বৃহস্পতিবার, ৩০ মে ২০২৪

সেকশন

 
আষাঢ়ে নয়

অভিনেতা হাজতে, অভিনেত্রী থানায়

আপডেট : ৩১ ডিসেম্বর ২০২২, ০৯:৩৪

আফসানা মিমি। প্রতিদিন বেলা ১১টায় রিপোর্টার্স মিটিং। জনকণ্ঠের উপদেষ্টা সম্পাদক তোয়াব খান নিজে সেই মিটিংয়ের মধ্যমণি। গ্রীষ্ম-বর্ষা বলে কোনো কথা নেই। মিটিংয়ে গরহাজির হলে হাজারটা কৈফিয়ত, মিথ্যা বলেও পার পাওয়ার জো নেই।

সিদ্ধেশ্বরীতে থাকি। বেশির ভাগ দিনেই ১০-১৫ মিনিট হাতে নিয়ে বের হই। মোটরসাইকেলে ইস্কাটনে যেতে এর চেয়েও কম সময় লাগে। সেদিন কী মনে করে একটু আগেই বের হলাম। সিদ্ধেশ্বরীর মনোয়ারা হাসপাতাল ছেড়ে ভিকারুননিসা নূন স্কুলের মোড় পেরোলেই রমনা থানা। মনে হলো, হাতে যখন সময় আছে, একটু ঢুঁ মেরে যাই।

রমনা থানার ওসি ও সেকেন্ড অফিসার দুজনই বেশ পরিচিত। সেকেন্ড অফিসার বসতেন ভেতরের রুমে। ডিউটি অফিসারের রুমের ভেতর দিয়ে সেই রুমে যেতে হতো। ডিউটি অফিসারের রুমে ঢোকার আগে ডান পাশে হাজতখানা, একটি ছোট গলির মতো ছিল।

মোটরসাইকেল পার্ক করে ডিউটি অফিসারের রুমের দিকে আসতেই কানে এল নারী কণ্ঠের চিৎকার। তিনি বেশ চড়া গলায় কথা বলছেন। মনে হলো গলাটা খুব চেনা চেনা। একটু এগিয়ে গিয়ে দেখি, অভিনেত্রী আফসানা মিমি দাঁড়িয়ে চিৎকার করছেন। ডিউটি অফিসারের রুমে চার-পাঁচজন পুলিশ সদস্য রয়েছেন, কিন্তু তাঁরা কেউ কিছু বলছেন না। মিমি একাই বলে যাচ্ছেন তাঁর মতো করে। আর সবাই নীরবে দাঁড়িয়ে তা শুনছেন। অভিনেত্রী হিসেবে আফসানা মিমির তখন অনেক নামডাক। টিভি নাটকে ভালো অভিনয়ের সুবাদে তাঁর তারকাখ্যাতি চারদিকে। সেই অভিনেত্রীকে থানায় এভাবে চেঁচামেচি করতে দেখে একটু অবাক হলাম। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে তাঁর কথা শুনলাম। এরপর নিজের পরিচয় দিয়ে জানতে চাইলাম, কী হয়েছে।

আমার পরিচয় পেয়ে মিমি কিছুটা শান্ত হলেন। এরপর আমার অফিসের এক সহকর্মীর নাম নিয়ে বললেন, তিনি তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আমাকে ঘটনা বলতে শুরু করেছেন মিমি, ঠিক তখনই ওসি এলেন। তখন রমনা থানার ওসি ছিলেন মোজাম্মেল হোসেন। এই থানায় যোগ দেওয়ার আগে তিনি ডিবির জনসংযোগ শাখায় ছিলেন। সে কারণে সব ক্রাইম রিপোর্টার তাঁর পরিচিত। আমাকে ও আফসানা মিমিকে একসঙ্গে দেখে তিনি ধরে নিয়েছেন, আমরা দুজন একই কাজে এসেছি। রুমে ঢোকার মুখে আমাদের তাঁর সঙ্গে আসতে বললেন। ভেতরে ঢুকে ওসি বেশ বিনয়ের সঙ্গে আমার কাছে জানতে চাইলেন, অভিনেত্রীর সঙ্গে কেন থানায় এসেছি। ওসিকে বললাম, ‘আমি অভিনেত্রীর সঙ্গে আসিনি। আমরা যে যাঁর মতো এসেছি।’

ওসি এবার আফসানা মিমির কাছে জানতে চাইলেন, এত সকালে তিনি কেন থানায় এসেছেন। মিমি আর চুপ থাকতে পারছেন না। তিনি বললেন, তাঁর তিন সহকর্মীকে গত রাতে পুলিশ অন্যায়ভাবে ধরে এনেছে। তাঁদের এখনই ছেড়ে দিতে হবে। ওসি মিমির আবদার শুনে একটু চুপ হয়ে গেলেন। ওসির কথা শুনে আমার মনে হলো, পুরো ঘটনা তিনি আগেই জেনেছেন। আফসানা মিমিকে থামিয়ে দিয়ে ওসি বললেন, ‘দেখুন ম্যাডাম, মামলা হয়ে গেছে, এখন পুলিশের আর কিছুই করার নেই।’ কিন্তু মিমি এসব শুনতে চান না। তিনি তিনজনের মুক্তি চান। ওসি অনেক বুঝিয়ে-শুনিয়ে তাঁকে থামালেন, জামিনের প্রস্তুতি নিতে বললেন। জামিনের কথা শুনে মিমি চরম ক্ষিপ্ত হয়ে গেলেন। তিনি থানা থেকেই তাঁদের ছেড়ে দেওয়ার কথা আবারও বললেন।

ততক্ষণে আমি ঘটনার কিছুটা জেনে ফেলেছি। ওসি আর মিমির কথা শুনে সব আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। ঘটনা হলো, মিমি যাঁদের সহকর্মী বললেন, তাঁদের একজন হলেন নামকরা অভিনেতা আবুল কালাম আজাদ পাভেল (আজাদ আবুল কালাম)। অন্য দুজন হলেন নজরুল ইসলাম ও শাহরিয়ার। ওই তিনজনকে রাতে গ্রেপ্তারের পর থানায় রাখা হয়েছে। জানতে পারলাম, আগের রাতে মগবাজার মোড় থেকে পুলিশ তাঁদের আটক করেছিল। এরপর সারা রাত হাজতেই ছিলেন তাঁরা।

যেটা শুনলাম, সেদিন ছিল শনিবার (২০০১ সালের ১ সেপ্টেম্বর)। রাতে তাঁরা তিনজন মগবাজার থেকে শেওড়াপাড়ায় যাওয়ার জন্য ট্যাক্সি খুঁজছিলেন। তাঁদের সম্ভবত খুব জরুরি কোনো কাজ ছিল। মগবাজার মোড়ে তখন স্যালিডা ক্যাবের একটিমাত্র ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে ছিল।

চালক শাহাদত গাড়িতে বসে বিশ্রাম করছিলেন। তিনজনই গাড়ির চালক শাহাদতকে যাওয়ার জন্য বারবার বলেন, কিন্তু শাহাদত তাঁদের কথামতো যেতে রাজি হননি। এ নিয়ে শুরু হয় কথা-কাটাকাটি। একপর্যায়ে তিনজনের একজন শাহাদতের মুখে ঘুষি মেরে বসেন। এতে শাহাদতের দুটি দাঁত ভেঙে যায়। আহত শাহাদত ‘ছিনতাইকারী’ বলে চিৎকার দেন। একটু দূরে পুলিশের একটি গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল। পুলিশ সদস্যরা ঘটনা শুনে তখনই সবাইকে ধরে থানায় নিয়ে যান। রাতেই শাহাদতকে দিয়ে মামলা করানো হয়। সেই মামলায় মারধরের সঙ্গে চালকের টাকা ছিনতাইয়ের অভিযোগ আনা হয়। মামলার আসামি হিসেবে তিনজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। সকালে সেই খবর শুনে থানায় ছুটে আসেন মিমি।

যা হোক, ওসি তাঁদের ছাড়তে রাজি না হওয়ায় মিমি বিভিন্নজনকে ফোন করতে শুরু করেন। আমি অফিসে গিয়ে এ ঘটনার কথা জানিয়ে আবার থানায় ফিরে আসি। দুপুরের দিকে সবাইকে আদালতে পাঠানো হয়। মিমির সঙ্গে আদালতে যাই। সেই সময়ের নাটকের আরও অনেক মানুষ আদালতে যান। কয়েকজন নামকরা আইনজীবী আসামিদের পক্ষে দাঁড়িয়ে জামিনের আবেদন করেন। অনেকক্ষণ জেরার পর তিনজনকে জামিন দেন ম্যাজিস্ট্রেট।

তাঁর সহকর্মীরা জামিন পাওয়ার পর মিমি আমাকে বললেন, ‘কথায় আছে না, বাঘে ছুঁলে ১৮ ঘা আর পুলিশ ছুঁলে ৩৬ ঘা। আজ আমি সত্যিই ৩৬ ঘা দেখলাম।’ আমি কিছু না বলে মোটরসাইকেলে উঠলাম। হাতে সময় নেই। জ্যাম ঠেলে সময়মতো অফিসে পৌঁছাতে হবে। 

আরও পড়ুন:

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
 
    সব মন্তব্য

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    পঠিতসর্বশেষ

    এলাকার খবর

     

    জাপার হাওলাদারের সাড়া নেই, ব্যাংকে দুদকের চিঠি

    জেনারেল আজিজ ও সাবেক আইজিপি বেনজীরকে নিয়ে যা বলল যুক্তরাষ্ট্র

    শাহীন গ্রেপ্তার না হলে এমপি আনোয়ারুল হত্যার কারণ জানা যাবে না: ডিএমপি কমিশনার 

    তিন দেশে বেনজীরের সম্পদের খোঁজে দুদক

    ব্যাংকের ত্রুটিতে ৬৬২ জনের হজযাত্রায় শঙ্কা

    আনোয়ারুল আজিমের মরদেহ পাওয়ার কোনো স্পষ্ট খবর নেই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

    কনফারেন্স লিগ জিতে গ্রিক ক্লাবের ইতিহাস

    কোরবানি ঈদে মহাসড়কের পাশে বসা ২১৭টি পশুর হাট না বসাতে নির্দেশনা

    কলাপাড়ায় পৌঁছে দুর্গতদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করলেন প্রধানমন্ত্রী

    সেতু ভেঙে যাওয়ায় গোপালগঞ্জ-টুঙ্গিপাড়ার একাংশের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন

    লালন বিজ্ঞান ও কলা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক পদে চাকরি

    নতুন আঙ্গিকে এথিক নাট্যদলের ‘হাঁড়ি ফাটিবে’