Alexa
শনিবার, ২৮ জানুয়ারি ২০২৩

সেকশন

epaper
 

একটি লিফলেট ও মানবাধিকারচর্চা

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:০২

একটি লিফলেট ও মানবাধিকারচর্চা বিদেশে বসে মানবাধিকারের মধুর বাণী উচ্চারণ খুব সহজ। কিন্তু পথে-প্রান্তরে ঘুরে সাধারণ মানুষের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা পাহাড় সরানোর সমান। ঔপনিবেশিক আমলে তৈরি হওয়া আইনি-রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিপরীতে মানবাধিকারের প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবে রূপ দেওয়া কঠিন কাজ।

২০২১ সালে জাতিসংঘের স্পেশাল র‍্যাপোর্টিয়ার আইরিন খান ‘ডিসইনফরমেশন অ্যান্ড ফ্রিডম অব অপিনিয়ন অ্যান্ড এক্সপ্রেশন’ শিরোনামে তাঁর রিপোর্টটিতে লিখেছেন, অসত্য তথ্য (ডিসইনফরমেশন) গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের জন্য হুমকিস্বরূপ। একই সঙ্গে তিনি এ-ও লিখেছেন, এসব অসত্য তথ্য কঠোর হাতে দমন করাটাও মানবাধিকারের পরিপন্থী। সুতরাং অসত্য তথ্যের প্রচারণা উভয়সংকটের জন্ম দিতে পারে। এই রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, সরকারকে বাক্‌স্বাধীনতার অধিকার সুপ্রশস্ত করতে হবে, যাতে করে অসত্য তথ্য জনগণের কাছে ধরা পড়ে যায় এবং এর ক্ষতিকর প্রভাব তারা মোকাবিলা করতে পারে। অসত্য তথ্য প্রচার-প্রোপাগান্ডার হাতিয়ার বানিয়ে মানবাধিকার হরণের উদাহরণ সারা পৃথিবীতে রয়েছে। বেশি দূরে যাওয়ার প্রয়োজন হবে না। আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে অসত্য তথ্য ছড়িয়ে বৌদ্ধদের রোহিঙ্গা নিধনে প্ররোচিত করা হয়েছে। যার পরিণামে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অসত্য তথ্য প্রচারের একটি সংঘবদ্ধ চেষ্টা লক্ষ করা যাচ্ছে। গত বছরের ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট বাংলাদেশের র‍্যাব এবং এই প্রতিষ্ঠানের সাবেক ও তৎকালীন কর্মরত ঊর্ধ্বতন সাত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে স্যাংশন (নিষেধাজ্ঞা) আরোপ করে। এরই সূত্র ধরে ১০ ডিসেম্বর কিছু ভুঁইফোড় সংগঠনের উদ্যোগে লন্ডনে একটি র‍্যালির আয়োজন করা হয়েছে। এ উপলক্ষে সম্প্রতি ‘হিউম্যান রাইটস ডে র‍্যালি: হিউম্যান রাইটস ইন বাংলাদেশ-এ ক্রাই ফর হেল্প’ শিরোনামে ইংরেজিতে একটি লিফলেট প্রকাশিত হয়েছে। এতে আয়োজকেরা দাবি করেছেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে স্যাংশন দেওয়া হোক। তাঁরা লিখেছেন, ‘স্যাংশন হাসিনা অ্যান্ড হার ডেথ স্কোয়াড’। এই লিফলেটে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির বিষয়ে ভয়াবহ অসত্য তথ্য প্রচার করা হয়েছে। অবশ্য এতে তাঁরা একটি সত্য তথ্য তুলে ধরেছেন। সত্য কথাটি হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্যাংশন আরোপ করেছে। যা হোক, আয়োজকেরা তাঁদের উদ্দেশ্য পরিষ্কারভাবে লিফলেটটিতে ব্যক্ত করেছেন। তাঁরা পুরো সরকারের বিরুদ্ধে স্যাংশন চান। তাঁদের এই কর্মকাণ্ড থেকে এটি প্রতীয়মান হচ্ছে, বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক দলের সুরে তাঁরা কথা বলছেন।

ওই লিফলেটের শুরুতেই দাবি করা হয়েছে, সরকারিভাবে ৬৩১ জনকে অপহরণ ও গুম করা হয়েছে। এই তথ্যের উৎস কী? কত বছরে এই গুমগুলো হয়েছে তার কোনো উল্লেখ নেই। বাংলাদেশের একটি মানবাধিকার সংগঠনেরও ভিত্তিহীন দাবি ছিল তাদের সংখ্যার কাছাকাছি। এই সংগঠনের দাবি, ৬৩৮ জন গুমের শিকার হয়েছে। এই সংগঠনের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে হংকংভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন এএইচআরসি দাবি করেছে, ৬১৯ জন গুমের শিকার হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, এই তিনটি সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যের কোনোটিই ছয় শর নিচে নয়, যা কিনা জাতিসংঘের ডব্লিউজিইআইডি দাবি করা সংখ্যার চেয়ে ঢের বেশি। অবশ্য আমাদের এ-ও মনে রাখতে হবে, জাতিসংঘের দেওয়া গুম হওয়া মানুষের তালিকায় দুজন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন, ১০ জন পরিবারের সঙ্গে বাস করছেন এবং ২৮ জনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রয়েছে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই ২৮ জনের অধিকাংশের বিরুদ্ধে আগে থেকেই মামলা ছিল। তাঁদের কেউ মাদক মামলায়, আবার কেউ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার জন্য গ্রেপ্তার হয়েছেন। জাতিসংঘের এই তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজনকে বিভিন্ন মামলায় কারাগারে আটক অবস্থায় পাওয়া গেছে। তা ছাড়া, এই সিদ্ধান্ত টানলে ভুল হবে না যে মামলার আসামিদের মধ্যে অনেকেই আইনের আওতা থেকে পালিয়ে বাঁচার জন্য গা ঢাকা দিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত দোষীদের অপরাধের বিচার চলমান রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে সাজা দেওয়া হচ্ছে। এই আদালতের রায়ে কোনো পক্ষ সংক্ষুব্ধ হলে আপিল করার বিধান রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ১৯৭৩ সালের আইনে রাষ্ট্রপক্ষের জন্য প্রতিবন্ধকতা ছিল। ফলে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা অসম সুযোগ পেতেন। মূল আইনে রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের অধিকার ছিল না। ফলে ২০১৩ সালে কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন শাস্তি দেওয়া হলে শাহবাগ চত্বরে এই বিধানের বিপক্ষে আন্দোলন হয়। তখন বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ জনদাবির মুখে ১৯৭৩ সালের আইনটি সংশোধন করে। অথচ এই লিফলেটে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচার কার্যক্রমকে ‘বিচারিক হত্যাকাণ্ড’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। এটা স্পষ্টভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে দেশে ও বিদেশে যারা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, লিফলেট প্রচারকারীরা তাদেরই অংশ।

শাহবাগ চত্বরে সংগঠিত মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের আন্দোলনকে বানচাল করে দিতে দেশজুড়ে তাণ্ডব শুরু করে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজনৈতিক শক্তি জামায়াতে ইসলামী। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার নেমে আসে, ক্ষুণ্ন হয় তাদের মানবাধিকার। অথচ লন্ডন থেকে প্রকাশিত লিফলেটে শাপলা চত্বর ম্যাসাকার, বগুড়া ম্যাসাকার এবং সাতক্ষীরা ম্যাসাকারের নামে তিনটি মনগড়া নারকীয় হত্যাকাণ্ডের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে তৎকালীন বিরোধী দলের সরকার উচ্ছেদের রাজনীতি এবং পরে বিরোধী দলের সংখ্যাতত্ত্বের রাজনীতি মানবাধিকারের প্রতি তাদের অঙ্গীকারের চেয়ে ক্ষমতার প্রতি তাদের মোহকে স্পষ্ট করে তোলে।

সেই একই গোষ্ঠী, একই বিষয় নিয়ে আবার মাঠে নেমেছে বলে সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

বাংলাদেশে আইনের শাসনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ বিষয়ে আমাদের আরও কাজ করতে হবে। ধনী-গরিব কিংবা ক্ষমতাধর ও ক্ষমতাহীন আইনের দৃষ্টিতে সমান, আদালতে উভয়ের গুরুত্ব একই রকম হওয়া উচিত। প্রত্যেকের মানবিক মর্যাদা রক্ষা করা বিচারকের কাজ। যদিও সব ক্ষেত্রে তা হয় না। কিন্তু তাই বলে কি যখন হয় তখনো এর বিরোধিতা করতে হবে? খালেদা জিয়া একটি বড় রাজনৈতিক দলের চেয়ারপারসন হওয়ায় তিনি আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাবেন? আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার করে তাঁকে শাস্তি দিয়েছেন। তারপরও বয়স ও স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে সরকার তাঁকে প্যারোলে মুক্তি দিয়েছে। সময়ে-সময়ে প্যারোলের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।

এর চেয়ে বেশি তাঁরা কী চান? যদি লিফলেট প্রচারকারীরা বলেন, বাংলাদেশে যেটুকু আইনের শাসন আছে তা-ও উঠে যাক, তাহলে তাঁরা খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি করতেই পারেন!

বাংলাদেশে ৩৪টি টিভি চ্যানেল সম্প্রচারিত হচ্ছে। এর মধ্যে ৩০টিই বেসরকারি মালিকানাধীন, যার কয়েকটির মালিক বিরোধী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ ছাড়া রয়েছে প্রায় বার শ সংবাদপত্র। এরপরও অসত্য দাবি করা হচ্ছে যে সরকার ‘নিরপেক্ষ’ সংবাদপত্র এবং টিভি চ্যানেল বন্ধ করে দিচ্ছে। এভাবে লিফলেট থেকে আরও অনেক অসত্য তথ্যের উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। সেটা কেবল লেখাকে দীর্ঘায়িত করবে।

বিদেশে বসে মানবাধিকারের মধুর বাণী উচ্চারণ খুব সহজ। কিন্তু পথে-প্রান্তরে ঘুরে সাধারণ মানুষের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা পাহাড় সরানোর সমান। ঔপনিবেশিক আমলে তৈরি হওয়া আইনি-রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিপরীতে মানবাধিকারের প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবে রূপ দেওয়া কঠিন কাজ। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের বীর জনগণ মুক্তিযুদ্ধে নিজেদের রক্ত ঢেলে দিয়ে বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা অঙ্গীকার করেছিলাম যে এ দেশে আমরা সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করব।

আমরা সব ক্ষেত্রে সফল হতে পারিনি, কিন্তু লড়াই জারি রয়েছে। এ লড়াই একান্তই আমাদের নিজস্ব লড়াই। এ ক্ষেত্রে কোনো বিদেশি স্বার্থের প্রতিনিধিত্বকারী মানবাধিকারের ছদ্মবেশে রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কর্মকাণ্ড আমাদের আশাহত করতে পারবে না। মানবাধিকারের পক্ষে আমাদের সংগ্রাম চলবেই!

ঘৃণা ছড়ানোর অধিকার পৃথিবীর কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রই কোনো নাগরিককে দেয়নি। ঠিক একইভাবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দলিলেও কোনো ব্যক্তিকে এই অধিকার দেওয়া হয়নি। কিন্তু লন্ডনে বসে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের অপব্যবহার করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছে। বিশ্বের বিবেকবান মানুষেরা এসব কর্মকাণ্ড সমর্থন করেন না। তা ছাড়া, অসত্য তথ্য ব্যবহার করে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে স্যাংশনের দাবি করে প্রচারণা চালানোর আর যা-ই উদ্দেশ্য থাক, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা যে তাদের উদ্দেশ্য নয়—এ কথা বলা বাহুল্য। বিদেশে বসে দেশের বিরুদ্ধে অসত্য তথ্য ছড়ানো এবং দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করাটা কোনো দেশপ্রেমিক নাগরিকের পক্ষে সম্ভব নয়।

ইতিবাচক নানা সূচকে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। করোনা মহামারির সময়ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। করোনা মোকাবিলায় আমরা উন্নত বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় ভালো করেছি। প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে যেখানে পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেয়েছে, সেখানে বর্তমান সরকার দারুণ সফলতা লাভ করেছে। একই সঙ্গে এ কথাও মাথায় রাখতে হবে যে স্বাস্থ্যসেবা নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার নয়। সচেতন নাগরিক ও মানবাধিকারকর্মী সবার দাবি হওয়া উচিত, স্বাস্থ্য অধিকারকে সংবিধানে বলবৎযোগ্য অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। পাশাপাশি নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের পরিধিও বিস্তৃত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি।

তবে বিরোধী দলগুলো এবং নাগরিক সমাজেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।

লেখক: অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান, সাবেক চেয়ারম্যান, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
 
    সব মন্তব্য

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    এলাকার খবর

     
     

    ইসির সেই জয়নাল এখনো তৎপর

    কে হচ্ছেন নতুন রানি

    গোলরক্ষক বাবার স্ট্রাইকার ছেলে

    ফকিরাপুলের হোটেলগুলো ‘আদমের হাট’

    সায়েদ আলীর পরম মমতা

    শাহরুখ ফিরলেন রাজার মতোই

    ‘বৌদ্ধ সন্ত্রাসের মুখ’: মিয়ানমারের ভিক্ষু উইরাথু ফের আলোচনায়