শনিবার, ২২ জুন ২০২৪

সেকশন

 

যুক্তরাষ্ট্রের ধ্বংসাত্মক প্রয়াস অব্যাহত

আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০৮:২৫

চিলিতে সামরিক অভ্যুত্থান হয়েছিল ১৯৭৩ সালে। এএফপির ফাইল ছবি ১১ সেপ্টেম্বর ছিল চিলিতে সেই বিপর্যয়কর সামরিক অভ্যুত্থানের ৫০তম বার্ষিকী, যা লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে নৃশংস স্বৈরশাসনের সূচনা করেছিল।

১৯৭৩ সালের এই দিনে জেনারেল অগাস্তো পিনোশের নেতৃত্বে এক সামরিক জান্তা প্রেসিডেন্ট সালভাদর আইয়েন্দের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করেন। এরপর পিনোশের ১৭ বছরের স্বৈরশাসনে ৪০ হাজার মানুষ নির্যাতনের শিকার হয়। হত্যা করা হয় ৩ হাজারের বেশি মানুষকে এবং ১ হাজারের বেশি মানুষ ‘গুম’ হয়। দেশত্যাগে বাধ্য হয় হাজার হাজার মানুষ।

যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের প্রশাসন চিলিতে এই সামরিক অভ্যুত্থানকে উৎসাহিত ও সমর্থন করেছিল, যা এসব নৃশংসতার পথকে প্রশস্ত করে।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো ১৮২৩ সালের ডিসেম্বরে কার্যকরভাবে পশ্চিম গোলার্ধের (যুক্তরাষ্ট্রের আশপাশের দেশ) জন্য একটি সুরক্ষা নীতি ঘোষণা করেছিলেন, যা মনরো মতবাদ নামে পরিচিত। এই নীতির সুযোগ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রায়ই তার নিজ স্বার্থে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে হস্তক্ষেপ করে। কিন্তু সব সময় নিজে থাকে সুরক্ষার মোড়কে।

চিলিতে ১৯৭৩ সালের অভ্যুত্থান ছিল সে রকমই একটি হস্তক্ষেপ।

সরকারি নথি ও টেলিফোন কল ট্রান্সক্রিপ্ট যেগুলোকে শ্রেণিবদ্ধ এবং অনেক বছর ধরে প্রকাশ করা হয়েছিল। ১৯৭০ সালের ৮ সেপ্টেম্বর চিলির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আইয়েন্দে খুব অল্প ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেন। এর পর থেকে ওয়াশিংটন কীভাবে তাঁর পতন নিশ্চিত করতে কাজ করেছিল তার একটি পরিষ্কার চিত্র এসব নথি ও টেলিফোন কল ট্রান্সক্রিপ্টে ফুটে ওঠে। 

তৎকালীন সিআইএ পরিচালক রিচার্ড হেলমসের হাতে লেখা নোট অনুসারে, আইয়েন্দের বিজয়ের মাত্র এক সপ্তাহ পর, ১৯৭০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন তাঁকে ‘ইকোনমি স্ক্রিম’ (অর্থনীতি পঙ্গু হওয়ার অপপ্রচার চালানোর) নির্দেশ দিয়েছিলেন, যাতে ‘আইয়েন্দেকে ক্ষমতায় আসতে বাধা দেওয়া যায় বা বিরত রাখা যায়।’ এর তিন দিন আগে, হেলমসের কাছে একটি ফোন কল আসে, যা তিনি রেকর্ড করেছিলেন। নিক্সনের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার ওই ফোনটি করেছিলেন। তিনি ইতিমধ্যেই আইয়েন্দেকে ক্ষমতাচ্যুত করার মার্কিন প্রশাসনের অভিপ্রায় নিশ্চিত করেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা চিলিকে নালায় ভেসে যেতে দেব না।’

১৯৭৩ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর, পিনোশের রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের মাত্র ছয় দিন পরে, নিক্সন তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাকে ফোন করে জানতে চেয়েছিলেন যে এই অভ্যুত্থানে মার্কিন ‘হাত’ দেখাবে কি না। শ্রেণিবদ্ধ কল ট্রান্সক্রিপ্ট অনুসারে, কিসিঞ্জার স্বীকার করেছেন, ‘আমরা তাদের সাহায্য করেছি’ এবং ‘(মুছে দেওয়া রেফারেন্স) যা বিরাট এক সম্ভাবনার সুযোগ তৈরি করেছে।’

যুক্তরাষ্ট্র গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নেতার বিরুদ্ধে সফলভাবে একটি অভ্যুত্থান ঘটানোর পরও চিলির বিষয়ে তার বিধ্বংসী হস্তক্ষেপ 
বন্ধ করেনি।

পিনোশের স্বৈরশাসনের তিন বছর পার হওয়ার পর, ১৯৭৬ সালের জুন মাসে কিসিঞ্জার তাঁর প্রতি ওয়াশিংটনের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করতে ব্যক্তিগতভাবে চিলির রাজধানী সান্তিয়াগোতে যান। তাঁদের কথোপকথনের একটি ট্রান্সক্রিপ্ট অনুসারে, কিসিঞ্জার পিনোশেকে কীভাবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর ভাবমূর্তি উন্নত করা যায়, সে বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছিলেন। পিনোশের শাসনের মানবাধিকার রেকর্ডের সব সমালোচনা ‘বামপন্থীদের অপপ্রচার’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিসিঞ্জার পিনোশেকে বলেছিলেন, ‘আপনি এখানে যা করার চেষ্টা করছেন তার প্রতি আমরা সহানুভূতিশীল।’ অথচ পিনোশে তত দিনে তাঁর শাসনের হাজার হাজার নিন্দাকারীকে হত্যা ও গুম করেছিলেন। কিসিঞ্জার বলেছিলেন, ‘আমরা আপনাকে সাহায্য করতে চাই, আপনাকে দুর্বল করতে নয়।’ কিসিঞ্জার আরও বলেছিলেন, ‘আপনি আইয়েন্দেকে উৎখাত করে পশ্চিমের জন্য একটি দুর্দান্ত কাজ করেছেন।’ 

চিলিতে আইয়েন্দের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান সম্ভবত লাতিন আমেরিকায় সবচেয়ে বিধ্বংসী মার্কিন হস্তক্ষেপ ছিল। তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম বা শেষ হস্তক্ষেপ ছিল না।

যুক্তরাষ্ট্র চিলিতে আইয়েন্দে সরকারকে অস্থিতিশীল করার জন্য কাজ শুরু করার আগেই ওয়াশিংটন ১৯৫৪ সালে গুয়াতেমালায় গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত আরবেনজ সরকারকে উৎখাত করার জন্য একটি অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করে। ১৯৫৬ সালে ২৪ হাজার সৈন্য নিয়ে ডোমিনিকান রিপাবলিক আক্রমণ করে। কিউবার নেতা ফিদেল কাস্ত্রোকে হত্যা করার জন্য অসংখ্যবার চেষ্টা চালায়। ফলে আইয়েন্দে একমাত্র নন।

মার্কিন-বান্ধব পিনোশে সরকারকে সফলভাবে চিলিতে ক্ষমতায় বসানোর পর, যুক্তরাষ্ট্র নিকারাগুয়ার সান্দিনিস্তা সরকারকে উৎখাত করার জন্য একটি ছায়া যুদ্ধ শুরু করে। এর জন্য প্রক্সি আর্মি হিসেবে প্রায় ছয় হাজার ‘কন্ট্রাস’কে (যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত ডানপন্থী বিদ্রোহী গোষ্ঠী) আর্থিক সাহায্য করা হয়। ওই অঞ্চলের অনেক স্বৈরশাসককে আমেরিকার স্কুলে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পানামার শাসককে হটাতে ২৪ হাজার সৈন্য নিয়ে ঢুকে পড়তে দ্বিধা করেনি যুক্তরাষ্ট্র।

দুঃখজনকভাবে, ‘বাড়ির পেছনের উঠোন’ নিয়ন্ত্রণের জন্য ধ্বংসাত্মক মার্কিন প্রচেষ্টা আজও অব্যাহত রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, ওয়াশিংটন এখনো লাতিন আমেরিকার জনগণকে অপরিমেয় কষ্ট দিচ্ছে। এটা নিশ্চিত হওয়ার জন্য দিচ্ছে যে তারা এমনভাবে শাসিত হবে, যাতে তারা মার্কিন স্বার্থকে চ্যালেঞ্জ করতে না পারে। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্র এখনো কিউবাকে সন্ত্রাসবাদে সমর্থনকারী দেশের তালিকায় রাখে এই আশায় যে, এর ফলে অর্থনৈতিক মন্দা একটি অভ্যুত্থান ঘটাবে।

যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার শতকোটি ডলার আটকে দিয়েছে। নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে ফেলে দেশটির অর্থনীতিকে পঙ্গু করে ফেলছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন শয়তান ত্রয়ী বলে কিউবা, ভেনেজুয়েলা ও নিকারাগুয়ার নিন্দা করেছিলেন। কিন্তু গুয়াতেমালা, ইকুয়েডর, কলম্বিয়া, হন্ডুরাসের দুর্নীতিবাজ শাসকদের নিয়ে এল সালভাদর রা করেননি।

এটি এখন জনপ্রিয় এবং সহজ—অভ্যুত্থানের নিন্দা করা যা আইয়েন্দেকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল এবং পিনোশের অনেক মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং নৃশংসতার পথ প্রশস্ত করেছিল। নিঃসন্দেহে এর ৫০তম বার্ষিকীতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক ভূমিকার কিছু উল্লেখ থাকবে। 
কিন্তু গত ৫০ বছরে ‘বাড়ির পেছনের উঠোন’ সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গির কেন পরিবর্তন হয়নি তা নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা নেই।

পিনোশেকে চিলির ক্ষমতায় বসতে সাহায্য করার পর, ওয়াশিংটন মনরো মতবাদের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখে, যার অর্থ এই যে যুক্তরাষ্ট্র যখনই প্রয়োজন অনুভব করবে, তখন পশ্চিম গোলার্ধের দেশগুলোর বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে।

বারাক ওবামা হলেন প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যিনি প্রকাশ্যে এই নীতি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তাঁর পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি, ২০১৩ সালের নভেম্বরে অর্গানাইজেশন অব আমেরিকান স্টেটসে ঘোষণা করেছিলেন, ‘মনরো মতবাদের যুগ শেষ।’ কিন্তু মাত্র পাঁচ বছর পর এবং কিউবা, ভেনেজুয়েলা ও অন্য অনেকের প্রতি মার্কিন নীতিতে কোনো বড় পরিবর্তন হয়নি; বরং ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা বোল্টন মায়ামিতে এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন যে মনরো মতবাদ আবার ‘জীবিত হয়েছে এবং ভালো অবস্থায় আছে।’ 

প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, যিনি ওবামার ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে লাতিন আমেরিকার রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার ব্যাপারে গভীর আগ্রহ দেখিয়েছিলেন, মনে হচ্ছে তিনি মনরো মতবাদকে আবার কবর দিয়েছেন—এটাই আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে। 

তা সত্ত্বেও, যেহেতু আমরা চিলির ৫০ বছর আগের মর্মান্তিক ঘটনার কথা এবং ‘বাড়ির পেছনের উঠোন’ রক্ষার নামে অন্য অনেক মার্কিন হস্তক্ষেপের গুরুতর মানবিক পরিণতির কথা স্মরণ করি, আমাদের সচেতন হওয়া উচিত যে এখনো ওয়াশিংটনে মনরো মতবাদের অগণিত সমর্থক রয়েছেন। 

আইয়েন্দের পতনের ঠিক ৫০ বছর এবং মনরো মতবাদের ২০০ বছর পরও লাতিন আমেরিকায় মার্কিন হস্তক্ষেপের হুমকি ক্রমেই প্রবল আকার ধারণ করছে।

জন কার্ক
ইমেরিটাস অধ্যাপক, লাতিন আমেরিকান স্টাডিজ, ডালহৌসি ইউনিভার্সিটি, কানাডা

স্টিভেন কিম্বার 
অধ্যাপক, সাংবাদিকতা, ইউনিভার্সিটি অব কিংস কলেজ, কানাডা 

(আল জাজিরায় প্রকাশিত লেখাটি ইংরেজি থেকে অনূদিত ও ঈষৎ সংক্ষেপিত)

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
 
    সব মন্তব্য

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    পঠিতসর্বশেষ

    এলাকার খবর

     

    সংকট নেই, তবু বাড়ল সবজি, মাছের দাম

    সাক্ষাৎকার

    আমাদের আরও অনেক কিছু দেওয়ার আছে: টিপু

    সিনেমা: তুফানের আন্তর্জাতিক মুক্তি ২৮ জুন

    শিল্পকলায় নবরসের নাটক ‘উনপুরুষ’

    ভারতের সঙ্গে চুক্তির আগে দেশের নিরাপত্তার কথা ভাবতে হবে

    ধূসর রুক্ষ মহানগরীতে বিপন্ন নাগরিক জীবন

    অস্ট্রেলিয়া-ধাক্কার পরই বাংলাদেশের ভারত-পরীক্ষা

    যুক্তরাষ্ট্রকে উড়িয়ে দিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ, দুশ্চিন্তা বাড়ল ইংল্যান্ড-দক্ষিণ আফ্রিকারও