Alexa
মঙ্গলবার, ২৫ জানুয়ারি ২০২২

সেকশন

epaper
 

আওয়ামী লীগের আদর্শিক অবস্থান দুর্বল?

আপডেট : ২৬ নভেম্বর ২০২১, ১১:১৪

 আওয়ামী লীগ ২০০৯ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে ক্ষমতায় আছে। শেখ হাসিনার সরকার দেশ পরিচালনায় অর্থনৈতিক, সামাজিক নিরাপত্তাবলয়, যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক—ইত্যাদি ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব উন্নয়ন ঘটিয়ে চলছে। ২০১১-১৪ সালে দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যবস্থা করার মাধ্যমে বাংলাদেশে স্বাধীনতাবিরোধীদের রাজনীতি সরকার প্রথমবারের মতো জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে চিহ্নিত করে দেয়। একই 
সঙ্গে জঙ্গিবাদ, উগ্র ডানপন্থার রাজনীতি, আন্তর্জাতিক উগ্র ধর্মগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত শক্তিসমূহ সরকারের কঠোর নীতির কারণে কোণঠাসা হয়ে পড়ে।

শেখ হাসিনার সরকার বাংলাদেশকে উগ্রপন্থার বেড়াজাল থেকে অর্থনৈতিক, সামাজিক উন্নয়ন সূচকে একটি গতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত করার নীতি-কৌশল দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হয়। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে কোনো বিশেষ বলয়ভুক্ত না হয়ে সবার সঙ্গে বন্ধুত্বের নীতিতে অটল থাকে। এর ফলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেড়ে যায়, বিদেশে বাংলাদেশের জনশক্তির চাহিদা স্বাভাবিক নিয়মে বৃদ্ধি পায়। এর ফলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে দ্রুত উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা লাভ করে। সাফল্যের এই অংশকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশের জন্য এসব অর্জন ছাড়া পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশকে ক্ষুধামুক্ত, কর্মের সংস্থান এবং বস্ত্র, আশ্রয় ও চিকিৎসাসেবা দিয়ে টিকিয়ে রাখা মোটের ওপর অসম্ভব হয়ে পড়ত।

জাতীয় জীবনে ক্রমবর্ধমান এই সমুদয় পরিবর্তনের সঙ্গে দেশের রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, স্বাধীনতা ও মানবিক মূল্যবোধ এবং উন্নত রাষ্ট্র গঠনের সামাজিক, রাজনৈতিক, সামগ্রিক রাষ্ট্রচিন্তার বিকাশ ঘটানো অত্যন্ত জরুরি বিষয়। অবশ্য ৭৫-উত্তর দেশের রাজনীতির নীতি ও আদর্শের স্খলন, সমাজ ও রাজনীতিতে সুবিধাবাদ, উগ্র হঠকারী, সাম্প্রদায়িক, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির কর্তৃত্বপরায়ণতার কারণে এবং মূলধারার রাজনীতিকে কণ্ঠরোধ করে দেওয়ার পরিণতি হিসেবেই দেখতে হবে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ প্রথম ২১ বছর পর ক্ষমতায় এসে রাজনীতিকে মূলধারায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিল। আওয়ামী লীগের দলীয় শৃঙ্খলা ও আদর্শের কোনো মৌলিক পরিবর্তন তখন ঘটেনি। কিন্তু দলের ভেতরে এবং বাইরে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের রাজনীতির যে লড়াই, তাতে এঁটে ওঠার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ একা হয়ে যায়।

বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে ২০০১-০৮ পর্যন্ত সময়ে দেশের অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় ধরনের অস্তিত্বের সংকটের মুখে পড়ে। রাজনীতি তখন এক ঘোলাটে অবস্থার মধ্যে নিপতিত হয়। ২০০৮ সালের নির্বাচনে জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ২০০১-০৮ সময়ের রাজনীতির বিপক্ষে গণরায় দেয়। আওয়ামী 
লীগ তথা মহাজোট সেই রায়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। ২০০৯ সাল থেকে আওয়ামী লীগ দিনবদলের পরিকল্পনা নিয়ে দেশ পুনর্গঠনের কর্মযজ্ঞ হাতে নিয়েছিল।

বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার সম্পন্ন করা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু ও শেষ করা এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বাংলাদেশকে ফিরিয়ে আনার কঠিন রাজনৈতিক সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছিল। কিন্তু মূলধারার বিপক্ষ শক্তি ধর্ম, সাম্প্রদায়িকতা, জঙ্গিবাদ ইত্যাদিকে ব্যবহার করে আওয়ামী লীগকে কঠোর চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়। সে ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের দলীয় রাজনীতি ২০১৩ সালের প্রথম পর্যন্ত দৃঢ় অবস্থানেই ছিল। কিন্তু সামাজিক এবং আন্তর্জাতিক নানা চাপে আওয়ামী লীগ ধর্মাশ্রয়ী কিছু গোষ্ঠীর সঙ্গে কিছুটা আপস করে। এর পেছনে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে দলছুট, আদর্শছুট নানা গোষ্ঠীর আত্তীকরণকৃত ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর ভূমিকা থাকতে পারে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে উদীয়মান গোষ্ঠীর অবস্থানও আওয়ামী লীগে শক্তিশালী হতে থেকে। এরা সম্মিলিতভাবে আওয়ামী লীগকে সমন্বয়বাদী ধারায় পরিচালিত করার ক্ষেত্রে প্রভাবিত করতে থাকে। এর ফলে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে দলের মূল আদর্শের অবস্থান ক্রমেই দুর্বল হতে থাকে এবং কৃত্রিম জোড়াতালি দেওয়া মানসিকতা তৃণমূল থেকে নীতিনির্ধারক মহল পর্যন্ত নীরবে সমর্থিত ও কার্যকর হতে থাকে।

এর ফলে আওয়ামী লীগের তৃণমূল থেকে মাঝারি অবস্থান পর্যন্ত আদর্শের প্রতি নিষ্ঠাবান নয়, বিশ্বাসীও নয়—এমন অনেকেই দল এবং দেশ পরিচালনায় বিভিন্ন পদ-পদবিতে আসীন হয়। দল দেশ পরিচালনার পাশাপাশি আদর্শে সুসজ্জিত নেতা-কর্মী গড়ে তোলার কাজটিতে মনোযোগ দেয়নি। ফলে দলের অভ্যন্তরে এখন দীর্ঘদিনের পোড় খাওয়া ত্যাগী আদর্শবানেরা অর্থ, বিত্ত ও প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। আবার আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন করা ঐতিহ্যের ধারক-বাহক হয়ে অনেকেই বিত্তবৈভব, নীতির স্খলন ইত্যাদিতে আত্মসমর্পণ করেছে। ফলে দলে এখন ক্রমবর্ধমানভাবে আদর্শহীন, দুর্নীতিপরায়ণ, ক্ষমতালোভী বনাম আদর্শ ও ত্যাগী নেতা-কর্মীরা বিরোধ, দ্বন্দ্বে ভীষণভাবে জড়িয়ে পড়েছে।

বিশেষ করে দলের পদ-পদবি, বিভিন্ন নির্বাচন, দায়িত্ব পাওয়া ইত্যাদির প্রশ্ন যখন উপনীত হয়, তখনই শৃঙ্খলাভঙ্গ, দ্বন্দ্ব-সংঘাত, রক্তপাত, হানাহানির মতো ঘটনা সংঘটিত হতে দেখা যায়। বিত্তবান, আদর্শে দুর্বল ও দোদুল্যমান ব্যক্তি ও নেতাদের বেপরোয়া হয়ে উঠতেও দেখা যায়। গাজীপুরের মেয়র জাহাঙ্গীর আলম ছাত্রলীগের মাধ্যমে উত্থান হলেও দ্রুত পদ-পদবি, ক্ষমতা ও বিত্তের শক্তিকে কতটা তাঁর জন্য নির্ভরযোগ্য মনে করেছিলেন সেটি ২০১৩ সাল-পরবর্তী সময় থেকেই বোঝা যাচ্ছিল। কিন্তু দল তখন থেকে তাঁকে নিবৃত্ত করতে চায়নি।  আওয়ামী লীগের ইতিহাসে খন্দকার মোশতাক ও আরও অনেক ব্যক্তি অতীতে দলকে কীভাবে ছুরিকাঘাত করেছিল, বঙ্গবন্ধু ও চার জাতীয় নেতাকে হত্যা এবং হত্যার পরবর্তী সময়ে বিপক্ষ গোষ্ঠীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে কতটা কঠিন সংকটের মুখে ফেলেছিল, স্বাধীনতা ও আওয়ামীবিরোধীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে দেশ ও রাজনীতির এমন পরিণতি সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছিল, সেটি নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না।

গত এক যুগেও আওয়ামী লীগের স্থানীয় পর্যায় থেকে ওপরের বিভিন্ন স্তরে এমন অনেক ব্যক্তির বিতর্কিত অবস্থান সবাই প্রত্যক্ষ করেছেন। কিন্তু তাঁদের দলীয় শৃঙ্খলা ও আদর্শবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। দলের অভ্যন্তরে সাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাসী অনেকেই জায়গা করে নিয়েছেন। তাঁদের অনেকে সাম্প্রদায়িক ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক রাখা, সুযোগ-সুবিধা দেওয়া এবং রাজনীতিতে অবস্থান নেওয়ার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। রাজশাহীর কাটাখালী পৌরসভার মেয়র আব্বাস আলী বঙ্গবন্ধুর ম্যুরালের বিরুদ্ধে যে বক্তব্য দিয়েছেন সেটি সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অবস্থান। এ ধরনের আরও অনেকেই আছেন।

ফেসবুক ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভারতবিরোধিতা, সাম্প্রদায়িকতা, হিন্দু সম্প্রদায়ের পূজা-প্রতিমা ইত্যাদি নিয়ে মহলবিশেষের উসকানির সঙ্গে সহমত পোষণ করতে অনেক আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা-কর্মীদেরও দেখা যাচ্ছে। এটি আওয়ামী লীগের জন্যও অত্যন্ত বিপজ্জনক।

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম ২৩ নভেম্বর এলডি ভবনে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন এবং আওয়ামী লীগের প্রস্তুতি সম্পর্কে বিভাগীয় কর্মশালায় দলের এই পরিস্থিতির গুণগত পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, আগামী মার্চ মাসের মধ্যেই উপজেলা কমিটি এবং বিভাগীয় সম্মেলনের মাধ্যমে দলের আবর্জনা পরিষ্কার করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে তিনি দলের মধ্যে ‘কোয়ালিটি ওভার কোয়ানটিটি’ অর্থাৎ পরিমাণের চাইতে গুণগত মান বৃদ্ধির যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, সেটি জন-আকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন।

আওয়ামী লীগকে দলীয় শৃঙ্খলা ও আদর্শে ফিরিয়ে আনার কোনো বিকল্প নেই। তাতে দলে আদর্শবান, মেধাবী, যোগ্য, নিষ্ঠাবান, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার পক্ষের উত্তরাধিকারের হাতে দল ও দেশের ভার ন্যস্ত হবে। 

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
 
    সব মন্তব্য

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    এলাকার খবর

     
     

    স্বাস্থ্যবিধি মেনে বিদ্যালয় চালু রাখার দাবি

    কবর খুঁড়ে কঙ্কাল চুরি

    এ যুগের কুম্ভকর্ণ

    ছয় দিন পর শিক্ষার্থীদের টিকাদান আবার শুরু

    শ্রীবরদীতে মই দৌড় প্রতিযোগিতা

    সড়কের অভাবে নিঃসঙ্গ সেতু

    দুর্নীতির ধারণা সূচকে ‘উন্নতি নেই’ বাংলাদেশের

    ফাইনাল খেলার প্রস্তুতি নেন: গয়েশ্বর 

    এক বছরের বেশি সময় পর মাঠে ফিরলেন মাশরাফি

    শাবিপ্রবি উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে প্রতীকী অনশনে ছাত্রদল

    শাবিপ্রবির উপাচার্যকে কেন পদত্যাগ করতে হবে

    করোনায় ইবিতে দাপ্তরিক সময়সূচি কমছে ১ ঘণ্টা