Alexa
বৃহস্পতিবার, ৩০ জুন ২০২২

সেকশন

epaper
 
আষাঢ়ে নয়

ঘাতক পুলিশ, অসহায় বিচার

কামরুল হাসান
আপডেট : ২১ মে ২০২২, ০৮:৪৪

জালাল উদ্দিন মিন্টো রোডে ডিবি অফিসে ঢুকতেই পুকুরপাড়ে যে টিনশেড, তার সামনের একটি কক্ষে বসতেন মহানগর পুলিশের জনসংযোগ কর্মকর্তা, আমরা যাঁকে বলতাম এসি পিআর। তাঁর কক্ষটি ছিল বোর্ডের দেয়াল দিয়ে দুই ভাগ করা। এক পাশে তিনি দাপ্তরিক কাজ করতেন, অন্য পাশে ক্রাইম রিপোর্টাররা আড্ডা দিতেন। সেখানকার একটি ফ্রি টেলিফোনে ক্রাইম রিপোর্টাররা সিটি রাউন্ডআপের কাজও সেরে নিতেন।

ডিবিতে তখন মাত্র একজন ডিসি আলতাফ হোসেন মোল্লা বসতেন পুরোনো ভবনের দোতলার বাম দিকে। ভবনের সিঁড়ি দিয়ে উঠে ডান দিকে কক্ষটিতে বসতেন মহানগর পুলিশের দক্ষিণ বিভাগের ডিসি হাসান মাহমুদ খন্দকার। পরে তিনি র‍্যাবের ডিজি ও আইজিপি হয়েছিলেন।

তখনকার এসি পিআরের অফিস ছিল ক্রাইম রিপোর্টারদের আড্ডাস্থল; বিশেষ করে বিকেলের দিকে তাঁরা সেখানে জড়ো হতেন। সেই আড্ডা চলত সন্ধ্যা পর্যন্ত। তখন অবশ্য সংবাদপত্র অফিসের কাজও শুরু হতো সন্ধ্যার পর। স্বাভাবিকভাবেই এক দফা আড্ডা আর কিছু খবর নিয়ে সবাই অফিসে ফিরতেন। সেই সব খবরের বেশির ভাগই ছিল পুলিশের বিভিন্ন গ্রেপ্তার বা উদ্ধারের। পিআর অফিসে কেউ এলেই খান বা না খান এক কাপ চা সামনে দেওয়া হতো। অনেকে সেই চা খুব মজা করে খেতেন। অন্য সব ক্রাইম রিপোর্টারের মতো আমিও প্রায় প্রতিদিন সেই অফিসে যেতাম, তবে চা খুব একটা খেতাম না।

একদিন বিকেলে এসি পিআরের অফিসে গিয়ে শুনি, কয়েকজন চা-খোর সহকর্মী চায়ের মান নিয়ে কথা বলছেন। তাঁরা বেশ ক্ষুব্ধ। তাঁদের অভিযোগ, চা খেতে খুবই বাজে লাগছে, সঙ্গে বিশ্রী গন্ধ। এসি পিআর তখন অফিসে নেই। তিনি এলে অভিযোগ দেওয়া হবে বলে বলাবলি করছেন। আমি আর কোনো কিছু না বলে অফিসে ফিরে এলাম। এটা ছিল ১৯৯৯ সালের ২৪ মার্চ বিকেলের কথা।

পরদিন ২৫ মার্চ সকালে ফোন দিলেন পুলিশ কর্মকর্তা জেড এ মোর্শেদ। তিনি তখন দক্ষিণ বিভাগে এসি। ২০১৩ সালের ৭ মে মিরপুরে একটি গার্মেন্টসে আগুনের ঘটনায় জেড এ মোর্শেদ মারা যান। এর আগে তিনি চট্টগ্রাম জেলার এসপি ও হেডকোয়ার্টার্সের অতিরিক্ত ডিআইজি ছিলেন। তিনি ফোন দিয়ে দ্রুত ডিবি অফিসে যেতে বললেন। এসে দেখি হুলুস্থুল কাণ্ড। পুলিশের প্রায় সব বড় কর্মকর্তা সেখানে। আমি যাওয়ার মিনিট দশেক পর এলেন কমিশনার এ কে এম শামসুদ্দিন। তিনি এসে কোনো কথা বললেন না। ডিসি ডিবি তাঁকে নিজের কক্ষে ডেকে নিয়ে গেলেন। এরপর একে একে সব পরিষ্কার হতে লাগল।

দোতলা ডিবি অফিসের ছাদে যাওয়ার কোনো সিঁড়ি নেই। লোহার মই দিয়ে ছাদে যেতে হয়। সেই ছাদে ছিল পানির চারটি ট্যাংক। সেই ট্যাংকগুলোর একটিতে লাশ পাওয়া গেছে। কে বা কারা একজনকে মেরে পানির ট্যাংকে ফেলে দিয়েছে। কয়েক দিন ধরে পানিতে থাকা সেই মৃতদেহে পচন ধরেছে। এবার মনে হলো, আগের দিনে পানির দুর্গন্ধ নিয়ে যে অভিযোগ শুনেছিলাম—আসলে সেই দুর্গন্ধের উৎস ছিল এই মৃতদেহ। সেটি উদ্ধারের পর ডিবির পুকুরপাড়ে কয়েকজন বমি করতে থাকেন, কয়েকজন অসুস্থ হয়ে পড়েন।

ডিবির একজন সদস্য বললেন, আগের দিন রাত ১১টার দিকে ডিসি আলতাফ হোসেন মোল্লার এক বন্ধু এসেছিলেন। তিনি পানি খেতে গিয়ে বমি করে ফেলেন। এরপর ডিসি নির্দেশ দেন পানিতে দুর্গন্ধের উৎস খুঁজে দেখতে। সকালে পানির লাইনের মিস্ত্রি এসে খুঁজতে গিয়ে মৃতদেহের সন্ধান পান। এ ঘটনার এক বছর আগে ডিবি পুলিশের নির্যাতনে রুবেল নামের এক শিক্ষার্থী মারা যান। সেই রেশ তখনো চলছিল। এর মধ্যে নতুন করে পানির ট্যাংকে মৃতদেহ পাওয়ার ঘটনা নিয়ে রীতিমতো হইচই পড়ে যায়। পুলিশ সদর দপ্তর ডিআইজি আবুল কাশেমকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করে দিল।

মৃতদেহ উদ্ধারের ঘটনা নিয়ে রমনা থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) এস এম আলী আজম একটি মামলা করলেন। সেই মামলার তদন্তের দায়িত্ব পেলেন সিআইডির এএসপি মুন্সি আতিকুর রহমান। মুন্সি আতিক এর আগে রুবেল হত্যা মামলার তদন্তকারী ছিলেন। তিনি আমাদের সঙ্গে খুবই ভালো ব্যবহার করতেন, কিন্তু সহজে কোনো তথ্য দিতেন না।

ডিবিতে সে সময় কয়েকজন এসি ও ইন্সপেক্টর ছিলেন, যাঁরা দম্ভ করে নিজেদের ‘ঢাকার মালিক’ বলে পরিচয় দিতেন। তাঁরা বিভিন্ন অনৈতিক কাজে যুক্ত ছিলেন। এগুলোর একটি ছিল সোনা ও ডলার আটকের পর তা আত্মসাৎ করা। পুলিশের ভাষায় একে বলে ‘সামারি’ কেস। এই কর্মকর্তারা একাধিক সোর্স রাখতেন। সেসব সোর্স সোনা ও ডলার পাচারের খবর এনে দিতেন। তাঁরা অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করা সোনা ও ডলার আত্মসাৎ করতেন। এ নিয়ে সে সময় অনেক প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে।

একটি ঘটনায় তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর এক ইন্সপেক্টরকে পদাবনতি করে সাবইন্সপেক্টর করা হয়। ডিবির ছাদের পানির ট্যাংকে মৃতদেহটি উদ্ধারের পর সে আলোচনাই জোরালো হয়ে ওঠে। অবশ্য কয়েক দিনের মধ্যে এটি সত্যি বলে প্রমাণিত হয়। মৃতদেহ উদ্ধারের পাঁচ দিন পর মোহাম্মদপুর থেকে আব্বাস উদ্দিন নামের এক যুবক এসে বলেন, নিহত ব্যক্তি তাঁর বাবা। নাম জালাল উদ্দিন। তিনি ডিবির সোর্স ছিলেন। ৪ এপ্রিল সিআইডি তাঁকে দিয়ে আরেকটি মামলা করায়।

এরপর তদন্ত সহজ হয়ে যায়। ধীরে ধীরে সবই বের হতে লাগল। ডিবির সে সময়ের ডাকসাইটে ইন্সপেক্টর জিয়াউল হাসানকে ১৯৯৯ সালের ৭ এপ্রিল গ্রেপ্তার করা হলো। অনেকেই ভেবেছিলেন, জিয়াউলের মতো ক্ষমতাধরের গায়ে কেউ হাত দিতে পারবে না।

একদিন গেলাম লালমাটিয়ায়, জালালের বাসায়। জালালের ছেলে আব্বাস আমাকে বললেন, তাঁর বাবা ভাড়ায় মাইক্রোবাস চালাতেন। ডিবি পুলিশ কোনো গাড়ি রিক্যুইজিশন করলে সে গাড়ি চালানোর জন্য তাঁর বাবাকে ডাকা হতো। ওই কারণে ডিবি অফিসের সঙ্গে তাঁর সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। ডিবির ইন্সপেক্টর জিয়াউল হাসান ও এসআই আরজু প্রায়ই তাঁকে ডেকে নিতেন। ১৯৯৯ সালের ২০ মার্চ মোহাম্মদপুর থানাধীন লালমাটিয়ার বাসা থেকে গাড়ির লাইসেন্স ও চেকবই নিয়ে রাত তিনটায় ডিবি অফিসের উদ্দেশে বের হন জালাল। তারপর কয়েক দিন বাড়িতে না ফেরায় পরিবারের ধারণা ছিল, তিনি ঢাকার বাইরে গেছেন।

৩১ মার্চ কয়েকজন লোক বাসায় এসে জালালের ছবি দেখিয়ে পরিচয় জানতে চান। তিনি বললেন, তাঁর বাবা অবৈধ স্বর্ণ, হেরোইন ও মাদক চোরাচালানের খবর এনে জিয়াউল হাসানকে দিতেন। বিনিময়ে ভালো পারিশ্রমিক পেতেন। কিছুদিন যেতে না যেতেই সেই পারিশ্রমিক কমে যায়। এরপর তিনি জিয়াকে খবর না দিয়ে অন্য দলকে খবর দিতে শুরু করেন। এতে জিয়া ক্ষুব্ধ হন। পরে তদন্তে জানা যায়, সেদিন জালালকে এনে মারধর করার একপর্যায়ে তিনি মারা যান। এই অবস্থায় মৃতদেহ লুকানোর জায়গা না পেয়ে ছাদে পানির ট্যাংকে ফেলে দেওয়া হয়। তাঁদের ধারণা ছিল, এই ট্যাংক পরিত্যক্ত। ওই সময় ছাদের চারটি ট্যাংকের দুটি পরিত্যক্ত ছিল।

যাহোক, পরে সে মামলার তদন্ত শেষ হয়। সিআইডি ডিবির পরিদর্শক মো. জিয়াউল হাসান, হাবিলদার মো. বিল্লাল, কনস্টেবল আবদুর রউফ, আনোয়ার হোসেন ও আবদুল মালেককে আসামি করে অভিযোগপত্র দেন মুন্সি আতিক। তাঁদের মধ্যে আনোয়ার হোসেন পরে মারা যান। মালেক প্রথম থেকেই পলাতক ছিলেন। তিন আসামির সবাই অবশ্য পরে জামিনে বেরিয়ে আসেন।

এ গল্প এখানেই শেষ হতে পারত, কিন্তু সমস্যা হয় বিচার শুরুর পর। কোনোভাবেই আর বিচার এগোয় না। এ নিয়ে সংবাদপত্রে অনেক লেখালেখি শুরু হয়। গাফিলতির অভিযোগ ওঠে মহানগর দায়রা জজ আদালতের তৎকালীন রাষ্ট্রপক্ষের ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে। তখন পিপি ছিলেন সাবেক মন্ত্রী কামরুল ইসলাম। বিচারপতি আলী আসগর খান ও বিচারপতি এস কে সিনহার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ ২০০১ সালের ২৮ জানুয়ারি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কামরুল ইসলামকে বাদ দিয়ে মামলাটির দ্রুত নিষ্পত্তি করতে বলেন। কিন্তু মামলার সাক্ষী আর আসে না, আজও আসেনি। দিনের পর দিন যায়, কোনো সাক্ষী আর আসে না। এখনো সেই অবস্থায় পড়ে আছে মামলাটি।

গতকাল ‘আষাঢ়ে নয়’ লেখার আগে ফোন দিয়েছিলাম মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মুন্সি আতিকুর রহমানকে। তিনিও জানেন না মামলার কী হাল। তাঁর কথা শুনে মনে হলো, এখানে বিচারের বাণী শুধুই কাঁদে, কিন্তু সে কান্না কারও কান অব্দি আর পৌঁছায় না।

আরও পড়ুন:

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
 
    সব মন্তব্য

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    এলাকার খবর

     
     

    জুনে ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির শিকার ৭৬ জন আত্মহত্যা করেছেন

    পদ্মা সেতুর নাট-বল্টু খোলায় আরেকজন গ্রেপ্তার

    শিক্ষককে জুতার মালা পরানোর বিচার বিভাগীয় তদন্ত চেয়ে রিট

    বিদেশিদের জন্য দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে ব্যয়বহুল শহর ঢাকা

    মানবতাবিরোধী অপরাধ: হবিগঞ্জের শফির মৃত্যুদণ্ডসহ ৩ জনের আমৃত্যু কারাদণ্ড

    এক দিনে আরও ৪০ ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত

    এই সরকার জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে: আব্দুল আউয়াল মিন্টু

    কোম্পানীগঞ্জে বেপরোয়া গতির বাস ঢুকে পড়ল দোকানে, আহত ১০

    নির্বাচনে দায়িত্ব পেতে টাকা দিতে হয়েছে ভিডিপি সদস্যদের

    ‘স্নেক আইল্যান্ড’ থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করেছে রাশিয়া

    খাদ্যাভ্যাস ঠিক থাকলে হাসপাতালে যেতে হয় না: আরেফিন সিদ্দিক

    প্রধান শিক্ষকের কক্ষে পেটে ছুরি ঢুকিয়ে যুবকের আত্মহত্যার চেষ্টা