Alexa
রোববার, ০৩ জুলাই ২০২২

সেকশন

epaper
 

বৈদেশিক ঋণ নিয়ে সংসদে আলোচনা হোক

যেকোনো বৈদেশিক চুক্তি স্বাক্ষরের আগে জাতীয় সংসদে উত্থাপনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকলেও ৫০ বছরে এ দেশের কোনো সরকারই সেটি করেনি, যা আগেও উল্লেখ করা হয়েছে।

আপডেট : ২৪ মে ২০২২, ০৮:৩২

অলংকরণ: মীম বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ নিয়ে ইদানীং দেশে অনেক কথাবার্তা হচ্ছে, বিশেষ করে শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক বিপর্যয় সংকটে রূপান্তরিত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে। বলা হচ্ছে, শ্রীলঙ্কা যথেষ্ট বাছবিচার ও সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই অযৌক্তিকভাবে ও অধিক হারে বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের জন্য যে বিপদ ডেকে এনেছে, তা থেকে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর অবশ্যই শিক্ষা নেওয়া উচিত। এ প্রসঙ্গে প্রথমেই বলা প্রয়োজন যে বাছবিচারহীন বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ করে শ্রীলঙ্কা বিপদে পড়েছে বলেই যে কেবল এ ব্যাপারে বাংলাদেশের সতর্ক হওয়া প্রয়োজন, এরূপ মনে করাটা একেবারেই অগভীর চিন্তাপ্রসূত ধারণা।

বস্তুত সরকার কর্তৃক অভ্যন্তরীণ বা বৈদেশিক যেকোনো ঋণ গ্রহণের আগেই তার সম্ভাব্য ফলাফল ও লাভ-লোকসানের বিষয়টি অনুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করি। কিন্তু সেটি এ দেশে প্রায় কখনোই হয়নি—কোনো সরকারের আমলেই নয়। বাজেটের রাজস্ব ঘাটতি পূরণের সহজ সমাধান হিসেবে সরকার যেমন যখন-তখন অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ গ্রহণ করছে, তেমনি তারা তা করছে নানা অগ্রহণযোগ্য শর্তে বিদেশ থেকেও। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা ও এর ভবিষ্যৎ ফলাফল—এসব কোনো বিবেচনা থেকেই এগুলোকে প্রায় কখনোই যাচাই-বাছাই করে দেখা হয় না।

অন্যদিকে যেকোনো বৈদেশিক ঋণ বা সহায়তা গ্রহণের বিষয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৪৫(ক) অনুচ্ছেদে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে ‘বিদেশের সহিত সম্পাদিত সকল চুক্তি রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ করা হইবে, এবং রাষ্ট্রপতি তাহা সংসদে পেশ করিবার ব্যবস্থা করিবেন।’ কিন্তু বিদেশের সঙ্গে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশ যত চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, তার সবগুলোই কি রাষ্ট্রপতির কাছে বা তাঁর মাধ্যমে জাতীয় সংসদে পেশ করা হয়েছে? এগুলো রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করা হয়েছে কি না, আমাদের মতো সাধারণ মানুষের তা জানার কথা নয়। তবে এটা মোটামুটি সর্বজন বিদিত যে বিদেশের সঙ্গে বাংলাদেশ এ পর্যন্ত যত চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, সেগুলোর খুব সামান্যই জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয়েছে বা প্রায় কোনোটিই হয়নি। ফলে এই সূত্রে এটি মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে বৈদেশিক চুক্তি স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে দলনির্বিশেষে দেশের প্রায় সব সরকারই এ পর্যন্ত একের পর এক সংবিধানের এতদসংক্রান্ত নির্দেশনা লঙ্ঘন করে এসেছে।

আত্মসমালোচনার স্বার্থে স্বীকার করা প্রয়োজন যে দলীয় স্বার্থপ্রসূত নিজস্ব প্রয়োজন ও আকাঙ্ক্ষা, বিভিন্ন ভাতা ও শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুযোগ এবং বাজেটের মতো রুটিন বিষয় ছাড়া দেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নিয়ে জাতীয় সংসদে খুব একটা সোচ্চার হতে দেখা যায় না। আর দেশের স্বার্থবিরোধী বৈদেশিক চুক্তিগুলোর অধিকাংশই স্বাক্ষরিত হয়েছে সংসদকে পাশ কাটিয়ে; উদাহরণস্বরূপ—মাগুরছড়া গ্যাসক্ষেত্র নিয়ে শেল অয়েল কোম্পানির সঙ্গে উৎপাদন বণ্টন চুক্তি (১৯৮১), কাফকো নিয়ে জাপানের সঙ্গে চুক্তি (১৯৯৫) ইত্যাদি।

আর সংসদে উত্থাপিত না হওয়া এসব বৈদেশিক চুক্তির তালিকা এতটাই দীর্ঘ যে তার পুরোটা এখানে আনতে গেলে স্থান সংকুলানের সমস্যাই শুধু তৈরি হবে না, সংশ্লিষ্টতার ব্যাপকতার কারণে এ নিয়ে নতুন করে তোলপাড় তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। অতএব সে রকম তোলপাড় সৃষ্টিকারী পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে যুক্তি ও সংবিধানের আলোকে এই উপসংহারে উপনীত হওয়া যে রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থে যেকোনো বৈদেশিক চুক্তি স্বাক্ষরের আগে তা নিয়ে সংসদে আলোচনা হতে হবে এবং সংসদের অনুমোদন নিয়ে তা স্বাক্ষর করতে হবে। নইলে তা হবে সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং জনগণের প্রতি সরকারের জবাবদিহিকে অস্বীকার করার শামিল।

যেকোনো বৈদেশিক চুক্তি স্বাক্ষরের আগে জাতীয় সংসদে উত্থাপনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকলেও ৫০ বছরে এ দেশের কোনো সরকারই সেটি করেনি, যা আগেও উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে এই সমগ্র বিষয়টিকে কীভাবে আইনগত বৈধতা দিয়ে জায়েজ করা যাবে, তা আইন বিশেষজ্ঞরা ভালো বলতে পারবেন। তবে এখানে শুধু এটুকু বলব, এতদসংক্রান্ত যেকোনো ভবিষ্যৎ উদ্যোগের ক্ষেত্রে এখন থেকে এ-জাতীয় প্রতিটি বিষয় যেন যথাযথ প্রক্রিয়া ও নিয়ম মেনে অবশ্যই জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হয় এবং তারও আগে সেগুলো নিয়ে যেন সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে বিস্তারিতভাবে আলোচনা হয়।

একটি বিষয়ের প্রতি সংশ্লিষ্ট সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার কোনো রাষ্ট্র যখন বাংলাদেশকে কোনো আর্থিক সহায়তা, ঋণ কিংবা অনুদান দেয়, তখন সেসব নিয়ে দেশগুলোর সংসদে কী কঠোর বাহাসই না আমরা হতে দেখি! এমনকি সেই সব সহায়তার আওতাধীন অর্থ কোথায় কীভাবে ব্যয় হলো, তা নিয়েও সেখানে চুলচেরা বিশ্লেষণ হয়। অথচ আমরা এ ধরনের বিষয়গুলোকে সংসদের নজরে আনতেও ন্যূনতম দায় বোধ করছি না, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে দায়বদ্ধতার এ সংস্কৃতি যত দিন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত না হবে, তত দিন পর্যন্ত মাথাপিছু আয়ের ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রগতি হলেও মর্যাদাবান সমাজ ও রাষ্ট্রের মাপকাঠিতে বরাবর আমরা পিছিয়েই থাকব। অথচ আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রামের অন্যতম চেতনাই ছিল একটি মর্যাদাবান জাতিরাষ্ট্র গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা।

আবু তাহের খান। অলংকরণ: সুজয় শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে বৈদেশিক ঋণে মেগা প্রকল্প গ্রহণের যুক্তি-অযুক্তির প্রসঙ্গটি যেহেতু সামনে এসেছে, সেহেতু সতর্কতামূলক পদক্ষেপের অংশ হিসেবেই এ ক্ষেত্রে জরুরি ভিত্তিতে তিনটি কাজ করা যেতে পারে বলে মনে করি।

এক. বৈদেশিক ঋণসহায়তার আওতায় (সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট বা সরবরাহকারী ঋণসহ) বর্তমানে যেসব মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন আছে, সেগুলোর বাস্তবায়ন অগ্রগতি সংসদে উপস্থাপন করা হোক এবং সেখানকার আলোচনার ভিত্তিতে সেগুলোর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।

দুই. ভবিষ্যতে বৈদেশিক ঋণসহায়তাপুষ্ট যেকোনো প্রকল্প গ্রহণের আগে তা জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করে সেখান থেকে মতামত গ্রহণ করা হোক।

তিন. বৈদেশিক ঋণসহায়তাপুষ্ট প্রকল্পের বার্ষিক বাস্তবায়ন অগ্রগতি প্রতিবেদন নিয়মিতভাবে জাতীয় সংসদে পেশ করে সেসবের ওপর সংসদের পরামর্শ গ্রহণ করা হোক।

আমাদের আইনপ্রণেতা ও নীতিনির্ধারকদের মনে রাখা প্রয়োজন যে জনগণের স্বার্থ ও উন্নয়নে কথা বলে অথচ তাদের না জানিয়েই ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে এসব বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ করা হচ্ছে। তার চেয়েও বড় কথা, এসব ঋণ সুদসহ জনগণকেই পরিশোধ করতে হচ্ছে। তো যাদের নামে এসব ঋণ আনা হচ্ছে বা হবে এবং এ ঋণ যাদের পরিশোধ করতে হবে, এ বিষয়ে তাদের জানার অধিকার অবশ্যই আছে বৈকি! আর ন্যায় ও ন্যায্যতার প্রশ্নে তাদের সম্মতিসাপেক্ষেই কেবল তা গ্রহণ করা যেতে পারে এবং জনগণের পক্ষে এ সম্মতি দেবে জাতীয় সংসদ। অতএব ন্যায় ও স্বচ্ছতার স্বার্থেই শুধু নয়, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণেও এখন থেকে সব বৈদেশিক ঋণ ও অন্যান্য চুক্তি স্বাক্ষরের আগে তা জাতীয় সংসদে পেশ করা হবে—এটাই প্রত্যাশা।

লেখক: পরিচালক, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইনোভেশন সেন্টার, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
 
    সব মন্তব্য

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    এলাকার খবর

     
     

    কেন অবনত আজ শিক্ষাগুরুর শির

    কোনটা জরুরি, ইভিএম না নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ?

    ফেলুদা

    মেসি বার্গার

    গরুর চর্মরোগ, দুশ্চিন্তা খামারির

    রেলক্রসের ওভারপাসে বরাদ্দ বাড়ল ১৫০ কোটি টাকা

    ২২ দিনের মধ্যে পরিবারের তিনজনের মৃত্যু

    জড়িতদের গ্রেপ্তার দাবিতে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ

    আগাম আমন রোপণের ধুম

    গিনেস বুকে নাফিস

    কাউনিয়ার ৩৭ মণের সুলতান দাম ১২ লাখ টাকা

    ব্রহ্মপুত্র গিলে খাচ্ছে বসতভিটা