঁরা নির্দেশ দিলেন কোথাও থামা যাবে না, চলতে থাকবে ডালু পৌঁছার আগপর্যন্ত। কিন্তু সঙ্গীদের কেউ কেউ রংরায় থেকে গেল। তারপর ফান্দা পর্যন্ত পৌঁছাতে রাত হলো। প্রচণ্ড খিদে পেল। চিড়া আর গুড় কিনে খেলাম। আশ্রয় নিলাম এক বিদ্যালয়-গৃহে এবং হাতের ওপর মাথা রেখে ক্লান্ত শরীরে ঘুমিয়ে গেলাম। সকালে জেগে শুনি কান্নাকাটি—রাতে একজন মারা গেছেন কলেরায়। এখানে আর অপেক্ষা করা যায় না। হাঁটতে শুরু করলাম বাঘমারার উদ্দেশে। পথে হাতির বড় বড় ল্যাদা রাস্তার ওপর দেখে ভয় হলো। তবে দেশত্যাগী মানুষের অশেষ মিছিল সে ভয় কাটিয়ে দিয়েছিল। বাঘমারা এলে আমাদের গ্রামের বিনয়, নাজিম উদ্দিন ও লতিফ এখানকার ক্যাম্পে ভর্তি হয়ে গেল। তারপর যাঁরা থাকলেন, তাঁদের নিয়ে আমরা অবশেষে অনেক কষ্টে বারেঙ্গাপাড়ায় ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের ক্যাম্পে পৌঁছাতে সক্ষম হলাম। আমাদের সঙ্গে ছিলেন ফজলু ভাই, লতিফ মাস্টার, আলী উসমান প্রমুখ।

বারেঙ্গাপাড়া ক্যাম্পে অবস্থান করছিলেন জ্যোতিষ বোস, মহাদেব সান্যাল, রবি নিয়োগী, আজিজুল ইসলাম খান ও কাজী আব্দুল বারির মতো নিবেদিতপ্রাণ নেতারা। আমার খুব মনে পড়ে, রাত দুপুরে বারি ভাই মেইন রোডে হেঁটে হেঁটে নবাব সিরাজউদ্দৌলার অভিনয় করতেন আর মহাদেব সান্যাল বলতেন, ‘দেখবে, পুলিশ তোমাকে ধরে নিয়ে যাবে।’ তিনি হাসতেন। এই ক্যাম্পে আমার গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে নেত্রকোনার অঞ্জন ভদ্রের সঙ্গে। তিনি দত্ত উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, বর্তমানে অবসরে আছেন। আমরা কেউ কাউকে ভুলতে পারি না। সে অনেক স্মৃতির বেড়াজাল।

ওখানে আমাদের ওপর দায়িত্ব পড়ে তথ্য বিভাগের। তখন মুক্তিযুদ্ধের ওপর বামদের দুটো পত্রিকা চলত। একটির নাম ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এবং অপরটি ‘নতুন বাংলা’। পত্রিকা দুটোর প্রচার এবং ওগুলোর জন্য সংবাদ সংগ্রহের কাজটি আমরা দুই বন্ধু মিলে করতাম। পত্রিকা বিক্রি করতে যেতাম প্রিন্সিপাল মতিউর রহমান পরিচালিত রিক্রুটিং ক্যাম্পে। আমরা গেলে তিনি খুব খুশি হয়ে পত্রিকা রাখতেন, আমাদের রণাঙ্গনের খবর জানাতেন। প্রায়ই খাওয়াতেন এবং পত্রিকার জন্য অগ্রিম টাকা দিয়ে দিতেন। ওনার স্নেহের বিষয়টি খুব মনে পড়ে।

আমরা পত্রিকা বিক্রি করতে যেতাম ভেতরের দিকে। সেখানে বাস করতেন হরিষচন্দ্র মারাক। তিনি ছিলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। নিঃসন্তান মানুষ। তাঁর আদিবাস ছিল বাংলাদেশের দুর্গাপুরে। তিনি আমাদের দুজনকে খুব ভালোবাসতেন, গারো ভাষার তালিম দিতেন। তিনি নিয়মিত পত্রিকা দুটো রাখতেন। ওনার স্ত্রী বড় হৃদয়বতী মানুষ ছিলেন। আমরা গেলেই চা-নাশতা বরাদ্দ করতেন। তাঁর এই আদরে চোখ ভিজে উঠত, মায়ের মুখচ্ছবি হৃদয়ের আয়নায় ভেসে উঠত।

ওখানে উঁচু টিলার ওপর একটি সুন্দর বাড়ি ছিল খুবই পরিপাটি। সেখানে এক দম্পতি বাস করতেন। ওনারা ছিলেন উচ্চশিক্ষিত এবং দুজনই সরকারি চাকরি করতেন। তাঁদের কাছে পত্রিকা বিক্রি করতে যেতাম বিকেলবেলায়। প্রায়ই দেখতাম ওনারা চুটিয়ে ব্যাডমিন্টন খেলছেন। আমাদের খুব সম্মান করতেন। খেলা থামিয়ে পত্রিকা রাখতেন। আন্তরিকতার সঙ্গে গল্প করতেন। বাংলাদেশের মানুষের মুক্তিযুদ্ধের উচ্চমূল্যায়ন করতেন। আমাদের দেশের জন্য ত্যাগ, লড়াই তাঁদের অভিভূত করেছিল।

তাড়াইলের রেজ্জাক ভাই ছিলেন ক্যাম্পের খাদ্য পরিচালক। তিনি আমাদের প্রতিদিন পঞ্চাশ পয়সা করে হাতখরচ দিতেন। সকালের নাশতায় থাকত রুটি-ভাজি। রুটি বেলার দায়িত্ব পড়েছিল আমার আর অঞ্জনের ওপর। অঞ্জন খুব সুবিধে করতে পারত না, কাজটা একা আমাকেই করতে হতো। বেলন ছিল না, একটা লম্বা কাচের বোতল দিয়ে কাঠের টুকরায় রুটি বেলতাম। দিনগুলো স্মৃতির আকাশে ভেসে থাকে অনুক্ষণ।

তারপর সেই মাহেন্দ্রক্ষণটি উপস্থিত হয়। এবার সশস্ত্র প্রশিক্ষণে যাওয়ার পালা। আমরা ৫০ জনের একটি দল যাত্রা করি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, মেঘালয়ের রাজধানী তুরা পৌঁছালে পুলিশ আমাদের আটকিয়ে থানায় নিয়ে যায়। আমি এবং অঞ্জন সেখান থেকে পালিয়ে গিয়ে সিপিআই নেতা ললিত হাজংয়ের কাছে বিষয়টি জানাই। তিনি কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে আমাদের পুলিশ ফের বারেঙ্গাপাড়া পাঠায়। সিপিআই কেন্দ্রীয় নেতা ভূপেশগুপ্ত বিষয়টি নিয়ে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ইন্দিরা গান্ধীর হস্তক্ষেপে অল্পদিনের মধ্যেই আমরা আবার সামরিক লরিতে করে ট্রেনিংয়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করি। ৬০০ কিলোমিটার পাহাড়ি রাস্তা অতিক্রম করে আমাদের জন্য নির্ধারিত ট্রেনিং সেন্টার আসামের তেজপুর ক্যান্টনমেন্টে পৌঁছাই। সেখানে একটা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ সামনে রেখে আমাদের গেরিলা প্রশিক্ষণ হয়। ভোর ৫টার মধ্যে আমরা ঘুম থেকে উঠতাম, ৬টার মধ্যে ফলইন, তারপর পিটি হতো। পিটি শেষে নাশতা, মগভর্তি খসখসে চায়ের কথা খুব মনে পড়ে। তারপর গেরিলাযুদ্ধের কৌশলের ওপর ট্রেনিং হতো। সবশেষে অস্ত্র-প্রশিক্ষণ। আমাদের জঙ্গল ট্রেনিং হয়েছিল হিমালয়ের পাদদেশে বুরুলি নদীর তীরে।

আমাদের সঙ্গে যাঁরা প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন, তাঁদের সবার নাম মনে নেই, সেটা স্মৃতির প্রতারণা। যাঁদের নাম মনে পড়ে তাঁরা হলেন গৌরচন্দ্র, ঝাড়ু, মানিক, ভূপেন্দ্র ভৌমিক, গোলাম রহমান, প্রতাপ দাস, সেন্টু রায়, দিলীপ চক্রবর্তী, শরাফ, অধ্যাপক নুরুল হক, ইপিআর জাহেদ, নজরুল, আলী উসমান, আব্দুর রশিদ, বুলবুল প্রমুখ। আমাদের গ্রুপটির নাম ছিল আই গ্রুপ। কমান্ডার ছিলেন অধ্যাপক নুরুল হক।

আজ জীবনের শেষ অংশে এসে সেই সব দিনগুলোর কথা খুবই মনে পড়ে। মনে পড়ে, কী ছিল আমাদের প্রাণের দাবি, যার জন্য আমরা লড়েছিলাম। এখন স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পরেও মানুষের বেকারত্বের সমস্যা মেটেনি। মাতৃভাষায় বিজ্ঞানভিত্তিক একমুখী কোনো শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। সব ক্ষেত্রে কেবল লুটপাট। গণতন্ত্র নির্বাসনে। ধর্মনিরপেক্ষতায় পাণ্ডুরোগ। বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ রুদ্ধপ্রায়। সব দেখে মনে হয়, শোষণহীন একটা সমাজ দূরে। তাই আজ শপথ নিতে হবে, একটি মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য মুক্তিযুদ্ধ অব্যাহত রাখার।

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
 
    সব মন্তব্য

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    পঠিতসর্বশেষ

    এলাকার খবর

     
     

    ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কাছ থেকে কী শিখতে পারলাম

    এয়ার কুলারের যত্নআত্তি

    জলাধার বন্ধ করে প্রাচীর পানির নিচে খেতের ধান

    বাইক বিক্রি অর্ধেকে নেমেছে

    পতনের বৃত্তে পুঁজিবাজার

    কাজ না করে ভুয়া ভাউচার

    ডায়াবেটিস রোধ করা গেলে বছরে ৪টি পদ্মাসেতু নির্মাণ সম্ভব: বিএসএমএমইউ উপাচার্য

    রাশিয়ায় তথ্য পাচারের অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি জার্মান সেনা কর্মকর্তা

    ভোরে নিলাম ডেকে সম্পত্তি বিক্রি: কুষ্টিয়ার ডিসি–এসপি ও ব্র্যাক ব্যাংকের এমডিকে তলব

    আবাসিক হোটেল থেকে নারী চিকিৎসকের মরদেহ উদ্ধার, ঘাতক রেজাউল গ্রেপ্তার

    খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২৬ হাজার কোটি টাকা

    সাংবাদিকের প্রশ্নে বাবরের জবাব, এখনো বুড়ো হইনি