Alexa
মঙ্গলবার, ০৯ আগস্ট ২০২২

সেকশন

epaper
 

পদ্মা সেতু: দক্ষিণাঞ্চলের সত্যিকারের ‘বাংলার ভেনিসে’ রূপান্তরের আশা

আপডেট : ২৫ জুন ২০২২, ১১:০১

বাংলাদেশের বহুল কাঙ্ক্ষিত ও স্বপ্নের পদ্মা সেতুর উদ্বোধন আজ ২৫ জুন। ছবি: হাসান রাজা বাংলাদেশের বহুল কাঙ্ক্ষিত ও স্বপ্নের পদ্মা সেতুর উদ্বোধন আজ ২৫ জুন। সকল আয়োজন শেষে আজ এ সেতু উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সেতুর মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলের সাধারণ মানুষের এত দিনের স্বপ্ন আজ দৃশ্যমান হচ্ছে। এ জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়েছে। ১৯৯৮ সালে প্রথম এই সেতু নির্মাণের স্বপ্ন দেখেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ। কিন্তু অর্থায়নের অভাবে স্বপ্ন পূরণে জটিলতার সৃষ্ট হয়। পরে নিজস্ব অর্থায়নে স্বপ্নের পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ আরম্ভ হয়।

দ্বিতলবিশিষ্ট সেতু হিসেবে নির্মিত হচ্ছে পদ্মা সেতু, যার নিচের অংশে চলবে ট্রেন এবং ওপরে চলবে সাধারণ যানবাহন। ওপরের ২২ মিটার চওড়া অংশের রাস্তাগুলো চারটি লেনে বিভক্ত। সেতুতে এশিয়ান ট্রান্সপোর্টের সড়ক ও রেলপথ যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি  নিচের অংশে ব্রডগেজ ও মিটারগেজ রেল যোগাযোগের ব্যবস্থা থাকবে। ২০১৬ সালে এই সেতুর মূল কাজ শুরু হয়। সেতু নির্মাণের দায়িত্ব পাওয়ার পর বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশের মধ্য দিয়ে কাজ অব্যাহত রাখে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি।

আজ ২৫ জুন পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের দিন। ২৬ জুন সেতু নিয়ে যান চলাচল শুরু হবে। ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পিছিয়ে পড়া ২১টি (খুলনা, বাগেরহাট, যশোর, সাতক্ষীরা, নড়াইল, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, বরিশাল, পিরোজপুর, ভোলা, বরগুনা, ঝালকাঠি, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও রাজবাড়ী) জেলার সঙ্গে রাজধানীসহ দেশের সব অঞ্চলের যোগাযোগসহ ব্যবসা ও বাণিজ্যের ব্যাপক উন্নতি ঘটবে। এতে দেশের অর্থনীতির চাকা আগের চেয়ে একটু বেশি গতিশীল হবে। 

অর্থনীতির হিসাব অনুসারে কোনো বিনিয়োগের ১২ শতাংশ রেট অব রিটার্ন হলে, তাকে সেটি আদর্শ বিবেচনা করা হয়। পদ্মা সেতুতে বিনিয়োগের ১৯ শতাংশ করে বছরে উঠে আসবে বলে বিভিন্ন হিসাবে উঠে এসেছে। এই অঞ্চলের কৃষি ক্ষেত্র সম্প্রসারণ, যাতায়াত ব্যবস্থায় গতি আসা ও পর্যটন সম্ভাবনা বাড়বে। সেতু চালু হলে দক্ষিণাঞ্চলের জিডিপি অন্তত ২ শতাংশ বাড়বে, যার দরুন সামগ্রিকভাবে দেশের জিডিপি আরও ১ শতাংশ বাড়বে। 

পদ্মা সেতুর কারণে যে যে ক্ষেত্রে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ—
ব্যবসা-বাণিজ্য: পদ্মা সেতুর নির্মাণে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে স্বল্প সময় ব্যয়ে এই অঞ্চলের উৎপাদিত সেবা ও পণ্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে। এ সুবিধা থাকায় এই অঞ্চল হবে বিনিয়োগকারীদের প্রথম পছন্দ। এরই মধ্যে এই অঞ্চলে কয়েকটি সিমেন্ট কারখানা চালু হয়েছে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম পণ্য হলো হিমায়িত মৎস্য ও পাটজাত দ্রব্য। এসব খুলনা অঞ্চলে বেশি হয়। সেতু চালু হলে সবকিছু আরও বেশি গতিশীল হবে। দেশের অর্থনীতিতে মোংলা ইপিজেড আগের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকরী ভূমিকা রাখবে। এ ছাড়া এই এলাকায় নতুন গার্মেন্টস, বিভিন্ন মিল, ফ্যাক্টরি, শিল্পকারখানা তৈরি হবে। সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতির চাকা গতিশীল করতে এই সেতু বিশেষ ভূমিকা রাখবে। 

যোগাযোগ: বাংলাদেশের ৮০ শতাংশের বেশি পণ্য আমদানি-রপ্তানি হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। ফলে ঢাকা-চট্টগ্রাম পথে সারা বছর যানজট লেগেই থাকে। এতে অনেক মূল্যবান সময় ও অর্থের অপচয় হয়। রাজধানীর সঙ্গে এই অঞ্চলের যোগযোগ হয় লঞ্চ ও ফেরির মাধ্যমে। শীতকালে নদীর পানি কমে গেলে ও কুয়াশার ফলে বেশ ভোগান্তিতে পড়তে হয়। সেতু হলে এসব ভোগান্তি থেকে মুক্তি পাবে এই অঞ্চল। অন্যদিকে দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগে সময় ও অর্থের অপচয় বহুগুণে কমবে। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্র বন্দর মোংলা ও পায়রা সচল ও গতিশীল হলে দুই বন্দরে অনেক পণ্যের আমদানি-রপ্তানি সহজ হবে। একদিকে চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরে চাপ কমবে, অন্যদিকে অর্থ ও সময়ের অপচয় কমবে। সার্বিকভাবে যোগযোগ ব্যবস্থার ওপর চাপ কমাতে ও দেশের অর্থনীতি গতিশীল করতে পদ্মা সেতু অন্যতম ভূমিকা রাখবে। 

কৃষি: বাংলাদেশের শস্যভান্ডার হিসেবে পরিচিত বরিশাল অঞ্চল। দেশের বেশির ভাগ সবজি ও খাদ্য শস্য এই অঞ্চলে উৎপাদিত হয়। কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না থাকায় অনেক সময় বিভিন্ন শস্য দূরের অঞ্চলে পাঠানো সম্ভব হয়ে ওঠে না। কিংবা পাঠালেও যোগাযোগে বেশি সময় ব্যয় হওয়ায় শস্যের ন্যায্য দাম পাওয়া যায় না। আবার শসা নষ্ট হওয়ার ভয়ও থাকে। এতে ব্যবসায়ী ও প্রান্তিক কৃষকেরা ক্ষতির মুখে পড়েন। বৃহৎ অর্থে চিন্তা করলে সার্বিকভাবে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সঠিক দাম না পেয়ে কৃষকেরা আগের তুলনায় কৃষিপণ্য উৎপাদনবিমুখ হয়ে পড়েছেন। পদ্মাসেতু এই অঞ্চলের কৃষকের দুঃখ লাঘবে বড় সহায় হবে। 

শিক্ষা: দেশের বরিশাল ও খুলনা অঞ্চলের মানুষ শিক্ষার দিক দিয়ে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে পিছিয়ে। এর মূল কারণ, রাজধানীর সঙ্গে এই অঞ্চলের বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা। অনেক সময় উচ্চশিক্ষার জন্য বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নিতে ব্যর্থ হয় এই অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা। যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন কারণে বেশির ভাগ দরিদ্র পরিবারের অনেকে শিক্ষাবিমুখ হয়ে পড়ে। এই সেতু হলে যেমন তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা পরিবর্তন হবে, তেমনি তাদের উচ্চশিক্ষার পথও অনেকটা সুগম হবে। সবকিছু মিলিয়ে সেতু চালু হলে এই অঞ্চলের শিক্ষার হার দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। এই শিক্ষিত জনগোষ্ঠী দ্বারা দেশের অর্থনীতি সচল হবে। 

পর্যটন: বাংলাদেশের ভেনিস হলো বরিশাল বিভাগ। বর্ষা মৌসুমে এই অঞ্চলের বিভিন্ন স্থান পানিতে ডুবে যায়। ফলে এক ভিন্ন ধরনের রূপ পায় এই অঞ্চল। এই প্রাকৃতিক দৃশ্য, দেশের দ্বিতীয় সমুদ্র সৈকত সাগরকন্যা কুয়াকাটা, সুন্দরবন, ষাট গম্বুজ মসজিদ, মনপুরাসহ বিভিন্ন দ্বীপের সৌন্দর্য দেখার জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসে। কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না থাকায় দ্বিতীয়বার এই অঞ্চলে আসতে চায় না পর্যটকেরা। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হলে পর্যটকদের জন্য নতুন ও বিলাসবহুল হোটেল ও কর্মসংস্থান তৈরি হবে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পর্যটক খুব সহজেই এ অঞ্চলে ভ্রমণ করতে পারবেন। এতে পর্যটন খাতের বিকাশ হবে এবং সেই সঙ্গে আঞ্চলিক পণ্যের চাহিদাও বাড়বে। ফলে বিভিন্নভাবে এই অঞ্চলের মানুষ লাভবান হবে। 

চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য: এই অঞ্চলের মানুষ সাধারণত লঞ্চ বা ফেরির মাধ্যমে রাজধানীর সঙ্গে যোগাযোগ করে। এটি বেশ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। অনেক সময় জরুরি ওষুধ ও রোগীদের স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় ভোগান্তির সৃষ্টি হয়। সঠিক চিকিৎসার অভাবে অনেকে মারাও যায়। সেতু চালু হলে খুব অল্প সময়ে রাজধানীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবে ২১টি জেলার মানুষ। জরুরি সব রোগীকে আগের চেয়ে অনেক কম সময়ে ঢাকায় নিয়ে সঠিক চিকিৎসা ও ওষুধ সরবরাহের ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে। সর্বোপরি পদ্মা সেতুর মাধ্যমে এই অঞ্চলের মানুষ অধিকতর উন্নত চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করতে পারবে।

জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন: দেশের পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের মধ্যে বরিশাল অন্যতম। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করতে না পেরে এই অঞ্চলের অনেক মানুষ রাজধানীতে পাড়ি জমায়, যাদের একটি বড় অংশ বিভিন্ন গার্মেন্টস কারখানায় কাজ করে নিম্নমানের জীবনযাপন করে। সেতু চালু হলে দুই পাশে সিঙ্গাপুর ও চীনের সাংহাই শহরের আদলে নতুন দুটি শহর তৈরির চিন্তা আছে বর্তমান সরকারের। এরই মধ্যে বিভিন্ন বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান শিল্প কারখানার জন্য জমি কিনতে শুরু করেছে। সেতুর দুই পাশে বিভিন্ন শিল্প এলাকা ও নতুনভাবে গার্মেন্টস খাতের সম্প্রসারণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে এ এলাকার জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। তরুণেরা বিভিন্ন বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত হয়ে ও নিজেরা উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে। এতে খুব দ্রুত এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন আসবে। ফলে তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হবে।

স্বপ্নের পদ্মা সেতু সম্পর্কে সবশেষ খবর পেতে - এখানে ক্লিক করুন

দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে অনেক বেশি সুযোগ-সুবিধা পাবে এই অঞ্চলের মানুষ। স্বপ্নের এই সেতু এ অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মান অনেকাংশে উন্নত করবে। একটি সেতুর মাধ্যমে গড়ে উঠতে পারে বিশ্বের উন্নত দুটি শহর। সেই সঙ্গে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর উৎপাদন, সেবা, জীবনযাত্রা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পর্যটনশিল্পের উন্নয়ন ঘটবে। নিঃসন্দেহে দেশের অর্থনীতিতে পদ্মা সেতু সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। বাংলার ভেনিস হিসেবে এবার বাস্তবে রূপ নেবে দক্ষিণের পিছিয়ে পড়া জনপদ। 

লেখক: সদস্য, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন

পদ্মা সেতু সম্পর্কিত আরও পড়ুন:

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
 
    সব মন্তব্য

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    এলাকার খবর

     
     

    কার স্বার্থে জ্বালানি তেলের আচমকা মূল্যবৃদ্ধি? 

    মধ্যরাতের মূল্যোত্থান!  

    চুষে খাবেন, নাকি চিবিয়ে? 

    পথগুলো আর আমাদের নেই? 

    পুঁজিবাদ, স্বৈরাচার ও পিতৃতন্ত্র

    বেলাল মোহাম্মদ: ইতিহাসের ট্র্যাজিক চরিত্র

    ফেনীতে ট্রাক থেকে ৩০ লাখ টাকার ইয়াবা উদ্ধার

    ‘নেমেসিস’ ব্যান্ডে আবারো ভাঙন

    কলা কেন বাঁকা

    ভরা বর্ষায় মরা মাতামুহুরি

    পার্বত্য চট্টগ্রামে সামরিক শাসন চলছে: সন্তু লারমা

    মিস ইউনিভার্স প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারবেন বিবাহিতরাও