Alexa
শনিবার, ২২ জানুয়ারি ২০২২

সেকশন

epaper
 

‘অবসর’ নেওয়ার ধারণা আবিষ্কার হলো কবে

আপডেট : ২৩ নভেম্বর ২০২১, ১১:০০

বর্তমান সময়ের অবসরকাল মানেই এক যন্ত্রণাময় জীবন। ছবি: পিক্সাবে ডটকম ‘অবসর’ হলো মানুষের আবিষ্কৃত একটি বৈপ্লবিক ধারণা। এই ধারণার উদ্ভব কিন্তু খুব বেশি দিন আগের নয়। ঐতিহাসিকদের মতে, আঠারো শতকে ব্যাপকভাবে গৃহীত হওয়ার আগেও ব্যাপারটি সম্পর্কে মানুষের ধারণা ছিল না। মূলত সেনা কর্মকর্তা ও বয়োজ্যেষ্ঠ কর্মীদের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই এই ধারণার অবতারণা করা হয়েছে।

অবশ্য এর মধ্যেও ভয়ানক রকমের শ্রেণিবৈষম্য রয়েছে। আঠারো শতক তো বটেই, এই একুশ শতকে এসেও দরিদ্রদের অবসর বলে আসলে কিছু নেই। সেটি বাংলাদেশের মতো দেশে গ্রামের দরিদ্র পরিবারগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যায়। শহরেও ত্বক কুঁচকে যাওয়া, হাড় জিরজিরে শুভ্র চুল-দাঁড়িবিশিষ্ট বৃদ্ধের কুঁজো হয়ে রিকশা চালানোর দৃশ্য হরহামেশাই দেখা যায়। অবসরের আগে বরং তাঁরা মৃত্যুর প্রহর গোনেন।

আঠারো শতকে আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রগুলো ব্যাপকভাবে উদ্যোগ নেওয়ার আগে রোমান সাম্রাজ্যে সামরিক বাহিনীর লোকদের জন্য পেনশন দেওয়ার একটা ব্যবস্থা চালু হয়েছিল। আঠারো শতকে নিউ ইংল্যান্ডের পিউরিটান মন্ত্রী ও লেখক কটন ম্যাথার বয়স্কদের ভাতা দেওয়ার প্রস্তাব করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, কর্ম থেকে অব্যাহতি নেওয়া বয়স্ক ব্যক্তিদের খুশি থাকার ব্যবস্থা করা উচিত। 

১৮৮৩ সালে জার্মান চ্যান্সেলর অটো ভন বিসমার্ক মার্কসবাদীদের ঠেকাতে সামাজিক সুরক্ষার একটি স্কিম চালু করেন। মার্কসবাদীদের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা এবং ক্ষমতা বৃদ্ধি নিয়ে শঙ্কিত বিসমার্ক ঘোষণা দেন, ৬৫ বছরের বেশি বয়সী যাঁরা অবসর নেবেন, তাঁদের নিয়মিত পেনশন দেওয়া হবে। জার্মান সম্রাট প্রথম উইলিয়াম ১৮৮১ সালে রাইখস্ট্যাগে (পার্লামেন্ট) বিসমার্কের উপস্থাপিত প্রস্তাবে সায় দেন। প্রস্তাবে বলা হয়: যাঁরা বয়স এবং দুর্বলতার কারণে কাজ করতে অক্ষম, তাঁরা নিজেদের যত্নের জন্য সুনির্দিষ্ট সুবিধাদি দাবি করতে পারবেন। 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টও এমন পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। এ ধরনের কল্যাণমূলক কর্মসূচি প্রবর্তনের জন্য অনেকে তাঁকে ‘সমাজতান্ত্রিক’ বলে কটাক্ষ করে। বিসমার্ককেও এমন কথা শুনতে হয়েছে। তাঁকেও ‘সমাজতান্ত্রিক’ গালি শুনতে হয়েছে। তবে জবাবে বিসমার্ক বলেছেন, এটাকে সমাজতন্ত্র বলুন আর আপনার খেয়াল খুশিমতো যাই বলুন, আমার তাতে কিছু আসে যায় না। 

জার্মানির এই কল্যাণ কর্মসূচিতে অবসরসুবিধা এবং কাজ করতে অক্ষমতা বা শারীরিক প্রতিবন্ধিতার জন্য বিভিন্ন সরকারি সুবিধা অন্তর্ভুক্ত ছিল। অবসরব্যবস্থা বাধ্যতামূলক ছিল। এই সুবিধাদি সংস্থানে কর্মচারী, নিয়োগকর্তা ও সরকার অবদান রাখত। 

১৮০০ দশকের মাঝামাঝিতে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু পৌর কর্মচারী, যার মধ্যে ছিলেন অগ্নিনির্বাপক, পুলিশ ও শিক্ষক, তাঁরা পাবলিক পেনশন পেতে শুরু করেন। ১৮৭৫ সালে আমেরিকান এক্সপ্রেস কোম্পানি ব্যক্তিগত পেনশন দিতে শুরু করে। ১৯২০ সাল নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, রেলপথ, জ্বালানি তেল, ব্যাংকিং খাতসহ আরও বেশ কিছু বৃহৎ খাত পেনশন দেওয়া শুরু করে। 

কুড়ি শতকে অবসর নিয়ে মানুষের চিন্তাভাবনা অনেকখানি পাল্টে যায়। 

 ১৯০৫ সালে জনস হপকিন্স হাসপাতালে দেওয়া ভাষণে কানাডীয় চিকিৎসক উইলিয়াম ওসলার বলেন, একজন মানুষ চল্লিশ বছর বয়স হওয়ার আগেই তাঁর সেরাটি দিয়ে ফেলেন। ৬০ বছর বয়সে তাঁর অবসর নেওয়া উচিত। ২৫ থেকে ৪০-এর মধ্যের সময়টাকেই বলে ‘ব্যাপক সম্ভাবনার সোনালি ১৫ বছর’। ৪০ থেকে ৬০ বছর বয়সী কর্মচারীদের সহনীয় বলা যায়, কারণ এই সময়টাতে তাঁদের ‘নিছক অসৃজনশীল’ বলা যেতে পারে। কিন্তু ষাট বছর বয়সের পর গড়পড়তা কর্মী অকেজো হয়ে পড়েন। তখন তাঁকে আর কাজে রাখার কোনো মানে হয় না। 

শিল্পবিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্রে অবসর গ্রহণের ধারণাটি ব্যাপকভাবে গৃহীত হতে শুরু করে। ওই সময় বিপুলসংখ্যক কারখানাশ্রমিক বার্ধক্যে উপনীত হন। কর্মীদের মধ্যে বয়সের প্রভাব দেখা যেতে থাকে, প্রচুর শ্রমিক অ্যাসেম্বলিতে আসছিলেন না, অসুস্থতাজনিত ছুটি চাওয়ার পরিমাণও বেড়ে যায়। তা ছাড়া কারখানাগুলো তরুণ, সম্ভাবনাময় ও লাভজনক শ্রমিকদের ওপর জোর দিতে শুরু করে। বয়স্করা কর্মস্থল দখল করে রাখার কারণে যুব জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেকারত্ব বাড়তে শুরু করে। গ্রেট ডিপ্রেশন এই সমস্যাকে আরও প্রকট করে তোলে। ওই সময় কর্মীদের অবসরে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। 

অনেকেই অবসর গ্রহণকে একটি অপরিহার্য সমন্বয় হিসেবে দেখেন। তবে বয়স্কদের মধ্যে অনেকেই এই ধারণার প্রতিবাদ করেন। 

যথেষ্ট অর্থ হাতে ধরিয়ে দিয়ে বয়স্ক কর্মীদের অবসরে পাঠানোর ধারণাটি ১৯৩৫ সালের মধ্যে ব্যাপকভাবে চর্চায় আসে। ক্যালিফোর্নিয়ার অধিবাসী ফ্রান্সিস টাউনসেন্ড ৬০ বছর বয়সে বাধ্যতামূলক অবসর গ্রহণের প্রস্তাব দিয়ে একটি পরিকল্পনা প্রকাশ করেন। তাঁর প্রস্তাবে বলা হয়, অবসরপ্রাপ্তকে আইনসভা মাসে ২০০ ডলার পর্যন্ত ভাতা দেবে। কেন্দ্রীয় বিধি অনুযায়ী একজন শ্রমিকের পূর্ণ বেতনের সমান এটি। এর ভিত্তিতেই প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট ১৯৩৫ সালে সামাজিক সুরক্ষা আইনের প্রস্তাব করেন। 

বয়স্কদের অবসর ভাতার পক্ষে যুক্তি দিয়ে তৎকালীন ফার্স্ট লেডি এলিয়ানর রুজভেল্ট বলেছিলেন, প্রবীণরা তাঁদের নিজস্ব জিনিসগুলোকে তরুণদের চেয়েও বেশি ভালোবাসেন। আপনি যে চেয়ারে অনেক বছর ধরে বসেছিলেন, সেই চেয়ারে বসার মূল্য অনেক।’ 

তবে এর পরও ওই সময় বেশির ভাগ পদত্যাগকারী কর্মী কাজ করে যেতেই চেয়েছিলেন। ধারণাটি জনপ্রিয় করতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ১৯১০ সালে ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে হোয়াইট কলার কর্মীদের অবসরের জন্য আলাদা ভ্রমণ গন্তব্য তৈরি হয়। ১৯২০ এবং ১৯৩০-এর দশকে অবসরপ্রাপ্তদের আলাদা সংগঠন দেখা যেতে শুরু করে। এ সময় প্রচুর গলফ কোর্স তৈরি হয়। সিনেমা, টেলিভিশন অবসর সময় কাটানোর বড় অবলম্বন হয়ে ওঠে। ১৯৫৫ সালে ‘সিনিয়র সিটিজেন’ ম্যাগাজিন বাজারে আসে। অবশ্য দ্রুতই এই ম্যাগাজিন বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু এখান থেকেই ‘সিনিয়র সিটিজেন’ শব্দগুচ্ছটি জনপ্রিয় হয়। 

১৯৯৯ সালে আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন অব রিটায়ার্ড পারসন্স সংগঠন তাদের নাম থেকে ‘অবসরপ্রাপ্ত’ শব্দটি বাদ দেয়। নাম হয় ‘এএআরপি ইনকরপোরেটেড’। তাদের দৃষ্টি যে শুধু আমেরিকান অবসরপ্রাপ্তদের মধ্যে সীমিত নেই, এটাই বোঝানোর চেষ্টা করেন তাঁরা। 

বর্তমানকালে এই অবসর সময়টা আর আগের মতো আনন্দময় নেই। কঠিন নাগরিকজীবনে ব্যস্ত নাগরিকেরা বয়স্কদের প্রতি আর খেয়াল রাখার ফুরসত পান না। ফলে ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে বৃদ্ধাশ্রম, সেফহোম ইত্যাদির মতো ‘নিষ্ঠুর’ ধারণা। এতে করে জীবনের শেষ সময়টা নিরানন্দ কাটছে বয়স্কদের। 

যুক্তরাজ্যের মেন্টাল হেলথ ফাউন্ডেশনের মতে, বর্তমান সময়ে অবসরপ্রাপ্তদের পাঁচজনের মধ্যে একজন বিষণ্নতায় ভোগেন। শোক বা বিবাহবিচ্ছেদের কারণে যাঁরা একা থাকেন, তাঁদের ঝুঁকি বেশি। শারীরিক স্বাস্থ্যসমস্যাও মানুষকে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাগুলোর জন্য আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে। 

সাম্প্রতিক একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, অবসর গ্রহণের কারণে ক্লিনিক্যাল বিষণ্নতায় ভোগার ঝুঁকি প্রায় ৪০ শতাংশ বাড়ে।

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
 
    সব মন্তব্য

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    এলাকার খবর

     
     

    একের সঙ্গে হরেক

    সুন্দরবনের জার্নাল

    হংস মাংস খাইব শীতে

    আজকের রাশিফল

    আজকের রাশিফল

    মাস্ক পরলে বেশি আকর্ষণীয় লাগে: গবেষণা

    শিক্ষককে মারধর করে অব্যাহতিপত্রে সাক্ষর নেওয়ার অভিযোগ

    চবির হলে জ্বর-সর্দির প্রকোপ, করোনা পরীক্ষায় অনীহা

    জাজিরায় মোটরসাইকেলের ধাক্কায় বৃদ্ধা নিহত

    ইউক্রেনে ‘মারণাস্ত্র সহায়তা’ পাঠালো যুক্তরাষ্ট্র 

    সালিসি বৈঠক শেষেই সংঘর্ষ, নিহত ১ 

    অবৈধভাবে মাটি কাটায় ৭ জনকে কারাদণ্ড