Alexa
বৃহস্পতিবার, ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩

সেকশন

epaper
 

অর্থনীতির ভিত্তি যখন অর্থ আর অস্ত্রের ব্যবসা

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ অস্ত্র উৎপাদক ও বিপণনকারী দেশ। অন্যান্য দেশ, যথা রাশিয়া, চীন, ব্রিটেন, ফ্রান্সও অস্ত্র ব্যবসায় নিয়োজিত; কিন্তু বিশ্ব অস্ত্র বাজার মূলত নিয়ন্ত্রিত হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বারা। 

আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০২৩, ১২:৫৩

প্রতীকী ছবি বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি বিভিন্ন পণ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকে। যেমন মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, নেপালের অর্থনীতি বহুলাংশে পর্যটনশিল্পের ওপর নির্ভরশীল। আবার বাংলাদেশের অর্থনীতি নির্ভরশীল মূলত পোশাকশিল্প, বিভিন্ন দেশে কর্মরত শ্রমিকদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা এবং কৃষির ওপর। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর আয়ের প্রধান উৎস তাদের তেল সম্পদ। আবার কালের প্রবাহে এই ভিত্তি সদা পরিবর্তনশীল; অর্থাৎ দেশগুলোর সেই পণ্যের ওপর নির্ভরশীলতা পরিবর্তিত হয়ে অন্য ধরনের পণ্যের দিকে চলে যায়। একসময় বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য ছিল পাট ও পাটজাত পণ্য। পাটকে বলা হতো সোনালি আঁশ। কিন্তু বর্তমানে রপ্তানি বাণিজ্যে পাটের ভূমিকা খুবই নগণ্য। বর্তমান পৃথিবীর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পরস্পর নির্ভরশীল। তাই পৃথিবীর কোনো দেশে বা জায়গায় অর্থনৈতিক কোনো বিপর্যয় দেখা দিলে অন্য দেশগুলোকেও প্রভাবিত করে। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো অর্থ ও মুদ্রাব্যবস্থা।

বর্তমান বিশ্বের মুদ্রাব্যবস্থা কুক্ষিগত হয়ে পড়েছে একটা দেশের ওপর, তার নাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রা বা ডলার পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বাণিজ্যিক বিনিময়ে ব্যবহৃত মুদ্রা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীব্যাপী বিনিময়যোগ্য মুদ্রার সংকট দেখা দেয় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য একধরনের হুমকির মুখে পড়ে। এই সুযোগটা পুরোপুরি কাজে লাগাতে সক্ষম হয় যুক্তরাষ্ট্র। ব্রেটন উডস সম্মেলনে (১৯৪৪ সালের জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ হ্যাম্পশায়ারের ব্রেটন উডস নামক স্থানে জাতিসংঘ মুদ্রা ও অর্থবিষয়ক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।) মার্কিন ডলারকে আন্তর্জাতিক বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে এবং স্বর্ণের স্থলে ডলারকে রিজার্ভ কারেন্সি হিসেবে ব্যবহার করা শুরু হয়।

যদিও প্রথম অবস্থায় ডলারের মান নির্ধারিত হওয়ার কথা ছিল স্বর্ণের বিপরীতে, কিন্তু পরে যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে পদ্ধতি পরিবর্তন করে নেয়। এখন আর স্বর্ণের বিপরীতে ডলার মূল্যায়িত হয় না। এখন সুবিধা হলো যথেচ্ছ ডলার ছেপে তার সুবিধা নেওয়া। ডলারের চাহিদা বিশ্বব্যাপী। কেননা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অনেকটাই এখন ডলারের ওপর নির্ভরশীল। তা ছাড়া, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর তেলের মূল্য ডলারে পরিশোধ করার জন্য দেশগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ। এ কারণে তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেলে ডলারেরও দাম বেড়ে যায়।

শুধু তেল নয়, অন্য যেকোনো কিছুরই যদি মূল্য বৃদ্ধি পায় এবং তা যদি ডলারের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হয়, তবে ডলারের মূল্য বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে বাংলাদেশে ডলারের যে সংকট দেখা দিয়েছে, তা-ও ওই একই কারণে।

পৃথিবীব্যাপী লক্ষকোটি মানুষ বিভিন্ন ধরনের আর্থিক লেনদেন করে থাকে প্রতিনিয়ত ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড ইত্যাদির মাধ্যমে। এই সব লেনদেনে মূলত লাভবান হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার ডলারকেন্দ্রিক বিনিময়ব্যবস্থার জন্য।

ডলারনির্ভরতার সব থেকে বিপজ্জনক দিকটা হলো, কোনো কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরাগভাজন হলে তার ওপর নেমে আসবে অবরোধ বা নিষেধাজ্ঞার খড়্গ। যেহেতু লেনদেনের সবকিছু ডলারনির্ভর, তাই ডলারের ওপর নিষেধাজ্ঞা মুহূর্তেই সেই দেশকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে ফেলে। ব্যক্তি বা রাষ্ট্র যে-ই হোক অবরোধ আরোপের শিকার হওয়া মানেই ভয়াবহ বিপদের সম্মুখীন হওয়া।

এরই ধারাবাহিকতায় ইরাক, ইরান, উত্তর কোরিয়া, আফগানিস্তান, লিবিয়া এবং সবশেষে রাশিয়ার ওপর আরোপিত হয়। কিন্তু রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা আর কার্যকর কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। কারণ, তিনটি জিনিস যদি নিয়ন্ত্রণে থাকে কোনো দেশের, তবে তাকে কাবু করা খুব কঠিন। এই তিনটি জিনিস হলো খাদ্য, জ্বালানি আর অর্থ—ইংরেজিতে থ্রি এফ ফুড, ফুয়েল এবং ফিন্যান্স (food, fuel and Finance)। রাশিয়ার হাতে খাদ্য আর জ্বালানি থাকলেও অর্থব্যবস্থা সম্পূর্ণ ছিল পশ্চিমা শক্তির হাতে। ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা বিশ্ব প্রথমেই অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে। আশা ছিল এই অবরোধ রাশিয়ার অর্থনীতিকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাবে। কিন্তু বিধি বাম—রাশিয়া তার জ্বালানি অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে শুধু সংকট মোকাবিলাই নয়, ডলার এবং পশ্চিমা অর্থব্যবস্থার বিকল্প অর্থব্যবস্থা দাঁড় করানোর পর্যায়ে কিছুটা অগ্রসরও হয়েছে। এখানে সে চীন এবং অন্যান্য কিছু মিত্রের সহযোগিতা লাভে সফল হয়েছে। হয়তো নিকট ভবিষ্যতে রাশিয়া ও চীনকেন্দ্রিক অর্থব্যবস্থা ডলারের বিকল্প মুদ্রা হিসেবে বিশ্ববাণিজ্য ও বিনিময়ব্যবস্থায় স্থান করে নেবে। তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ ও মুদ্রা ব্যবসার একচেটিয়া আধিপত্যের অবসান ঘটবে নিশ্চিতভাবে। সারা বিশ্বকে তখন আর হাতের মুঠোয় রেখে যথেচ্ছ ব্যবহার করা যাবে না।

দ্বিতীয় হলো অস্ত্রের ব্যবসা। দেশে দেশে যুদ্ধবিগ্রহ না হলে তো আর অস্ত্র কেনার প্রয়োজন পড়ে না। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশই অস্ত্র উৎপাদন করে না। যারা অস্ত্র উৎপাদন করে না, তাদের চড়া দামে অস্ত্র কিনতে হয় উৎপাদনকারী দেশগুলোর কাছ থেকে। দেশের মানুষের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বৃদ্ধির জন্য যে অর্থ ব্যবহৃত হতে পারত, তা ব্যয়িত হয় মারণাস্ত্র কেনার কাজে। তাই দেশে দেশে সংঘাত-সংঘর্ষ বাধিয়ে অস্ত্র ব্যবসার প্রসার ঘটিয়ে দেশের অর্থনীতিকে তরতাজা করে তোলার সেই আদিম কৌশল আজও বিদ্যমান। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ না বাধলে আজ ন্যাটোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠত এবং উঠছিলও। কিন্তু আজ ন্যাটোতে কে কার আগে যোগ দেবে, তা যেন এক প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। রাশিয়ার হুমকি উপেক্ষা করে একে একে আবেদন-নিবেদন করে চলেছে ন্যাটোয় অন্তর্ভুক্তির জন্য ইউরোপের দেশগুলো, এমনকি যারা দীর্ঘদিন তাদের নিরপেক্ষতা বজায় রেখে চলছিল। শুধু ইউরোপ নয়, পৃথিবীর সব অঞ্চলই এখন যথাসাধ্য তাদের অস্ত্রভান্ডার সমৃদ্ধ করার কাজে নিয়োজিত। কারণ একটাই—কে কখন কাকে আক্রমণ করে বশে। আর পৃথিবী এখন আবার দুই মেরুতে বিভক্ত হয়ে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে। প্রত্যেকেই একে অপরের শত্রু। তাই একদিকে ক্ষুধা আর দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে, অন্যদিকে রমরমা অস্ত্র ব্যবসার আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ অস্ত্র উৎপাদক ও বিপণনকারী দেশ। অন্যান্য দেশ, যথা রাশিয়া, চীন, ব্রিটেন, ফ্রান্সও অস্ত্র ব্যবসায় নিয়োজিত; কিন্তু বিশ্ব অস্ত্র বাজার মূলত নিয়ন্ত্রিত হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বারা। দেশে দেশে সংঘাত আর অস্ত্রের ব্যবসা প্রতিনিয়ত হত্যা করছে শত-সহস্র মানুষকে, পঙ্গুত্ব বরণ করছে তার চেয়েও বেশি সংখ্যায়, গৃহহীন-বাস্তুচ্যুত মানুষের কান্না শোনার কেউ নেই। এই অর্থ আর অস্ত্রের ব্যবসা যত দিন চলবে, অসহায় মানুষের কান্নাও থামবে না তত দিন। 

লেখক: সিনিয়র ফ্যাকাল্টি, ডারল্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুল

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
 
    সব মন্তব্য

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    এলাকার খবর

     
     

    রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রভাষা

    কৃষিজমি সুরক্ষায় অঙ্গীকার ও তৎপরতা

    ‘হাঁসুলিবাঁকের নসুবালা’

    এ কেমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান!

    ফ্লোরা হল্যান্ড ফুল-বাণিজ্যের রাজ্য

    কোথায় নতুন প্রজন্মের নেতা?

    ঢাকায় বিএনপির পদযাত্রা স্থগিত

    ছাত্রলীগ নেতার বিরুদ্ধে অন্তঃসত্ত্বা ‘প্রেমিকার’ ধর্ষণ মামলা

    রিংকুসহ ২২ বাংলাদেশিকে আঙ্কারায় আনা হচ্ছে: কনসাল জেনারেল

    পা দিয়ে লিখে এইচএসসি পাস, হতে চান বিসিএস কর্মকর্তা

    ভূমিকম্প: তুরস্কে তীব্র ঠান্ডায় উদ্ধার ব্যাহত, বাড়ছে ক্ষোভ

    না.গঞ্জে রেস্তোরাঁয় ঢুকে গুলির ঘটনায় মালিকদের বিক্ষোভ