Alexa
বৃহস্পতিবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২২

সেকশন

epaper
 

অপচয়ে বিশ্বে খাদ্যাভাব

আপডেট : ৩০ নভেম্বর ২০২১, ১৩:০২

অপচয়ে বিশ্বে খাদ্যাভাব আমাদের দেশে ভাত প্রধান খাদ্য। সেই ভাত কম খাওয়া নিয়ে আবার কথা বলাবলি শুরু হয়েছে। তাই বিষয়টি একদিকে খুব চিত্তাকর্ষক ও অন্যদিকে অতিগুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে। ভাত শর্করাজাতীয় খাদ্য। ভাত শরীরে শক্তি জোগায়, কায়িক পরিশ্রমে গায়ে বল দেয়। এ জন্য গতর খাটা মানুষ ভাত একটু বেশি খায়। গৃহস্থের ঘরে ঘরে ভাত ফুরিয়ে গেলে অভাববোধ তৈরি হয়। এ অবস্থা দেশের অনেকের মধ্যে একই সঙ্গে শুরু হলে প্রধান খাদ্যের সংকটে দাম বেড়ে বাজার গরম হয়ে ওঠে এবং মূল্যস্ফীতির নিয়ন্ত্রণহীনতা ও আর্থসামাজিক নিরাপত্তাহীনতায় মঙ্গা পরিস্থিতি তৈরি হয়। এ নিয়ে রাজনীতিও জমে ব্যাপক।

অনেক দিন আগে গ্রামের মানুষ রুটি খেত না। আমদানি করা গমের আটার মূল্য চালের অর্ধেক ছিল। যাদের ঘরের ধান ফুরিয়ে যেত, তারা ‘ভাত ফুরিয়েছে’ বলে খুব লজ্জা পেত। এখনো অনেক গৃহস্থ ঘরে ভাত ফুরিয়ে গেলে খুব লজ্জা পেতে হয়। ভাত ফুরালে সমাজে তাদের অসম্মান হয়। গৃহস্থ ঘরে চাল কেনাটা অপমানজনক। তাই তারা হাটে-বাজারে চাল কিনতে যায় নিজেকে লুকিয়ে। গোলার ধান বা ভাত ফুরিয়ে গেলে নিজেদের অভাব প্রকাশ পাওয়ার ভয়ে অনেকে সে কথা কাউকে বলতে চায় না।

এখন দিন বদল হয়েছে। মানুষ গমের আবাদ করছে। আটার দাম চালের চেয়েও বেশি। তবু এখনো গ্রামের অনেক মানুষ রুটি খাওয়া পছন্দ করে না। তারা তিন বেলা ভাতই খেয়ে থাকে।

পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে আমাদের এই জনপদে গ্রামীণ যৌথ পরিবারগুলোয় গড়ে ৮-১০ জন নির্ভরশীল সদস্য দেখা যেত। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ বলে তখন কোনো কর্মসূচি ছিল না। পৃথগন্ন পরিবার সৃষ্টি হতে থাকলে পৈতৃক জমি ভাগাভাগির মেরুকরণ প্রক্রিয়ায় জমির পরিমাণ কমে যায়। পরিবারের সদস্য সংখ্যাও বাড়তে থাকে। অনেকে আবাদি জমিতে বসতবাড়ি তৈরি করে ও জমির আইলের পরিমাণ বেড়ে যায়। এ দেশে কৃষি প্রধান উপজীব্য হলেও অগণিত নদীভাঙা মানুষের বাস্তুভিটা নেই। অনেকের ভিটা থাকলেও কৃষিজমি নেই। খাসজমি বিতরণের ফলে ভূমিহীন কিছুটা কমলেও চার ভাগের এক ভাগ মানুষ ভূমিহীন (কৃষিশুমারি ২০১৯)। গ্রামীণ ভূমিহীনেরা অন্যের জমিতে শ্রম বিকোয় অথবা বর্গাচাষ করে।

একসময় চৈত্র ও কার্তিক মাসে সাধারণত ছোট ও প্রান্তিক কৃষকের ঘরের ধান-চাল ফুরিয়ে যেত। তারা হাত পাতত মহাজনের কাছে। জমি বন্দক বা বিক্রি করে ভাত কিনে খাওয়া শুরু হতো। চারদিকে অভাব শুরু হলে চালের দাম বেড়ে যেত। বিদেশ থেকে সাদা মোটা আতপ চাল ও গম আমদানি করে খাদ্যাভাব মেটানো হতো। দুর্ভিক্ষের সময় লঙ্গরখানা খুলে গমের আটার মোটা মোটা রুটি তৈরি করে বিতরণ করা হতো। ভাতের অভাবে লঙ্গরখানায় রুটি খেতে যাওয়ার বছরগুলোয় খাদ্যাভাবের সঙ্গে ‘পেটের ভোক’ শব্দটির কথা ছড়িয়ে পড়ে। এটাই কোনো কোনো এলাকায় ‘মঙ্গা’ নামে পরিচিতি পায়।

এরপর ভাতের ওপর চাপ কমাতে বেশি করে আলু খাবার পরামর্শ দেন অনেকে। আশির দশকের শুরুতে শ্যালো বা গভীর নলকূপের পানিতে স্কিমের আবাদের প্রচলন শুরু হলে ধানের ফলনে প্রাচুর্য দেখা দিতে শুরু করে। দেশে চালের দাম কমে যায় ইরি ধানের আগমনে। খরিফ মৌসুমে ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে হাইব্রিড ধানের আবাদ শুরু হলে ধানের দাম কমে যায় ও তিন বেলা ভাত খাওয়ার সহজলভ্য উপায় তৈরি হয় খেটে খাওয়া মানুষের জন্য। একই সঙ্গে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি চালু হয় ব্যাপক প্রচারণার মাধ্যমে।

কিন্তু বিগত বছরগুলোয় উন্নয়নের নামে প্রাকৃতিক জলাধার, নদী, বন, আবাদি জমি ইত্যাদি ধ্বংস করার ফলে ফসলের আবাদ কমতে থাকে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ব্যাপক হারে প্রাকৃতিক দুর্যোগে নষ্ট হতে থাকে সারা পৃথিবীর খাদ্য উৎপাদন। মরু ও নিচু সামুদ্রিক এলাকা পরিবেষ্টিত দেশগুলোয় খরা, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, পঙ্গপালের আক্রমণ প্রভৃতিতে ব্যাপক ফসলহানি ঘটে।

অপরদিকে ধনী দেশগুলোয় নষ্ট করা হয় বছরে ১০০ কোটি টনের বেশি খাদ্যদ্রব্য। দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, ‘সারা বিশ্বে বেশির ভাগ বাড়িতে একজন ব্যক্তির বছরে খাবার অপচয়ের পরিমাণ গড়ে ৭৪ কেজি। যুক্তরাজ্যের প্রতিটি বাড়িতে অপচয় করা হয় প্রতি সপ্তাহে একটি পরিবারের আট বেলার খাবার। মোট খাবার অপচয়ের ১৭ শতাংশ হয় রেস্তোরাঁ ও দোকানে। কিছু খাবার নষ্ট হয় কারখানা ও সাপ্লাই চেইনে।’ এর অর্থ হলো, মোট খাবারের এক-তৃতীয়াংশ কখনো খাওয়াই হয় না (আমাদের সময় ডট কম, ৬.৩.২০২১)। অনেকে বলছেন, জলবায়ু নয়, জলজ্যান্ত খাদ্য অপচয় বিশ্বের খাদ্যাভাবের মূল কারণ।

আমাদের দেশে খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে। তবু কেন খাদ্যাভাব? বাজারে খাদ্যদ্রব্য ও তৈজসপত্রের সরবরাহে ঘাটতি নেই, তবু কেন সংকট? লাখ লাখ টন খাদ্যশস্য গুদামে মজুত করা আছে বলে তথ্যে দাবি করা হচ্ছে। তবু কেন ক্ষুধার সময় ভাত কম করে খেতে বলতে হবে?

ব্যাপক আয়বৈষম্য ও শহর-গ্রামের মানুষের মধ্যে জীবনযাত্রায় ব্যাপক ভিন্নতা খাদ্য গ্রহণের ক্ষেত্রেও নানা ফাঁরাক তৈরি করেছে বিশ্বব্যাপী। শহরের বিত্তশালী পরিবারের স্বাস্থ্যবান শিশুকে তোয়াজ করে দামি খাবার খাওয়ানো যায় না। অথচ গ্রামের শিশুরা ভাতের নাগাল পেতে হিমশিম খাচ্ছে। শহরে হচ্ছে একশ্রেণির মানুষের বাহারি বিলাসী খাদ্য-খাবারের নামে পুষ্টিমানের অপচয় আর বস্তি ও গ্রামে হচ্ছে পুষ্টিমাত্রা গ্রহণের অভাব। গ্রামের প্রান্তিক কৃষক-মজুরেরা দুধ, ডিম উৎপাদন করে নিজে না খেয়ে অর্থের প্রয়োজনে শহরের বাজারে চালান বা বিক্রি করে দিয়ে ভাত-রুটি কিনে আনেন।

ধনী দেশে খাদ্যের অপচয় ব্যাপক। তারা খাদ্যদ্রব্য আমদানি করে। যেমন আমাদের দেশের ইলিশ মাছ কানাডা, আমেরিকায় যে দামে বিক্রি হয়, তার চেয়ে আমাদের দেশের বাজারে ইলিশের বেশি দাম। ধনী দেশের মানুষের ঘরের ফ্রিজে রাখা খাবারের মেয়াদ পার হয়ে যায়। নতুন কিনে বাসি-মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার ডাস্টবিনে ফেলে দেয়।

আরবের শেখেরা একটি আস্ত দুম্বা বা উটের রোস্ট পাতে নিয়ে সামান্য খেয়ে বাকিটা অপচয় করে। করোনায় ভিক্ষুকদের ভাঙা থালা বা হাত ধনীদের তালা দেওয়া দুয়ারের বাইরে রয়ে যায়। ফলে দান বা সাহায্য কিছুই সম্ভব না হওয়ায় ভিক্ষুক ও নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে সেগুলো অধরা থেকে অভাবকে আরও কঠিন করে তুলেছে। করোনার খারাপ প্রভাব দরিদ্রকে আরও দরিদ্র করেছে। করোনাভীতি খাদ্যহীনকে তালাবদ্ধ ধনীর দরজায় ফিরিয়ে দিয়ে আরও ক্ষুধাকাতর করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে।

জলবায়ুর প্রভাবকে ঠেকিয়ে মানুষ কৃত্রিম পদ্ধতিতে খাদ্য উৎপাদন বাড়ালেও সেগুলোর মূল্য বৃদ্ধি পেয়ে গরিবের নাগালের বাইরে চলে গেছে। সাম্প্রতিক ইউএনএফসিসি আয়োজিত ‘কনফারেন্স অব দ্য পার্টিজ (কপ-২৬)’ সম্মেলনে সে কথা মোটেও গুরুত্ব পায়নি। দরিদ্র দেশের মানুষ কপ-২৬-এ যোগদান করলেও তারা সেসব দেশের ধনিকশ্রেণি ও পাঁচতারা হোটেলে থাকা এবং বিলাসী খাদ্য ভক্ষণে অভ্যস্ত শ্রেণি-পেশার। আসল অভাবী মানুষ সেই সম্মেলনে প্রতিনিধিত্ব করেনি, সেখানে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ নেই তাদের।

জলবায়ুর প্রভাবে যতটুকু ক্ষতি হচ্ছে তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি ক্ষতি হচ্ছে বিত্তশালীদের খাদ্যবিলাস, দরিদ্র মানুষের প্রতি কার্পণ্য, অবহেলা ও কোটি কোটি টন খাদ্য অপচয়ের দ্বারা। তাই জলবায়ু নয়, জলজ্যান্ত খাদ্য অপচয় বিশ্বে খাদ্যাভাব সৃষ্টির মূল কারণ। এই অবিবেচক ও হৃদয়হীন মানুষগুলোর খাদ্য অপচয় ঠেকানোর জন্য ব্যাপক প্রচারণা চালানো উচিত।

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
 
    সব মন্তব্য

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    এলাকার খবর

     
     

    অস্তিত্ব সংকটে বংশাই নদ

    আত্মনির্ভরশীল হচ্ছেন আশ্রয়ণের বাসিন্দারা

    হেলে পড়া সেতু সংস্কার হয়নি চার বছরেও

    সখীপুরে দুই ইটভাটা মালিককে জরিমানা

    স্বর্ণের কয়েন বিক্রির নামে প্রতারণা, আটক ১

    গারো পাহাড়ে পানির সংকট

    আগামী নির্বাচন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে সংলাপ করার আহ্বান হারুনের 

    নাচ শেখার অনুষ্ঠান ‘নাচের ইশকুল’

    দ্বিতীয়বার করোনায় আক্রান্ত আফ্রিদি

    করোনা আক্রান্ত সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, গুরুতর অসুস্থ

    মৃত্যুর ২ দশক পর আপিল নিষ্পত্তি

    সিরিয়া সীমান্তে জর্ডান সেনাবাহিনীর গুলিতে ২৭ মাদক পাচারকারী নিহত