Alexa
বৃহস্পতিবার, ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩

সেকশন

epaper
 

বন্ধ আর খোলার খেলা

আপডেট : ২১ জানুয়ারি ২০২৩, ০৯:৫০

অনুমোদন না থাকায় মিরপুরে হলি হোম ক্লিনিক বন্ধ করে দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। কিছুদিন পরই আবার চালু করা হয় ক্লিনিকটি। ছবি: আজকের পত্রিকা বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়মে আনতে সরকার গত বছর দেশব্যাপী দুই দফা অভিযান চালিয়েছিল। মে ও আগস্টে চালানো অভিযানে ১ হাজার ৮৯৫টি প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়েছিল। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই ঢাকার বাইরের। পরে কিছু প্রতিষ্ঠান নিবন্ধনের আওতায় এলেও বড় অংশ নিয়মবহির্ভূতভাবেই চলছে। ঢাকা, খুলনা, কুমিল্লা, বগুড়াসহ অন্তত ১৫ জেলায় খোঁজ নিয়ে অবৈধ প্রতিষ্ঠান চালু রাখার তথ্য মিলেছে। ব্যতিক্রম শুধু চট্টগ্রাম। সেখানে বন্ধ করা কোনো প্রতিষ্ঠান শর্ত পূরণ না করে চালু করতে পারেনি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান ২২ হাজারের মতো। গত ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছে ১৮ হাজার ৭৩৩টি। এর মধ্যে নিবন্ধিত ১৩ হাজার ৬৯৬টি। সব শর্ত পূরণ না করাসহ নানা জটিলতায় নিবন্ধনের অপেক্ষায় ৫ হাজার ৩৭টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে মারাত্মক ত্রুটিপূর্ণ আবেদনই ২ হাজারের মতো। প্রায় ৩ হাজার প্রতিষ্ঠান আবেদনই করেনি।

অবৈধ প্রতিষ্ঠান স্থায়ীভাবে বন্ধ করার পরিকল্পনা আছে কি না—জানতে চাইলে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব ড. মুহাম্মদ আনোয়ার হোসেন হাওলাদার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘কেউ নিজে থেকে শুদ্ধ না হলে তাকে জোর করে ঠিক করা যায় না। এত অভিযান চালিয়ে, ব্যবস্থা নেওয়ার পরও যদি এভাবে চলে, তাহলে ভাবনার ব্যাপার। বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে কথা বলব।’ 

স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে খুলে নিচ্ছে
মিরপুরের বাউনিয়া বাঁধে অনুমোদনহীন হলি হোমস ৩১ আগস্ট বন্ধ করে দিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। কিন্তু ২৭ ডিসেম্বর গিয়ে দেখা যায়, ছোট দুটি কক্ষের একটিতে রিচার্জেবল বাতি জ্বালিয়ে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব করাচ্ছিলেন একটি সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক আঞ্জুমান আরা। পরে তাঁর নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। রোগীর শাশুড়ি মাহমুদা আক্তার বলেন, ‘বৈধ না অবৈধ জানি না। কম টাকায় করায়, তাই নিয়া আসছি।’ প্রশিক্ষণহীন কর্মী হাওয়া আক্তার জানান, মালিক কামাল মোল্লা ওমরাহ করতে গেছেন। দায়িত্বে থাকা আলমগীর কিছু বলতে নারাজ।

খিলগাঁও চৌধুরীপাড়ার মুক্তি নার্সিং হোমও বন্ধ করা হয়েছিল গত ৩০ আগস্ট। গত ২১ ডিসেম্বর গিয়ে সেটিও চালু পাওয়া যায়। মালিক ইফফাত আরা বেগম বলেন, ‘আবেদন করেছি, যেকোনো সময় হয়ে যাবে।’ বন্ধ আর খোলার খেলা

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. শেখ দাউদ আদনান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ করেছি। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে কোনোভাবে খুলে নিচ্ছে। বন্ধ করার পর যাতে না চলে সে জন্য সংশ্লিষ্ট থানায়ও কপি দেওয়া হয়। তাদের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা। কিন্তু সেটি হচ্ছে না।’ 

তড়িঘড়ি খোলা নিয়ে প্রশ্ন
ময়মনসিংহ মহানগরে বন্ধ করা হয়েছিল ২৯টি প্রতিষ্ঠান। সপ্তাহ না যেতেই মালিকেরা দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন সিভিল সার্জন কার্যালয়ে। পরে একে একে খুলে যায় ২৮টি প্রতিষ্ঠান। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ময়মনসিংহ মহানগর সম্পাদক আলী ইউসুফ বলেন, অবৈধ প্রতিষ্ঠান সিলগালা করার পর তড়িঘড়ি করে কীভাবে খোলা যায়, সেটা বোধগম্য নয়।

সিভিল সার্জন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘যেসব প্রতিষ্ঠান নিজেদের সংশোধন করেছে, সেগুলো চালুর অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানকে নজরে রাখছি। কোনো অনিয়ম করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

পটুয়াখালীতে ৪৫টি প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়েছিল। কিছু নিবন্ধন পেয়েছে। গোপনে কার্যক্রম চালাচ্ছে আটটি। বাউফলের শেফা ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধ করার কয়েক দিনের মাথায় অনুমোদন ছাড়াই কার্যক্রম চালাচ্ছে। মালিক মো. জলিলুর রহমান বলেন, ‘নিবন্ধন পাইছি, কিন্তু নবায়ন করাইনি। কয়েক দিনের মধ্যেই করাব।’

সিভিল সার্জন এস এম কবির হাসান বলেন, কেউ গোপনে কার্যক্রম চালাচ্ছে কি না, তা জানা নেই।

খুলনায় বন্ধ করা সাতটি প্রতিষ্ঠান দুই মাসের মাথায় অনুমোদন ছাড়াই চালু হয়েছে। নবায়নবিহীন ল্যাবএইড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে কিছু পরীক্ষার বিষয়ে জানতে চাইলে রিসেপশনে থাকা কর্মী বলেন, এখানে রক্ত পরীক্ষা করা যাবে। শান্তিধাম ল্যাব কেয়ার কনসালটেশন সেন্টারের এক কর্মী জানান, এখানে কোনো পরীক্ষা হয় না। তবে অন্য ল্যাবের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া হয়। বাংলাদেশ প্রাইভেট হাসপাতাল ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিপিএইচসিডিওএ) খুলনা শাখার সভাপতি গাজী মিজানুর রহমান বলেন, ‘লাইসেন্সবিহীন কিংবা মানহীন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিকের কারণে রোগীরা যেমন সুচিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, তেমনি চিকিৎসক সমাজেরও সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে।’

সিভিল সার্জন সুজাত আহমেদ বলেন, যাঁরা নিবন্ধন বা নবায়ন ছাড়া চালাচ্ছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কুমিল্লায় বন্ধ করা ৬৬টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কিছু নিবন্ধন পেলেও অন্যগুলো অবৈধভাবে চলছে। এমনই একটি দেবিদ্বারের আগমন ডায়াগনস্টিক সেন্টার। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মাসুদুর রহমান বলেন, ‘অভিযানের সময় কাগজপত্র সেন্টারে ছিল না। পরে কাগজপত্র দিয়ে অনুমোদন নিয়েছি।’

ডেপুটি সিভিল সার্জন নিসর্গ মেরাজ চৌধুরী বলেন, ‘অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন করে লাইসেন্স নিয়েছে। আমরা তদারকি করছি।’

টাঙ্গাইলে ৫৩টি প্রতিষ্ঠান সিলগালা করা হলেও কিছুদিনের মধ্যে আবেদন করেই অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান চালু হয়ে গেছে। সিভিল সার্জন মো. মিনহাজ উদ্দিন অবশ্য বলেন, সিলগালা করা প্রতিষ্ঠানের মালিকেরা লাইসেন্সের আবেদন করেন। শর্ত সাপেক্ষে খুলে দেওয়া হয়েছে।

নাম-মালিকানা পাল্টে কার্যক্রম
মালিকানা ও প্রতিষ্ঠানের নাম পাল্টে কার্যক্রম চালু করার চেষ্টা চলছে কুড়িগ্রাম সদরে বন্ধ ছয় প্রতিষ্ঠানের। শহরের মডার্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টার আগের ভবনেই হেলথ কেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টার নামে অংশিক কার্যক্রম চালাচ্ছে। নিবন্ধন পেতেও চেষ্টা চালাচ্ছে। একই ভবনে শাপলা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নাম দেশ ডায়াগনস্টিক সেন্টার রেখে কার্যক্রম শুরু করেছে।

সিভিল সার্জন মঞ্জুর মুর্শেদ বলেন, ‘বন্ধ হওয়া কিছু ডায়াগনস্টিক সেন্টার কাগজপত্র দাখিল করে লাইসেন্স নিয়ে আবার কাজ শুরু করেছে। তবে যাঁরা লাইসেন্স পাননি তাঁরা যাতে কার্যক্রম চালাতে না পারেন, সেদিকে নজর রাখছি।’

বগুড়ায় বন্ধ করা ৬৮টি প্রতিষ্ঠানের অর্ধশতাধিক চলছে। শহরের জলেশ্বরীতলা এলাকায় সিলগালা করা নিউ পল্লী ক্লিনিক নাম নিয়েছে মায়ের হাসি ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মোহাম্মদ সোহাগের দাবি, নিউ পল্লী ক্লিনিকের সঙ্গে মায়ের হাসি ক্লিনিকের কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি অনুমোদন না থাকার কথা স্বীকার করেন।

সিভিল সার্জন মোহাম্মদ শফিউল আজম বলেন, অবৈধ ক্লিনিকগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

অভিযান হবে আবার
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবির আজকের পত্রিকাকে বলেন, বন্ধ করে দেওয়ার পরও নিবন্ধন না নিয়ে চালানো প্রতিষ্ঠানের তালিকা হচ্ছে। ১ জানুয়ারি সিভিল সার্জনদের সঙ্গে বৈঠকে পূর্বঘোষণা ছাড়াই তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। আমরাও শিগগিরই শুরু করব।’ তিনি বলেন, ‘স্থানীয় প্রশাসনের সম্পৃক্ততা জোরালো করা দরকার। এর উপায় ভাবা হচ্ছে।’

স্থানীয় পর্যায়ে কমিটি করার তাগিদ 
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব বলেন, ‘অবৈধ প্রতিষ্ঠান নিয়ে সাপলুডু খেলা চলছে। এসব প্রতিষ্ঠান নিয়মের মধ্যে আনতে সিভিল সার্জন অফিস ও উপজেলা পর্যায়ে একটি করে কমিটি দরকার। স্থানীয় পর্যায়ে তারাই ব্যবস্থা নেবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একার পক্ষে এটি সম্ভব নয়। কিন্তু সরকার আদৌ চাইছে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন।’ 

[তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন সবুর শুভ (চট্টগ্রাম), ইলিয়াস আহমেদ (ময়মনসিংহ), এ এইচ এম শামীমুজ্জামান (খুলনা), মীর মো. মহিব্বুল্লাহ (পটুয়াখালী), দেলোয়ার হোসাইন আকাইদ (কুমিল্লা), গনেশ দাস (বগুড়া), আরিফুল ইসলাম রিগান (কুড়িগ্রাম), আনোয়ার সাদাৎ ইমরান (টাঙ্গাইল)।]

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
 
    সব মন্তব্য

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    এলাকার খবর

     
     

    মেলায় আছেন হ‌ুমায়ূনও

    ফারসি ভাষা শিখল কারা

    মাউশির প্রকল্প: কাজ শুরুর আগেই গচ্চা ১১৬ কোটি

    কান্না থামেনি সেই মায়ের

    বালু তোলায় তীরে ভাঙন নদীতে যাচ্ছে ফসলি জমি

    প্রচার ও দক্ষতার অভাবে বাড়ছে না প্রবাসী শ্রমিক

    ভূমিকম্পে তুরস্ক-সিরিয়ায় মৃতের সংখ্যা ১৫ হাজার ছাড়িয়েছে

    নোয়াখালীতে ট্রলি-মোটরসাইকেল সংঘর্ষে নিহত ২

    সিএনজি চালিয়ে হাতে ফোসকা পড়েছে শ্যামল মাওলার

    দেবাশীষের বিজলী হচ্ছেন বুবলী

    মেলায় আছেন হ‌ুমায়ূনও