Alexa
রোববার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৩

সেকশন

epaper
 

আইনকে আমরা থোড়াই কেয়ার করি

আপডেট : ২২ জানুয়ারি ২০২৩, ১৪:২৭

পারাপার ঠেকানোর বাঁধা মানে না অনেকেই।ছবি: আজকের পত্রিকা ছবিটি ছাপা হয়েছে ৪ জানুয়ারি আজকের পত্রিকার প্রথম পাতায়। ছবিতে দুই যুবককে রাস্তার মাঝখানের ডিভাইডারের ওপরে দেওয়া উঁচু তারের বেষ্টনী টপকে পার হতে দেখা যাচ্ছে। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান হানিফ ফ্লাইওভারের কাজলা টোলপ্লাজা-সংলগ্ন এলাকার দৃশ্য এটি। ছবিটির ক্যাপশনে বলা হয়েছে, ‘পারাপার ঠেকাতে পথের মাঝখানে দেওয়া আছে তারের বেষ্টনী। এরপরও মানুষকে রোখা দায়।’

এমন দৃশ্য অবশ্য বিরল নয় আমাদের দেশে। যেখানে যেটা করতে নিষেধ করা হয়, মানুষ যেন সেটা করতেই বেশি করে উৎসাহী হয়ে পড়ে। আপনি যদি চোখ-কান খোলা রেখে রাস্তা দিয়ে হাঁটেন বা চলাফেরা করেন, তাহলে এমন দৃশ্য হামেশাই নজরে পড়বে। হয়তো কোথাও লেখা আছে ‘এখানে প্রস্রাব করা নিষেধ’। দেখবেন সেখানে ওই কম্মটি সারার জন্য রীতিমতো লাইন লেগে গেছে। এ নিয়ে একটি কৌতুকও চালু আছে। একটি দেয়ালে লেখা ছিল, ‘এখানে প্রস্রাব করিবেন না। করিলে ৫০ টাকা জরিমানা।’ এক দুষ্টলোক মাঝখানের দাঁড়িটি মুছে ‘না’-এর আগে বসিয়ে দিল। হয়ে গেল ‘এখানে প্রস্রাব করিবেন। না করিলে ৫০ টাকা জরিমানা’। মুরুব্বিরা এ জন্যই বলতেন, আমাদের সুবুদ্ধি, মানে ভালো কাজের বুদ্ধি যত কমই থাক না কেন, দুষ্টবুদ্ধির কোনো অভাব নেই। কোনো কালে ছিলও না।

রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে নোটিশ বোর্ড টাঙানো থাকে, ‘কার পার্কিং নিষেধ’, ‘রিকশা দাঁড়ানো নিষেধ’। কিন্তু অবস্থা দেখলে মনে হবে যেন ওই জায়গাটাই গাড়ি পার্ক করা কিংবা রিকশা দাঁড়ানোর জন্য নির্দিষ্ট। পথচারীদের নিরাপত্তার জন্য কর্তৃপক্ষ সাইনবোর্ড লাগিয়ে থাকে ‘ফুটপাত দিয়ে হাঁটুন’। কিন্তু সেই ফুটপাত ব্যবহারে কেউ আগ্রহী হয় না, রাস্তার পাশ দিয়ে চলতেই তারা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। আবার সব ফুটপাত সব সময় পথচারীরা ব্যবহারও করতে পারে না। বেশির ভাগ ফুটপাত বারো মাস থাকে হকারদের দখলে। কোথাও কোথাও তো ফুটপাত রূপ নেয় অঘোষিত মার্কেটে। সদরঘাট, গুলিস্তান, পুরানা পল্টন কিংবা মতিঝিলে গেলে এর প্রমাণ মিলবে। এসব এলাকায় গিয়ে আপনি যদি নিয়ম মেনে ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে চান, তাহলে ভুল করবেন। সেখানে অনিয়মকেই নিয়ম বলে ধরে নিতে হবে।

পথচারীদের রাস্তা পারাপারের জন্য রয়েছে জেব্রা ক্রসিং এবং ফুটওভারব্রিজ। জেব্রা ক্রসিংয়ের কাছে এলে গাড়ির গতি কমিয়ে আনার নিয়ম। কিন্তু আপনি যদি খেয়াল করেন, দেখবেন ওই চিহ্ন দেখলেই যেন গাড়িগুলোর গতিতে অতিরিক্ত প্রাণসঞ্চার হয়। ফলে পথচারীরা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে একসময় অধৈর্য হয়ে পার হতে চায় রাস্তা। ফলে ঘটে অনিবার্য দুর্ঘটনা। আবার বিপরীত চিত্রও আছে। এই মহানগরীতে ফুটওভারব্রিজ একেবারে কম নয়। কিন্তু সেগুলোর ব্যবহারে নগরবাসীর আগ্রহে কমতি আছে ব্যাপক। তাই দেখা যায়, ওভারব্রিজগুলো পথচারীর অভাবে খাঁ খাঁ করছে, আর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষ চলন্ত গাড়ির সামনে দিয়ে পার হচ্ছে রাস্তা। অথচ একটু কষ্ট করে ১০-২০ গজ হেঁটে ওভারব্রিজ দিয়ে সহজেই রাস্তা পার হওয়া যায়। আমাদের গ্রামটি ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের পাশে। আগে গ্রাম থেকে বেরিয়ে সোজা হাইওয়ে পার হয়ে বাজারে যাওয়া যেত। এখন এক্সপ্রেসওয়ে হওয়ায় সোজাসুজি তা পার হওয়া বন্ধ। রাস্তার মাঝখানে চওড়া ডিভাইডার, তার ওপর আবার প্রায় তিন ফুট উঁচু স্টিলের বেড়া। সেখান থেকে একটু ঘুরে লোকাল রোড দিয়ে অপর পাশে যাওয়ার জন্য গজ পঞ্চাশেক দূরেই আন্ডারপাস। সহজেই দু-তিন মিনিট হেঁটে এক্সপ্রেসওয়ের অপর পাশে যাওয়া যায়। কিন্তু অত কষ্ট কেন করবে তারা? তাই ঝুঁকি নিয়েই বেড়া ডিঙিয়ে পার হয় এক্সপ্রেসওয়ে। ফলে প্রায়ই ঘটে দুর্ঘটনা। কখনো কখনো যাচ্ছে প্রাণ। মানুষ চোখের সামনে দেখছে সেসব ঘটনা। তারপরও বন্ধ হচ্ছে না এই অপরিণামদর্শী পারাপার।

রাজধানী ঢাকায় আরেকটি ঘটনা প্রায়ই চোখে পড়ে। যখনই কোনো সড়কে একটু যানজট লেগে যায় কিংবা সিগন্যাল বাতির কারণে চলাচল বন্ধ হয়, অমনি ফুটপাত ধরে কিছু সাইকেল-মোটরসাইকেল চলতে শুরু করে। যে ফুটপাত মানুষের পায়ে চলার পথ, সেই পথে যদি মোটরসাইকেল চলে, তাহলে? যাঁরা এ কাজটি করেন, তাঁরা আইনকানুন জানেন না বা অশিক্ষিত, তা কিন্তু নয়। তাঁরা সবই জানেন এবং বোঝেন। তবে মানতে চান না। একটু সময় বাঁচানোর জন্য আইন ভাঙতে তাঁদের বিবেকে বাধে না। বাধ্য হয়ে কর্তৃপক্ষ এখন প্রায় রাস্তায় নোটিশ লাগাতে বাধ্য হয়েছে, ‘ফুটপাত দিয়ে মোটরসাইকেল চালাবেন না’। কোথাও আবার আড়াআড়ি খুঁটি পোঁতা হয়েছে।

মোটরসাইকেলের ফুটপাতে ওঠা বন্ধ করতে। আমরা এমনই সচেতন জাতি যে ফুটপাত দিয়ে যান চালানো বন্ধ করতে সাইনবোর্ড লাগাতে হয়, খুঁটি গাড়তে হয়। নগরীর বিভিন্ন স্থানে রয়েছে ডাস্টবিন। লেখা থাকে ‘আমাকে ব্যবহার করুন’। কিন্তু অবস্থা দেখলে মনে হতে পারে ডাস্টবিন নয়, ওটার চারপাশকেই ব্যবহার করতে আহ্বান জানানো হয়েছে।

দেশে অনেক আইন আছে যেগুলোকে ‘কাজির গরু খাতায় আছে গোয়ালে নেই’ প্রবাদের সঙ্গে তুলনা করা যায়। ধরুন, প্রকাশ্যে ধূমপানবিষয়ক আইনটির কথা। আইনে প্রকাশ্যে ধূমপান করলে পাঁচ শ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে এ কথা লিখে নানা আকারের বোর্ডও লাগানো রয়েছে। কিন্তু কে শোনে কার কথা! দাঁড়িয়ে কিংবা হাঁটা অবস্থায় অথবা পার্কের বেঞ্চিতে বসে নির্বিকার ধোঁয়া উগরে দিচ্ছে অজস্র মানুষ। কোথায় ধূমপানবিরোধী আইন, কোথায় তার প্রয়োগ! সবচেয়ে অবাক কাণ্ড হলো, যে পুলিশ প্রশাসনের এ আইন প্রয়োগ করার কথা, তাদেরই ছোট-বড় অনেক সদস্যকে দেখা যায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে ধূম্র উদ্‌গিরণ করতে। কারও কিছু বলার নেই। আমি একদিন ধূমপানরত এক পুলিশ কর্মকর্তাকে বিনয়ের সঙ্গে প্রশ্ন করেছিলাম, ‘ভাইজান, প্রকাশ্যে ধূমপান নিষিদ্ধ। অথচ আপনি নিজেই ধূমপান করছেন। তাহলে আইন বাস্তবায়ন করবে কে? আর পাবলিক তা মানবে কেন?’ অল্প বয়সী কর্মকর্তা বাঁকা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘নিজের কাজে যান। এসব নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না।’ তাঁর উপদেশ অবনত মস্তকে মেনে সরে এলাম এই ভয়ে, শেষে না আমার হাতে সিগারেটটি গুঁজে দিয়ে ধূমপানবিরোধী আইনের প্রয়োগ তখনই শুরু করে দেন; যেমন ইয়াবা পকেটে দিয়ে নিরীহ মানুষদের ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়।

কিন্তু কেন আমাদের এই আইন না মানার প্রবৃত্তি? আইনকে থোড়াই কেয়ার করার এই কুপ্রবণতা আমাদের গ্রাস করল কেন? এ নিয়ে কথা হচ্ছিল বন্ধু নাট্য নির্মাতা শেখ আমানুরের সঙ্গে। সে বলল, এর জন্য দায়ী জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনিই তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতার মাধ্যমে আমাদের আইন না মানার জন্য উৎসাহ দিয়ে গেছেন। জিজ্ঞেস করলাম, কীভাবে? আমানুর ওর দরাজকণ্ঠে আবৃত্তি করল, ‘আমি অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল/আমি দলে যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম কানুন শৃঙ্খল!/আমি মানি নাকো কোনো আইন,/আমি ভরা-তরী করি ভরা-ডুবি,/আমি টর্পেডো, আমি ভীম ভাসমান মাইন’। বললাম, ভালোই বললি দোস্ত। নিজেদের দোষ পরের কাঁধে চাপাতে যে আমাদের জুড়ি নেই, তুই আবারও তার প্রমাণ দিলি। তাহলে আর কী করা! আইন লঙ্ঘনে মদদ দেওয়ার অভিযোগে কবির নামে একটি মামলা ঠুকে দিই, কী বলিস? দুই বন্ধু কিছুক্ষণ হাসাহাসি করে শেষমেশ এ বিষয়ে একমত হলাম যে যতই বলি কিংবা লিখি, এই প্রবণতার অবসান 
হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। কারণ কথায় আছে, ‘ইল্লত যায় না ধু’লে, আর খাসলত যায় না ম’লে’। 

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
 
    সব মন্তব্য

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    এলাকার খবর

     
     

    বাংলাদেশে আইটির সম্ভাবনা কেমন?

    ক্যারিয়ারে ভালো করার ছয় ধাপ

    ক্ষমা করার সুফল পাবে তো আওয়ামী লীগ?

    এমন ঐক্য যদি সব ক্ষেত্রে হতো!

    সুচিত্রা সেনের মঞ্চনাটক

    দায়িত্বজ্ঞানহীনতা

    লক্ষ্মীপুরে বিএনপির ৫৫ নেতা-কর্মীর জামিন মঞ্জুর

    এবার ব্যোমকেশ হচ্ছেন দেব

    জনগণের সঙ্গে পুলিশের নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে: প্রধানমন্ত্রী

    রশিদের নেতৃত্বে আমিরাত যাচ্ছে আফগানিস্তান

    চট্টগ্রামে অপহৃত শিশু উদ্ধার, অপহরণকারী গ্রেপ্তার

    সারার কর্নিয়ায় চোখের আলো ফিরে পেলেন তাঁরা