Alexa
রোববার, ০৩ জুলাই ২০২২

সেকশন

epaper
 

গণতন্ত্রে পালাবদল আর মানা না-মানার গল্প

আপডেট : ২৪ মে ২০২২, ০৮:৪৩

স্কট মরিসনকে (ডানে) হারিয়ে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীর আসন পেলেন অ্যান্থনি আলবেনিজ (বাঁয়ে)। ছবি: রয়টার্স অ্যান্থনি আলবেনিজ অস্ট্রেলিয়ার ৩১তম প্রধানমন্ত্রী। শিগগিরই শপথ নেবেন তিনি। নাটকীয় এই নির্বাচনী ফলাফলে লেবার দলের বাঁধভাঙা জয় প্রমাণ করেছে, মানুষ পরিবর্তনপ্রিয়। নয় বছরের শাসনামলে লিবারেল দল যে খুব খারাপ কিছু করেছে—এমন কিন্তু নয়। বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসনের কথা বিবেচনা করলে বলতে হবে তাঁর কপালে ভালো কিছু ছিল না। শাসনামলে প্রথমে অকল্পনীয় বুশ ফায়ার। তখন আমি মাত্র দেশ ঘুরে এসেছি। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে একদিন ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষা শেষে বাড়ি ফিরতে গিয়ে দেখি, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। চারদিকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী। গলায় আটকে যাচ্ছিল কাঁটার মতো কিছু একটা। সে রাতেই দাউদাউ করে ছড়িয়ে পড়েছিল বনের আগুন। সেই দাবানল নতুন কিছু না হলেও ছিল অভাবনীয়। দাবানলের বিভীষিকা নিভতে না নিভতেই হাজির হয়েছিল যমদূত করোনা।

গোড়ার দিকে বোঝা না গেলেও অচিরেই কোভিডের থাবায় কাহিল হয়ে পড়েছিল এই দেশ। আমাদের সবচেয়ে বড় আর বাণিজ্যিক শহর সিডনি। এই শহরে ছাব্বিশ বছরের বসবাসে এমন দুর্দশা দেখিনি। এক একটা দিন যেন ভূতের শহরে পরিণত হয়েছিল এই মনোরম নগরী। সেই সময় লাখ লাখ নাগরিক-অনাগরিককে খাইয়ে-পরিয়ে রাখা সহজ কিছু ছিল না। কিন্তু লিবারেল সেটা করেছিল। অনেক সমস্যা আর সমাধানের গোলক ধাঁধায় আস্তে আস্তে অজনপ্রিয় হয়ে উঠছিল স্কট মরিসনের সরকার। কিন্তু তিনি তা মানতে চাননি। এর পরই হাজির হয়েছিল বন্যা। সে আরেক যুদ্ধ। সিডনি নগরীর প্রাণকেন্দ্র থেকে উপশহর কিছুই ছাড় দেয়নি প্রকৃতি। সেই যুদ্ধও মোটামুটি ভালোভাবে সামাল দিয়েছিল স্কট মরিসনের সরকার। এই সেদিন অনেকেই পেয়েছে মাথাপিছু এক হাজার ডলারের অনুদান। তারপরও শেষরক্ষা হয়নি।

অন্যদিকে আপাতত আত্মবিশ্বাসের অভাব মনে হওয়া লেবার নেতা আলবেনিজের জন্ম, বেড়ে ওঠা আর রাজনীতিতে থাকাই এক উপন্যাস। সিঙ্গেল মাদার নামে পরিচিত একক মায়ের সন্তান আলবেনিজ। এসব সত্য এখানে লজ্জার কিছু না; বরং গৌরবের। ভদ্রলোক তাঁর পিতাকে দেখেনওনি। কোনো এক নৌভ্রমণে তাঁর মায়ের সঙ্গে পরিচয় ও ভালো লাগা গড়ে উঠেছিল এক ইতালিয়ান মানুষের। সেই ভদ্রলোকের সঙ্গে অনিবার্য মিলনের ফলেই জন্ম হয়েছিল আলবেনিজের। কিন্তু ওই ভদ্রলোক তাঁর মাকে বিয়ে করেননি। যদিও মা হাতে একটি হীরার আংটি পরিধান করে বলতেন যে তাঁদের বিয়ে হয়েছিল। এরপর সেই মা এখানে সরকারের অনুদানে বরাদ্দ দেওয়া হাউজিংয়ের ছোট বাড়িতে থেকে তাঁকে মানুষ করেছিলেন। ভোটে জেতার পর প্রথম ভাষণে নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মুক্তকণ্ঠে বলেছেন, স্বপ্ন দেখার জন্য ধনী হওয়ার দরকার নেই। তাঁর মা তাঁকে ভালোভাবে পড়াতে পর্যন্ত পারেননি। টাকার অভাব ছিল তাঁদের। কিন্তু আজ সেই সব বাধা পায়ে দলে তিনি হয়ে উঠেছেন এ দেশের প্রধানমন্ত্রী। এসবই বিষয় ছিল বৈকি।

মূল বিষয় কিন্তু গণতন্ত্র। যেকোনো সভ্য দেশে টার্ম শেষ হলে বড়জোর আর একবার তাঁদের সুযোগ দেয় জনগণ; যাতে অসমাপ্ত কাজগুলো শেষ করতে পারেন। যেসব দেশে নাগরিক সভ্যতা আর গণতন্ত্র মেনে জীবন চলে, সেই সব দেশে এটাই নিয়ম। আমাদের কথা ভিন্ন। সেখানে জোর করে গদিতে থাকার নিয়ম। আবার না থাকলেও বিপদ। যদি সত্যিকার গণতন্ত্র বা নিয়ম মানার রেওয়াজ থাকে, তো সংসদ বা বাইরে দুই বড় দল কিংবা ততোধিক দল কথা বলে নিয়মের ভাষায়। সবকিছু ঘটে যায় নিয়মে। আমরা সেসব থেকে এখনো অনেক দূরে। এবারের নির্বাচনে যে টান টান উত্তেজনা ছিল, সেটা আমি ভোটকেন্দ্রে গিয়েই টের পেয়েছিলাম। সকাল ১০টার দিকে সেন্টারে গিয়ে এমন লম্বা লাইন আমি আগে কম দেখেছি। গেলেই দুই বড় দলের এজেন্ট বা কর্মীরা লিফলেট আর ভোট দেওয়ার পদ্ধতি লেখা এ দেশের নিয়মমতো প্রায়োরিটি কিংবা আগে-পরে কাকে কোথায় টিক দিতে হবে, সেসব নির্দেশনাসহ কাগজ গছিয়ে দেন। খেয়াল করলাম মানুষজন কৌশলে লিবারেল তথা সরকারি দলের কাগজগুলো ফিরিয়ে দিচ্ছিল। থ্যাংকস বলার ফাঁকে ফাঁকে লেবার দলের লাল কাগজপত্র নেওয়াই বলে দিচ্ছিল, পালাবদল হতে যাচ্ছে।

রাত ১০টার পর যখন পালাবদল নিশ্চিত হয়ে গেল, তখনই আমরা দেখলাম গণতন্ত্রের আসল সৌন্দর্য। একটুও বিলম্ব করেননি স্কট মরিসন। তড়িঘড়ি করে সরকারি বাসভবন ছেড়ে দিলেন। বেরিয়ে এলেন তাঁর পার্টির হেডকোয়ার্টার্সে। হেরে গেছেন বলে দমে যাননি কর্মী-সমর্থকেরা। তাঁদের স্লোগান আর জয়ধ্বনির ভেতর দিয়ে স্টেজে যাওয়া মরিসন শুরুতেই নতুন ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী আলবেনিজকে জানালেন অভিনন্দন। বললেন হৃদয় থেকে তিনি আশা করেন দেশ তাঁর হাতে লেবারের নেতৃত্বে আরও ভালো করবে। তারপর সব দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে ভাষণ দিলেন আবেগময়ী ভাষায়।

অজয় দাশগুপ্ত। অলংকরণ: সুজয় নিয়মানুযায়ী এরপর এলেন জয়ী দলের নেতা। তিনিও শুরু করলেন বিদায়ী প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়ে। তাঁর রেখে যাওয়া ভালো কাজের জন্য প্রশংসা করে বললেন, সেখান থেকেই শুরু করবে নতুন সরকার। এর ফাঁকে অতি উৎসাহী কর্মী-সমর্থকের দল স্লোগান দিতে দিতে, চিয়ার্স করতে করতে বিদায়ী দলনেতার নাম ধরে কী যেন বলছিলেন। ভাষণ থামিয়ে দিয়েছিলেন আলবেনিজ। মুহূর্তকাল পরেই গর্জে উঠলেন তিনি। পরিষ্কার করে জানিয়ে দিলেন, এমন কিছু সহ্য করা হবে না। ভদ্রতা আর শালীনতাই হবে চলার নীতি। অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। একেই বলে বড় মানুষের বড় আচরণ। কী অবলীলায় একজন পদ হারিয়ে তা স্বীকার করে সাধারণ হওয়ার গৌরব মেখে নিলেন। আর একজনকে বিজয়ের পরমুহূর্তে তাঁর বিপরীতের মানুষটির বিরুদ্ধে একটি কথাও সহ্য করলেন না। এটা অবশ্য তাঁদের ডিবেট বা তর্কযুদ্ধের সময়ও দেখেছি। তর্ক করতে করতে রাগে তপ্ত হয়ে ওঠা দুজনই পরে স্বীকার করেছিলেন, এতটা উত্তেজিত হওয়া তাঁদের উচিত হয়নি।

দুই দিন ধরে এ দেশের নির্বাচন আর ফলাফলের ঘটনাপ্রবাহে একটা কথাও বলব, কোনো দেশ বা জাতি তখনই গণতান্ত্রিক হতে পারে যদি তার গ্রহণ-বর্জনের জায়গাটুকু হয় অবারিত। থাকে পারস্পরিক শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা। আলবেনিজ তাঁর অগ্রযাত্রায় প্রথমেই তিন দেশের নেতার সঙ্গে দেখা করবেন—আমেরিকা, জাপান আর ভারত। প্রবাসী বাংলাদেশিদের বেশির ভাগ ভোট গেছে লেবারের বাক্সে। তাই আমাদেরও চাওয়া থাকবে সেই তালিকায় যোগ হোক বাংলাদেশের নাম।

আমরা গণতান্ত্রিক আর উন্নত হলে সে কাজ হতে বাধ্য।

লেখক: অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী কলামিস্ট

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
 
    সব মন্তব্য

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    এলাকার খবর

     
     

    কেন অবনত আজ শিক্ষাগুরুর শির

    কোনটা জরুরি, ইভিএম না নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ?

    ফেলুদা

    মেসি বার্গার

    গরুর চর্মরোগ, দুশ্চিন্তা খামারির

    রেলক্রসের ওভারপাসে বরাদ্দ বাড়ল ১৫০ কোটি টাকা

    ত্রাণ বিতরণের নামে নাটক করেছে বিএনপি: কাদের

    বিরলে নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে এক ব্যক্তির মৃত্যু 

    বেনাপোল নিয়ে যা বলছে ভারতের হাইকমিশন

    বড়লেখায় নৌকা ডুবে নিখোঁজ ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার  

    অন্যের পক্ষে কোরবানি করার বিধান

    ঈদের আগে পদ্মা সেতুতে চলছে না মোটরসাইকেল