Alexa
মঙ্গলবার, ৩০ নভেম্বর ২০২১

সেকশন

 

মোবাইল ব্যাংকিং প্রতারণায় রাজনৈতিক নেতার নাম

আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২১, ১২:৩১

গভীর রাতে মোবাইল ফোনে আসা কলে কাঁচা ঘুম ভাঙে আবদুল কাদেরের। অচেনা নম্বর, অজানা আশঙ্কা। তবু ফোন ধরেন তিনি। ওপাশ থেকে বলা হয়, ‘আপনার রকেট অ্যাকাউন্টে সমস্যা, এখনই বন্ধ হয়ে যাবে। আমরা একটি পাঁচ ডিজিটের নম্বর দিচ্ছি। সেই নম্বরের সঙ্গে মিলিয়ে আপনার কাছে যাওয়া কোড নম্বরটি দ্রুত বলুন।’ ঘুমের ঘোরেই তিনি কোড নম্বর দেন। ঘোর কাটতেই বুঝতে পারেন তাঁর ডাচ্–বাংলা ব্যাংকের আশুলিয়া শাখার হিসাব থেকে ১ লাখ ৪৮ হাজার ২৯০ টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

প্রতারণার শিকার হওয়া অন্য সব সাধারণ মানুষের মতো হাল ছাড়েননি আবদুল কাদের। তিনি পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তে নামে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তারা এ ঘটনায় জড়িত তিনজনকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলা থেকে গ্রেপ্তার করেন। পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে এমন ১৪টি চক্রের হদিস, যাদের পরিচিত নাম ‘ওয়েলকাম পার্টি’। আর এদের পেছনে থাকা স্থানীয় একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার নাম।

আশুলিয়ার মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির উপপরিদর্শক (এসআই) মজিবুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেছেন, ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার কামাল বয়াতিকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁর সহযোগী রিয়াদ ও নুরুজ্জামানকেও গ্রেপ্তার করে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা টাকা হাতিয়ে নেওয়ার কৌশল ও ভাঙ্গা উপজেলার কয়েকটি প্রতারক চক্রের নাম পুলিশের কাছে স্বীকার করেন।

গ্রেপ্তার হওয়া তিন আসামি আদালতেও স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তিনজনের একজন তাঁর স্বীকারোক্তিতে এই প্রতারণার মদদদাতা হিসেবে ভাঙ্গা উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এবং ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক দীপক মজুমদারের নাম বলেন। তবে তিনি কীভাবে জড়িত, তার বিস্তারিত বিবরণ জবানবন্দিতে উল্লেখ নেই।

জানতে চাইলে দীপক মজুমদার এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। আজকের পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘আমি দেড় বছর এলাকায় যাই না। স্মার্টফোনও ব্যবহার করতে পারি না। এলাকায় আমার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আছে। তারা ফাঁসানোর জন্য এসব কাজ করছে।’

স্বীকারোক্তিতে ১৪ দলের নাম
জবানবন্দিতে তিনজনই স্বীকার করেন, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের প্রতারণার জন্য তিন থেকে চারজনকে নিয়ে একটি করে দল গঠন করা হয়। গ্রেপ্তার হওয়া কামাল বয়াতি জানান, তাঁর দলে সদস্যসংখ্যা আছেন চারজন। তাঁর দলের সদস্য নুরুজ্জামান মাতুব্বর ও রিয়াদ গ্রেপ্তার হয়েছেন। কেবল রাসেল নামে একজন পলাতক আছেন। কামাল বয়াতি আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে বলেন, ভাঙ্গার পাতরাইলে আরও একটি দল আছে, যার নেতা মেহেদী সজীব ও নাজিম কাজী। অন্য একটি দলের নেতা ইমারত, শহীদুল ও সম্রাট। আরেকটি দলে আছেন ভাঙ্গার মিয়াপাড়ার লাল্টু, মিনু ও ইজ্জাল ফকির। এ ছাড়া ইজ্জাল মাতবর, জাকির মেম্বার, বিলাল মাতুব্বর, মামুন সাইফুদ্দিন ব্যাপারী, রফিক ব্যাপারীরাও বড় দলনেতা।

আরেক আসামি নুরুজ্জামান মাতুব্বর গত ৩ জুন সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কাজী আশরাফুজ্জামানের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তাঁর বাড়িও ভাঙ্গার পাতরাইল গ্রামে। তাঁকে সবাই মোবাইল ব্যাংক প্রতারণার ‘ওস্তাদ’ হিসেবে চেনে। তিনি জবানবন্দিতে এলাকার ধলা ফকির, বাদল জামাই রুবেল, নজরুল, কামাল, ঠান্ডু, রুবেল মুনশি, ফরাজি রুবেল, সবুজ ফরাজি, দীপক মজুমদার বিকাশ প্রতারণার সঙ্গে জড়িত বলে স্বীকার করেন।

এদের আছে প্রশিক্ষক 
 জবানবন্দিতে তাঁরা স্বীকার করেন, রীতিমতো ট্রেনিং সেন্টার খুলে ভাঙ্গায় ওয়েলকাম পার্টির প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ভাঙ্গার পাতরাইল গ্রামের মো. কাশেম শেখের ছেলে রিয়াদ হোসেন নামকরা প্রশিক্ষক। তিনি স্থানীয় ছেলেদের কথায় জাদু ও প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তোলেন। তিনি নিজেও রিয়াদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন বলে স্বীকার করেন।

প্রতারণার কৌশল  
ভাঙ্গার মধ্য পাতরাইল গ্রামের কামাল বয়াতি সম্প্রতি ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রাজিব হাসানের কাছে জবানবন্দি দেন। তিনি জবানবন্দিতে জানান, বিকাশ, নগদ, রকেটসহ সব মোবাইল ব্যাংকিংয়ের লেনদেনের ক্ষেত্রে তাঁরা নিজেদের সংশ্লিষ্ট অফিসের লোক বলে পরিচয় দেন। এরপর সুযোগ বুঝে হিসাবের গোপন নম্বর আদায় করে হিসাব থেকে টাকা সরিয়ে নেন।

হাতিয়ে নেওয়া টাকা তাঁরা নিজেদের হিসাব বা পরিচিত কোনো ব্যক্তির হিসাবে হস্তান্তর করেন।

ভাঙ্গার শিমুল বাজারের (চম্পারচর) দোকানি রফিকুল ইসলাম আশুলিয়া থানার এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে বলেন, তাঁর অ্যাকাউন্টে দুবার ২৫ হাজার করে মোট ৫০ হাজার টাকা জমা হয়েছে। কামাল বয়াতি তাঁকে জানিয়েছিলেন, তাঁর কোনো এক আত্মীয় তাঁকে টাকা পাঠাচ্ছেন। পরে সেই টাকা তুলে কামাল বয়াতিকে দেন।

গ্রেপ্তার হওয়া তিনজন আদালতে বলেন, ভুয়া আইডি কার্ড ব্যবহার করে তাঁরা মোবাইল সিম সংগ্রহ করেন। পুলিশ কামাল বয়াতির পাতরাইল গ্রামে একটি আস্তানা থেকে ১০টি মোবাইল ফোনসেট, ৪০টি সিম কার্ড ও বিকাশ, রকেটের মোবাইল নম্বরযুক্ত রেজিস্টার খাতা উদ্ধার করে।

কামাল বয়াতি তাঁর স্বীকারোক্তিতে বলেন, প্রতিদিন ৩–৪টি করে প্রতারণা করতে পারেন। এতে হিসাবপ্রতি তিন হাজার করে টাকা পান। তবে দলের নেতারা মাসে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা আয় করেন।

পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় অভিযুক্তদের মধ্যে গ্রেপ্তার হওয়া বেশির ভাগই ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার বাসিন্দা। ভাঙ্গার পাতরাইলসহ কয়েকটি গ্রামে এদের তৎপরতা বেশি। এলাকায় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা তাঁদের আশ্রয় দিয়ে থাকেন।

জানতে চাইলে ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সৈয়দ লুৎফর রহমান বুধবার আজকের পত্রিকাকে বলেন, প্রতারণা নিয়ে এই থানায় নিয়মিত মামলা হয়। আসামি গ্রেপ্তার হয়। তাঁরা জামিনে বেরিয়ে এসে আবার একই অপরাধ করেন। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এলাকার মানুষ এ ধরনের অপরাধকে অপরাধই মনে করে না। এ একটি অদ্ভুত জগৎ, যেখানে প্রতারণাকে লোকে ব্যবসা মনে করে। 

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
 
    সব মন্তব্য

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    এলাকার খবর

    আষাঢ়ে নয়

    ১০১টা খুন করতে চেয়েছিলেন তিনি

    ফৌজদারি বিচারিক ক্ষমতা হারালেন কামরুন্নাহার

    স্বাস্থ্যের নথি গায়েব: বরখাস্তদের বিরুদ্ধে এখনো বিভাগীয় মামলা হয়নি

    পাকিস্তানকে সমর্থন দুর্ভাগ্যজনক, আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে: মন্ত্রী

    পর্যটন এলাকায় বাড়ছে প্রতারণা

    আসামিরা পালিয়ে যায় আর আপনারা নীরব দর্শক, দুদক আইনজীবীকে হাইকোর্ট

    সাঁতার শিখতে গিয়ে সদ্য নিয়োগ পাওয়া সেনাসদস্যের মৃত্যু

    ডিআরইউ সভাপতি মিঠু, সম্পাদক হাসিব

    ১৭ মিলিয়নের গাড়িতে চড়া হবে না রোনালদোর!

    নিরাপদ সড়কের দাবিতে খুবিতে মোমবাতি প্রজ্বালন

    রাবিতে জিল্লুর রহিম রিসার্চ ল্যাবরেটরি উদ্বোধন

    ‘বন্ধুকযুদ্ধে’ নিহতদের এলাকায় দাফন না করার দাবিতে ঝাড়ুমিছিল