Alexa
শনিবার, ১৩ আগস্ট ২০২২

সেকশন

epaper
 
আষাঢ়ে নয়

রাষ্ট্রের মদদেই তাঁর উত্থান নিজের দোষে পতন

কামরুল হাসান
আপডেট : ১৬ মে ২০২২, ২০:০০

নাজিম উদ্দিন নাজিম। নিকুঞ্জ-২ আবাসিক এলাকায় তখনো সেভাবে বসবাস শুরু হয়নি। এখন যেখানে ঢাকা রিজেন্সি হোটেল, সেখান থেকে পেছনের দিকে ৮-১০টি সড়কে কেবল বাড়িঘর উঠেছে। নাগরিক টেলিভিশন ভবনের সামনের সড়কটি তখন ছিল বসতির শেষ মাথা। তারপরে খোলা মাঠ, সেখানে দাঁড়ালে দূর থেকে উড়োজাহাজের ওঠানামা দেখা যেত।

এই সড়কগুলোর যেকোনো একটি বাড়ির খোঁজে সকাল থেকে আমরা ২-৩টা করে চক্কর দিয়েছি, কিন্তু খোঁজ মেলেনি। আমরা মানে, আমি আর আমার মোটরবাইকের পেছনে বসা পারভেজ খান, একটি জাতীয় দৈনিকের ক্রাইম রিপোর্টার।

আমাদের কাছে খবর ছিল, নিকুঞ্জ এলাকার কোনো একটি বাড়িতে সে সময়ে ঢাকার নামকরা এক সন্ত্রাসী তাঁর বান্ধবীসহ মারা গেছেন অথবা তাঁকে মেরে ফেলা হয়েছে। বান্ধবীর মৃত্যু ঢাকা মেডিকেলে হওয়ায় আমরা তাঁর নাম জানতে পেরেছি, কিন্তু সেই সন্ত্রাসীর নাম বা তিনি কোথায় মারা গেছেন, তা কেউ বলতে পারছে না। প্রথমে আমাদের ধারণা ছিল, সেই নারীর পরিবারকে ধরে সন্ত্রাসীর নাম-ঠিকানা বের করব। কিন্তু হাসপাতালের কাগজে নাম ছাড়া নারীর কোনো ঠিকানা নেই। মারা যাওয়ার পর কেউ তাঁর লাশও নিতে আসেনি। দুদিন ধরে মৃতদেহ হাসপাতাল মর্গে পড়ে আছে। পারভেজ খানের শক্ত সোর্স, সেই সোর্স বলেছেন, নিকুঞ্জের একটি বাড়িতেই এ ঘটনা ঘটেছে। সেই ভরসায় আমরা গলদঘর্ম হচ্ছি। এটা ১৯৯৯ সালের ১৮ মের ঘটনা।

ঘণ্টা দুয়েক ঘুরে ক্লান্ত হয়ে একটি চায়ের দোকানে বসার পরই মনে হলো, কৌটায় লুকানো ভ্রমরের খোঁজ পেয়ে গেছি। সেই দোকানি একটি বাড়ি দেখিয়ে বললেন, ওই বাড়িতে এ ঘটনা ঘটেছে। কীসের চা খাওয়া—গেলাম সেই বাড়িতে। ৫ নম্বর সড়কের চারতলা বাড়িটির উত্তর দিকে একটি ফ্ল্যাটে সেই ঘটনা। তিনতলায় বাড়িওয়ালা থাকেন, কিন্তু তিনি কিছুই বললেন না। পাশের এক ভাড়াটে বললেন, দুদিন আগে এক তরুণী এবং এক পুরুষ মদ পান করে অসুস্থ হওয়ার পর হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তিনি তাঁদের নাম জানেন না। কোন হাসপাতালে গেলেন—প্রশ্ন করতেই তিনি বললেন, যাওয়ার সময় তাঁরা বেবিট্যাক্সিচালককে মহাখালীর মেট্রোপলিটান মেডিকেল সেন্টারের নাম বলেছিলেন।

এই তথ্যটুকু আমাদের খুব কাজে দিল। এলাম মহাখালী বাস টার্মিনালের উল্টো দিকে মেট্রোপলিটান মেডিকেল সেন্টারে। ভাড়াটের দেওয়া বিবরণ মিলে গেল। দুদিন আগে নারী-পুরুষ এসেছিলেন। তাঁদের একজনের নাম জেসমিন আক্তার, আরেকজনের ছালাউদ্দিন। হাসপাতালে আসার পর পুরুষটি মারা গেছে, নারীকে তাঁরা ঢাকা মেডিকেলে পাঠান। ঠিকানা বলতে, খাতায় লেখা আছে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল।

ছালাউদ্দিন নামটি আমাদের পরিচিত নয়। এই নামে কোনো সন্ত্রাসী ঢাকায় আছে, মনে করতে পারছি না। তবু মনে হলো, টানেলে আলোর রেখা দেখা দিয়েছে। আমরা একটু একটু করে তথ্যের মালা গাঁথতে শুরু করেছি।

পারভেজ খান আমাকে বললেন, বন্ধু, এবার চলো সায়েদাবাদে, দেখি কে মারা গেছে। এলাম সায়েদাবাদ টার্মিনালে। এখানে সবকিছুই স্বাভাবিক। কিছু হয়েছে, তা কেউ বলছেন না। এক পরিবহননেতাকে আড়ালে ডেকে পারভেজ খান অনেকক্ষণ কথা বললেন, তিনি টার্মিনালের পাশে একটি বাড়ি দেখিয়ে বললেন, ওই বাড়িতে গেলেই সব জানতে পারবেন। গেলাম ১০/২ নম্বর বাড়িতে। বাড়িটি চারতলা। নিচতলায় এক লোককে পেয়ে জানতে চাইলাম, দোতলায় কে থাকেন। তিনি যাঁর নাম বললেন, তা শুনে আমরা চমকে গেলাম। বললেন, এই বাড়িতে থাকতেন সায়েদাবাদের সে সময়ের ত্রাস নাজিম উদ্দিন নাজিম। দুদিন আগে তিনি হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন। বাড়িতে তাঁর স্ত্রী-সন্তান আছে। নাজিমের নাম শুনেই বড় খবরের গন্ধ পেয়ে গেলাম। এতক্ষণের পরিশ্রমের মাশুল মিলল।

দোতলার উঠে দেখি বাড়িতে অনেক লোক, বেশির ভাগের চেহারা সন্ত্রাসীর মতো। কিন্তু সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তাঁরা আমাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করলেন। বসতে দিলেন। আমরা নাজিমের স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে চাইলাম। তিনি ভেতরে আছেন, অপেক্ষা করতে বললেন।

এবার নাজিমের কথা বলি। তখন এরশাদ ক্ষমতায়। রোজই হরতাল, অবরোধ হচ্ছে। এরশাদের পক্ষে একশ্রেণির পরিবহননেতা হরতাল উপেক্ষা করে রাস্তায় গাড়ি চালাতে চাইলেন। তাঁরা পরিবহনশ্রমিকদের হাতে অস্ত্র তুলে দিলেন, যাতে কেউ বাধা দিলেই ব্যবস্থা নেওয়া যায়। এরশাদের পক্ষে সন্ত্রাসী দলের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য দুই যুবককে বাছাই করা হলো। একজনের নাম নাজিম উদ্দিন, আরেকজন মুন্না। এসব করে এরশাদ ক্ষমতায় থাকতে থাকতেই তাঁরা বিপুল অর্থের মালিক হয়ে গেলেন।

এরশাদের পতনের পর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি তাঁরা পরিবহননেতা বনে গেলেন। বাসের হেলপার থেকে ঢাকা-সিলেট রুটের এনপি পরিবহনের অংশীদার হয়ে গেলেন নাজিম। কিন্তু স্বভাব গেল না। শুরু করলেন চাঁদাবাজি আর সন্ত্রাস। প্রথমে নাজিম আর মুন্না একসঙ্গে, পরে দুজন প্রতিপক্ষ হয়ে গেলেন। তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতা দিলেন কয়েকজন পরিবহননেতা। তখন দুই গ্রুপের মধ্যে গোলাগুলি আর বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনা ছিল নিত্যদিনের। পুলিশের তালিকায় দুজনই হয়ে গেলেন সন্ত্রাসী।

১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর মির্জা আব্বাসের লোকজন সায়েদাবাদে ঢোকার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলো। প্রথম দফা আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে গ্রেপ্তার হন নাজিম। কিছুদিন জেল খেটে বেরিয়ে এসে সায়েদাবাদের পরিবহন সন্ত্রাসীদের এক জোট করলেন। পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে নিকুঞ্জ এলাকায় একটি বাসা ভাড়া নিলেন। আমরা যে বাসার খোঁজ করছিলাম, সেটাই ছিল নাজিমের গোপন আস্তানা।

নাজিমের স্ত্রীর নাম নাসিমা আক্তার পপি। তাঁর এক সন্তান নাঈম। খুবই সাধারণ গৃহবধূ। তিনি কোনো রাখঢাক না করেই সব বলতে শুরু করলেন। ৫-৬ জন তাঁকে ঘিরে আছে।

আমরা যেদিন তাঁর বাড়িতে যাই, সেটা ছিল ১৯৯৯ সালের ১৮ মে, মঙ্গলবার। নাসিমা বললেন, এর দুদিন আগে ১৬ মে দুপুরের দিকে নিজের গাড়িচালক স্বপনকে সঙ্গে নিয়ে বের হন নাজিম। যাওয়ার সময় ম্যানেজার সেলিম, বন্ধু শামীম, কর্মচারী আজিজুল এবং শ্যালক ওমর ফারুক সঙ্গে ছিলেন। তাঁরা নিকুঞ্জে যাচ্ছিলেন। মালিবাগে যাওয়ার পর সেই গাড়িতে ওঠেন জেসমিন নামের এক তরুণী। জেসমিন আগে থেকেই রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁদের নিকুঞ্জে নামিয়ে দিয়ে গাড়িটি চলে আসে। নাসিমার কথা বলার সময় শ্যালক ওমর ফারুক পাশে ছিলেন। বাকিটা বললেন তিনি।

ওমর ফারুক বললেন, রাতের বেলা তাঁরা বাসায় মদ পান করছিলেন। এক দফা মদ ফুরিয়ে গেলে গভীর রাতে উত্তরার একটি বাড়িতে গিয়ে আবার মদ নিয়ে আসেন। সেটা খেয়ে নাজিম, জেসমিন ও আজিজুল অসুস্থ হয়ে পড়েন। সকালে তাঁদের মহাখালীর মেট্রোপলিটান মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। সেখানে নাজিমের নাম বলা হয় ছালাউদ্দিন। পরে নাজিম মারা যান। জেসমিন ও আজিজুলকে পাঠানো হয় ঢাকা মেডিকেলে। পরে তাঁরাও মারা যান। এরপর তাঁরা নাজিমের লাশ গোপনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ এসে লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। পরে নাজিমের গাড়িচালককে দিয়ে পুলিশ একটি অভিযোগ লিখিয়ে মদপানে মৃত্যুর মামলা করে।

নাসিমার কাছে জানতে চাইলাম, জেসমিনকে চেনেন? তিনি মাথা নাড়লেন, কিছু বললেন না। বোঝা গেল, স্বামীর এ কর্মকাণ্ডে তিনি খুবই বিরক্ত। বললেন, জেসমিনের বাবার নাম আওলাদ হোসেন। সিপাহিবাগে বাসা। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবস্থাপনা বিষয়ে পড়েছে। তাঁর সঙ্গে নাজিমের বৈবাহিক কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু দুজন একসঙ্গে থাকেন। এটা নিয়ে কেউ কিছু বলতে পারে না। তিনি খুব বিরক্তি নিয়ে বললেন, ‘লেখাপড়া জানা একটি মেয়ে আমার স্বামীর রক্ষিতা।’ নাসিমার দিকে তাকিয়ে মনে হলো, তিনি গোপন কিছু বলতে চান, কিন্তু পারছেন না। আমি তাঁকে বললাম, আপনি কি আলাদা কিছু বলতে চান? তিনি মাথা নাড়লেন, আমি সবাইকে বের হয়ে যাওয়ার অনুরোধ করতেই তাঁরা সরে গেলেন। নাসিমা এদিক-ওদিক তাকিয়ে বললেন, মদের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে তাঁদের মেরে ফেলা হয়েছে। এটুকু বলতেই লোকজন চলে এলেন। তিনি কথা বন্ধ করলেন।  

আমাদের কথা শেষ। পেটে প্রচণ্ড ক্ষুধা। সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের পূর্ব দিকের এক রেস্তোরাঁয় ডাল, মাংস আর রুটি খেয়ে আমরা যখন বের হলাম, তখন বিকেল হয়ে গেছে। পরের দিন সেই খবর ফলাও করে ছাপা হলো।

আজকের ‘আষাঢ়ে নয়’ লেখার আগে ফোন দিলাম পরিবহননেতা খন্দকার এনায়েত উল্যাহকে। নাজিমের কথা উঠতেই বললেন, নাজিম মারা যাওয়ার কিছুদিন পর মুন্নাও অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করে। একপর্যায়ে সেও মারা যায়। দুই সন্ত্রাসীর মৃত্যুর পরই সায়েদাবাদ টার্মিনাল শান্ত হয়। আজকের সায়েদাবাদ টার্মিনাল দেখলে বোঝাই যায় না, একটা সময় এখানে বন্দুকযুদ্ধ ছিল নিত্যদিনের ঘটনা।
মনে পড়ে গেল সেই পুলিশ কর্মকর্তার কথা, আসলেই সন্ত্রাসীদের চুল পাকে না। তার আগেই প্রতিপক্ষের হাতে প্রাণ যায়।

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
 
    সব মন্তব্য

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    পঠিতসর্বশেষ

    এলাকার খবর

     
     

    প্রথম দক্ষিণ এশীয় হিসেবে ‘মিলেনিয়াম লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ পেলেন স্থপতি মেরিনা

    প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় একমত ঢাকা-দিল্লি

    জ্বালানি সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বসবেন প্রধানমন্ত্রী

    ডেঙ্গুতে মৃত্যু নেই, হাসপাতালে ভর্তি ৯২ 

    করোনায় আরও একজনের মৃত্যু, শনাক্ত ১৯৮ 

    চার বছরের অচলায়তন ভেঙেছে, মালয়েশিয়ায় পৌঁছেছেন ৫৩ জন কর্মী

    ধর্ষণের অভিযোগে খুবি শিক্ষার্থী গ্রেপ্তার

    প্রথম দক্ষিণ এশীয় হিসেবে ‘মিলেনিয়াম লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ পেলেন স্থপতি মেরিনা

    মাদারগঞ্জে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী ঘোড়া দৌড় প্রতিযোগিতা

    আর্জেন্টিনায় উগ্র সমর্থকদের ক্ষোভের আগুনে পুড়ে ছাই ফুটবলারদের গাড়ি

    দেশে-বিদেশে সর্বত্রই ধিক্কৃত হচ্ছে সরকার: মির্জা ফখরুল

    ভেড়ামারায় ফিলিং স্টেশনে অগ্নিকাণ্ড, নিহত ২