Alexa
বৃহস্পতিবার, ০৭ জুলাই ২০২২

সেকশন

epaper
 

ফিলিস্তিন–ইসরায়েল সংঘাতে কে জিতল, হামাস নাকি নেতানিয়াহু?

আপডেট : ২১ মে ২০২১, ২২:৫৬

গাজায় ইসরায়েল–হামাসের কাঙ্ক্ষিত যুদ্ধবিরতির খবরে আনন্দ মিছিল ও জয়–পরাজয়ের হিসাব–নিকাশ সবই চলছে। ছবি: রয়টার্স ঢাকা: ১১ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে গাজার হামাস ও ফিলিস্তিন সরকার। এর মধ্যে প্রাণ ঝরেছে প্রায় আড়াই শ মানুষের। বাস্তুচ্যুত হয়েছে ৯০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি। গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংঘাতের ঘটনা এটি। এই সংঘাতের পূর্বাপর নিয়ে চলছে বিশ্লেষণ। বিশ্বনেতাদের কাছে অগ্রাধিকার পাচ্ছে গাজা পুনর্গঠন। এরই মধ্যে তহবিল সংগ্রহের কাজ শুরু হয়েছে। তবে ওদিকে চলছে, উভয় পক্ষে লাভক্ষতির হিসাব। ইসরায়েল ও হামাস উভয় পক্ষই বিজয় দাবি করছে। তবে এই যুদ্ধে রক্তের বিনিময়ে যে অর্জন, সেটি মূলত একান্তই রাজনৈতিক—এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। উইন–উইন সিচুয়েশনে হামাস ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এই লাভের হিসাবটা বুঝতে হলে একটু পেছনে ফিরে তাকাতে হবে।

চলতি বছরের প্রথম চার মাস ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে আলোচনার মঞ্চে কেন্দ্রীয় আসন দখল করেছিলেন। ফিলিস্তিনিদের পক্ষ থেকে জেরুজালেমে ভোটগ্রহণের দাবির জবাব দিতে গিয়ে ইসরায়েলের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে এপ্রিলের শেষ নাগাদ নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করেন তিনি। সিদ্ধান্তটি বিতর্কের জন্ম দিলেও আব্বাস আলোচনায় ছিলেন। তবে গত কয়েক সপ্তাহে আব্বাস ফিলিস্তিন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি থেকে অনেকখানি সরে গেছেন। চলমান ফিলিস্তিন–ইসরায়েল সংঘাতে তিনি একেবারেই অনুপস্থিত ছিলেন।

এর মধ্যে জেরুজালেম থেকে পাঁচ ফিলিস্তিনি পরিবারের উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ফিলিস্তিন। গত ১০ মে এ নিয়ে আদালতের রায় দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আল–আকসায় সংঘাত বেঁধে যাওয়ায় শুনানি পিছিয়ে দেওয়া হয়। মূলত জেরুজালেমে নির্বাচন অনুষ্ঠানে বাধা দেওয়ার কারণে আগে থেকেই ফুঁসছিলেন ফিলিস্তিনিরা। এর মধ্যে আল–আকসায় ইসরায়েলি পুলিশের নির্বিচার কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট নিক্ষেপ আগুনে ঘৃতাহুতি দেয়। আর এই সুযোগই লুফে নেয় হামাস। হামাসের সামরিক শাখার প্রধান মোহাম্মদ দেইফ উত্তেজিত জনতার কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন। তিনি ইসরায়েলকে আল–আকসা থেকে পুলিশ প্রত্যাহারের আলটিমেটাম দিয়ে বসেন। বলতে গেলে জেরুসালেমের রাস্তায় ও আল-আকসা মসজিদ চত্বরের বিক্ষোভ হামাস ও আব্বাসবিরোধী নেতা–কর্মীদের দ্বারা প্রথম দিনেই ছিনতাই হয়ে যায়। বিক্ষোভকারীরা তখন থেকে শুধু ইসরায়েলের বিরুদ্ধেই নয়, আব্বাসের বিরুদ্ধেও তাদের ক্রোধ প্রকাশ করতে থাকে।

বিক্ষোভ শেষ পর্যন্ত হামাস সমর্থকদের সমাবেশে পরিণত হয়। হামাসের নেতাদের সমর্থনে স্লোগান দিতে থাকে মানুষ। এমনকি হামাসের পতাকা উড়িয়ে ‘আমিই দেইফ’ বলে স্লোগানে ফেটে পড়ে জনতা। ঈদুল ফিতরে দিন আল-আকসায় নামাজ আদায় করতে আসা কয়েক হাজার মুসল্লিকে হামাস নেতাদের ছবি সংবলিত পোস্টার বহন করতে দেখা যায়। এর আগে, জেরুজালেমের রাস্তায় ও আল আকসায় ফিলিস্তিনি বিক্ষোভকারীরা আব্বাসকে মার্কিন ‘এজেন্ট’ এবং ইসরায়েলের ‘সহযোগী’ বলে স্লোগান দেন।

গত সপ্তাহের গোড়ার দিকে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যে লড়াই শুরু হয়, তা ফিলিস্তিনিদের মধ্যে আব্বাসের অবস্থান ব্যাপকভাবে ক্ষুণ্ন করেছে। সে স্থলে সবার মনোযোগ ও ভালোবাসার কেন্দ্রে চলে আসে হামাস। আব্বাসকে আবারও অনেক ফিলিস্তিনি অযোগ্য ও দুর্বল নেতা হিসেবে চিত্রিত করতে শুরু করেছেন। বিপরীতে হামাসের নেতারা ‘জেরুজালেম ও আল-আকসা মসজিদের রক্ষাকারী’ নায়ক হিসেবে ফিলিস্তিনিদের কাছে আবির্ভূত হন।

আলটিমেটামের মধ্যে আল–আকসা থেকে পুলিশ প্রত্যাহার না করায় ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে রকেট ছোড়ে হামাস। এরপরই শুরু হয় পাল্টাপাল্টি হামলা। আকাশপথে হামলা মূলত হামাস শুরু করলেও ফিলিস্তিনিরা এই যুদ্ধ বাধানোর জন্য ইসরায়েলকেই দায়ী করছেন। ১১ দিনের সংঘাতে প্রায় আড়াই শ সহনাগরিককে হারিয়ে যুদ্ধবিরতি ঘোষণাকে নিজেদের বিজয় বলেই মনে করছেন ফিলিস্তিনিরা। সেই সঙ্গে হামাসের অবস্থান গাজা উপত্যকা ছাড়িয়ে পশ্চিম তীর ও জেরুজালেমে ছড়িয়ে পড়ার উর্বর ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। যদিও সংঘাতকালে আব্বাস বা পিএলওর নীরবতাকে অনেকে হামাসের সঙ্গে তাদের সংহতি বলে মনে করেছেন।

সর্বশেষ ২০০৬ সালে সাধারণ নির্বাচনে বিপুল ভোট পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় হামাস। নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ করে মাহমুদ আব্বাসের দল পিএলও। সুযোগ পেয়ে যায় পশ্চিমা বিশ্বও। হামাস ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিতে রাজি না থাকায় তাদের সরকার গঠনে বাধা দেয় যুক্তরাষ্ট্রসহ ইসরায়েলর মিত্র দেশগুলো। শেষ পর্যন্ত রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মাধ্যমে পিএলওকে হটিয়ে গাজার নিয়ন্ত্রণ নেয় হামাস।

২০০৭ সাল থেকে আর গাজা উপত্যকায় পা রাখেননি আব্বাস। পরবর্তী নির্বাচনের তারিখ ঘোষণায় দেরি করায় হামাস ও অন্য ফিলিস্তিনি দলগুলোর সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে। সাম্প্রতিক সংঘাতের পরিস্থিতি এবার ফিলিস্তিন থেকেই পিএলওকে আরও দুর্বল করে দেওয়ার একটি সুযোগ পেয়েছে হামাস। বিষয়টি পিএলও নেতারাও হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন। সংঘাত চলাকালে আব্বাস মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন ও ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁসহ একাধিক বিশ্বনেতার সঙ্গে কথা বলেছেন। জেরুজালেম ও গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি আগ্রাসনের অবসান ঘটানোর উপায় নিয়ে আলোচনা করতে রামাল্লায় ফিলিস্তিনি নেতৃত্বের বৈঠকের সভাপতিত্বও করেছেন আব্বাস। বিশ্বজুড়ে ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিদের গাজা উপত্যকায় হামলা বন্ধে ইসরায়েলের ওপর চাপ বাড়াতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ত্বরান্বিত করারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

হোয়াইট হাউসে ২০১০ সালে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ফাইল ছবি: রয়টার্স আব্বাস, তাঁর দল বা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (পিএ) কিন্তু মিসর, কাতার ও জাতিসংঘের উদ্যোগের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিল না। বরং কাতার ও লেবাননভিত্তিক হামাস নেতাদের আরব ও পাশ্চাত্য মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করার কথা জানা গেছে। কাতারভিত্তিক হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়ে, হামাসের কূটনৈতিক প্রধান খালিদ মেশাল ইসরায়েলের সঙ্গে সমঝোতার প্রস্তাব নিয়ে মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যোগাযোগ রেখেছেন।

জেরুজালেমে ও গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনিদের সহায়তা না দেওয়া এবং নির্বাচন স্থগিতের সিদ্ধান্তের কারণে ফিলিস্তিনিরা আব্বাসের ওপর ক্ষুব্ধ। এ ছাড়া পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি নিরাপত্তা বাহিনী ও ইসরায়েলের মধ্যে অব্যাহত সমন্বয়–সহযোগিতাও যথেষ্ট বিরক্তি উৎপাদন করেছে। সব মিলিয়ে ধরেই নেওয়া যায় ফিলিস্তিনের মাঠে আব্বাস বা পিএলও এখন ক্রমেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছেন।

সুতরাং বলা যেতে পারে, ১১ দিনের সংঘাতে হামাস ও ফিলিস্তিনিরা তীব্র সামরিক আঘাতের শিকার হয়েছেন বটে তবে, ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে শত শত রকেট বর্ষণ করে ফিলিস্তিনি ও অন্য আরবদের মধ্যে হামাস এরই মধ্যে যে অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে, সেই রাজনৈতিক অর্জন কোনোভাবেই উপেক্ষা করার মতো নয়। এই লড়াইয়ে হামাস ফিলিস্তিনি এবং সমস্ত আরব ও মুসলমানদের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিজয়ী এবং ‘রক্ষাকারী’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অন্যদিকে আব্বাস সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত, একজন ‘বিশ্বাসঘাতক’ ও ‘ব্যর্থ’ নেতা হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছেন।

অপরদিকে ইসরায়েলেও চলছে রাজনৈতিক সংকট। গত মার্চে ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দল লিকুদ পার্টি। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে জোট গঠনে ব্যর্থ হওয়ায় প্রধান বিরোধী দলের নেতা ইয়াইর লাপিদকে সরকার গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট। ফলে ইসরায়েলিদের সমর্থন আদায়ের জন্য ইহুদিদের ‘ভিকটিমহুড’ কার্ডই খেলতে হচ্ছে নেতানিয়াহুকে। ১২ ইসরায়েলির প্রাণ হারানো এবং হামাসের ঝাঁকে ঝাঁকে রকেট সামলাতে বিপুল সামরিক ব্যয়ের পরও শর্তহীন যুদ্ধবিরতিকে ‘অসাধারণ বিজয়’ বলে বর্ণনা করছেন ইসরায়েলের বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।

সুতরাং, আগামী নির্বাচনে ফিলিস্তিনের প্রশাসনে হামাসের ফিরে আসা, আর ওদিকে ইসরায়েলে ফের নেতানিয়াহুর সরকার গঠনের সম্ভাবনা কতখানি সত্যি হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
 
    সব মন্তব্য

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    এলাকার খবর

     
     

    ইউক্রেন যুদ্ধে পুতিন এখন কী করবেন

    পশ্চিমা নেতৃত্ব বিশ্বকে কি আরও বিভক্ত করছে

    এশিয়ায় জ্বালানি সংকটে সংকুচিত হচ্ছে উৎপাদন, ভুগবে সারা বিশ্বই

    জন্মনিয়ন্ত্রণ কি শুধু নারীর একার দায়িত্ব

    ইউক্রেনে রাশিয়াকে এগিয়ে রাখছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের রণকৌশল

    এশিয়া অঞ্চলে কেমন বাণিজ্যনীতি চায় যুক্তরাষ্ট্র 

    বিএম ডিপো থেকে পণ্যভর্তি অক্ষত কনটেইনার সরানো শুরু

    পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল চালু হচ্ছে এ মাসেই

    কিশোরী নেতৃত্ব এবং কর্মশালাবিষয়ক সেমিনার

    পুলিশের গুলিতে নিহত জেল্যান্ড ওয়াকারের মরদেহে পরানো হয়েছিল হাতকড়া

    পাবনায় স্বামীর বিরুদ্ধে ছুরিকাঘাতে স্ত্রীকে হত্যার অভিযোগ

    সিলেটে ব্লগার অনন্ত হত্যা: বেঙ্গালুরুতে গ্রেপ্তার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ফয়সাল