Alexa
মঙ্গলবার, ২৫ জানুয়ারি ২০২২

সেকশন

epaper
 

মিতুকে না মারলে মুছাকে ক্রসফায়ারে দিতেন বাবুল

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২১, ১২:৩৩

বাবুল আক্তার, মাহমুদা খানম মিতু ও এহতেশামুল হক ভোলা। ফাইল ছবি স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতুকে খুন না করলে নিজের সোর্স মুছাকে ‘ক্রসফায়ার’-এ খুনের হুমকি দিয়েছিলেন সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তার। এই হত্যাকাণ্ডের কয়েক দিন পর বাবুল আক্তার সোর্স মুছাকে ফোনও করেছিলেন, ফোন ধরেছিলেন মুছার স্ত্রী পান্না আক্তার। এরপর মুখ খোলার হুমকি দেন মুছা। তারপর থেকে তিনি নিখোঁজ। তাঁকে আজও খুঁজে বের করতে পারেনি পুলিশ। আর মিতু হত্যাকাণ্ডে যে অস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছিল, সেটা কেনার জন্য টাকা দিয়েছিলেন বাবুল আক্তার।

মিতু হত্যা মামলার অন্যতম আসামি এহতেশামুল হক ভোলা আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এসব কথা বলেছেন বলে আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। গত ২৩ অক্টোবর চট্টগ্রামের মহানগর মুখ্য হাকিম শফিউদ্দিনের আদালতে ভোলা এই জবানবন্দি দেন। আড়াই ঘণ্টার এই জবানবন্দিতে মিতু হত্যার আগে-পরের পুরো বিবরণ উঠে এসেছে।

মামলার তদন্ত সংস্থা পিবিআইয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, মিতু হত্যায় যেসব আসামি গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাদের মধ্যে ভোলার বিবরণে সবকিছু পরিষ্কার হয়েছে। গত শুক্রবার যশোরের বেনাপোল সীমান্ত থেকে ভোলাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তিনি ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টার করছিলেন।

পিবিআইয়ের প্রধান, ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘নিখোঁজ মুছার খোঁজ চলছে। এ ছাড়া আরও একজনের জবানবন্দি বাকি আছে। সেটা হওয়ার পরই অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।’

পিবিআইয়ের কর্মকর্তারা বলেন, বাবুল ও মিতুর দুই সন্তানের সঙ্গে কথা বলবে পিবিআই। তারা মাগুরায় বাবুলের ভাইয়ের বাসায় আছে।

২০১৬ সালের ৫ জুন ভোরে ছেলেকে স্কুলে পৌঁছে দিতে বের হন তৎকালীন এসপি বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু। চট্টগ্রাম নগরের জিইসি মোড়ে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয় তাঁকে। ঘটনার পর বাবুল আক্তার পাঁচলাইশ থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। মামলায় বাবুল অভিযোগ করেন, জঙ্গিবিরোধী কার্যক্রমের তাঁর জন্য স্ত্রীকে হত্যা করা হতে পারে। এর কিছুদিন পর মিতুর বাবা মোশাররফ হোসেন এই হত্যার জন্য জামাতা বাবুলকে দায়ী করে মামলা করেন। মোশাররফ হোসেন অভিযোগ করেন, বাবুল এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের কারণে স্ত্রীকে খুন করিয়েছেন তিনি। চলতি বছরের ১১ মে বাবুলকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চট্টগ্রাম পিবিআইয়ের কার্যালয়ে ডাকা হয়। পরে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। বাবুল এখন ফেনী জেলা কারাগারে আছেন।

চট্টগ্রাম আদালত সূত্র জানায়, জবানবন্দিতে ভোলা বলেছেন, তিনি চট্টগ্রামের রাজাখালী এলাকায় বালু, মুরগির খাদ্য, চালকলের লাকড়ি সরবরাহসহ নানা ব্যবসা করতেন। স্থানীয়ভাবে কিছু মামলায়ও জড়িয়ে পড়েন। ২০০৮ সালে বাবুল আক্তার পুলিশের সহকারী কমিশনার (এসি) কোতোয়ালি হিসেবে চট্টগ্রামে যোগদানের পর আসামি কামরুল ইসলাম শিকদার ওরফে মুছার মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয়। মুছাকে আগে থেকেই চিনতেন ভোলা। জানতে পারেন মুছা বাবুল আক্তারের সোর্স হিসেবে কাজ করেন।

ভোলার দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলা থাকায় মুছার মাধ্যমে বাবুল আক্তারের সাহায্য নেন তিনি। সেগুলো সমাধানও হয়ে যায়। এরপর থেকেই বাবুলকে বিভিন্ন তথ্য দিতেন ভোলা। চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানার একটি অস্ত্রের গোপন অভিযানের তথ্য দেন ভোলা। সেই তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান করে বাবুল বেশ সুনাম অর্জন করেন, পুলিশের পক্ষ থেকে মেডেলও পান। পরে বাবুল আক্তার বদলি হয়ে যান। যোগাযোগও কমে যায় ভোলার সঙ্গে। ২০১০-১১ সালের দিকে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা শাখায় (ডিবি) অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) হিসেবে আসেন বাবুল আক্তার। দেখা করতে যান ভোলা। এ সময় বাবুল আক্তার পুরোনো সোর্স মুছাকে একটা চাকরির ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেন। পরে নিজের বালুর ব্যবসায় ম্যানেজার হিসেবে মুছাকে নিয়োগ দেন ভোলা। মনির নামে একজনকে কেয়ারটেকার হিসেবে নিয়োগ দেন মুছা।

১৫ হাজার টাকা বেতনে চাকরি শুরু করলেও বেশির ভাগ সময় অনুপস্থিত থাকতেন মুছা। কারণ হিসেবে সব সময় বাবুলের কাজে ব্যস্ত থাকার কথা বলতেন। কিন্তু বাবুলের ভয়ে এ নিয়ে মুছাকে কিছু বলতে পারতেন না ভোলা। এভাবে যখন চলছিল, তখন একদিন মুছা ভোলাকে বলেন, বাবুল স্যারের সঙ্গে তাঁর স্ত্রীর কী যেন ঝামেলা চলছে। তাঁকে ফিনিস করে দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মুছাকে।

ভোলা দাবি করেন, তিনি ওই সময় মুছাকে বলেছিলেন, এই ঝামেলায় যেন তাঁকে জড়ানো না হয়। এতে রেগে যান মুছা। ৩-৪ দিন পরে মুছা ভোলাকে বলেন, বাবুল তাঁকে দেখা করতে বলেছেন। জিইসি মোড়ে মেরিডিয়ানের সামনে বাবুল তাঁকে ডেকে নিয়ে বলেন, মুছাকে একটা কাজ দিয়েছি, উপকার করতে পারলে করতে, নইলে যেন বাধা না দেন। বাধা দিলে সমস্যা হবে।

ওইদিন মুছার সঙ্গে মিতু হত্যা মামলার অন্যতম আসামি ওয়াসিমও ছিলেন বলে জবানবন্দিতে জানান ভোলা। আদালতকে ভোলা বলেন, এর কয়েক দিন পর মুছা আমার অফিসে আসে। বলে, বাবুল স্যার আমাকে টাকা দিয়েছেন, একটা মেশিন (অস্ত্র) কিনতে হবে। কিন্তু ভোলা কোনো সাহায্য করতে পারবেন না বলে জানান। মুছা চলে যান।

ভোলার দাবি, এর ৩-৪ দিন পর ২০১৬ সালের ৫ জুন, যেদিন মিতু খুন হন ওই দিন ভোর ৭টা, সাড়ে ৭টার দিকে মুছা বেশ কয়েকবার ফোন দেন তাঁকে। কিন্তু ঘুমের কারণে তিনি ইচ্ছে করে ধরেননি। একপর্যায়ে মোবাইলটি সাইলেন্ট করে রাখেন।

তাঁর ভাষ্যে, ‘বেলা ১১টার দিকে চেক পাস করাতে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের শাহজালাল ব্যাংকে গিয়ে টেলিভিশনে (হেডলাইন) শিরোনাম দেখি, বাবুল আক্তারের স্ত্রী মিতুকে হত্যা করা হয়েছে। আমি সঙ্গে সঙ্গেই মুছাকে ফোন দিই। কিন্তু বন্ধ পাই। পরে তাঁর স্ত্রী পান্নাকে ফোন দিই। পান্না জানায়, সে নাকি ঘটনাস্থলে গিয়েছে খোঁজখবর নিতে।’

ভোলার বক্তব্য, আমি অফিসে চলে আসি, বিকেল ৪টা, সাড়ে ৪টার দিকে মুছা আমার অফিসে এসে অস্বাভাবিক আচরণ করতে থাকে, তাকে দেখে আমিও নার্ভাস হয়ে যাই। তাকে জেরা করার পরে সে বলে, তার নাকি কোনো উপায় ছিল না। সে যদি মিতু ভাবিকে না মারত, তাহলে বাবুল স্যার তাকে ক্রসফায়ারে দিত।

তখন আমি মুছাকে বলি, ‘এ কাজটা না করলে বাবুল স্যার হয়তো একবার ক্রসফায়ারে দিত, এখন পুলিশ তো তোকে ১০ বার মারবে।’

এরপর মুছা ভোলার অফিসে একটি কাপড়ের ব্যাগ দিয়ে বলেন কেয়ারটেকার মনিরকে দিতে। মুছা চলে যাওয়ার ১৫ থেকে ২০ মিনিট পর মনির এসে ব্যাগটি নিয়ে যান। এর ৪-৫ দিন পর ডিবি পুলিশ ভোলাকে ডেকে নিয়ে যায়। সবকিছু খুলে বলতে অনুরোধ করে। পরে ভোলার তথ্যেই মনিরের বাসা থেকে ব্যাগটি উদ্ধার করা হয়। সেখানে একটি অস্ত্র ছিল যা মিতু হত্যায় ব্যবহার হয়েছিল। এরপর ভোলাকে চালান দেওয়া হয়। সাড়ে তিন বছর পর ২০১৯ সালের শেষে জামিন পান ভোলা।

জবানবন্দিতে ভোলা বলেন, মুছার কারণে তিনি এ ঝামেলায় পড়েছেন। জামিন পেয়েই প্রথমে তিনি মুছার খোঁজ করেন। তাঁকে (মুছাকে) ফোনে না পেয়ে তাঁর স্ত্রী পান্নাকে ফোন করেন। তখন পান্না জানান, মুছা তারপর থেকেই নাই। অনেক দিন ধরে নিখোঁজ।

পান্না ভোলাকে বলেন, মিতু হত্যার কয়েক দিন পর বাবুল মুছাকে ফোন করেছিলেন, সেটি রিসিভ করেন পান্না। মুছাকে সাবধানে থাকতে বলেন বাবুল। পরে বাবুল আরেক দিন ফোন মুছার সঙ্গে কথা বলেন বাবুল। কথাবার্তার একপর্যায়ে রেগে যান মুছা। বলেন, আপনার জন্য এত বড় কাজ করলাম, এখন যদি তার ও তার পরিবারের কোনো ক্ষতি হয়, তাহলে এ বিষয়ে সে পুলিশের কাছে মুখ খুলব। সেই থেকে মুছা পলাতক, তাঁকে পাওয়া যাচ্ছে না।

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
 
    সব মন্তব্য

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    এলাকার খবর

     
     

    স্বাস্থ্যবিধি মেনে বিদ্যালয় চালু রাখার দাবি

    কবর খুঁড়ে কঙ্কাল চুরি

    এ যুগের কুম্ভকর্ণ

    ছয় দিন পর শিক্ষার্থীদের টিকাদান আবার শুরু

    শ্রীবরদীতে মই দৌড় প্রতিযোগিতা

    সড়কের অভাবে নিঃসঙ্গ সেতু

    পুলিশের ‘বাধায়’ ছাত্রদলের প্রতীকী অনশন পণ্ড করার অভিযোগ 

    বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোতে চাকরি

    শক্তিশালী ইসি গঠনে আইন প্রণয়ন করছে সরকার: কাদের

    হাসপাতাল থেকে নবজাতক চুরি

    এমপির বিরুদ্ধে গরু চুরির অভিযোগ তুললেন যুবলীগ নেতা

    রামেকের করোনা ইউনিটে ৩ জনের মৃত্যু