Alexa
বৃহস্পতিবার, ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩

সেকশন

epaper
 

পেনশনের ৩০ লাখ দিলেন ভাই-বোনদের, শেষকৃত্যে পেলেন শুধু প্রতিবেশী

আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০২৩, ১৮:২১

আজ মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে দূরসম্পর্কের আত্মীয়দের কাছে শিক্ষিকার মরদেহ হস্তান্তর করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ছবি: আজকের পত্রিকা বিয়ে করেননি। সারা জীবন একা কাটিয়েছেন শিক্ষিকা উর্মিলা ভট্টাচার্য। অবসরের পর পেনশনের প্রায় ৩০ লাখ টাকা তুলে দিয়েছিলেন ভাই-বোনদের হাতে। আশা করেছিলেন, জীবনের শেষ সময়টা ভাই-বোনেরা তাঁকে দেখে রাখবেন। কিন্তু হাসপাতালে মৃত্যুশয্যায় তাঁদের কাউকে পেলেন না। শেষকৃত্যে রইলেন শুধু দূরসম্পর্কের আত্মীয় আর প্রতিবেশীরা।

বলছি উপজেলার ছনহরা ইউনিয়নের মটপাড়া এলাকার মৃত বিশ্বেশ্বর ভট্টাচার্যের মেয়ে উর্মিলা ভট্টাচার্যের কথা। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর গতকাল সোমবার পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মারা যান উর্মিলা ভট্টাচার্য। 

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিশ্বেশ্বর ভট্টাচার্যের ২ ছেলে, ৯ মেয়ের মধ্যে উর্মিলা ভট্টাচার্য ছিলেন পরিবারের ৬ নম্বর মেয়ে। ছিলেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষিকা। পরিবার থেকে অনেকবার চাপ দেওয়ার পরও বিয়ে করেননি তিনি। ২০১৪ সালের দিকে চাকরি থেকে অবসরে যান তিনি। সবশেষ শিক্ষকতা করেছেন চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ শিশু নিকেতন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।

শহরের বাসায় শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়াতেন। অবসর সময়ে পেয়েছেন পেনশনের এককালীন প্রায় ৩০ লাখ টাকা। স্বামী-সন্তান কেউ না থাকায় পেনশনের টাকা ছোট ভাই অমর কৃষ্ণ ভট্টাচার্যসহ অন্যান্য ভাই-বোনদের হাতে তুলে দেন। উর্মিলা ভট্টাচার্যের আশা ছিল, শেষ বয়সে তাঁর ভাই, বোন, ভাতিজারা পাশে থাকবেন। 

কিন্তু শেষ সময়ে কাউকে পাননি ৭০ বছর বয়সী এ নারী। পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিছানায় ২২ দিন ধরে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে গতকাল সোমবার রাত ১২টার দিকে পটিয়া হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক সাখাওয়াত হোসেন। 

মৃত্যুর আগে সোমবার বিকেলে অসুস্থ উর্মিলা ভট্টাচার্যের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তিনি আজকের পত্রিকাকে জানিয়েছিলেন, তিনি আগ্রাবাদ শিশু নিকেতনে শিক্ষকতা করতেন। অবসরকালীন প্রায় ৩০ লাখ টাকা এককালীন পেনশন পেয়েছেন, যা তিনি তাঁর ভাই-বোনদের দিয়েছেন। ওই টাকায় তাঁরা পুকুর খনন করেছেন, জমি কিনেছেন। কিন্তু তিনি তা ভোগ করছেন না। কয়েক দিন আগে তাঁর এক বোনের ছেলে হাসপাতালে এসেছিলেন। তাঁকে ২ হাজার টাকা দিয়ে চলে গেছেন। ভাই-বোনেরা কেউ খবর নিচ্ছে না বলে জানিয়েছিলেন তিনি। 

পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা যায়, ২ জানুয়ারি উর্মিলা ভট্টাচার্য পেটব্যথা নিয়ে ভর্তি হন পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। এরপর শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলে ১৫ জানুয়ারি তাঁকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়, কিন্তু হাসপাতাল ছেড়ে যাননি তিনি। এরপর তাঁর কোনো স্বজন হাসপাতালে না আসায় বিপাকে পড়েছিল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। 

হাসপাতালে ভর্তির পর তিনি একদিকে বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যা ভুগছিলেন, অন্যদিকে নিঃসঙ্গতায় তাঁর শারীরিক অবস্থাও ধীরে ধীরে অবনতির দিকে যাচ্ছিল। কিন্তু স্বজনদের কাউকে দেখতে না পাওয়ায় বিপাকে পড়েছিলেন হাসপাতালের চিকিৎসকেরা। 

পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ফারহানা জেরিন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘বৃদ্ধা হাসপাতালে ভর্তির পর থেকেই কোনো স্বজন হাসপাতালে আসেননি। আমরা সরকারিভাবে সকল ওষুধসহ চিকিৎসাসেবা দিয়েছি। তাঁকে ছাড়পত্র দেওয়ার পরও তিনি হাসপাতালের বেড ছাড়েননি। একসময় তাঁর অবস্থা দিন দিন অবনতি যখন হচ্ছিল, বেড ছেড়ে কোথাও নিজে যেতে পারছেন না। আমরা রোগীর ছোট ভাই অমর কৃষ্ণ ভট্টাচার্যের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেছি। তিনি ঢাকায় আছেন জানিয়ে বলেন—আমার কিছুই করার নেই।’ 

উর্মিলা ভট্টাচার্য। ছবি: সংগৃহীত ফারহানা জেরিন আরও বলেন, ‘এরপর আমরা পটিয়া গাউছিয়া কমিটিকে খবর দিই। তাদের টিম ও হাসপাতালের নার্সদের সমন্বয়ে ওই রোগীর সেবাযত্ন করছিলেন। সোমবার রাতে তাঁর মৃত্যুর খবরটা জানানো হয়েছে তাঁর ভাইপোকে। তিনি দূরে আছেন বলে জানিয়েছেন। আজ মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তাঁর দূরসম্পর্কের আত্মীয়দের কাছে লাশটি হস্তান্তর করা হয়েছে।’ 

উর্মিলা ভট্টাচার্যের ছোট বোন প্রতিমা চক্রবর্তী আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমার বোনকে আমরা ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি। তিনি একরোখা টাইপের। নিজে যা বোঝেন, তা-ই করেন। তাঁকে আমার বাবা-মা বারবার চেষ্টা করেও বিয়ে দিতে পারেননি। বিয়ের কথা শুনলে তিনি বাড়ি থেকে পালিয়ে যেতেন। আমরা ৯ বোন, ২ ভাই। তাঁর ছোট ভাই অমর কৃষ্ণ ভট্টাচার্য দেশের বাড়িতে থাকেন। অন্য ভাই রবীন্দ্র ভট্টাচার্য পরিবার-পরিজন নিয়ে স্থায়ীভাবে ভারতে থাকেন। বোনেরা সবাই স্বামীর-সংসারে রয়েছেন। আমরা সবাই নিজ নিজ পরিবার নিয়ে ব্যস্ত। আমার স্বামী মারা গেছেন কিছুদিন আগে। আমিও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত।’ 

পটিয়া উপজেলা গাউছিয়া কমিটি মানবিক টিমের সচিব মাওলানা মো. ইছহাক আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘হাসপাতালের ডা. ফারহানা জেরিন ১৭ জানুয়ারি আমাদের খবর দিলে ওই দিন থেকেই আমাদের টিম এসে ওই রোগীকে হাসপাতালে সেবা দিয়েছি। তবে তিনি একজন মহিলা। তা ছাড়া তিনি বেডের মধ্যেই পায়খানা-প্রস্রাব করতেন। যার কারণে আমাদের সেবা দিতে নানামুখী সমস্যা সৃষ্টি হতো। তারপরও আমরা ও নার্সদের সহযোগিতায় রোগীকে সেবাযত্ন দিয়েছি। সোমবার রাত ১২টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। এ খবরটা আমি তাঁর ভাইয়ের নম্বরে জানালে সে দূরে আছে বলে জানায়।’ 

ছনহরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুর রশিদ দৌলতী আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘শিক্ষিকা উর্মিলা ভট্টাচার্য আমার এলাকার বাসিন্দা। সারা জীবন চিরকুমারী ছিলেন। তাঁর ভায়েরা সবাই বড়লোক হওয়ার পরও তাঁকে দেখতেন না। তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁরা লাশটি গ্রামের বাড়িতে দাহ করতে বাধা দেন। কিন্তু আমি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমার নিজ উদ্যোগে লাশটির দাহ করার কাজ সম্পন্ন করেছি।’

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
 
    সব মন্তব্য

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    এলাকার খবর

     
     

    পা দিয়ে লিখে এইচএসসি পাস, হতে চান বিসিএস কর্মকর্তা

    না.গঞ্জে রেস্তোরাঁয় ঢুকে গুলির ঘটনায় মালিকদের বিক্ষোভ

    ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিচারপ্রার্থীরা অংশ নিচ্ছেন মামলার শুনানিতে

    ডেমরায় ফ্ল্যাট থেকে নারীর মরদেহ উদ্ধার

    যশোরে বিএনপি কর্মীদের সঙ্গে ধস্তাধস্তিতে ৪ পুলিশ আহত, আটক ৬ 

    ‘বিয়ে নিয়ে দ্বন্দ্বে’ নারীকে হত্যার অভিযোগ, গণধোলাই থেকে বাঁচতে ৯৯৯ ফোন

    মেলায় আছেন হ‌ুমায়ূনও

    ফারসি ভাষা শিখল কারা

    মাউশির প্রকল্প: কাজ শুরুর আগেই গচ্চা ১১৬ কোটি

    ঢাকায় বিএনপির পদযাত্রা স্থগিত

    ছাত্রলীগ নেতার বিরুদ্ধে অন্তঃসত্ত্বা ‘প্রেমিকার’ ধর্ষণ মামলা

    রিংকুসহ ২২ বাংলাদেশিকে আঙ্কারায় আনা হচ্ছে: কনসাল জেনারেল