Alexa
বৃহস্পতিবার, ২০ জানুয়ারি ২০২২

সেকশন

epaper
 

ক্ষমা ও উদারতার শিক্ষা

ক্ষমা করলে সম্মান কমে না; বরং ক্ষমাকারীর মর্যাদা বাড়ে। ক্ষমাকারী জান্নাতের নিকটবর্তী হয়। আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা দ্রুত অগ্রসর হও তোমাদের রবের পক্ষ থেকে ক্ষমা ও জান্নাতের দিকে, যার পরিধি আসমান ও জমিনের সমান, যা মুত্তাকিদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।

আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০২২, ০৯:১৩

ড. এ এন এম মাসউদুর রহমান মানব চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ক্ষমা ও উদারতা। সমাজজীবনে বাস করতে হলে নানা রকম ভুলত্রুটি হওয়া স্বাভাবিক। ভুল করার পর যেমন ক্ষমা চাওয়া উচিত, তেমনি যার কাছে ক্ষমা চাওয়া হয়, তারও দায়িত্ব হলো ক্ষমা করা। ক্ষমা করা উদারতার শামিল। আল্লাহ তাআলা ক্ষমাশীল ও উদার এবং তিনি এই দুই কাজ পছন্দ করেন। মহানবী (সা.)-কে লক্ষ্য করে তিনি বলেন, ‘হে নবী, আপনি তাদের উত্তমভাবে ক্ষমা করে দিন।’ (সুরা হিজর/ ৮৫)। তিনি আরও বলেন, ‘আপনি তাদের ক্ষমা করে দিন এবং তাদের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করুন।’ (সুরা আলে-ইমরান/ ১৫৯)।

প্রত্যেক মানুষের জন্য ক্ষমা ও উদারতার গুণে গুণান্বিত হওয়া আবশ্যক। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যদি তাদের ক্ষমা করো, তাদের দোষ-ত্রুটি উপেক্ষা করো এবং তাদের মার্জনা করো, তবে জেনে রেখো, আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা তাগাবুন/ ১৪)। মানবজীবনে ক্ষমা ও উদারতা সাহসিকতার নিদর্শন। আল্লাহ বলেন, ‘যে ধৈর্যধারণ করবে এবং ক্ষমা করবে, নিঃসন্দেহে এটা সাহসিকতাপূর্ণ কাজের অন্তর্ভুক্ত।’ (সুরা শুরা/ ৪৩)।

ক্ষমার মাধ্যমে যে কেউ খোদাভীতি অর্জন করতে পারে এবং খোদাভীতি মানুষকে জান্নাতের পথে পরিচালিত করে। আল্লাহ বলেন, ‘আর ক্ষমা করাই আল্লাহভীতির অধিক নিকটতম।’ (সুরা বাকারা/ ২৩৭)। হাদিসে বর্ণিত আছে, একদা মুসা (আ.) আল্লাহ তাআলাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘হে আল্লাহ, আপনার বান্দাদের মধ্যে অধিক সম্মানী কে?’ আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ক্ষমা করে দেয়।’

তাই তো ক্ষমার আদর্শ গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘ক্ষমার নীতি অবলম্বন করুন, সৎকাজের নির্দেশ দিন এবং অজ্ঞ লোকদের এড়িয়ে চলুন।’ (সুরা আরাফ/ ১৯৯)। আয়াতটি অবতীর্ণ হলে মহানবী (সা.) এটির তাৎপর্য সম্পর্কে জিবরাইলকে প্রশ্ন করেন। জিবরাইল (আ.) বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা আপনাকে আদেশ দিচ্ছেন যে, আপনার সঙ্গে যে সম্পর্ক ছিন্ন করে, আপনি তার সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখবেন। আর যে আপনাকে বঞ্চিত করে, আপনি তাকে দান করবেন। যে আপনার প্রতি অন্যায়-অনাচার করে, আপনি তাকে ক্ষমা করে দিন।’ (তাবারি)।

হজরত মুজাহিদ (রহ.) বলেন, ‘ক্ষমার নীতি অবলম্বনের মাধ্যমে মানুষের অশোভন আচার-আচরণ ও সাধারণ অন্যায় অপরাধকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’ ইবন জারির আত-তাবারি (রহ.) বলেন, ‘যেসব কাফিরের সঙ্গে যুদ্ধের নির্দেশ ছিল না, তাদের সঙ্গে আচার-আচরণের নীতি শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে আয়াতটি অবতীর্ণ হলেও এর মূল উদ্দেশ্য হলো, সামগ্রিকভাবে মহানবী (সা.) এবং সব মুসলমানকে পারস্পরিক জীবনযাপনের নীতি-পদ্ধতি শিক্ষা দেওয়া। মানুষকে স্বাভাবিক আচার-আচরণ শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি বিবেক-বুদ্ধি কাজে লাগানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

তবে পরিস্থিতি ভিন্ন হলে কঠোরতা অবলম্বন করাও আবশ্যক। কারণ, কেউ যদি বারবার আঘাত দেয় এবং অন্যায়-অত্যাচার করে, তার ব্যাপারে কঠোরতা আরোপের নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। তবে তা সমপরিমাণ হতে হবে। কোনোভাবেই কৃত অপরাধের চেয়ে বেশি হতে পারবে না। কিন্তু প্রতিশোধ না নিয়ে ক্ষমা করা যে মহানুভবতা ও ঔদার্যের লক্ষণ—তা সর্বাবস্থায় স্বীকৃত। মহানবী (সা.) বলেন, ‘দান করলে সম্পদের ঘাটতি হয় না। যে ব্যক্তি ক্ষমা করে, আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন। যদি কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিনত হয়, আল্লাহ তার অবস্থান সুউচ্চ করেন।’ (মুসলিম)

ক্ষমা ও উদারতার প্রবাদপুরুষ ছিলেন মহানবী (সা.)। তিনি অগণিত শত্রুকে ক্ষমা করেছেন। ব্যক্তিগত কারণে তিনি কারও কাছ থেকে প্রতিশোধ নিয়েছেন–এমন দৃষ্টান্ত নেই। মক্কার কাফিরদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ইসলাম প্রচারের নিমিত্তে তিনি মাতৃভূমি মক্কা ত্যাগ করে মদিনায় হিজরত করতে বাধ্য হয়েছিলেন। মক্কার কাফিররা তাঁর ওপর যে অত্যাচার চালিয়েছে, তা কারও অজানা নয়। সর্বশেষ তারা তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র করলে তিনি আল্লাহর নির্দেশে হিজরত করেন। হিজরতের আট বছর পর মহানবী (সা.) যখন সাহাবিদের নিয়ে বিজয়ীর বেশে মক্কায় প্রবেশ করেন, তখন তিনি কারও প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি; বরং সবার জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন এবং বলেন, ‘ভাইয়েরা আমার, আজ তোমাদের প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই। যাও, আজ তোমরা সবাই মুক্ত, স্বাধীন।’ মক্কা বিজয়ের রক্তপাতহীন এ ঘটনা বিশ্বের ইতিহাসে দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে। রক্তপাতহীন এমন বিজয়ের ঘটনা ইতিহাসে আর একটিও নেই।

অনুরূপভাবে যারা ইসলামের প্রধান প্রধান শত্রু ছিল, তাদেরও মহানবী (সা.) ক্ষমা করেন। যেমন হজরত হামজা (রা.)-এর হন্তারক ওয়াহশি, আবু জাহেলের পুত্র ইকরামা, আবু সুফিয়ান ও তার পত্নী হিন্দা ছাড়াও হুবার ইবনে আসওয়াদ, সাফওয়ান ইবনে উমাইয়াকে তিনি নিঃশর্ত ক্ষমা করেন। তাদের জন্য দোয়াও করেন। তাঁর দোয়ার ভাষা ছিল এরূপ, ‘হে আমার প্রতিপালক, আমার সম্প্রদায়কে ক্ষমা করে দিন। কেননা, তারা বোঝে না।’ (বুখারি) এমনকি মহানবী (সা.) যুদ্ধে পরাজিত শত্রু ও বন্দীদেরও ক্ষমা করেছেন। ফলে অনেক অমুসলিম যোদ্ধা ও বন্দী ইসলাম গ্রহণ করেছেন।

ক্ষমা করলে সম্মান কমে না; বরং ক্ষমাকারীর মর্যাদা বাড়ে। ক্ষমাকারী জান্নাতের নিকটবর্তী হয়। আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা দ্রুত অগ্রসর হও তোমাদের রবের পক্ষ থেকে ক্ষমা ও জান্নাতের দিকে, যার পরিধি আসমান ও জমিনের সমান, যা মুত্তাকিদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। যারা সুসময়ে ও দুঃসময়ে ব্যয় করে, ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে-ইমরান/ ১৩৩-১৩৪)। তিনি আরও বলেন, ‘মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ। আর যে ক্ষমা করে ও আপস-নিষ্পত্তি করে, তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে রয়েছে। নিশ্চয় আল্লাহ অত্যাচারীদের পছন্দ করেন না।’ (সুরা শুরা/ ৪০)।

ক্ষমা ও উদারতা মানুষকে অমর করে। যাঁরা সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও প্রতিশোধ গ্রহণ না করে ক্ষমা করে দেন, তাঁরা যেমন আল্লাহর কাছে প্রিয় বান্দায় পরিণত হন, তেমনি পার্থিব জীবনেও সুনাম কুড়াতে থাকেন। প্রত্যেক ইমানদারের দায়িত্ব ক্ষমা ও উদারতার ন্যায় মহৎ গুণে গুণান্বিত হওয়া এবং পারস্পরিক সম্পর্ক দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর করা।

ড. এ এন এম মাসউদুর রহমান: সহযোগী অধ্যাপক ইসলামিক স্টাডিজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
 
    সব মন্তব্য

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    পঠিতসর্বশেষ

    এলাকার খবর

     
     

    দোয়া সফলতার হাতিয়ার

    ফ্যাশনেবল ফিউশন

    নিরাপদ অভিবাসন নিয়ে কর্মশালা

    ঘাটাইলে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো ৩ অবৈধ ইটভাটা

    জরাজীর্ণ টিনের ঘরে ৩৮ বছর পাঠদান

    আ. লীগ লবিস্ট নিয়োগ করে জনগণের অর্থ ব্যয় করছে: খন্দকার মোশাররফ

    ভেড়ামারায় পানিতে ডুবে দেড় বছরের শিশুর মৃত্যু

    চট্টগ্রামে শুল্ক আত্মসাতের দায়ে কারাগারে দুই রাজস্ব কর্মকর্তা

    নিখোঁজের ২ দিন পর খাল থেকে শিক্ষার্থীর লাশ উদ্ধার

    নান্দাইলে ট্রলি-অটোর সংঘর্ষে নিহত ১

    সিভাসুতে ৭ জনের ওমিক্রন শনাক্ত