Alexa
শনিবার, ২০ আগস্ট ২০২২

সেকশন

epaper
 

স্বপ্ন হলো পূরণ, পদ্মা সেতুর উদ্বোধন

আপডেট : ২৫ জুন ২০২২, ১৫:৩১

পদ্মা সেতুর উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: ফোকাস বাংলা সেদিনও ছিল শনিবার, ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর। যেদিন পদ্মা সেতুতে প্রথম স্প্যান বসেছিল। আজ ২৫ জুন ২০২২, কাকতালীয় হলেও আবার সেই শনিবার। এই যাত্রার শুরুতে বোধ হয় শনিই ভর করেছিল। কিন্তু প্রমত্তা নদীর পানি যেভাবে সব নুড়িপাথর নিচে ফেলে এগিয়ে যায় সমুদ্রের দিকে, সেভাবেই কেটে গেছে শনির দশা, পদ্মাকে রুখতে চাওয়ার ষড়যন্ত্রও।

পদ্মা সেতুর মাওয়া প্রান্তে সুধী সমাবেশে আজ শনিবার বেলা ১১টা ৫৮ মিনিটে স্বপ্নের পদ্মা সেতুর উদ্বোধন ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে পদ্মার দুই প্রান্ত যুক্ত হয়েছে সড়কপথে।

মুন্সিগঞ্জের মাওয়া প্রান্তের সুধী সমাবেশে অংশগ্রহণ করেছেন ৩ হাজার ৫০০ জনের মতো আমন্ত্রিত অতিথি। আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার কর্মকর্তারা রয়েছেন। বিদেশি রাষ্ট্রদূত, সরকারি আমলা, রাজনৈতিক নেতারা, বিশ্বব্যাংক, এডিবিসহ নানা উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া রয়েছেন সেতুর কাজে যুক্ত থাকা বিদেশি এবং দেশের বড় বড় প্রকৌশলী। জমকালো এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে জাজিরা প্রান্তে হবে জনসভা।

বিশ্বব্যাংকের দুর্নীতির অভিযোগ, অর্থায়ন থেকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সরে যাওয়া, সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের পদত্যাগ, বাংলাদেশের টাকায় পদ্মা সেতু তৈরির ঘোষণা—সবই এখন ইতিহাস। পদ্মায় হচ্ছে না সেতু, সেই সমালোচকদের জবাব দিচ্ছে খোদ স্থাপনাই। ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার গর্বের পদ্মা সেতুতে যানবাহন চলবে রোববার সকাল ৬টা থেকেই।

স্বপ্ন দেখা শুরু
১৯৯৮ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই বুনেছিলেন এই স্বপ্নের বীজ। তবে শুরুতে এই যাত্রা ছিল বন্ধুর। বিশ্বব্যাংক ২০১২ সালের ৩০ জুন পদ্মা সেতুর ১২০ কোটি ডলার ঋণ সহায়তার চুক্তি বাতিল করে। তাদের দেখাদেখি নিজেদের সরিয়ে নেয় জাইকা, এডিবি ও আইডিবি। ঋণদাতাদের চাপ, দেশে-বিদেশে নানা সমালোচনার মুখে সরিয়ে দেওয়া হয় ওই সময়ের যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমানের দিকেও অভিযোগের আঙুল ওঠে। প্রকল্প পরিচালক রফিকুল ইসলামের নাম কাটা পড়ে। ওই সময়ের সেতুসচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্যসচিব কাজী মোহাম্মদ ফেরদৌসকে যেতে হয় কারাগারে। মাঠে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন। বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিরাও আসেন তদন্তে। এরপর ২০১২ সালের জুলাইতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দেন—নিজের টাকায় পদ্মা সেতু করবে বাংলাদেশ। সারা বিশ্ব অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখে—পারবে তো বাংলাদেশ?

২০১৪ সালের ৭ ডিসেম্বর শুরু হলো পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ। পদ্মা সেতু নির্মাণে সবচেয়ে বড় জটিলতা তৈরি হয়েছিল এর পাইল ড্রাইভিং নিয়ে। সেতুর কাজ শুরুর পর দেখা গেল, নদীর নিচে মাটির যে স্তর পাওয়া গেছে, তা পিলার গেঁথে রাখার উপযোগী নয়। এ অবস্থায় দুটি বিকল্প রয়েছে। প্রথমত, পাইল নিয়ে যেতে হবে আরও গভীরে। কত গভীরে? ১৩০ মিটার। বাকি থাকে দ্বিতীয় বিকল্প। আর তা হলো—গভীরতা কমিয়ে পাইলের সংখ্যা বাড়িয়ে দেওয়া। গোটা বিশ্বে এই পদ্ধতি প্রয়োগের নজির খুব একটা নেই।

পৃথিবীর অন্য কোথাও কোনো সেতুতে ১২০ থেকে ১২২ মিটার গভীরে পাইল প্রবেশ করাতে হয়নি। এর মধ্যে সর্বোচ্চটি ১৫০ দশমিক ১২ মিটার বা ৪৯২ দশমিক ৫ ফুট। অর্থাৎ, সেতুটি নির্মাণের জন্য এমনকি প্রায় ৫০ তলা ভবনের উচ্চতার সমান দৈর্ঘ্যের পিলার স্থাপন করতে হয়েছে।

আরেকটি রেকর্ড হলো এতে ব্যবহৃত বেয়ারিং। পদ্মা সেতু নির্মাণে পিলার ও স্প্যানের মাঝে প্রতিটি ১০০ টন ওজনের ৯৬টি বিয়ারিং ব্যবহৃত হয়েছে। বিশ্বে এর আগে এত বড় বিয়ারিং আর কোনো সেতুতে ব্যবহার করা হয়নি। এখন রিখটার স্কেলে ৯ মাত্রার ভূমিকম্পেও টিকে থাকবে সেতুটি।

নদীশাসনের কাজেও হয়েছে রেকর্ড। এই সেতু নির্মাণে ১৪ কিলোমিটার এলাকা নদীশাসনের আওতায় আনা হয়েছে। ৯ হাজার ৪০০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের এই নদীশাসনের কাজটি করেছে চায়না সিনোহাইড্রো করপোরেশন। কোনো সেতু নির্মাণে নদীশাসনের জন্য এখন পর্যন্ত এত বড় চুক্তি আর কোথাও হয়নি।

পদ্মা সেতু নির্মাণে ব্যবহৃত ক্রেনটিও রেকর্ড করেছে। প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, পিলারের ওপর স্প্যান বসাতে যে ক্রেনটি ব্যবহৃত হয়েছে, সেটি আনা হয়েছে চীন থেকে। প্রতি মাসে এর ভাড়া বাবদ গুনতে হয়েছে ৩০ লাখ টাকা। সাড়ে তিন বছরে মোট খরচ হয়েছে ১২ কোটি ৬০ লাখ টাকা। বিশ্বে এই প্রথম কোনো সেতু নির্মাণে এত দীর্ঘ সময় ক্রেনটি ভাড়ায় থেকেছে। ক্রেনটির বাজারদর ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

মূল সেতুতে ৩০টি উপকরণের ব্যবহার বেশি হয়েছে। পদ্মা সেতুতে সিমেন্ট লেগেছে আড়াই লাখ টনের চেয়ে বেশি। বাংলাদেশে তৈরি রড ব্যবহৃত হয়েছে ৯২ হাজার টনের বেশি। সেতুতে বালু লেগেছে সাড়ে ৩ লাখ টন। বিদ্যুৎব্যবস্থার জন্য সোয়া ৪ কোটি লিটার ডিজেল পোড়ানো হয়েছে। বিটুমিন লেগেছে ২ হাজার টনের বেশি। দেশে তৈরি বিদ্যুতের কেব্‌ল ব্যবহার করা হয়েছে প্রায় পৌনে ৩ লাখ মিটার এবং পাইপ ১ লাখ ২০ হাজার মিটার। পদ্মা সেতুর পাইলিংয়ের ওপরের অংশে মাটিকে বেশি ওজন বহনে সক্ষম করতে একধরনের বিশেষ সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়, যাকে মাইক্রোফাইন বা অতি মিহি সিমেন্ট বলা হয়। সিঙ্গাপুর থেকে আনা ২ হাজার টন এই সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়েছে। কংক্রিটের পথের ওপর প্রথমে দুই মিলিমিটারের পানিনিরোধক একটি স্তর বসানো হয়েছে, যা ওয়াটারপ্রুফ মেমব্রেন নামে পরিচিত। ৫৬০ টন পানিনিরোধক উপকরণ এসেছে যুক্তরাজ্য থেকে। সেতুর পাশে রেলিংয়ের অ্যালুমিনিয়ামও এসেছে যুক্তরাজ্য থেকে।

যেকোনো সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রেই এতে চলাচলকারী যানবাহনের নিরাপত্তা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোথাও ধাতব রেলিং দিয়েই কাজ সারা হয়। আবার কোথাও ব্যবহার করা হয় কংক্রিটের দেয়াল। বাড়তি নিরাপত্তার প্রয়োজন হলে সাধারণত কংক্রিটের দেয়ালকেই বেছে নেওয়া হয়, যাকে প্রকৌশলের ভাষায় প্যারাপেট ওয়াল বলে। পদ্মা সেতুতে এই প্যারাপেট ওয়াল ব্যবহার করা হয়েছে।

৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই সেতুর দুই পাশে এমন দেয়াল রয়েছে মোট ১২ হাজার ৩৯০টি। সঙ্গে অবশ্য স্টিলের রেলিংও বসছে। পদ্মা সেতুর মূল কাঠামোর পাশাপাশি সেতুর ভায়াডাক্টেও এই প্যারাপেট ওয়াল আছে। শুধু সেতুর সড়কপথেই নয়, নিচের রেললাইনের দুই পাশেও একই ধরনের প্যারাপেট ওয়াল বসানো হয়েছে।

শ্রমিক-প্রকৌশলীসহ প্রায় ১২ হাজার কর্মীর মেধা ও শ্রমে তৈরি হয়েছে পদ্মা সেতু। যদি দেশের জনসংখ্যা ১৮ কোটি ধরা হয়, তার অর্ধেকের উপকারে এলেও সাড়ে সাত শ মানুষের স্বপ্নপূরণের জন্য শ্রম দিয়েছেন পদ্মা সেতু প্রকল্পে কাজ করা একেকজন মানুষ।

সেতু প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, সেতুর কাজ শুরুর পর এক দিনের জন্যও নির্মাণকাজ বন্ধ রাখা হয়নি। লোকবলের মধ্যে চীনের শ্রমিক-প্রকৌশলী ছিলেন ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ জন। এর বাইরে সবাই ছিলেন বাংলাদেশের।

স্বপ্নের পদ্মা সেতু সম্পর্কে সবশেষ খবর পেতে - এখানে ক্লিক করুন

পদ্মা সেতু রিখটার স্কেলে প্রায় ৯ মাত্রার ভূমিকম্প সহ্য করতে পারবে। ধাক্কা সামলানোর শক্তি আছে চার হাজার ডেড ওয়েট টনেজ (ডিডব্লিউটি) ক্ষমতার জাহাজেরও। এমনকি ৬২ মিটার মাটি সরে যাওয়া, আট মাত্রার ভূমিকম্প ও জাহাজের ধাক্কা—এই তিনটি একসঙ্গে ঘটলেও সেতুর কোনো সমস্যা হবে না।

পদ্মা সেতু সম্পর্কিত আরও পড়ুন:

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
 
    সব মন্তব্য

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    এলাকার খবর

     
     

    বেঁচে থাকলে সবাই থাকে, মরলে কেউ থাকে না: প্রধানমন্ত্রী

    প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কমিটি গঠনে এমপির পরামর্শ লাগবে না

    রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল কেনার উপায় খুঁজতে বললেন প্রধানমন্ত্রী

    ৪০ এসপিকে নির্দেশনা: পরিস্থিতি অস্বাভাবিক হবে, এটা ভেবেই মাঠে নামতে হবে

    নতুন সিআইডি প্রধান মোহাম্মদ আলী, দুই কর্মকর্তাকেও পদায়ন

    মানবাধিকারকর্মীদের কথা শুনলেন জাতিসংঘের মিশেল ব্যাচেলেট

    গুরুদাসপুরে নিখোঁজের ২১ ঘণ্টা পর মরদেহ উদ্ধার

    আগামী সপ্তাহে শ্রীলঙ্কা যাচ্ছেন আইএমএফ কর্মকর্তারা

    অন্তিম গান

    টিভিতে আজকের খেলা (২০ আগস্ট ২০২২, শনিবার)

    প্রাচীন প্রাচীর

    আরও সাড়ে ৭৭ কোটি ডলারের অস্ত্র পাচ্ছে ইউক্রেন