Alexa
রোববার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৩

সেকশন

epaper
 

পাঠ্যপুস্তকে ভুল: সমালোচনা না ব্যক্তিবিদ্বেষ?

আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০২৩, ১৫:০০

সপ্তম শ্রেণির বিজ্ঞান বইটি সম্পাদনা করেছেন ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল ও অধ্যাপক ড. হাসিনা খান। ছবি: সংগৃহীত মজার ব্যাপার হচ্ছে, চৌর্যবৃত্তির কাজটি যিনি করেছেন, তাঁর কিন্তু কোনো দোষ নেই। তিনি কে, সেই প্রশ্নটিও আমরা করছি না। তাঁকে আমরা কেউ কি চিনি? জাফর ইকবালরা কিন্তু তাঁকে ঠিকই চেনেন। জনসমক্ষে তাঁর নাম বলেন না।

বিষয়টি গণমাধ্যমে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বর্গীয় ‘জ’ লিখতেও হাত কাঁপছে। ভয় থাকছে একটি বিশেষ গোষ্ঠীর আক্রোশের, আক্রমণের শিকার হওয়ার। এ এক বিচিত্র দেশ! বিচিত্র আমাদের মনোজগৎ! অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা তো দূরের কথা, প্রকৃত সত্যটি কী, তা খতিয়ে দেখারও প্রয়োজন মনে করি না আমরা।

কিছু একটা ঘটলে বা কোনো একটা সুযোগ পেলে সবকিছু ‘গেল’ ‘গেল’ বলে হইহই করে উঠি। ব্যাপারটি যে শুধু অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিতরা করে থাকেন, এমনটি নয়।

আমরা যাঁরা তথাকথিত শিক্ষিত আছি, তাঁরা যেন আরও বেশি সরব হই, চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধারে লেগে পড়ি। দুই-তিন দিন আগে একজন উচ্চশিক্ষিত মানুষ আমার গতি রোধ করে বললেন, ‘আপনার স্যার তো দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে একেবারে বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে এবং সঙ্গে তার সংগ্রহে যতগুলো কু-বিশেষণ আছে, সেই সব একসঙ্গে উগরে দিয়েছে।’

আমি বললাম, ‘দেখেন, শিক্ষাব্যবস্থা কোনো ব্যক্তিবিশেষ নির্ধারণ করেন না। এটি একটি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত। রাষ্ট্র এ সিদ্ধান্তটি নিয়ে থাকে দেশসেরা শিক্ষাবিদদের পরামর্শে।

এমনকি একটি পাঠ্যবই রচনার ক্ষেত্রেও রাষ্ট্র বেশ কয়েকজন শিক্ষাবিদকে এই দায়িত্বটুকু দিয়ে থাকে। সে ক্ষেত্রে ভুল হওয়াটা কাঙ্ক্ষিত না হলেও তা হয়ে যায়, অতীতেও হয়েছে। আর এ কারণেই সংশোধনের সুযোগও রাখা হয়।’

প্রশ্ন হচ্ছে, একটি পাঠ্যবইয়ের ভুলের জন্য গোটা শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়ে কি না, কিংবা রাষ্ট্রের এমন কোনো ক্ষতি হয় কি না, যা অপূরণীয়! গত ২০ বছরে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা তো আর কম হয়নি; যা হয়েছে, তা কি কোনো একক ব্যক্তির সিদ্ধান্তে?

আমরা সবাই জানি যে এ বছর আমরা একটি নতুন শিক্ষাক্রমের দিকে যাচ্ছি এবং সেই উদ্দেশ্যে অনেকটা তাড়াহুড়ো করে পাঠ্যবইগুলো তৈরি করতে হয়েছে। সব সময় বলা হয়েছে, ২০২৩ সালটি হবে পরীক্ষামূলক বছর। ফলে সারা বছর শিক্ষার্থী-শিক্ষক-অভিভাবক-শিক্ষাবিদ-সাংবাদিকসহ সচেতন মহলের পরামর্শ নেওয়া হবে। কারণ, এই প্রথম দেশে শিক্ষার পদ্ধতিতে গুণগত মৌলিক পরিবর্তন আনার একটি চেষ্টা চলছে।

কাজেই লেখক থেকে শিক্ষক, সম্পাদক থেকে শিক্ষার্থী—সবার জন্যই কাজটি নতুন। তার ওপর পদ্ধতিটি বুঝে সে অনুযায়ী পাঠ্যবই প্রণয়নও যথেষ্ট কষ্টসাধ্য। ফলে রচয়িতাদের সবাই একমত যে প্রতিটি বইয়ের আরও উন্নয়ন সম্ভব বা প্রয়োজন এবং এই লক্ষ্যে এর পরিমার্জন চালিয়ে যেতে হবে অন্তত আরও কয়েক বছর। উন্নত বিশ্বেও এ পদ্ধতি শতভাগ সফলভাবে প্রবর্তনে যথেষ্ট সময় লেগেছে। তবে যে বিষয়টির সমালোচনা হতে পারত সেটি হচ্ছে, নতুন একটি পদ্ধতিতে যাওয়ার আগে আমরা যথেষ্ট ভাবনাচিন্তা করি কি না।

অভিযোগ উঠেছে, নতুন শিক্ষাক্রমের আলোকে লেখা সপ্তম শ্রেণির বিজ্ঞান ‘অনুসন্ধানী পাঠ’ বইয়ের একটি অংশ ইন্টারনেট থেকে হুবহু কপি পেস্ট করা। বইয়ের একটি অধ্যায়ের বিতর্কিত ওই অংশ ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক এডুকেশনাল সাইট থেকে নিয়ে হুবহু অনুবাদ করে ব্যবহার করা হয়েছে। এই যে পাঠ্যবই প্রণয়নের অসংগতিটুকুর জন্য এতটা শোরগোল পড়ে গেল, সেটি সবদিক বিবেচনায় কি ঠিক আছে? কেউ কেউ চুরি বা চৌর্যবৃত্তি বলে পাবলিক প্লেসে গলা ফাটাচ্ছেন, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কুৎসা রটাচ্ছেন, কোনো কোনো গণমাধ্যমে এ-সম্পর্কিত খবর, মতামত, প্রশ্নোত্তর বা টক শোতে আলোচনার পাশাপাশি ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও ড. হাসিনা খানের ছবি বিকৃতভাবে উপস্থাপন করছে। এমন সব কাণ্ড সাংবাদিকতার নীতিতে কতটা উত্তীর্ণ?

এ দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য, এই রাষ্ট্রের জন্য, এই দুজন গুণী মানুষ কী পরিমাণ অবদান রেখেছেন, তা কি আমরা জানি না? এই একটি ভুলের জন্য আমরা তাঁদের সব কৃতি বেমালুম ভুলে গেলাম? নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীদের কারখানা ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি ও বেল কমিউনিকেশনস রিসার্চ ছেড়ে দেশের প্রথম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শাবিপ্রবিতে যোগদান করে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে অন্যতম একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বানাতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। দেশের আইটি সেক্টর, টেলিকমিউনিকেশনসহ অনেক সেবামূলক প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট মানদণ্ডে উন্নীত করতে বিনা পারিশ্রমিকে সরকারকে সহযোগিতা করেছেন। বিজ্ঞান শিক্ষাকে জনপ্রিয় করতে, শিক্ষার্থীদের গণিতভীতি দূর করতে প্রয়াত ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী, মুনির হাসান, ড. কায়কোবাদ স্যারকে সঙ্গে নিয়ে সারা দেশ চষে বেড়িয়েছেন। আজ যে আইএমওতে আমাদের শিক্ষার্থীরা স্বর্ণপদকসহ প্রতিবছর বিভিন্ন পদক লাভ করছেন, শত শত শিক্ষার্থী অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, হার্ভার্ডসহ বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন—সে তো উল্লিখিত গুণীদেরই প্রচেষ্টার ফল। ফিজিকস অলিম্পিয়াড, ইনফরমেটিকস অলিম্পিয়াড, প্রোগ্রামিংসহ আরও অনেক আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ এসবেরই ধারাবাহিকতা। পাট ও ইলিশের জিনোম সিকোয়েন্স নিয়ে গবেষণার সাফল্যে ড. হাসিনা খান জাতির জন্য গৌরব বয়ে এনেছেন। এই অবদানের জন্য রাষ্ট্র তাঁকে সর্বোচ্চ পদক স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করেছে।

যে দুজন সম্মানিত শিক্ষককে নিয়ে আজ আমরা বিদ্বেষ ছড়িয়ে ঠাট্টা-তামাশা করছি, তাঁদের কেউ কিন্তু আলোচিত অংশটুকু লেখেননি। তাঁরা ছিলেন সংশ্লিষ্ট বইটির পাণ্ডুলিপি সম্পাদক। বইয়ের লেখকদের মধ্যে কেউ ওই তথ্য ওয়েবসাইট থেকে সরাসরি গ্রহণ করে বইয়ে জুড়ে দিয়েছেন। নৈতিকভাবে এ কাজ সমর্থনযোগ্য নয়। নয় আইনগতভাবেও। সাধারণত এসব ক্ষেত্রে দেখা যায়, সম্পাদকেরা নিজেদের গা বাঁচান এবং সবাই মিলে কোনো অদৃশ্য দায়ী ব্যক্তিকে দোষারোপ করতে থাকেন। কিন্তু এই দুজন বিজ্ঞানী যথার্থ শিক্ষকের মতোই সম্পাদক হিসেবে এর নৈতিক দায় গ্রহণ করেছেন। তাঁরা এটি কেবল সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানিয়ে ক্ষান্ত হননি, জনসমক্ষে বিবৃতি প্রকাশ করে দায় স্বীকার করেছেন।

আচ্ছা, যে অংশটুকুর জন্য পুরো শিক্ষাব্যবস্থা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলে আমরা বিদ্রূপ করছি, সেগুলো যদি এতই অশিক্ষাসুলভ হয়ে থাকে তাহলে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ডট ওআরজির মতো ওয়েবসাইটে জায়গা পেল কী করে? আসলে প্রশ্ন সেটিও না। আসল কথা, ব্যক্তিগত বিদ্বেষের একটি সুযোগ পাওয়া। এই বিদ্বেষ কেন, তা-ও কারও অজানা নয়। কারও লেখা কপি করতে হলে তার অনুমতি লাগে, যা নির্দিষ্ট লেখক করেননি, শুধু এটুকুই। আর এতেই তাঁরা চৌর্যবৃত্তির অভিযোগে যা-তা বলছেন।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, চৌর্যবৃত্তির কাজটি যিনি করেছেন, তাঁর কিন্তু কোনো দোষ নেই। তিনি কে, সেই প্রশ্নটিও আমরা করছি না। তাঁকে আমরা কেউ কি চিনি? জাফর ইকবালরা কিন্তু তাঁকে ঠিকই চেনেন। জনসমক্ষে তাঁর নাম বলেন না। বলেন, ‘আমাদের মধ্যে কোনো একজন এই ভুলটুকু করে ফেলেছেন। টিম হিসেবে এই দায় আমার বা আমাদের।’ কিছু কী বুঝতে পারেন? এটিই নৈতিকতা, এটিই ভব্যতা। এ জন্যই তাঁরা জাফর ইকবাল।

লেখক: মাসুদ উর রহমান, কলেজশিক্ষক ও সংস্কৃতিকর্মী

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
 
    সব মন্তব্য

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    এলাকার খবর

     
     

    ক্ষমা করার সুফল পাবে তো আওয়ামী লীগ?

    এমন ঐক্য যদি সব ক্ষেত্রে হতো!

    সুচিত্রা সেনের মঞ্চনাটক

    দায়িত্বজ্ঞানহীনতা

    ভোটের মাঠে

    নৌকার দুর্গে নীরব বিএনপি

    জমে উঠেছে সাকিব-মাশরাফি-ইমরুলের প্রতিযোগিতা

    চট্টগ্রামে আসবাব মেলা শুরু ১ ফেব্রুয়ারি

    নির্জন স্থানে ডেকে নিয়ে মুক্তিপন আদায় করতেন তাঁরা

    হবিগঞ্জে অর্থ আত্মসাৎ মামলায় আরও ৩ জন কারাগারে

    নেত্রকোনায় ময়লার ভাগাড়ে যুবকের গলা কাটা লাশ

    শেখ হাসিনার কাছ থেকেই রাজনীতি শিখতে হবে: এসএম কামাল

    সাভারে চাকরি দেওয়ার কথা বলে ডেকে নিয়ে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার ৪