Alexa
শনিবার, ২২ জানুয়ারি ২০২২

সেকশন

epaper
 

আমেরিকার চাপ প্রয়োগের কৌশল?

আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০২২, ০৯:৪২

২০১৬ সালের পর দেশে জঙ্গিবাদী সন্ত্রাস অনেকখানি কমে গেছে। স্বস্তি ফিরে এসেছে জনমনে। একটি জঙ্গিবিরোধী অভিযানে র‍্যাব ও পুলিশ সদস্যরা সম্প্রতি বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে বড়সড় ফাটল দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জো বাইডেন ২০২০ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ২০২১ সালের ২০ জানুয়ারি ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই বিভিন্ন আলামত থেকে বোঝা যাচ্ছিল, বাংলাদেশের বর্তমান সরকার সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের দৃষ্টিভঙ্গি খুব বন্ধুসুলভ নয়। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময় থেকেই ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বর্তমান সরকারের বৈরী আচরণ তখনকার মার্কিন প্রশাসনের কাছে মোটেও গ্রহণযোগ্য ছিল না। তদানীন্তন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ব্যাপারটি সহজে ভুলে যাওয়ার কথা নয়! ২০২১ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর হয়তো এই ইস্যুতেই শেখ হাসিনার প্রতি নেতিবাচক মনোভাব প্রদর্শন করে আসছিলেন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। এতদসত্ত্বেও মার্কিন পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিতে যোগদানের আমন্ত্রণ জানানো হলো। এর আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আমলে বাংলাদেশকে মার্কিন সরকার মার্কিন নেতৃত্বাধীন চীনবিরোধী সামরিক জোট ‘কোয়াডে’ যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিল, যে আমন্ত্রণ বাংলাদেশ প্রত্যাখ্যান করেছিল। কোয়াড ছিল যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার প্রস্তাবিত সামরিক জোট। কিন্তু বাংলাদেশ ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিতেও যোগদানের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করায় যুক্তরাষ্ট্র এখন সরাসরি বাংলাদেশবিরোধী অবস্থানে চলে গেছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। এই মার্কিন প্রস্তাবে বাংলাদেশ সাড়া না দেওয়ায় ভারতও বিলক্ষণ নাখোশ হয়েছে। ভারতও হয়তো মনে করছে, বাংলাদেশ ক্রমেই চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। এরপর ২০২১ সালের ডিসেম্বরেই বাংলাদেশের র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) সাতজন সাবেক ও বর্তমান শীর্ষ কর্মকর্তার ওপর যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করল, যা বিশ্বে বাংলাদেশের ইমেজকে বড় ধরনের বিপদে ফেলে দিয়েছে।

এর আগে জো বাইডেন কর্তৃক আয়োজিত ৯-১০ ডিসেম্বরের গণতন্ত্র সম্মেলনে বিশ্বের ১১০টি দেশকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ না জানানোয় বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের ব্যাপারেও যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অসন্তোষ রয়েছে, সে ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার চারটি দেশ ভারত, পাকিস্তান, মালদ্বীপ এবং নেপাল ওই গণতন্ত্র সম্মেলনে আমন্ত্রিত হয়েছিল। (পাকিস্তান অবশ্য দাওয়াত পেয়েও সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেনি)। ভোটের রাজনীতি চালু থাকা সত্ত্বেও বাদ পড়া দক্ষিণ এশীয় দেশ ছিল বাংলাদেশ এবং শ্রীলঙ্কা। এর মানে, এই দুই দেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলো যথেষ্ট জালিয়াতিমুক্ত হিসেবে বিশ্বস্বীকৃতি পায়নি। ভুটান রাজতন্ত্র হিসেবে দাওয়াত পায়নি, আর আফগানিস্তানের মৌলবাদী তালেবান সরকার এখনো মার্কিন স্বীকৃতি না পাওয়ায় ওই সরকারেরও দাওয়াত না পাওয়াই স্বাভাবিক। প্রকৃত প্রস্তাবে ২০১৮ সালের সংসদীয় নির্বাচনের পথ ধরে গত তিন বছর বাংলাদেশের পুরো নির্বাচনী গণতন্ত্রের প্রক্রিয়া লাইনচ্যুত হয়ে গেছে। এরপর মানবাধিকার লঙ্ঘন ইস্যুতে র‍্যাবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ মার্কিন চাপ প্রয়োগের রাজনীতিকে তুঙ্গে নিয়ে গেল। মার্কিন চাপ প্রয়োগের শিকার আরও একবার হয়েছিল বাংলাদেশ, যার ফলে ১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষ মোকাবিলা করতে হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর সরকারকে। বাংলাদেশ কিউবার কাছে পাটের বস্তা রপ্তানি করে যুক্তরাষ্ট্র-আরোপিত অবরোধ কেন লঙ্ঘন করল, তার কৈফিয়ত চেয়ে ১৯৭৪ সালে খাদ্যশস্যবাহী কয়েকটি জাহাজকে সাগরের যাত্রাপথ থেকে বিভিন্ন দেশের বন্দরে নোঙর করতে বাধ্য করে যাত্রা বিলম্বিত করে দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। ফলে কূটনৈতিক চ্যানেলে দুঃখ প্রকাশ করে কয়েক মাস পর মার্কিন খাদ্যসাহায্য পুনরায় চালু করা গেলেও দুর্ভিক্ষ ঠেকানো যায়নি। প্রফেসর নুরুল ইসলামের বই ‘মেকিং অব এ নেশন বাংলাদেশ: এন ইকোনমিস্ট’স টেইল’-এ এই কাহিনির বর্ণনা রয়েছে। বাংলাদেশ ধান উৎপাদনে স্বয়ম্ভরতা অর্জন করায় এখন দেশকে অত বড় বিপদে পড়তে হবে না ইনশা আল্লাহ। এতদসত্ত্বেও মার্কিন অবরোধ এলে, তা আমাদের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।
বাংলাদেশে র‍্যাব প্রতিষ্ঠা করেছিল ২০০৪ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। দেশের সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, আনসার–সব বাহিনী থেকেই এই এলিট ফোর্সের অফিসার ও কর্মচারীদের ডেপুটেশনে র‍্যাবে নিয়োগ করা হয়।

২০০৯ সালে মহাজোট সরকারে আসীন হওয়ার পর দেশে বিএনপি-জামায়াত-শিবিরের ছত্রচ্ছায়ায় বেড়ে ওঠা জঙ্গিবাদী সন্ত্রাসীদের খুনোখুনি মারাত্মক পর্যায়ে উপনীত হয়। বিশেষত দেশে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত জামায়াত ও বিএনপির কয়েকজন নেতাকে যখন ফাঁসি দেওয়া হয়, তখন সারা দেশে জামায়াত-শিবির এবং তাদের জঙ্গিবাদী কিলিং স্কোয়াডগুলোর খুনোখুনি চরম আকার ধারণ করে। ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের ১ জুলাইয়ের হোলি আর্টিজানের নৃশংস হত্যাযজ্ঞ পর্যন্ত দেশে সংঘটিত যাবতীয় খুন-জখম থেকে পুলিশ বাহিনীও রক্ষা পায়নি। এর প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছিল পুলিশ ও র‍্যাবের গ্রেপ্তার অভিযানের মধ্য দিয়ে। এটা বলতেই হবে,  আইনের শাসনকে সমুন্নত রেখেই জঙ্গিদের  নির্মূল করার অভিযানকে শক্তিশালী করতে হবে। ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার, হার্ট অ্যাটাক–যে নামেই বলা হোক কেন, তা বিশ্বাস করা কঠিন। ২০১৬ সালের পর দেশে জঙ্গিবাদী সন্ত্রাস অনেকখানি কমে গেছে। আবশ্যক ছিল গ্রেপ্তারকৃত সন্দেহভাজন জঙ্গিদের ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে অতি দ্রুত বিচার করে যথোপযুক্ত শাস্তির বিধান করা। ২০১৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধ করার অঙ্গীকার ঘোষণা করেছিল। তাই আল্লাহর ওয়াস্তে ক্রসফায়ার বন্ধ করুন।

অন্যদিকে, লাইনচ্যুত ভোটের রাজনীতি অবিলম্বে মেরামত করা সম্পর্কে যদি বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন মহল যত্নবান না হয়, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে জাতি আরও বড় বিপদে পড়বে বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোর ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপের মাধ্যমে। এমনকি এই ইস্যুতে খোদ জাতিসংঘও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে দ্বিধা করবে না। তখন শুধু যুক্তরাষ্ট্রকে দোষারোপ করে পার পাওয়া যাবে না। যদি যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাক আমদানির ওপর অবরোধ আরোপ করে, তাহলে আমাদের বিপদ ও বেইজ্জতির সীমা থাকবে না। আমাদের উদীয়মান অর্থনীতিও এহেন পদক্ষেপের ফলে কঠিন সমস্যায় পড়বে। অতএব, সাবধান হওয়ার এখনই সময়!

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ড. মইনুল ইসলাম

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
 
    সব মন্তব্য

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    এলাকার খবর

     
     

    এগারো বছরেও শেষ হয়নি খুলনা-মোংলা রেললাইনের কাজ

    তিন বছরেও নিজস্ব ভবন হয়নি শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের

    রাকিবুলদের বাঁচা মরার লড়াই

    নতুন ধারাবাহিক ‘ভাড়াবাড়ি বাড়াবাড়ি’

    সিরিজটি আমাদের জন্য একটা স্কুলিং ছিল

    আবারও টালিউডে মোশাররফ

    মমেক করোনা ইউনিটে তিনজনের মৃত্যু

    বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানালেন ডিক্যাপ্রিও

    মা হয়েছেন প্রিয়াঙ্কা

    ময়মনসিংহে গত ২৪ ঘণ্টায় ১২ আসামি গ্রেপ্তার

    সপরিবারে উচ্ছেদ করতে বাড়িতে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ

    নানার মৃত্যুর খবরেও অনশনে অনড় মরিয়ম