Alexa
বৃহস্পতিবার, ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩

সেকশন

epaper
 

কক্সবাজারের বাঁকখালী দখলে মেয়রও

আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০২৩, ১০:৩১

খাসজমি নিজেদের দাবি করে সাইনবোর্ড বসিয়েছে কক্সবাজার পৌরসভা। বাঁকখালী নদীর মোহনার কাছে। ছবি: আজকের পত্রিকা রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, আইনজীবী থেকে শুরু করে খোদ পৌরসভা কর্তৃপক্ষ দখল করে নিচ্ছে নদীতীরের জমি। কক্সবাজারের বাঁকখালী নদীর মোহনায় প্রায় ৬০০ হেক্টর জায়গা দখলে নিয়ে ভরাট করে ফেলা হয়েছে। কয়েক মাস আগেও যেখানে ছিল ম্যানগ্রোভ বা প্যারাবন, পাখপাখালির কিচিরমিচির; সেখানে এখন স্থাপনার পর স্থাপনা। প্রাকৃতিক দুর্যোগে উপকূল রক্ষায় প্রহরী হিসেবে ভূমিকা রাখা সব গাছ কেটে স্থাপনা গড়ে রুদ্ধ করা হয়েছে নদীর প্রবাহ। নদীতীরের জমি দখলে নেওয়ার এমন দৃশ্য দেখা গেছে শহরের কস্তুরাঘাট এলাকা ঘুরে। ভরদুপুরেও চলছিল বালু তোলা এবং ভবন নির্মাণের কাজ।

এক পাশে নদীর জায়গা ভরাট করে স্থাপনা বানানোর তৎপরতার মধ্যেই আরেক পাশে দেখা যায় ‘এই জমির মালিক কক্সবাজার পৌরসভা’ লেখা সাইনবোর্ড। শহরের অংশে বাঁকখালী সেতুর দুই পাশে প্রায় ৩০০ একর প্যারাবান দখলের সব আয়োজন পাকা।

কয়েকজন বাসিন্দা জানান, ২০১৩ সাল থেকে বাঁকখালীর পাড়ে পৌরসভার বর্জ্য ফেলা শুরু হয়। ক্রমান্বয়ে ভাগাড়টিই দখলের চাবিকাঠি হয়ে ওঠে। দখলদারেরা খুব প্রভাবশালী হওয়ায় প্রকাশ্যে কেউ কিছু বলতে রাজি হননি। তবে সবারই অভিযোগ, পৌরসভার বর্জ্য ফেলার মাধ্যমেই শুরু দখল প্রক্রিয়ার। ২০১৮ সালে মুজিবুর রহমান মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর বেগবান হয় বন উজাড় করে নদীতীরের জায়গা দখল করার কার্যক্রম। প্রতিদিন শহরের প্রায় ১৫০ টন বর্জ্য সংগ্রহ করে বিভিন্ন মাধ্যমে কস্তুরাঘাটে নদীর জায়গায় ফেলা হয়। এতে সেখানে বর্জ্যের পাহাড় জমেছে।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ২০১৪ সালে তৈরি নদী দখলদারের তালিকায় মুজিবুর রহমানের নাম প্রথম উঠে আসে। স্থানীয় বাসিন্দা ও বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা যায়, নতুন বাহারছড়া এলাকায় বাঁকখালীর পাড় দখল করে বেশ কিছু ছোট ঘর ও একটি ওয়্যারহাউস বানিয়ে ভাড়া দিয়েছেন মুজিবুর।

নদীর তীরবর্তী জমিতে ঘর বানিয়ে ভাড়া দেওয়া এবং পৌরসভার সাইনবোর্ড লাগানোর বিষয়ে জানতে গতকাল বুধবার ফোন করে পরিচয় দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মেয়র মুজিবুর রহমান সংযোগ কেটে দেন। পরে আর সংযোগ পাওয়া যায়নি। তাঁর ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা যায়, ফোন করার সময় মেয়র বিমানবন্দের ছিলেন। বিদেশে চলে যাওয়ায় তাঁর সঙ্গে আর কথা বলা সম্ভব হয়নি। কক্সবাজার পৌরসভার সদ্য বিদায়ী প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ কে এম তারিকুল আলম বলেন, তাঁরা নদী বা নদীর জায়গায় বর্জ্য ফেলেন না। পৌরসভার নিজস্ব এবং খাস জায়গায় বর্জ্য ফেলা হয়। তবে সাইনবোর্ড লাগানো জায়গাটি পৌরসভার কীভাবে হলো, সে বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি। 

সাইনবোর্ড লাগানো জমি পৌরসভার নয় 
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আমিন আল পারভেজ আজকের পত্রিকাকে বলেন, বাঁকখালী নদীর কস্তুরাঘাট এলাকায় যে জায়গায় কক্সবাজার পৌরসভা সাইনবোর্ড লাগিয়েছে, সে জায়গাটা জেলা প্রশাসনের ১ নম্বর খাস খতিয়ানের। তাই এটা কোনোভাবেই পৌরসভার জমি নয়।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান মঙ্গলবার বাঁকখালী পরিদর্শনে যান। পরিদর্শন শেষে তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘একই জমি জেলা প্রশাসন বলছে তাদের, আবার পৌরসভা তাদের বলে নোটিশ টাঙায়। কী হাস্যকর বিষয়টা! কৌশলে পৌরসভা এই নদীর জায়গাই বেছে নিয়েছে ময়লা ফেলার জন্য। নদী দখল করার দুরভিসন্ধি থেকেই তারা এখানে আগে থেকে কাজ শুরু করেছিল, তা প্রমাণ হয়ে গেছে।’ 

মাস চারেক আগেও এখানে ছিল ঘন প্যারাবন। গাছ কেটে, নদীর জায়গা দখল করে সেখানে তৈরি করা হয়েছে প্লট। চলছে স্থাপনা নির্মাণ। ছবি: আজকের পত্রিকা দখলে মেয়র, নেতা, আইনজীবী, ব্যবসায়ীদের নাম 
জানা যায়, দখলকাজে জড়িত জেলা আওয়ামী লীগের কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতা, স্থানীয় কয়েকজন হোটেল ব্যবসায়ী, আইনজীবী এবং জেলা পরিষদের প্রতিনিধি। ২০২০ সালে বিআইডব্লিউটিএ ১৩০ জন দখলদারের নতুন যে তালিকা করে, তাতেও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পৌর মেয়র মুজিবুর রহমান, জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মাশেদুল হক রাশেদের নাম আছে।

স্থানীয় কয়েকজন জানান, প্রভাবশালী অনেক ব্যক্তি কস্তুরাঘাটে বাঁকখালীর তীর দখল করে প্লট বানিয়ে বিক্রি করেছেন। কিন্তু তাঁরা নিজেদের নামে কোনো সাইনবোর্ড লাগাননি কিংবা অন্য কোনোভাবে নাম ব্যবহার করেননি। তাঁদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কেউ কোনো মন্তব্যও করেন না। পরিবেশ অধিদপ্তরও তাঁদের নামে অভিযোগ করে না।

কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. হাফিজুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমাদের ক্ষমতা কতটুকু, সেটাও দেখতে হবে। অভিযান চালাতে গেলে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করতে হয়। নিজেদের বিচারিক ক্ষমতা নেই, অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে কাজ করতে হয়।’ 

শত দখলদারের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার ১ 
সরকারি নথি ও স্থানীয় সূত্রমতে, প্রায় ৬৭ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁকখালী নদীর একসময় প্রশস্ততা ছিল ১২০ মিটার। কিন্তু দখলের কারণে প্রশস্ততা কমে কক্সবাজার শহরের কোথাও ৫০ মিটার, কোথাও ৬০-৭০ মিটার হয়ে গেছে। 
এই কাজে জড়িত প্রায় ১০০ দখলদারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে তিনটি মামলাও করে পরিবেশ অধিদপ্তর। আসামিদের মধ্যে মাত্র একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। বাকি সবাই ধরাছোঁয়ার বাইরে।

জানা যায়, ২০২১ সালের ৩ ডিসেম্বর, ২০২২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি এবং একই বছরের ১৫ জুন তিন দফায় ৪৪ জনের নাম উল্লেখ করে আরও প্রায় অর্ধশত বেনামি আসামির বিরুদ্ধে তিনটি মামলা করা হয়। বাঁকখালীর তীর দখল করে স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগে পরিবেশ অধিদপ্তরের করা শেষ মামলায় আসামি হিসেবে নাম আছে জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মারুফ আদনান ও সাবেক সভাপতি ইশতিয়াক আহমেদ জয়ের। মামলায় বলা হয়, সংঘবদ্ধ একটি চক্র পাঁচ মাস ধরে বাঁকখালী নদীর প্যারাবন কেটে জায়গা দখল করে বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করেছে। এতে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে।

কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. হাফিজুর রহমান বলেন, ‘তিনজন অফিসার নিয়ে জেলা চলে। তবু আমরা এখন পর্যন্ত ২৮১টি মামলা করেছি। কোটি টাকার বেশি জরিমানা করেছি।’ 

উপকূল রক্ষার প্রহরী উজাড়
বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির পাহাড় থেকে সৃষ্ট বাঁকখালী নদী রামুর ওপর দিয়ে কক্সবাজার শহরের উত্তর পাশ হয়ে আঁকাবাঁকা পথে মিশেছে বঙ্গোপসাগরের মহেশখালী চ্যানেলে। সেই নদীর তীরে এক দশক আগে গড়ে তোলা হয়েছিল প্যারাবন। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের মতো সামুদ্রিক দুর্যোগ থেকে উপকূলকে বাঁচাতে এ বনাঞ্চল প্রহরীর ভূমিকায় ছিল। প্যারাবন উজাড় করার পর খননযন্ত্র দিয়ে নদী থেকে মাটি তুলে রাতারাতি জলাশয় ভরাট করে বানানো হয়েছে ঘরবাড়ি। মঙ্গলবার এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ভরাট করা জমিতে টিনের ঘের দিয়ে প্লট আলাদা করা। তীরের জমি দখল করে স্থাপনা গড়ায় নদীর গতিপথ সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মী জানান, প্যারাবনের অন্তত ৪০ হাজার বাইন ও কেওড়াগাছ উজাড় হওয়ায় ২০০ প্রজাতির পাখির আবাসস্থলসহ জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়েছে। গত দুই-তিন মাসেই অন্তত আড়াই শ একর প্যারাবন উজাড় করা হয়েছে। অথচ কক্সবাজার মডেল থানা থেকে কস্তুরাঘাটের দূরত্ব মাত্র কয়েক শ গজ।

পরিবেশবিষয়ক সংগঠন এনভায়রনমেন্ট পিপলের প্রধান নির্বাহী রাশেদুল মজিদ বলেন, ‘খুরুশকুলের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের জন্য কস্তুরাঘাটে নদীর ওপর বানানো হচ্ছে বাঁকখালী সেতু। খুরুশকুল ও বৃহত্তর ঈদগাহ অঞ্চলের সঙ্গে শহরের বিকল্প সড়ক যোগাযোগ তৈরির সেতুটিই যেন বাঁকখালী নদীর জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ জাকারিয়া আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘এসব অবৈধ দখল যেকোনোভাবে উচ্ছেদ করা হবে। তবে উচ্ছেদ নিয়ে কিছু আইনি জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। নানা কারণে কিছু জমি খতিয়ানভুক্ত হওয়ায় এই জটিলতা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রশাসক, নদী রক্ষা কমিশনসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা হচ্ছে। আইনি জটিলতা বিবেচনা করে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ 

প্রকাশ্যে নদী হত্যায় কী বিচার
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘দখলের দৃশ্যটি অত্যন্ত বিস্ময়কর মনে হচ্ছে। বিশাল প্যারাবন নিধন করে ফেলা হয়েছে। এখানে যে ঘরবাড়ি তৈরি হচ্ছে, সেখানে জোয়ারের পানি দেখা যাচ্ছে, নিধন করা প্যারাবনের গাছও দেখা যাচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রকাশ্যে এ নদী হত্যায় আদালতের যে রায় আছে, তার আলোকে কী বিচার হচ্ছে, এটা দেখতে হবে। সরকার কেন মনে করছে এ রায় মানতে হবে না?’

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
 
    সব মন্তব্য

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    এলাকার খবর

     
     

    মেলায় আছেন হ‌ুমায়ূনও

    ফারসি ভাষা শিখল কারা

    মাউশির প্রকল্প: কাজ শুরুর আগেই গচ্চা ১১৬ কোটি

    উদ্যোগ ব্যক্তির, সুফল সবার

    কান্না থামেনি সেই মায়ের

    বালু তোলায় তীরে ভাঙন নদীতে যাচ্ছে ফসলি জমি

    ডলার সংকট না কাটলে ফল আমদানি নয়

    আরও তেল ও ডাল কিনছে সরকার

    ভূমিকম্পে তুরস্ক-সিরিয়ায় মৃতের সংখ্যা ১৫ হাজার ছাড়িয়েছে

    নোয়াখালীতে ট্রলি-মোটরসাইকেল সংঘর্ষে নিহত ২

    সিএনজি চালিয়ে হাতে ফোসকা পড়েছে শ্যামল মাওলার