সোমবার, ১৭ জুন ২০২৪

সেকশন

 
ফ্যাক্টচেক

উটকে কেন বিষধর সাপ খাওয়ানো হয়, সত্যিই কি এতে রোগ সারে

আপডেট : ১৪ মে ২০২৪, ০০:৫২

উটকে বলা হয় মরুর জাহাজ। ঊষর মরুভূমির বৈরী পরিবেশে টিকে থাকার অনন্য ক্ষমতা আছে এই প্রাণীর। প্রাণীটি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সম্প্রতি ৩ মিনিট ৭ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওটিতে দাবি করা হচ্ছে, পবিত্র কোরআনে উটের ‘হায়াম’ নামে এক রোগের বর্ণনা আছে। এই রোগ হলে উট খাওয়া–দাওয়া ছেড়ে দিয়ে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকে। এই ‘হায়াম’ রোগের প্রতিষেধক হচ্ছে উটকে জীবন্ত বিষধর সাপ খাইয়ে দেওয়া।

অনেক সময় উট নিজেই সাপ খেয়ে থাকে। সাপ গিলে ফেলার পর উটের তৃষ্ণা বাড়তে থাকে এবং প্রায় আট ঘণ্টা এ অবস্থায় থাকে। সে সময় উটের চোখ থেকে অঝোর ধারায় পানি ঝরতে থাকে। উটের চোখ থেকে ঝরা এ পানির নাম ‘তিরায়ক’। এই পানি অনেক মূল্যবান! এটি যেকোনো প্রাণীর বিষ নষ্ট করে দিতে পারে। এই পানির অনেক উপকারিতা। তাই এটি চামড়ার পাত্রে সংরক্ষণ করে রাখা হয়।

তরিকুল ইসলাম তুষার নামের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে গত ২১ এপ্রিল ভিডিওটি ‘উটকে কেন বিষধর জীবিত সাপ খাওয়ানো হয়?’ শিরোনামে পোস্ট করা হয়। ভিডিওটি আজ সোমবার (১৩ মে) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত ৬৩ হাজার বার দেখা হয়েছে। পোস্টটিতে রিয়েকশন পড়েছে ৩ হাজারের বেশি।

একই তথ্য বিগত বিভিন্ন সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার করা হয়েছে। যেমন, ২০২২ সালে মুসলিম টিভি নামের একটি ফেসবুক পেজে মাওলানা সিদ্দিকুর রহমান নাসরুল্লাহ নামে এক ইসলামি বক্তার ওয়াজ ভাইরাল হয়। ওয়াজে তিনি বলেন, কোরআনের সুরা আল–ওয়াকিয়ার ৫২ থেকে ৫৫ নম্বর আয়াতের মধ্যে উটের ‘হায়াম’ রোগের বর্ণনা আছে।

ভাইরাল এসব তথ্যের সত্যতা যাচাই করে দেখেছে আজকের পত্রিকার ফ্যাক্টচেক বিভাগ।

উটের অসুস্থতায় খাওয়ানো হয় বিষধর সাপ খাওয়ানোর দাবিতে পোস্ট। ছবি: ফেসবুক  কোরআনে উট ও ‘হায়াম’ রোগের বর্ণনা
ইসলাম সম্পর্কে প্রচলিত বিভিন্ন ভুল ধারণা নিরসনে কাজ করে যুক্তরাজ্যে বেডফোর্ডে অবস্থিত আল–কুদওয়া ইনস্টিটিউট। সংস্থাটির ওয়েবসাইটে কোরআনে বর্ণিত প্রাণীদের নিয়ে একটি আলোচনা পাওয়া যায়। এতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, কোরআনে মোট ১৫ বার উটের বর্ণনা এসেছে। কোরআনে উটকে আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টির শৈল্পিকতার উদাহরণ দেখিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। 

ওয়েবসাইটটিতে উট নিয়ে কোরআনের আলোচনায় উটের ‘হায়াম’ নামের রোগ ও এর চিকিৎসায় সাপ খাইয়ে দেওয়ার ব্যাপারে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

দ্য লাস্ট ডায়লগ’ নামের ধর্মভিত্তিক একটি কনটেন্টের ওয়েবসাইটে কোরআনে উটের বর্ণনা সংবলতি ১৫টি আয়াত পাওয়া যায়। এর মধ্যে তিনবার এসেছে সুরা আল–আনআমে, একবার করে এসেছে— সুরা হুদ, সুরা ইউসূফ, সুরা বনি ইসরাইল, সুরা আশ–শুআ’রা, সুরা আল–কামার, সুরা আল–ওয়াকিয়া, সুরা আল হাশর, সুরা আল–মুরসালাত, সুরা আত–তাকভীর, সুরা আল–গাশিয়া এবং সুরা আশ–শামসে।

আয়াতগুলোতে উটের প্রসঙ্গ এসেছে বিভিন্ন ঘটনার বর্ণনায়। কিন্তু আয়াতগুলো থেকে উটের ‘হায়াম’ নামের রোগ ও এর চিকিৎসায় সাপ খাইয়ে দেওয়ার ব্যাপারে কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না। 

তবে সুরা ওয়াকিয়ার ৫৫ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় উটের এক ধরনের অসুস্থতার কথা বলা হয়েছে। এ রোগে উট ঘন ঘন পানি পান করে কিন্তু পিপাসা নিবৃত্তি হয় না। এমন পিপাসার্ত উটদের বোঝাতে আয়াতটিতে ‘হিম’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। যার বহুবচন আহয়াম। সম্ভবত এই শব্দটির সূত্রেই অনেকেই হায়াম রোগের কথা কোরআনে বর্ণিত আছে বলে দাবি করেন।

কোরআনে উটের উপস্থাপন নিয়ে ইরানের সিরাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সায়েন্স ও ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজেস অ্যান্ড লিংগুয়াস্টিক্টস বিভাগের দুই গবেষক একটি কনফারেন্স পেপার তৈরি করেন। ২০১২ সালে ইরানে অনুষ্ঠিত ‘ন্যাশনাল কংগ্রেস অব ক্যামেল ইন ইরান’ শীর্ষক কনফারেন্সে এটি উপস্থাপন করা হয়। এই কনফারেন্স পেপার থেকেও হায়াম রোগ ও এর নিরাময় হিসেবে বিষাক্ত সাপ খাইয়ে দেওয়ার ব্যাপারে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

উট কি সাপ খায়?
উট মূলত তৃণভোজী প্রাণী, বিভিন্ন উদ্ভিদই এদের প্রধান খাদ্য। তবে কেউ কেউ দাবি করেন, এরা কখনো সাপও খায়। যদিও এ নিয়ে বিতর্ক আছে। কারও কারও দাবি, উট কখনোই সাপ খায় না। তবে যারা উট সাপ খায় বলে দাবি করেন তাঁদের মত হলো, প্রাণীটি কখনো কখনো মাংস খেয়ে থাকে। বিশেষ করে যখন খাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত উদ্ভিদ পাওয়া যায় না।

‘হায়াম’ রোগের চিকিৎসায় উটকে সাপ খাওয়ানো
স্বেচ্ছায় বা খাদ্য সংকটে উট সাপ খায় কিনা সে নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, হায়াম রোগে আক্রান্ত উটকে সাপ খাওয়ানোর প্রচলন রয়েছে। প্রাণী ও প্রকৃতি বিষয়ক ওয়েবসাইট দ্য ওয়াইল্ড লাইফে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ‘হায়াম’ রোগের চিকিৎসায় উটকে সাপ খাওয়ানো সম্পর্কে বলা হয়, এটি প্রচলিত বিশ্বাস। এর সঙ্গে চিকিৎসা বিজ্ঞানের কোনো সম্পর্ক নেই বরং এটি প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা।

উটকে অসুস্থতায় সাপ খাওয়ানোর দাবিটি মধ্যপ্রাচ্যে প্রচলিত মিথ। ছবি: পেটকিন  পশু বিশেষজ্ঞদের মতে, উটকে যে রোগের জন্য সাপ খাওয়ানো হয়, এটি মূলত ট্রাইপ্যানোসোমিয়াসিস টি. ইভানসি নামক আনুবীক্ষণিক পরজীবী দ্বারা সৃষ্ট গুরুতর রোগ। এটি মাছির মাধ্যমে রক্তে সংক্রমিত হয়। এই রোগে আক্রান্ত হলে উটের গর্ভপাত, বাচ্চা উটের উচ্চ মৃত্যুহার এবং অন্ডকোষের ক্ষতি হতে পারে।

এই রোগের লক্ষণের মধ্যে আছে— জ্বর, চোখ দিয়ে ঝরা, রক্তা স্বল্পতা, শরীরের বিভিন্ন অংশ ফুলে যাওয়া, নিস্তেজ হয়ে পড়া, দুর্বলতা, খাওয়ার রুচি থাকলেও শারীরিক অবস্থার অবনতি। যথাসময়ে চিকিৎসা না করা হলে উটের ক্ষেত্রে এই রোগে মৃত্যুর হার প্রায় শতভাগ।

এই রোগের চিকিৎসায় উটকে বিষধর সাপ খাওয়ানোর দাওয়া প্রচলিত থাকলেও এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

সাপ খাওয়ার পর কি উটের ক্ষতি হয়?
সাপের বিষ বিভিন্ন দুর্বল বন্ধনের প্রোটিন দিয়ে তৈরি। সাপের বিষের প্রভাব শুরু হয় আক্রান্ত প্রাণীর রক্তের সঙ্গে মিশে যাওয়ার পর। বিষ রক্তের সঙ্গে মিশে সারা শরীর ছড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন অঙ্গ–প্রত্যঙ্গ অকার্যকর করে দেয়। কিন্তু উটকে সাপ খাওয়ালে সেটি সরাসরি পরিপাকতন্ত্রে চলে যায়। হজমক্রিয়ায় বিভিন্ন এনজাইমের প্রভাবে সেই সাপের বিষ অকার্যকর হয়ে পড়ে। তাই সাপ খেলে উটের শরীরে সেভাবে বিষক্রিয়া হয় না, বরং কিছু সময় অসুস্থ থাকতে পারে।

সাপ খাওয়ানোর পরে উট প্রচুর কান্না করে?
বিষাক্ত সাপ খাওয়ানোর পর দীর্ঘ সময় ধরে উটের দুই চোখ দিয়ে পানি ঝরে— এমন গল্প প্রচলিত রয়েছে। এ প্রসঙ্গে প্রাণী বিষয়ক আরেকটি ওয়েবসাইট পেটকিনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সাপ খাওয়ানোর পর উট অঝোরে কান্না করে এবং সেই কান্না সাপের কামড়ের প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার দাবিকে সমর্থন করে এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। এটি মূলত লোকমুখে প্রচলিত গল্প।

অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, উটের ‘হায়াম’ রোগের প্রতিষেধক হিসেবে বিষধর সাপ খাওয়ানো এবং এর ফলে উটের চোখ থেকে ঝরা অশ্রু সাপের কামড়ের প্রতিষেধক হিসেবে মানুষের ব্যবহারের তথ্য পুরোটাই মধ্যপ্রাচ্যে প্রচলিত বিশ্বাস ও সংস্কার। এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। 

তবে উট থেকে তৈরি হয় অ্যান্টিভেনম
অ্যান্টভেনম তৈরির প্রচলিত পদ্ধতিতে সাধারণ ঘোড়া, ভেড়া বা উট ব্যবহার করা হয়। উটের দেহে নিয়ন্ত্রিত পরিমাণে সাপের বিষ প্রবেশ করানো হলে এটির দেহে এর প্রতিক্রিয়ায় অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। এই অ্যান্টিবডি সংগ্রহ করেই মানুষের জন্য সাপের কামড়ের প্রতিষেধক তৈরি করা হয়।

বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন, মরুভূমিতে রুক্ষ্ম পরিবেশে বসবাসের কারণে উট সাধারণত ঘোড়া এবং ভেড়ার চেয়ে ভালো অ্যান্টিবডি তৈরি করতে পারে। পাফ অ্যাডার, ধারালো আঁশযুক্ত ভাইপার বা ব্ল্যাক কোবরার মতো সাপ থেকে বিষ নিয়ে উটের শরীরে অল্প পরিমাণে প্রবেশ করিয়ে অ্যান্টিভেনম তৈরি করা হয়। উট থেকে তৈরি অ্যান্টিবডি তাপসহনীয়। তাই এটি সহজে সংরক্ষণ ও বহন করা যায়।

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
 
    সব মন্তব্য

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    এলাকার খবর

     
    ফ্যাক্টচেক

    ‘শত শত গরু ভারত থেকে আসছে’ দাবিতে ভাইরাল ভিডিওটি অন্য দেশের

    ফ্যাক্টচেক

    কোকা-কোলার গোপন ফর্মুলায় অ্যালকোহল! ভাইরাল তথ্যটির সত্যতা কী

    ফ্যাক্টচেক

    ওয়াজে কোকা–কোলার ‘বিজ্ঞাপন’, মিজানুর রহমান আজহারীর ভিডিও ভাইরাল

    ফ্যাক্টচেক

    ফেসবুকে জুয়ার অ্যাপের বিজ্ঞাপনে সাকিব–মুশফিক! প্রতারণার ফাঁদ 

    ফ্যাক্টচেক

    ব্যারিস্টার সুমন যখন ইউটিউবারদের ভিউ বাণিজ্যের ‘পুঁজি’

    ফ্যাক্টচেক

    কোকা–কোলার দোকান ভাঙচুরের দাবিতে ছাত্রলীগের মারামারির ভিডিও ভাইরাল

    জুরাইনে কোরবানির গরুর মাংস বিক্রির হাট

    জাপান সফরের যাত্রাপথে প্লেন বিড়ম্বনায় নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী

    সখীপুরে নিখোঁজের ১ দিন পর গৃহবধূর লাশ মিলল পুকুরে

    কারস্টেনকে কেন পাকিস্তানের চাকরি ছাড়তে বলছেন হরভজন

    সুন্দরবনে ১২০ বোতল কীটনাশকসহ নৌকা জব্দ

    ন্যায্যমূল্য না পেলে চামড়া ভারতে পাচারের শঙ্কা, সতর্ক অবস্থানে বিজিবি