Alexa
রোববার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২

সেকশন

epaper
 

নিজের ১৫টি মহিষ নিলামে কিনে মালিকানা প্রমাণ করলেন কৃষক

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২২, ২০:৫৬

কেনার পর মহিষগুলোকে নীলবোনা গ্রামে নেওয়া হলে সেগুলো নিজে থেকেই সেন্টুর বাড়িতে ঢুকে যায়। বৃহস্পতিবার দুপুরে তোলা। ছবি: আজকের পত্রিকা নিলাম থেকে কিনে বাড়ি থেকে দুই কিলোমিটার দূরে ১৫টি মহিষকে মহাসড়কের ধারে ছেড়ে দেওয়া হয়। সরু পাকা সড়ক ধরে মহিষগুলো মালিকের বাড়ির পথ ধরে। প্রায় ২০ মিনিট হাঁটার পর মহিষগুলো ঠিকই মালিকের বাড়িতে নেমে যায়! এই যাত্রাপথে মালিকের ছেলে মহিষগুলোর পেছনেই ছিলেন। কিন্তু মহিষগুলোকে তিনি কোনোভাবেই পথের ইঙ্গিত দেননি। 

আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায় গিয়ে এ ঘটনার সাক্ষী হয়েছেন আজকের পত্রিকাসহ তিনটি জাতীয় দৈনিকের তিনজন ফটোসাংবাদিক। নিলামে মহিষগুলো কেনার সময় মালিক মো. সেন্টু চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, নিজের মহিষ তিনি নিজেই কিনছেন। কেনার পর যখন নিয়ে যাবেন তখন মহিষগুলোকে বাড়ি চেনাতে হবে না। মহিষগুলো ঠিকই তাঁর বাড়ি চলে যাবে। তাঁর এ কথার সত্যতা যাচাই করতেই তিন পত্রিকার তিনজন ফটোসাংবাদিক মহিষগুলোকে অনুসরণ করেন। 

মো. সেন্টুর বাড়ি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার নীলবোনা গ্রামে। কৃষিকাজের পাশাপাশি তিনি মহিষ পালন করেন। সেন্টুর বাড়ির সামনে দিয়ে বয়ে গেছে পদ্মা নদী। শুষ্ক মৌসুমে জেগে থাকে চর। সেই চরেই মহিষগুলো চরে বেড়ায়। বর্ষায় পদ্মায় পানি এলে মাঝচরে বাথানে থাকে মহিষগুলো। গত ৭ সেপ্টেম্বর রাতে ওই বাথান থেকেই নদীতে নেমে যায় সেন্টুর ১৬টি মহিষ। ভাসতে ভাসতে হারিয়ে যায়। ৮ ও ৯ সেপ্টেম্বর বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মহিষগুলো জব্দ করে। সেন্টুর মহিষগুলো নিজের বলে দাবি করলেও সপক্ষে প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি বলে দাবি কর্তৃপক্ষের। পরে নিলামে মহিষগুলো বিক্রি করে দেওয়া হয়। নিলাম থেকে সেন্টু মহিষগুলো কিনেছেন। আজ দুপুরে বাড়িতেও নিয়েছেন। 

মহিষগুলো বাড়ি এলে কান্নায় ভেঙে পড়েন নারীরা। বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার নীলবোনা গ্রামে। ছবি: আজকের পত্রিকা সেন্টু জানান, সীমান্ত এলাকা বলে কার বাড়িতে কয়টি গরু-মহিষ আছে তার হিসাব রাখে বিজিবি। দুটি খাতায় তা লিখে রাখা হয়। একটি খাতা থাকে মালিকের কাছে, অন্যটি বিজিবির স্থানীয় ক্যাম্পে। গরু-মহিষের হিসাব ক্যাম্প কমান্ডার লিখে রাখেন তাঁর স্বাক্ষরসহ। তাঁর খাতার ক্রমিক নম্বর-২৯। এই খাতায় তাঁর ২১টি মহিষ থাকার হিসাব আছে। ৮ সেপ্টেম্বর যখন তিনি দেখেন ১৬টি মহিষ হারিয়ে গেছে, তখন বিজিবি ক্যাম্পকে জানিয়েই খুঁজতে বেরিয়েছিলেন। এ নিয়ে সেদিনই গোদাগাড়ীর প্রেমতলী পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে একটি অভিযোগও দেন। ৮ সেপ্টেম্বর খবর পান, রাজশাহীর চারঘাটের ইউসুফপুর বিজিবি ক্যাম্প কিছু মহিষ উদ্ধার করেছে। তিনি সেখানে গিয়ে মালিকানা দাবি করেন। কিন্তু তা আমলে নেওয়া হয়নি। একই দিন দুপুরে বাঘার আলাইপুর বিজিবি ক্যাম্পে আরও কিছু মহিষ উদ্ধারের খবর পান। তিনি সেখানেও যান। কিন্তু দুই ক্যাম্প থেকেই তাঁকে মারধর করে তাড়িয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন সেন্টু। 

নিলামে কিনে বাড়িতে ফিরিয়ে আনার পর মহিষগুলোকে আদর করে খেতে দেন বাড়ির নারীরা। বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার নীলবোনা গ্রামে। ছবি: আজকের পত্রিকা সেন্টুর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুই ক্যাম্প থেকে মহিষগুলো বিজিবির ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তরে নেওয়া হয়। এরপর নিলামে বিক্রির জন্য বিজিবি সেগুলো কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের গুদামে পাঠায়। সেন্টু সেখানে গিয়েও মহিষগুলোর মালিকানা দাবি করে লিখিত আবেদন জানান। মহিষগুলো যে তাঁর সে ব্যাপারে এলাকার ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান বেলাল উদ্দিন সোহেলের প্রত্যয়নও দেন। এরপর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি তদন্ত শেষে মতামত দেয়, এই মহিষ সেন্টুর নয়। 

তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন কাস্টমসের যুগ্ম কমিশনার হাসনাইন মাহমুদ। সদস্য সচিব সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা শাহাফুল ইসলাম। সদস্য ছিলেন বিজিবির রাজশাহীর সহকারী পরিচালক নজরুল ইসলাম, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার কৌশিক আহমেদ এবং কাস্টমসের রাজস্ব কর্মকর্তা ছাবেদুর রহমান। হাসনাইন মাহমুদ ও কৌশিক আহমেদের উপস্থিতিতে গতকাল বুধবার বিকেলে রাজশাহী নগরীর দাসপুকুরে শুল্ক গুদামে ১৫টি মহিষের প্রকাশ্যে নিলাম শুরু হয়। সেখানে যান সেন্টুও। তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্থানীয় ইউপি সদস্য লিটন হোসেনও। কিন্তু তাতে কাজ হয়নি। 

নিলামের সময় মহিষগুলোর দিকে নির্বাক তাকিয়ে থাকেন কৃষক মো. সেন্টু। ছবি: আজকের পত্রিকা বুধবার আটটি মহিষ নিলাম দিয়ে কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। দুপুরের মধ্যে সাতটি মহিষ নিলামে বিক্রি হয়। প্রথম দিন যাঁরা মহিষগুলো কিনেছিলেন তাঁদের কিছু বাড়তি টাকা দিয়ে সেগুলো কিনে নেন সেন্টু। দ্বিতীয় দিন নিজেই নিলামে অংশ নিয়ে মহিষ কেনেন। মোট ১৫টি মহিষ কিনতে সেন্টুকে গুণতে হয় সাড়ে ১৩ লাখ টাকা। 

সেন্টু বলেন, তাঁর ১৬টি মহিষের বাজারমূল্য এখন অন্তত ২৫ লাখ টাকা। তিনি ১৫টি মহিষ কিনলেন সাড়ে ১৩ লাখে। এই সাড়ে ১৩ লাখ আর হারানো একটা মহিষের ক্ষতি তাঁর কাঁধে এলো। তিনি বলেন, ‘১৬টা মহিষের মধ্যে একটা কোথায় তা জানি না। নিলামে আসা ১৫টা মহিষের মধ্যে দুটি বলদ, ১৪টিই গাভী। এর মধ্যে নয়টি গর্ভবতী। ১০ দিনের মধ্যে চারটার বাচ্চা হবে। সবগুলোর বাচ্চা হওয়ার পর সাড়ে ১৩ লাখ টাকার ক্ষতিটাও উঠে যাবে। নিখোঁজ মহিষটার ক্ষতিও পুষিয়ে যাবে।’ কিন্তু এরপরও একটা ক্ষতি থেকেই গেল! এই ক্ষতিপূরণ আদায়ে মামলা করবেন বলে জানিয়েছেন সেন্টু। 

বুধবার সন্ধ্যায় রাজশাহী নগরীর দাশপুকুর এলাকায় শুল্ক গুদামে নিলামের সময় মহিষের সঙ্গে কৃষক মো. সেন্টু। ছবি: আজকের পত্রিকা তবে সেন্টুর পালের মহিষ নিলামে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কার্যালয়ের রাজশাহীর যুগ্ম কমিশনার হাসনাইন মাহমুদ। তিনি মহিষের মালিকানা তদন্তে গঠিত কমিটি এবং নিলাম কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। হাসনাইন বলেন, ‘রাজশাহী নগরীর তালাইমারী এলাকার সুজন আলী নামের এক ব্যক্তিও সাতটি মহিষের মালিকানা দাবি করেছিলেন। তাই তদন্ত কমিটি করা হয়। তদন্তে কারও মালিকানা প্রতিষ্ঠা পায়নি।’ অবশ্য মালিকানা দাবি করা ওই অন্যজন তদন্ত কমিটির সামনেও আসেননি। আজকের পত্রিকার পক্ষ থেকে খোঁজ করে ওই ব্যক্তির সন্ধান মেলেনি। ওই ব্যক্তি কখন মালিকানা দাবি করেছিলেন সেটিও জানাতে চাননি হাসনাইন মাহমুদ। 

রাজশাহী নগরীর দাশপুকুর এলাকায় শুল্ক গুদামে নিলামে তোলা হয় জব্দ করা ১৫টি মহিষ। ছবি: আজকের পত্রিকা আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে বাড়ি থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে মহিষগুলোকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। প্রায় ২০ মিনিট হেঁটে মহিষের পাল একাই সেন্টুর বাড়ি চলে যায়। এ সময় বাড়ির নারীরা কাঁদতে শুরু করেন। আদর-যত্নে খাওয়াতে শুরু করেন। মহিষগুলোর প্রত্যেকেরই আলাদা আলাদা নাম দেওয়া আছে। যে মহিষটি পাওয়া যায়নি তার নাম ফুরকানি। বাড়িতে যাওয়া মহিষগুলোকে পাগলি, ঘণ্টি, যমুনা, ময়ূরী, ফুতনসহ নানা নামে নারীদের ডাকতে দেখা যায়। নাম ধরে ডাকলেই মহিষগুলো সাড়া দিচ্ছিল। মহিষগুলোকে দেখতে গ্রামের লোকজন ভিড় জমান। একবাক্যে সবাই বলেন, এগুলোই সেন্টুর হারিয়ে যাওয়া মহিষ। খাওয়া শেষে মহিষগুলো আবার পদ্মায় নেমে গা ভাসিয়ে দেয়।

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
 
    সব মন্তব্য

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    পঠিতসর্বশেষ

    এলাকার খবর

     
     

    হাসপাতালে চিকিৎসকের অপেক্ষায় থেকে শিশু মৃত্যুর অভিযোগ, চিকিৎসকসহ আটক ২ 

    মেয়ের জিম্মায় বাড়ি ফিরলেন রহিমা বেগম

    মরীচিকা পড়া সেতুর কাজ পুনরায় শুরু, অনিয়ম নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ 

    বাবার মরদেহ বাড়িতে রেখে এসএসসি পরীক্ষায় বসেছে মরিয়ম

    ৩ কেজির ইলিশ বিক্রি হলো প্রায় ১০ হাজার টাকায়

    ১১ বছরের কন্যাশিশুকে বিয়ের আয়োজন, আটক ৭

    হাসপাতালে চিকিৎসকের অপেক্ষায় থেকে শিশু মৃত্যুর অভিযোগ, চিকিৎসকসহ আটক ২ 

    মেয়ের জিম্মায় বাড়ি ফিরলেন রহিমা বেগম

    টস হেরে ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশ, নেই তাসকিন

    স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওয়ার্ড বয়ের বিরুদ্ধে রোগীকে ধর্ষণের অভিযোগ

    ‘উপাত্ত সুরক্ষা আইন’ ঢেলে সাজানোর দাবি টিআইবির

    মরীচিকা পড়া সেতুর কাজ পুনরায় শুরু, অনিয়ম নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ