Alexa
শুক্রবার, ২১ জানুয়ারি ২০২২

সেকশন

epaper
 

‘পাখিটা বুকের ভেতর রয়’

আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০২১, ১১:৩৯

প্রতিটি শিল্পকর্মের আলাদা আলাদা নাম দেন সনাতন। ছবি: লেখক মানুষ জীবন ধারণের জন্য যা কিছু গ্রহণ করে, তার সিংহভাগই আসে প্রকৃতি থেকে। প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণের আছে আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য। প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে পশু-পাখি ও মানুষের সঙ্গে প্রতিটি গাছের ভাষা ও আচরণ আলাদা। গাছের কাছে না গেলে সেই ভাষা বোঝা যায় না।

সনাতন মালো উল্লাস। প্রকৃতিকে ভালোবাসেন মনপ্রাণ উজাড় করে। ভালোবাসার সেই জায়গা থেকে রাস্তাঘাটে পড়ে থাকা অপ্রয়োজনীয়, মূল্যহীন নানা উপকরণ দিয়ে তৈরি করেন বিভিন্ন ধরনের শিল্পকর্ম। 

রাস্তাঘাটে নিতান্তই অবহেলায় পড়ে থাকা উপকরণ দিয়ে ভাস্কর্য তৈরির প্রসঙ্গে সনাতন বলেন, ‘শিল্পকর্ম, চিন্তা, চর্চা, সাধনা বা সংরক্ষণ এক সূত্রে গাঁথা। এ ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাটা মূল বিষয় বলে মনে হয় না আমার কাছে। আগ্রহ বা ভালোবাসা থাকলে যেকোনো জায়গা থেকে মানুষ অনেক কিছু তৈরি করতে পারে। আমার কাজের মূল উপাদান রাস্তাঘাটে, মাঠে, জঙ্গলে, পুকুরপাড়ে, নদীর ধারে পড়ে থাকা গাছের শেকড়, ভাঙা ডালপালা, লতাপাতা ও পশু-পাখির হাড়গোড়। ভাস্কর্য নিয়ে আমার কাজ করা ভালো লাগার জায়গা থেকে। এই ভালো লাগাটা ক্রমাগত ভালোবাসায় পরিবর্তিত হচ্ছে। তবে এই ভালোবাসাকে যত্ন ও পরিচর্যায় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আন্তরিকতার। সেই আন্তরিকতার গভীরে আছে মানবিক সমাজ গঠনে নিজেকে নিবেদন করা।’ 

রাস্তাঘাটে পড়ে থাকা অপ্রয়োজনীয়, মূল্যহীন নানা উপকরণ দিয়ে তৈরি করেন বিভিন্ন ধরনের শিল্পকর্ম তৈরি করেন সনাতন মালো উল্লাস। ছবি: লেখক তবে নিজের তৈরি শিল্পকর্মকে ‘ভাস্কর্য’ বলার চেয়ে ‘রূপান্তর’ বলতে বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করেন সনাতন। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘আমরা তো কোনো কিছু সৃষ্টি বা তৈরি করতে পারি না; বরং এই প্রকৃতিতে যা আছে, সেটাকে চিন্তা আর ইচ্ছেশক্তির সমন্বয়ে রূপান্তর করতে পারি মাত্র। আমরা কেউ গাছ বা পাখি সৃষ্টি করতে পারি না। কিন্তু গাছের শেকড়, পাতা, ফুল বা পাখির পালক, এমনকি ফেলে দেওয়া যেকোনো প্রাকৃতিক উপকরণ কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন ধরনের শিল্পকর্ম তৈরি করতে পারি। প্রাকৃতিক এই উপকরণগুলো একসময় সেই সময়ের ইতিহাসকে বহন করবে। ধ্বংস হয়ে যাওয়া সভ্যতা যখন মানুষ মাটি খুঁড়ে আবিষ্কার করে, তখন সেখান থেকে উদ্ধারকৃত ভাস্কর্য এবং অন্যান্য শিল্পকর্মই বলে দেয় সেই সময়ের ইতিহাস।’ 

এ ধরনের শিল্পকর্মের দিকে সনাতনের আকর্ষণ কিন্তু ছোটবেলা থেকেই। বলা যায়, বেড়ে ওঠার সঙ্গেই কাঠ খোদাইয়ের বিষয়টি জড়িয়ে রয়েছে। সনাতন বলছেন, ‘তখন আমি বড়জোর তৃতীয় কিংবা চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। বাড়িতে প্রায় প্রতিবছর বর্ষাকালের শুরু কিংবা শীতের শেষে চার-পাঁচজনের একদল কাঠমিস্ত্রি আসতেন। তাঁরা মাসাধিককাল কিংবা তারও বেশি সময় ধরে নতুন নৌকা বানানো, পুরোনো নৌকা মেরামতের পাশাপাশি কাঠের নানা আসবাব তৈরি করতেন। বাড়ির খুব কাছেই ছিল কুমার নদ। তাঁরা নদের পাড়ে নৌকার বাদাম টানিয়ে ছায়াময় জায়গা তৈরি করে সেখানে কাজ করতেন সকাল থেকে রাত অবধি। স্কুল থেকে ফিরে প্রায় সারা দিনই কাটত সেই মিস্ত্রিদের সঙ্গে। হাতুড়ি, বাটাল, বাইসখান, রেন্দা, করাত, শীল ইত্যাদি হাতিয়ারের আলাদা আলাদা শব্দ আমাকে খুব টানত। কখনো কখনো টুকরো কাঠের ওপর হাতুড়ি ও বাটাল নিয়ে কিছু একটা করার প্রাণান্তকর চেষ্টা করতাম। বলতে গেলে শুরুর প্রথমটা সেখান থেকেই।’ 

নিজের তৈরি শিল্পকর্মকে ‘ভাস্কর্য’ বলার চেয়ে ‘রূপান্তর’ বলতে বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করেন সনাতন। ছবি: লেখক সনাতনের চারুকলায় পড়ার ভীষণ ইচ্ছা থাকলেও উপযুক্ত গাইডলাইন বা অর্থনৈতিক সংকটের কারণে সেদিকে আর যাননি। কোনো সম্ভ্রান্ত বা বনেদি পরিবারে তাঁর জন্ম হয়নি। খুব সাধারণ খেটে খাওয়া শ্রমজীবী পরিবারে জন্ম। সনাতনের পূর্বপুরুষের পেশা ছিল মাছ ধরা। অর্থনৈতিক টানাপোড়েন ও বৈরী স্রোতে দাঁড় বেয়ে, জাল বেয়ে, মাছ ধরে, কখনো বিক্রি করে তাঁর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাজীবন শেষ হয়। সনাতনের ছোটবেলা কেটেছে জল-কাদা, স্রোত, রোদ-বৃষ্টি, ঝড়, নৌকা, নদী, অন্ধকার রাত আর নদীতে ভেসে যাওয়া সুখ-দুঃখের গল্পের সঙ্গে। পাড় ভেঙে জলে পড়ে যাওয়া গাছ, শেকড়, লতাপাতা আরও অনেক কিছুর সঙ্গে মিলেমিশে কেটেছে তাঁর ছেলেবেলা। একসময় মাছ ধরার নৌকায়ও কুপিবাতির আলোয় পড়ালেখা করেছেন। 

 ২০০৫ সালে তিনি ঢাকায় স্থায়ীভাবে বাস করতে শুরু করেন। ছাত্রজীবন শেষে ঢোকেন বেসরকারি চাকরিতে। এর মধ্যে তিনি সময় ও সুযোগ বের করে তাঁর কাজ করার উপাদান সংগ্রহ করতেন। কাজের প্রয়োজনে ঢাকার বাইরে গেলে সেখান থেকে তিনি নিয়ে আসতেন গাছের টুকরো বা শেকড়সহ বিভিন্ন উপকরণ। এ ছাড়া পুরানা পল্টনের মুক্তি ভবনের বেসমেন্টে তাঁর কাজের জন্য একটা রুম ছিল। সেখানে তিনি তাঁর কাজগুলো সংরক্ষণে রাখতেন। ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের তাণ্ডবে হাজারো মানুষের অনেক মূল্যবান জিনিসের সঙ্গে তাঁর কাজগুলোও আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এ ঘটনার পরে ক্ষোভে অনেক দিন তিনি কাজ থেকে দূরে ছিলেন। 

বর্তমানে কাজের পরিবেশ বা পরিধির বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, ‘সীমিত আয়ের চাকরি করে ভাস্কর্যের মতো বিরাট বিষয়ে চর্চা করা দুঃসাহস ছাড়া আর কিছুই নয়। সংগ্রহে থাকা কিছু কাঠ আর শিকড় নিয়ে সাধারণ অ্যান্টিকাটার ও হাতুড়ি-বাটাল দিয়েই কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। এভাবে কাজ করা ভীষণ কষ্টকর ও সময়সাপেক্ষ। একদিকে বেঁচে থাকার সংগ্রাম, অন্যদিকে শিল্পচর্চা। নিজের জীবনের টানাপোড়েন মাঝেমধ্যে এই কাজে বিরাট বাধা হয়ে দাঁড়ায়। যদি টাকা-পয়সা উপার্জনের চাপ না থাকত, তবে নিজের মনের মতো করে তৈরি করতাম বিভিন্ন ধরনের শিল্পকর্ম। যদিও মাঝেমধ্যে মনে হয় এই উন্মাদনা নিতান্তই বিলাসিতা।’ 

সনাতন মালো উল্লাসের করা একটি শিল্পকর্ম। ছবি: লেখক সনাতন গান করেন, লেখেন। কাঠের তৈরি এসব ভাস্কর্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে নিজের গানের কাছেই ফিরে গেলেন তিনি। বললেন, ‘আমার লেখা একটা গানের একটা প্রিয় লাইন হলো—“পাখিটা বুকের ভেতর রয়…”। আমি আমার কাজে প্রথম এবং সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা পাই প্রকৃতির কাছ থেকে। দু-একজন জানেন আমি বড় গাছদের “মা”, আর ছোট গাছদের “সন্তান” বলে ডাকি। সুযোগ পেলে গাছ লাগাই। বৃক্ষ নিধনে ভীষণ কষ্ট পাই। পরিবারের সহযোগিতা না থাকলে কেউ কোনো কাজই ভালোভাবে করতে পারে না। আমি কৃতজ্ঞ আমার ব্যক্তিগত এবং আত্মিক পরিবারের কাছে। আত্মিক পরিবারের দু-একজন সুহৃদ কিছু কাজ সংরক্ষণের জন্য জায়গা দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। এর বাইরে সহযোগিতা বলতে যা বোঝায়, তা পাইনি কারও কাছ থেকে।’ 

সনাতনের করা এই ‘ব্যক্তিগত’ ও ‘আত্মিক’ পরিবারের উল্লেখ বেশ আগ্রহী করে তুলল। জানতে চাইলে বললেন, ‘আমি তিন রকম পরিবারের সদস্য। একটি নিজস্ব বা ব্যক্তিগত, একটি বৃহত্তর, আরেকটি আদর্শিক। ব্যক্তিগত পরিবার বলতে বৈবাহিক সূত্রে শিল্পী আক্তার আমার জীবনবন্ধু। আমাদের একটি কন্যাসন্তান আছে। তার নাম মেঘবতী স্লোগান। সে ৮ পেরিয়ে ৯-এর পথে। ক্লাস ওয়ানে পড়ে। আমরা বলি, “স্লোগান শিল্পী সনাতন—এক সত্তায় তিনজন”। মা-বাবা আছেন। আমার তিন বোন ও চার ভাই। এ ছাড়া দেশ ও দেশের সীমানা ছাড়িয়ে মানবধর্মে বিশ্বাসী অগণিত আপনজন আমার আদর্শিক পরিবারের সদস্য।’ 

জীবনযাপনের উপায়ের সঙ্গে শিল্পচর্চাকে যুক্ত করতে পারলে জীবন সার্থক হবে বলে মনে করেন সনাতন। ছবি: লেখক এই কাজ নিয়ে পরিকল্পনা কী—জানতে চাইলে সনাতন বলেন, ‘এটা আমার পেশা নয়। আবার শুধু শখের বসে করছি, তা-ও নয়। তবে যদি কখনো জীবনযাপনের সঙ্গে একে সম্পূর্ণভাবে যুক্ত করতে পারি, তবে জীবন সার্থক হবে। অনেক কিছু নিয়ে অনেক ভাবনা আছে, সবটা তো আর বাস্তবায়ন সম্ভব না। প্রতিনিয়ত কাজ করা এবং কাজগুলো সংরক্ষণের মতো একটি জায়গা হলে একটি গ্যালারি করতাম। কাজগুলো সবাইকে দেখানোর জন্য প্রদর্শন করতে চাই। পাখিরা যাতে ভালো থাকে, তার জন্য পৃথিবীকে সবুজ করতে চাই। দেশ যে আদর্শের জন্য স্বাধীন হয়েছে, সেই আলোকে অগণিত ভাস্কর্য করতে চাই। নতুন প্রজন্মকে এই বিষয়ের প্রতি আগ্রহী করতে একটি পাঠশালা করার ভাবনা অনেক দিনের। যদিও আমার চলমান বাস্তবতায় এটা অনেকটাই অলীক কল্পনা। সব থেকে বড় কথা হলো, আমি প্রতিনিয়ত শিখতে চাই, জানতে চাই এবং কাজ করতে চাই।’ 

আলাপে পাখির প্রসঙ্গই ঘুরেফিরে আসে বারবার। নিজের স্বপ্ন ও কাজ যেন পাখির ডানাতেই ভর করে আছে। যেন সবুজই সনাতনের একমাত্র আরাধ্য। বললেন, ‘পৃথিবী ক্রমাগত পাখিশূন্য হয়ে যাচ্ছে। আমাদের এই প্রিয় শরীর খাঁচাটাও একদিন পাখিশূন্য হয়ে যাবে। যেদিন পৃথিবী থেকে শেষ পাখিটা বিলুপ্ত হবে, সেই দিন সেই পৃথিবীতে কোনো মানুষ বেঁচে থাকতে পারবে কি না, সে বিষয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। আমি আমার কাজের মাধ্যমে একটা কথা বারবার বলতে চাই। সেটা হলো, মানুষের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে অবশ্যই পাখিদের বাসযোগ্য করতে হবে পৃথিবীকে।’

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
 
    সব মন্তব্য

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    এলাকার খবর

     
     

    চিরকিশোর এক রঙিন প্রজাপতি

    জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়া দুই অদেখা মানুষ

    রমণীয় রমনা এবং প্রাউডলক

    ‘মানুষ কি মানুষরে ফালাইয়্যা দিতে পারে!’

    ‘বাহে এবার জারোত থাকি মুই বাঁচিম বাবা’

    গৃহযুদ্ধের কিনারায় যুক্তরাষ্ট্র!

    দক্ষিণখানে নির্মাণাধীন ভবন থেকে পড়ে শ্রমিকের মৃত্যু

    সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন পরিচয়ে প্রতারণার অভিযোগে মেম্বর প্রার্থী গ্রেপ্তার 

    দক্ষিণখানে ধর্ষণের অভিযোগে যুবক গ্রেপ্তার

    রাবিতে সশরীরেই চলবে ক্লাস-পরীক্ষা