রোববার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১

সেকশন

 

এই শতাব্দীতে এগিয়ে যাচ্ছে জিনবিদ্যার গবেষণা

আপডেট : ৩০ মে ২০২১, ০০:০০

মানুষের জিন। ছবি: সংগৃহীত অস্ট্রিয়ার ধর্মযাজক গ্রেগর জোহান মেন্ডেলের বংশগতি বিষয়ক গবেষণার মধ্য দিয়ে জিন সম্পর্কে মানুষের ধারণা স্বচ্ছ হয়। এরপর ডিএনএ অণুর আবিষ্কার জিনবিজ্ঞানের রাসায়নিক ভিত্তি রচনা করে। আস্তে আস্তে জেনেটিক কোড, জিনের সক্রিয়তা নিষ্ক্রিয়তা প্রভৃতি ধারণা মানুষকে শারীরিক আর মানসিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে সাহায্য করে।

এই শতাব্দীর শুরুতে জিনের সিকুয়েন্সিং নিয়ে শুরু হয় ব্যাপক গবেষণা। যুক্তরাষ্ট্রের হিউম্যান জিনোম প্রকল্পের বিজ্ঞানীরা প্রথম মানুষের জিনবিন্যাস উন্মোচন করেন। ২০০০ সালের জুনে প্রথমবারের মতো প্রকাশ করা হয় এ নকশার খসড়া। এরপর ২০০১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি হিউম্যান জিনোম প্রকল্প তাদের প্রথম মানব জিনোম নেচার জার্নালে প্রকাশ করে। এর একদিন পর সায়েন্স জার্নালে মানব জিনোম প্রকাশ করে সেলেরা জিনোমিকস।

মানব জিনোম সিকোয়েন্স উন্মোচন প্রক্রিয়া শুধু মানুষের শারীরিক এবং মানসিক প্রক্রিয়া বুঝতে সাহায্য করছে তা নয়। এটি মানুষের নানারকম অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে এবং স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নেও ভূমিকা রাখছে।

মানব জিনবিন্যাস উন্মোচন হলেও এর বিশ্লেষণ জটিল। এ বিশ্লেষণ জানা গেলে কোনো ব্যক্তি তাঁর দেহের রোগ নিরাময়ের জন্য ব্যক্তিগত ওষুধ ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করতে পারেন। অর্থাৎ, কোনো রোগীর জিনবিন্যাস অনুযায়ী রোগ নির্ণয় করে সেই অনুযায়ী ওষুধ সেবন করা যাবে। এ রকম নানারকম সম্ভাবনা নিয়ে হাজির হয়েছে মানব জিনোম। তাই মানব জিনবিন্যাস নিয়ে প্রতিনিয়তই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে গবেষণা চলছে।

জীব মাত্রই জিনের সমন্বয়ে গঠিত। আমরা যে পৃথিবীতে বাস করি সেখানে রয়েছে নানারকম প্রাণী আর উদ্ভিদ। এই প্রাণী আর উদ্ভিদের জিনোম সিকোয়েন্স জানাটা বিশেষ জরুরি। যেমন, কৃষিক্ষেত্রে নানারকম সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টিতে জিন প্রযুক্তি বিশেষ ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি কৃষিক্ষেত্রে জিন প্রযুক্তির ব্যবহার কী কী পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে সেটা জানা থাকাটাও জরুরি। এ জন্য ধান, পাটসহ নানারকম কৃষিজ উদ্ভিদের জিন বিন্যাস জানাটা দরকার। বাংলাদেশি বিজ্ঞানীরা পাট, পাটের ছত্রাক, পেঁপের জিন বিন্যাস উন্মোচন করেছেন। এভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে জিন বিশেষজ্ঞরা কৃষিজ উদ্ভিদের জিন বিন্যাস উন্মোচন করে মানব কল্যাণে ভূমিকা রাখছেন।

পাশাপাশি জীবাণুর জিন বিন্যাস বিষয়টি বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা করোনা ভাইরাসের জিন বিন্যাস উন্মোচন করতে পেরেছিলেন বলেই করোনার বিরুদ্ধে লড়াই একটি সুনির্দিষ্ট গতিবিধি পেয়েছে। বেশ কিছু ভ্যাকসিন তৈরি হয়েছে এবং আরও ভ্যাকসিন তৈরির প্রক্রিয়া চলছে। এভাবে মানবজাতির উন্নয়ন ও টিকে থাকার স্বার্থে জিনবিন্যাস জানাটা জরুরি।

মানসিক প্রক্রিয়া উন্মোচনে জিন গবেষণার ভূমিকা কম নয়। অনেক বিজ্ঞানী মানসিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে জিনের সম্পর্ক নিয়ে কাজ করেছেন। আণবিক জীববিজ্ঞান আর স্নায়ু জীববিজ্ঞান নিয়ে তাদের কাজে উঠে এসেছে সামাজিক বিবর্তন, অটিজমসহ মানসিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত নানারকম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই শতাব্দীতে জিনবিজ্ঞানের এই গবেষণার ধারাটি অব্যাহত থাকবে।

বিভিন্ন সময় মানসিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত নানারকম জিন আবিষ্কার করে রীতিমতো আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন বিজ্ঞানীরা। যেমন রেট সিনড্রোম নিয়ে কাজ করে মানসিক সমস্যার জিনগত ভিত্তি নির্মাণের কাজ করেছেন বিজ্ঞানীরা।

রেট সিনড্রোম একধরনের অটিজম সম্পর্কিত রোগ। রেট শব্দটি এসেছে ভিয়েনার শিশু বিশেষজ্ঞ রেট ওয়ারনিকের নাম থেকে। মেয়ে শিশুদের এ রোগটি হয়ে থাকে। এক্স ক্রোমোজোমে অবস্থিত এমইসিপি-২ জিনে মিউটেশন বা পরিবর্তন হলে রেট সিনড্রোম হয়ে থাকে। মটরস্নায়ুতে বিশেষ করে হাতের মটরস্নায়ুগত ত্রুটি এবং সামাজিক সম্পর্ক পরিমাপে ব্যর্থতার ফলে এক ধরনের নিঃসঙ্গতা তৈরি হয়। এটিই হচ্ছে রেট সিনড্রোমের লক্ষণ।

বিজ্ঞানীরা এমইসিপি-২ জিনের পরিবর্তন চিহ্নিত করেছেন। এই পরিবর্তন তাদের অটিজমের সঙ্গে জিনের সম্পর্ক বুঝতে বেশ সহায়তা করছে। এমইসিপি-২ জিন সামাজিক সম্পর্কগুলো অনুযায়ী কীভাবে আচরণ করতে হবে তার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।

মানুষের সামাজিক সম্পর্কগুলোর তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পারা মানব জাতির শিক্ষার ইতিহাসে অন্যতম একটি অর্জন। এ উপলব্ধি সাংস্কৃতিক বিবর্তনের ফল। সাংস্কৃতিক বিবর্তনের সঙ্গে পরিবেশ এবং জিনের সম্পর্ক নিয়ে বিজ্ঞানীরা নানারকম অনুপ্রেরণামূলক প্রবন্ধ লিখেছেন এই শতাব্দীর শুরু থেকেই।

এদিকে এই শতাব্দীতে বিজ্ঞানীরা জিন সম্পাদনা গবেষণায় নতুন অগ্রগতি নিয়ে এসেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে জিন সম্পাদনা নিয়ে ইউরোপ আর আমেরিকার জিনবিজ্ঞান সম্পর্কিত ল্যাবগুলোতে নানারকম গবেষণা হচ্ছে। এ সকল গবেষণা থেকে বেরিয়ে আসছে নতুন নতুন তথ্য আর প্রযুক্তি। এ রকমই একটি উল্লেখযোগ্য গবেষণা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকোতে অবস্থিত ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা।

এই গবেষকেরা জিন ধারণকারী জিনোমে কোনোরূপ কাটাকাটি না করেই জিন সম্পাদনার উপায় বের করেছেন। তাঁদের উদ্ভাবিত সম্পাদনা প্রক্রিয়া এপিজেনোমিক প্রোটিন আর এ সংক্রান্ত অন্যান্য অণু কেন্দ্রিক।

এই গবেষণার অন্যতম নেতৃত্ব দানকারী বিজ্ঞানী লুক গিলবার্ট বলেন, 'সিআরআইএসপিআর প্রযুক্তি জিন সম্পাদনার জন্য বহুল ব্যবহৃত প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তি উদ্ভাবনের জন্য ২০২০ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কারও দেওয়া হয়। তবে আমরা এই প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে একটু অন্যভাবে চিন্তা করেছি।'

বিজ্ঞানী লুক গিলবার্ট এখানে অন্যভাবে কাজ করা বলতে বুঝিয়েছেন, তারা জিনোম সম্পাদনা না করে এপিজিনোম সম্পাদনা করছেন। ফলে জিনোমে কাটাকাটি না করে তারা জিন সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় করতে পারছেন। জিন আসলে তার বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে নিজেকে সক্রিয় করার মধ্য দিয়ে। তাই কোনো খারাপ জিনকে নিষ্ক্রিয় করতে পারলে তার ক্ষতি থেকে মুক্ত হওয়া যায়। সিআরআইএসপিআর প্রযুক্তি দিয়ে জিনে কাটাকাটি করে এই নিষ্ক্রিয়করণ বা সক্রিয়করণ কার্যক্রম করা হতো। ফলে মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি থেকে যেত। লুক গিলবার্ট আর তাঁর দলের কাজের ফলে সিআরআইএসপিআর প্রযুক্তিতে মডিফিকেশন এসেছে। এখন আর জিনোমে কাটাকাটি করা লাগবে না। জিন সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় করতে পারে এ রকম প্রোটিন বা এই জাতীয় অণুতে মডিফিকেশন করেই কাজটি করা যাবে। এই প্রোটিন বা এই জাতীয় অণুকে বলা হয় এপিজেনোমিক উপাদান।

এই গবেষণার সঙ্গে জড়িত আরেকজন বিজ্ঞানী হলেন জোনাথন ওয়াইজম্যান। তিনি বলেন, 'আমাদের মডিফিকেশন পদ্ধতির নাম সিআরআইএসপিআর অন এবং সিআরআইএসপিআর অফ। এপিজেনোমিক উপাদানের সাহায্যে জিনে কাটাকাটি না করে জিন সক্রিয় করতে হলে সিআরআইএসপিআর অন প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হয়। আর এপিজেনোমিক উপাদানের সাহায্যে জিনে কাটাকাটি না করে জিন নিষ্ক্রিয় করতে হলে সিআরআইএসপিআর অফ প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হয়।'

লুক গিলবার্টের সহযোগী গবেষক কারমেন অ্যাড্রিয়ানস বলেন, 'এই অন আর অফের প্রযুক্তি নতুন ওষুধ তৈরি, অটিজম চিকিৎসা, ক্যানসার চিকিৎসাসহ চিকিৎসা শাস্ত্রের নানা ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে।'

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক আমান্ডা চাং, 'এই গবেষণা আসলে আমাদের অনেক দূর পর্যন্ত নিয়ে যাবে।'

এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত আরেকজন গবেষক অ্যাঙ্গেলা পগসন বলেন, 'এই প্রযুক্তি উদ্ভাবন আসলে জিন সম্পাদনার কাজের ক্ষেত্রে ঝুঁকি কমিয়ে দিল। এটি একটি ঐতিহাসিক অগ্রগতি।'

এভাবে জিন সম্পাদনা, মানসিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে জিনের সম্পর্ক, জিনোম সিকুয়েন্সিংসহ জিন সম্পর্কিত নানারকম গবেষণা এই শতাব্দীর সামনের সময়কে নানাভাবেই প্রভাবিত করবে।

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
 
    সব মন্তব্য

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    এলাকার খবর

    মৃতদেহে প্রাণের সঞ্চার সম্ভব কি?

    মৃতদেহে প্রাণের সঞ্চার সম্ভব কি?

    কবে থেকে মানুষ পোশাক পরা শিখল

    কবে থেকে মানুষ পোশাক পরা শিখল

    মঙ্গলে যেতে যত বাধা

    মঙ্গলে যেতে যত বাধা

    ডিমের গাণিতিক সমীকরণ আবিষ্কার

    ডিমের গাণিতিক সমীকরণ আবিষ্কার

    সম্পর্ক মেরামতে হাসুন

    সম্পর্ক মেরামতে হাসুন

    নিউট্রন স্টারের পাহাড় আসলে কেমন

    নিউট্রন স্টারের পাহাড় আসলে কেমন

    আলজেরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্টের মৃত্যু

    আলজেরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্টের মৃত্যু

    ফ্রান্সের নজিরবিহীন প্রতিক্রিয়া

    ফ্রান্সের নজিরবিহীন প্রতিক্রিয়া

    আফগানিস্তানে জাতিসংঘ মিশনের মেয়াদ বাড়ল

    আফগানিস্তানে জাতিসংঘ মিশনের মেয়াদ বাড়ল

    কোণঠাসা পুতিনের বিরোধীরা

    কোণঠাসা পুতিনের বিরোধীরা

    ভারতে বিরোধী মুখ নিয়েই বিরোধিতা তুঙ্গে

    ভারতে বিরোধী মুখ নিয়েই বিরোধিতা তুঙ্গে

    মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকা পুলিশ সদস্যের ওপর প্রতিপক্ষের হামলায়

    মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকা পুলিশ সদস্যের ওপর প্রতিপক্ষের হামলায়