Alexa
বৃহস্পতিবার, ২০ জানুয়ারি ২০২২

সেকশন

epaper
 

বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের কেন এই দুরবস্থা

আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০২১, ২১:৫৬

একটা প্রফেশনাল টিম বারবার হারতে থাকলে সমালোচকদের মুখ বন্ধ করা কঠিন। ছবি: বিসিবি আবারও হারের বৃত্তে আটকা পড়েছে বাংলাদেশের ক্রিকেট দল। মাঝে ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে লাগাতার পরাজয়ের গ্লানি মোচন করে কিছুটা সম্ভাবনা জাগিয়েছিল। চাপা পড়ে গিয়েছিল ব্যর্থতা ও ব্যর্থতাজনিত সমালোচনা। কিন্তু টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ এবং এর পরপরই পাকিস্তানের সঙ্গে শোচনীয় পারফরম্যান্সের পর আবার সমালোচনা শুরু হয়েছে।

ক্রিকেটে, বিশেষ করে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে বাংলাদেশ দলের কেন এই করুণ অবস্থা? যেকোনো খেলাতেই সবকিছু যে নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকবে, এমন কোনো কথা নেই। আবার এটাও সত্যি, কিছু জিনিস নিয়ন্ত্রণে থাকলে ম্যাচ সহজে হাতের মুঠোয় পুরে ফেলা যায়। অতীতে বাংলাদেশ সেটা করেনি বা করতে পারেনি, তা নয়। কিন্তু টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে আগাগোড়াই গলদ লক্ষ করা যাচ্ছে। সাফল্য ক্রমেই নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

এত সুযোগ-সুবিধা পেয়ে একটা প্রফেশনাল টিম যদি এ রকম করে হারতে থাকে, তখন সমালোচকদের মুখ বন্ধ করে দেওয়া কঠিন। অনেক দিন ধরে প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট খেলার পরও কেন যেন দলগত সংহতি এখনো গড়ে ওঠেনি। বাংলাদেশের সামনে রয়েছে পাকিস্তান বা আফগানিস্তানের মতো জলজ্যান্ত উদাহরণ, যারা একের পর এক সমস্যায় বিধ্বস্ত হয়েও বিশ্বকাপে জানপ্রাণ দিয়ে লড়েছে। বাংলাদেশ দলের খেলা দেখে মনে হয়েছে, দলের মধ্যে জেতার মানসিকতাটাই গড়ে ওঠেনি। না হলে একটি ম্যাচেও কেন ‘মরিয়া চেষ্টা’র ক্রিকেট দেখা গেল না? একজন খেলোয়াড়ও কেন আলাদা করে নজর কাড়তে পারলেন না? খেলোয়াড়দের শরীরী ভাষাই যেন ঠিক ছিল না। প্রতিটি ম্যাচে বাংলাদেশ যেন হারার আগে হেরে বসেছে। একটা দলের আত্মবিশ্বাস কতটা তলানিতে থাকলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, তা নিয়ে চর্চা চলছে ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে।

এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের শুরুতে বড় একটা ধাক্কা খেয়েছিল বাংলাদেশ। প্রথম পর্বের প্রথম ম্যাচে বাংলাদেশ দল হেরে গিয়েছিল স্কটল্যান্ডের কাছে। সেই ধাক্কা সামলে ওমান ও পাপুয়া নিউগিনিকে হারিয়ে সুপার টুয়েলভে ওঠে। কিন্তু টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় পর্ব থেকে ফিরতে হয়েছে শূন্য হাতে। সুপার টুয়েলভে পাঁচ ম্যাচের সবকটিতে হেরে যাওয়া বাংলাদেশ দলের দিকে ছুটে যাচ্ছে সমালোচনার তীক্ষ্ণ তির।

কষ্টের শুরুটা শুরু হয়েছিল অবশ্য তারও আগে, যখন বাংলাদেশকে সদ্যসমাপ্ত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মূল পর্বে অংশ নিতে বাছাইপর্ব খেলতে হয়েছে। অথচ বাংলাদেশের চেয়ে পরে আবির্ভূত আফগানিস্তান মূল পর্বে জায়গা করে নিয়েছে। র‍্যাঙ্কিংয়ে আমাদের চেয়ে দুই ধাপ এগিয়ে অষ্টম অবস্থানে থাকায় তারা এ সুবিধা পেয়েছে। ধরে নিলাম এটি আমাদের কয়েকটি প্র্যাকটিস ম্যাচ খেলার সুযোগ করে দিয়েছিল, কিন্তু হতাশার নতুন মাত্রা যোগ হয় যখন স্কটল্যান্ডের কাছে দ্বিতীয়বারের মতো হারতে হয়।

বলতে দ্বিধা নেই যে, আমাদের ক্রিকেট এখনো পরিকল্পনাহীন হ-য-ব-র-ল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এখনো আমাদের একটা ব্যালান্সড একাদশ ঠিক করা সম্ভব হয়নি। সবাই সব ম্যাচে ভালো খেলবে না, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দেখা গেছে প্রতিটি টুর্নামেন্টে কয়েকজন খেলোয়াড়কে নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হচ্ছে। বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট দলের ব্যাটিং অর্ডার এখনো ঠিক করা যায়নি। ওপেনাররা ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছেন, তাঁদের ব্যাট থেকে বড় অঙ্কের রান আসছে না। আর পাওয়ার-প্লেতে প্রায় সবাই ব্যর্থ।

ব্যাটারদের পারফরম্যান্স দুটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে, উইকেটের চারপাশে খেলার দক্ষতা ও ফুটওয়ার্ক। যদি এ দুটির ঘাটতি থাকে, তবে বলের লেংথ বুঝে হার্ড হিটিং শিখে নিতে হয়। বর্তমান সময়ে এ রকম অনেক ব্যাটার রয়েছেন, যাঁরা শারীরিক শক্তি দিয়েই খেলছেন। আর টি-টোয়েন্টি হলে তো কথাই নেই, প্রতি বলে ছক্কা প্রয়োজন না-ও হতে পারে, তবে ছক্কা মারার মানসিকতা ও যোগ্যতা থাকতে হয়।
বোলিং বিভাগেও হতশ্রী দশা। মোস্তাফিজ ছাড়া কোনো নির্ভরযোগ্য বোলার নেই। দেশে ভালো পেস বোলার তৈরি হচ্ছে না। ভালো মানের স্পিন বোলারও পাওয়া যাচ্ছে না। স্পিনারদের মধ্যে ধারাবাহিকতা নেই। আর ফিল্ডিংয়ের কথা বিবেচনা করলে সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে আছে আমাদের দল। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে এবং বর্তমানে বাংলাদেশে খেলতে আসা পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশ দলের ফিল্ডিং ছিল অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক।

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপকে একপাশে সরিয়ে রাখলেও তো চোখে ভেসে উঠছে ঘরের মাঠে আফগানিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট হার, ভারতের বিপক্ষে দুই টেস্টই আড়াই দিনে শেষ হয়ে যাওয়া (যার মধ্যে ইডেন গার্ডেনসের সেই ঐতিহাসিক ডে-নাইট টেস্টও রয়েছে), এক জিম্বাবুয়ে ছাড়া আর কোনো দলের বিপক্ষে গত তিন বছরে কোনো টেস্ট না জেতা এমনকি এই বছরের শুরুর দিকে তৃতীয় সারির ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে নিজেদের মাটিতেই হোয়াইটওয়াশ হওয়ার মতো বিভীষিকাময় সব স্মৃতি।

এমন পরিস্থিতিতে আমাদের ক্রিকেট এগিয়েছে, নাকি আরও পিছিয়েছে, সেটি নিয়ে গবেষণা হতে পারে। খেলার পাশাপাশি আরও অনেক কিছু বিবেচনার অবকাশ রয়েছে। যেমন বিশ্বকাপের মতো আন্তর্জাতিক আসরে ম্যাচ রেফারি কিংবা আম্পায়ার হিসেবে আমাদের কেউ নেই। কেন আমাদের দেশে আন্তর্জাতিক মানের আম্পায়ার তৈরি হচ্ছে না? সবচেয়ে হতাশার কথা হচ্ছে, আমাদের ক্রিকেটে নতুন খেলোয়াড় উঠে আসছে না। জাতীয় দলে নতুন যাঁদের অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, তাঁদের কেউ ভালো করতে পারছেন না। শারীরিক সামর্থ্যের অভাবও প্রকট হয়ে দেখা দিচ্ছে। অবশ্য যে দেশের অধিকাংশ মানুষ অভাবের কারণে মাছ-মাংস খেতে পায় না, অসুখ হলে চিকিৎসা করাতে পারে না, তাদের কাছ থেকে কীভাবে প্রতিভাবান খেলোয়াড় আশা করা যায়?

আমাদের দেশের ক্রিকেটে দুটি জিনিসের কোনো অভাব নেই। এক হলো সমর্থক, দুই হলো টাকা। ক্রিকেট উন্মাদনায় আমরা এখন ভারত-পাকিস্তানকেও ছাড়িয়ে গেছি। এখানে স্পনসরের অভাব নেই। ক্রিকেটে টাকা ঢালার মতো জাতীয়-আন্তর্জাতিক প্রচুর প্রতিষ্ঠান মুখিয়ে আছে। আমাদের দেশের ক্রিকেট বোর্ডও অনেক ধনী। বিশ্বের ধনী ক্রিকেট বোর্ডের তালিকায় পঞ্চম স্থানে অবস্থান করছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বা বিসিবি। বিসিবি প্রায় এক হাজার কোটি টাকার মালিক। অথচ এই টাকা ক্রিকেটের উন্নয়নে যথাযথভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে না।

আসলে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ কিংবা ঘরের মাঠে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের লজ্জাজনক পারফরম্যান্স কোনো ‘বিনা মেঘে বজ্রপাত’ হয়ে আসেনি; বরং বছরের পর বছর ধরে ঘরোয়া ক্রিকেটে চলে আসা সীমাহীন দুর্নীতির ফল। ঘরোয়া ক্রিকেটকে গত কয়েক বছরে ‘ক্রিমিনালাইজ’ করা হয়েছে। নির্দিষ্ট কিছু দলের প্রতি পক্ষপাতমূলক আম্পায়ারিং, ক্রিকেট বোর্ডের কিছু অযোগ্য কর্মকর্তার জবাবদিহিমুক্ত আচরণ ক্রিকেটকে এগোতে দিচ্ছে না।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সাফল্য অর্জন কোনো অসম্ভব ব্যাপার নয়। উচ্চমানের ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ঘরোয়া ক্রিকেট, তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রতিভাবান ক্রিকেটার তুলে আনার জন্য দক্ষ ও আন্তরিক ক্রীড়া সংগঠন ও সংগঠক তৈরি, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে অনুশীলন ও খেলা আয়োজন করার জন্য পর্যাপ্ত অবকাঠামোসমৃদ্ধ স্টেডিয়াম তৈরি এবং অবশ্যই আন্তর্জাতিক মানের উইকেট তৈরি করতে হবে। শুধু জাতীয় দলের খেলোয়াড় নয়, সম্ভাবনাময় সব খেলোয়াড়কেই প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা দিতে হবে। দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ বিভাগ ক্রিকেট লিগ চালু করতে হবে। জেলায় জেলায় একাডেমি বানাতে হবে। নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। পক্ষপাতহীনভাবে খেলোয়াড় নির্বাচন করতে হবে। এর কোনোটিই আমাদের দেশের ধনী ক্রিকেট বোর্ডের আয়ত্তের বাইরে নয়।

যেকোনো খেলার আন্তর্জাতিক আসরে কোনো দল অপ্রত্যাশিত রকমের বাজে ফলাফল করতেই পারে। ২০০৭ বা ২০১৫ ক্রিকেট বিশ্বকাপে বাংলাদেশের কাছে যথাক্রমে ভারত ও ইংল্যান্ড তাদের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম লজ্জাজনক ব্যর্থতার শিকার হয়েছিল। ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে পরবর্তী সময়ে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি না করার মানসিকতা যে দীর্ঘ মেয়াদে কোনো দলকে কী পরিমাণ সাফল্য এনে দিতে পারে, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ ঠিক আগের বিশ্বকাপে গ্রুপপর্ব থেকে বাড়ি ফেরার পরও ২০১১ ও ২০১৯ বিশ্বকাপে ভারত ও ইংল্যান্ডের বিশ্বজয়। কিন্তু একের পর এক ব্যর্থতার চোরাবালিতে ডুবে যেতে থাকার পরও এ দেশের ক্রিকেট-সংশ্লিষ্ট কারও পক্ষে কি সেই ‘প্রকৃত শিক্ষা’ নেওয়া সম্ভব হবে? যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে জাতীয় ক্রিকেট দলের কাছ থেকে একরাশ হতাশা ছাড়া আর কিছুই মিলবে না।

লেখক: চিররঞ্জন সরকার গবেষক ও কলামিস্ট  

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
 
    সব মন্তব্য

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    এলাকার খবর

     
     

    ফ্যাশনেবল ফিউশন

    নিরাপদ অভিবাসন নিয়ে কর্মশালা

    ঘাটাইলে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো ৩ অবৈধ ইটভাটা

    জরাজীর্ণ টিনের ঘরে ৩৮ বছর পাঠদান

    ৫ ইউপিতে আওয়ামী লীগের ৭ বিদ্রোহী

    ভাঙা রাস্তায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি

    মঠবাড়িয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় যুবক নিহত

    কর্ম জবস সিনিয়র এক্সিকিউটিভ নেবে

    আদমদীঘি ট্রাক-মোটরসাইকেল মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ১ 

    ঝিকরগাছায় গরু ব্যবসায়ীর মরদেহ উদ্ধার

    র‍্যাবকে শেষ করে পুলিশকে ধ্বংস করছে সরকার: রিজভী

    ময়মনসিংহ মেডিকেলে আরও ৩ জনের মৃত্যু