Alexa
বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২

সেকশন

epaper
 

জেল–জুলুম আর মাহাথিরের বিশ্বাসভঙ্গের ২৪ বছর, আনোয়ার ইব্রাহিম অবশেষে প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২২, ২০:৪৯

মালয়েশিয়ার রাজা সুলতান আহমদ শাহের সঙ্গে আনোয়ার ইব্রাহিম। ছবি: এএফপি  মালয়েশিয়ার ১০ম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন আনোয়ার ইব্রাহিম। দীর্ঘ ২৫ বছরের অপেক্ষা অবসান ঘটল।  ১৯৯৮ সালেই প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু একসময়ের রাজনৈতিক গুরু আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার খ্যাত মাহাথির মোহাম্মদের কোপানলে পড়ে জীবনের দীর্ঘ সময় কারাগারে কাটাতে হয়েছে তাঁকে। ২০২০ সালে জোট করে ক্ষমতায় এলেও মাহাথির শেষ পর্যন্ত কথা রাখেননি।

কিন্তু এবার আর হতাশ হতে হয়নি তাঁকে। মালয়েশিয়ার পার্লামেন্ট দেওয়ান রাকায়েতে প্রয়োজনীয়সংখ্যক আসন না পেলেও সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া দলের প্রধান হিসেবে দেশটির সুলতান আবদুল্লাহ সুলতান আহমদ শাহ আনোয়ারকেই পছন্দ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন তিনি। 

নির্বাচনে আনোয়ার ইব্রাহিমের পাকাতান হারাপান জোট সর্বোচ্চ ৮২টি এবং ইসমাইল ইয়াকোবের ইউনাইটেড মালয়েস ন্যাশনাল জোট ৩০টি আসনে জয়ী হয়। অন্যদিকে মুহিদ্দিন ইয়াসিনের পেরিকাতান ন্যাশনাল ৭৩টি আসনে জয় পায়। মালয়েশিয়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে হলে সংসদের ২২২টি আসনের মধ্যে অন্তত ১১২টি আসনে জয় পেতে হয়। 

আনোয়ার ইব্রাহিমের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু ১৯৮২ সালে। সে বছর মাহাথির মোহাম্মদের ইউনাইটেড মালয়াস ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনে (ইউএমএনও) যোগ দেন তিনি। দ্রুত উত্থান ঘটতে থাকে তাঁর। ১১ বছর পর অর্থাৎ ১৯৯৩ সালে মালয়েশিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী হন। একই সঙ্গে দেশটির অর্থমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ধারণা করা হচ্ছিল, মাহাথিরের পর তিনিই হবেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী। 

কিন্তু তা আর হয়নি। ১৯৯৮ সালের দিকে এশিয়াজুড়ে আর্থিক সংকট দেখা দেয়। সংকট মোকাবিলার পদ্ধতি নিয়ে মাহাথির এবং আনোয়ারের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে। মাহাথির চাইছিলেন নিজের মতো করে সংকট মোকাবিলা করতে। আনোয়ার ইব্রাহিমের ভূমিকা খর্ব করতে থাকেন। আনোয়ার তখন মাহাথির সরকারের দুর্নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে থাকেন। দুজনের দূরত্ব আরও বাড়ে।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার অনুষ্ঠানে আনোয়ার ইব্রাহিম। ছবি: এএফপি  অথচ একসময় মাহাথির এবং আনোয়ার এতটাই ঘনিষ্ঠ ছিলেন যে, মাহাথির আনোয়ারকে বন্ধু এবং শিষ্য বলেও আখ্যা দিয়েছিলেন। সেই আনোয়ার ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে সমকামিতা এবং দুর্নীতির অভিযোগ এনে তাঁকে পদচ্যুত করা হয়। তবে মাহাথিরের এমন আচরণের জবাবে চুপ ছিলেন না আনোয়ারও। দেশটির অধিকাংশ মুসলিম এবং বৃহত্তর নৃগোষ্ঠীগুলোর সমর্থন আদায়ে সমর্থ হন তিনি এবং তাঁর সমর্থনে লাখো মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। 

পরের বছর অর্থাৎ ১৯৯৯ সালে সমর্থকদের নিয়ে আনোয়ার ন্যাশনাল জাস্টিস পার্টি-কিয়াদিলান নামে একটি রাজনৈতিক দল গড়েন। সে বছরই আদালত তাঁকে কারাদণ্ড দেয়। কারাদণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় আনোয়ারে দাবি করেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কিন্তু তাঁর আরজি আমলে নেয়নি আদালত।

২০০৩ সালে মাহাথির মোহাম্মদ দীর্ঘ ২২ বছর স্বেচ্ছায় প্রধানমন্ত্রিত্ব  ছাড়েন। তাঁর পদত্যাগের পর ধারণা করা হচ্ছিল, এবার আনোয়ার মুক্তি পেতে যাচ্ছেন। হয়ও তাই। ২০০৪ সালে মুক্তি পান তিনি। মুক্তির চার বছর পর আবার তাঁর বিরুদ্ধে সমকামিতার অভিযোগ আনা হয়। এ সময়ে তিনি দেশটির পার্লামেন্টে বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন। এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, তাঁকে বিরোধীদলীয় নেতার পদ থেকে সরাতেই এই চক্রান্ত। সে সময় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন মাহাথিরেরই আরেক শিষ্য ড. নাজিব রাজাক। নাজিব সরকারের সময় ২০১৫ সালে আনোয়ার ইব্রাহিমকে আবারও কারাদণ্ড দেওয়া হয়, সেই সমকামিতার অভিযোগেই।

এক সময়ের গুরু ও বন্ধু মাহাথির মোহাম্মদের সঙ্গে আনোয়ার ইব্রাহিম। ছবি: এএফপি  ক্ষমতার খেলা বড় বিচিত্র! ২০১৬ সালে এসে পাশার ছক বদলে যায়। ‘ওয়ান মালয়েশিয়া ডেভেলপমেন্ট বেরহার্ড’ কেলেঙ্কারিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের পদত্যাগ দাবি করে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন মাহাথির। আন্দোলন গড়ে তোলেন নাজিব সরকারের বিরুদ্ধে। এই সময় রাজনৈতিক দর-কষাকষির বাজারে কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি হয়ে ওঠেন আনোয়ার ইব্রাহিম। মাহাথির রাজার কাছে আনোয়ারের সাজা মওকুফের আবেদন করবেন এবং নাজিব রাজাককে অপসারণের কিছুদিন পর আনোয়ারকে প্রধানমন্ত্রী করা হবে—   দুজনের মধ্যে এই সমঝোতা হয়। 

এ পর্যন্ত ঠিকই ছিল। ২০১৮ সালের ৯ মে মাহাথির-আনোয়ারের জোট পাকাতান হারাপান নাজিবের দল ইউএমএনওর বিরুদ্ধে বিশাল জয় পায়। এর মধ্য দিয়ে মাহাথির সাবেক দলটির টানা ৬০ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। এর এক সপ্তাহের মধ্যেই আনোয়ার মুক্তি পান জেল থেকে। তবে ক্ষমতা থেকে যায় মাহাথিরের হাতেই। 

প্রতিশ্রুতি দিলেও ২০২০ সালে এসে মাহাথির আনোয়ারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করেন। আনোয়ারের দল এ নিয়ে চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। একপর্যায়ে মাহাথিরের দলের সঙ্গে জোট ভেঙে যায় এবং দেশটিতে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়। 

আনোয়ার ইব্রাহিমকে কারাদণ্ড দেওয়া প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসে তাঁর সমর্থকেরা। ছবি: এএফপি  এরই ধারাবাহিকতায় ১৯ নভেম্বর মালয়েশিয়ায় নতুন পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আর সেখানেই সবচেয়ে বেশি আসন পায় আনোয়ারের দল। নিজের নির্বাচনী আসনে মাহাথির মাত্র ৪ হাজার ৫৬৬ বা ৬ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট পেয়ে জামানত হারান। ১৯৬৯ সালের পর মালয়েশিয়ার সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো পরাজয়ের স্বাদ পান ৯৭ বছর বয়সী মাহাথির মোহাম্মদ।

অবশেষে দীর্ঘ অচলাবস্থা ভেঙে বৃহস্পতিবার (২৪ নভেম্বর) রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমঝোতার ভিত্তিতে আনোয়ার ইব্রাহিমকেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ পাঠ করান দেশটির সুলতান। 

আনোয়ার ইব্রাহিমের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারকে কেউ তুলনা করেন ‘রোলার কোস্টারের’ সঙ্গে, আবার কেউ কেউ তাঁকে তুলনা করেন দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ–বিরোধী কিংবদন্তি নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার সঙ্গে। যেমন সিঙ্গাপুরের ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের ফেলো ই সুন ওহ বার্তা সংস্থা এপিকে বলেন, ‘আনোয়ারের রাজনৈতিক সংগ্রামকে অনেকটা নেলসন ম্যান্ডেলার সঙ্গে তুলনা করা যায়। তাঁরা দুজনই নিজ দেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চালুর লক্ষ্যে নানা মাত্রায় বিচারের সম্মুখীন হয়েছেন।’

কারাবন্দী আনোয়ার ইব্রাহিম। ছবি: এএফপি  তবে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রধানমন্ত্রী হলেও বিদ্যমান পরিস্থিতি আনোয়ার ইব্রাহিমের জন্য খুব মধুর কোনো স্মৃতি দিতে পারবে বলে মনে হয় না। কারণ, দেশটি কোভিড মহামারি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক এবং জ্বালানি সংকটের কারণে বেশ খানিকটা ঝুঁকিতে রয়েছে। এ ছাড়া পার্লামেন্টেও তাঁর দলের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। এটি তাঁর জন্য বড় মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়াতে পারে। আইন প্রণয়ন, বিভিন্ন বিল পাসের ক্ষেত্রে তাঁর কোনো আধিপত্য থাকছে না। পরিণতিতে তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বই ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।

আনোয়ার ইব্রাহিম নিজেও পরিস্থিতি আঁচ করে নিজের সীমাবদ্ধতার বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন। এমনকি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার আগেই তিনি এক সাক্ষাৎকারে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছিলেন, ‘আমি আমার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে অবগত।’ 

তবে, সন্দেহ নেই মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রিত্ব আনোয়ার ইব্রাহিমের জন্য বহু কাঙ্ক্ষিত। যদিও সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় তাঁকে বলা হচ্ছে জনগণের ভোটে এবং রাজার পছন্দে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স, এপি, এনপিআর, আল-জাজিরা ও স্ট্রেইট টাইম

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
 
    সব মন্তব্য

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    এলাকার খবর

     
     

    চীনে করোনা থামাবেন নাকি বিক্ষোভ, কী করবেন সি?

    পাকিস্তানের নতুন সেনাপ্রধান নিয়োগে ‘ডাল মে কুছ কালা হ্যায়’?

    নেতানিয়াহুর প্রত্যাবর্তনে সংঘাত বাড়বে মধ্যপ্রাচ্যে?

    কেমন নেতা হবেন ঋষি সুনাক

    ব্রিটেনের রাজনীতি: ভারতীয় বংশোদ্ভূত ঋষির পক্ষে এবার কি শিকে ছিঁড়বে

    ছয় বছরে ৫ প্রধানমন্ত্রী ব্রিটেনে, কিন্তু কেন

    এসইউবি মানসম্মত শিক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে বদ্ধ পরিকর: শিক্ষামন্ত্রী

    বগুড়া রেলস্টেশনে লাইন ভেঙে যাওয়ায় ১২ ঘণ্টা পর সচল 

    ফুটবল বিশ্বকাপ

    ‘শুধু ব্রাজিল নয়, আমরা কাউকে ভয় পাই না’

    চৌকির ওপর স্ত্রী ও নিচে পড়ে ছিল স্বামী মরদেহ

    চীনে ‘টিয়ার শেলের’ জবাবে পুলিশকে ‘ব্যারিকেড’ ছুড়ল জনতা

    চট্টগ্রামের ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ ম্যাক্সনের ভারতে মৃত্যু, জানাল পরিবার