রোববার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১

সেকশন

 

রাজনৈতিক দলের ভুঁইফোড় সংগঠন

আ.লীগ নেতাদের কখনো ভরসা, কখনো বোঝা

আপডেট : ৩১ জুলাই ২০২১, ১৯:১৭

আওয়ামী লীগের নাম ভাঙিয়ে একাধিক নামসর্বস্ব সংগঠন গড়ে উঠেছে। এসব সংগঠনের অনুষ্ঠানে যোগ না দেওয়ার জন্য বিভিন্ন সময়ে নেতাদের নিষেধ করেছিল আওয়ামী লীগ। কিন্তু তাঁরা তা শোনেননি। বরং অভিযোগ উঠেছে, নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এসব নামসর্বস্ব সংগঠনের বাড়বাড়ন্ত হচ্ছে।

সম্প্রতি আওয়ামী লীগের মহিলা-বিষয়ক উপকমিটির সদস্য হেলেনা জাহাঙ্গীর আওয়ামী চাকরিজীবী লীগ নামে একটি সংগঠন খুলে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন। তাঁকে ওই পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। পরে র‍্যাব গ্রেপ্তারও করে। এই ঘটনায় আবার আওয়ামী লীগের নাম ভাঙিয়ে সংগঠন বানানোর বিষয়টি আলোচনায় আসে।  
এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন বলেন, ‘আমাদের কিছু মানুষের মানসিক বিকারের ব্যামো হয়েছে। অতি ক্যামেরাপ্রীতির কারণে এসব আবর্জনাকে প্রশ্রয় দিই। আমাদের আশকারায় ওরা লালিত হয়। ওরা যখন অসহনীয় হয়ে ওঠে তখন আমাদের টনক নড়ে।’

গত ৭ জুন আওয়ামী হকার্স লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভায় ভার্চুয়াল যুক্ত ছিলেন দলীয় সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। এতে আরও উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ এবং ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী। গত ২২ জুন জননেত্রী শেখ হাসিনা পরিষদের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক।

সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফারুক খান বলেন, ‘কিছু কিছু সংগঠন লীগ নাম দিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে। তাঁরা বিভিন্ন জায়গায় অবৈধ কার্যক্রম করে যাচ্ছে। এগুলো আমাদের গঠনতন্ত্রে অনুমোদন নেই। আমরাও বারবার বলেছি, এগুলো ভুয়া সংগঠন। আমাদের দলের কিছু কিছু নেতা তাঁদের অনুষ্ঠানে যান। সেটা হয়তো না বুঝেই হতে পারে। এ ব্যাপারে আমরা আরও বেশি সতর্ক হয়েছি। আশা করি তাঁরা সতর্ক হবেন।’

মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম লীগের সভাপতি আসাদুজ্জামান দুর্জয় বলেন, ‘আমাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নেতাদের দাওয়াত দিয়েছি। আমরা বেশি পেয়েছি বর্তমান তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদকে। এ ছাড়া শাজাহান খান, কামরুল ইসলাম, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়াকে পেয়েছি।

একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতা বলেন, ‘আজকে যে নেতা আমাদের কাউয়া বলছেন, তাঁরাই তো এসব কাউয়া সৃষ্টি করেছিলেন। কারণ তাঁরা মন্ত্রী কিংবা দলের পদ পাওয়ার আগে এদের অনুষ্ঠানে নিয়মিত আসতেন।’ বঙ্গবন্ধু একাডেমির সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির মিজি বলেন, তাঁদের সংগঠনের শুরু ১৯৯৬ সালে। তাঁদের অনুষ্ঠানে অনেক নেতাই অতিথি হয়ে এসেছেন। ওবায়দুল কাদের নিজেই বঙ্গবন্ধু একাডেমির অনুষ্ঠানে অন্তত ১০ বার এসেছেন।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পরও একই ধারাবাহিকতা বঙ্গবন্ধু, বঙ্গমাতা, শেখ রাসেলসহ বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের নামে গড়ে ওঠে অনেক সংগঠন। মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরেও অনেক সংগঠন গড়ে উঠছে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য বলেন, এগুলো স্রেফ রাজনীতির দোকানদারি। আওয়ামী লীগের নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজির চিন্তা। এগুলোকে মোকাবিলা করতে হবে। কারণ, এসব ভিত্তিহীন সংগঠনের কারণে মূল সংগঠন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নামসর্বস্ব এসব সংগঠনের নেতাদের বিরুদ্ধে আছে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ নানা অভিযোগ। পদবঞ্চিত কিংবা দায়িত্ববঞ্চিত অনেকেই এদের অনুষ্ঠানে নিয়মিত যান। সেখানে বিরোধী দলের পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রীর সমালোচনা করেন। এটা করেন প্রচারের আলোয় আসার জন্য।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নামসর্বস্ব এসব সংগঠনের অধিকাংশের কার্যত কোনো কমিটি, কার্যালয় বা গঠনতন্ত্র নেই। বেশির ভাগ সংগঠনই নিজেদের কেন্দ্রীয় কার্যালয় হিসেবে দাবি করে ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়। জানা গেছে, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, বঙ্গবন্ধু শিশু-কিশোর মেলাসহ কয়েকটি সংগঠন ছাড়া বেশির ভাগেরই অস্তিত্ব কাগজ-কলমে।

গণতন্ত্র রক্ষা পরিষদ, জনতার প্রত্যাশা, স্বাধীনতা পরিষদ ও বঙ্গবন্ধু মানবকল্যাণ পরিষদসহ নানা নামে ৩৪টির বেশি কাগুজে সংগঠনের উদ্যোক্তা ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা। প্রায় সব কটির নামকরণ করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের নাম ব্যবহার করে। এর বাইরে আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের নাম ব্যবহার করেও কিছু সংগঠন বানিয়েছেন তাঁরা।

নৌকা সমর্থক গোষ্ঠী ও বঙ্গবন্ধু একাডেমির সভাপতি ও মহাসচিব হলেন হুমায়ুন কবির মিজি। মিজির আরেকটি সংগঠন আছে যার নাম হলো ‘আমরা মুজিব হব’। একসময় প্রতি শুক্র ও সোমবার অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন তিনি। মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগ নামের সংগঠনটি সাত ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। নেতৃত্বে আছেন আসাদুজ্জামান দুর্জয়, ফয়েজ উল্লাহ, ফাতেমা জলিল সাথী, মাহমুদুর রহমান রাজা, কেটু।

কয়েক দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরছে আওয়ামী চাকরিজীবী লীগ ও জনসেবা লীগ-এর নাম।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব উল আলম হানিফ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘লীগ নাম ব্যবহার করে যারা এসব সংগঠন করে বেড়াচ্ছে, তারা প্রতারক। তাদের বিরুদ্ধে দলীয় ফোরামে আলোচনা করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তিনি বলেন, ‘সারা দেশে আমরা আড়াই শ প্রতারক সংগঠনের তালিকা করে পুলিশের কাছে দিয়েছিলাম। এরপর কিছুদিন এই প্রতারকদের তৎপরতা বন্ধ ছিল। এখন আবার শুরু হয়েছে। তাদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
 
অনুমোদিত সংগঠন
সহযোগী আট সংগঠন হলো মহিলা আওয়ামী লীগ, কৃষক লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ, তাঁতী লীগ, যুব মহিলা লীগ ও মৎস্যজীবী লীগ। আর ভ্রাতৃপ্রতিম দুটি সংগঠন হলো জাতীয় শ্রমিক লীগ ও ছাত্রলীগ।

অনুমোদনহীন সংগঠন
জননেত্রী শেখ হাসিনা কেন্দ্রীয় লীগ, জননেত্রী শেখ হাসিনা কেন্দ্রীয় সংসদ, আওয়ামী প্রচার লীগ, আওয়ামী সমবায় লীগ, আওয়ামী তৃণমূল লীগ, আওয়ামী ছিন্নমূল হকার্স লীগ, আওয়ামী মোটরচালক লীগ, আওয়ামী তরুণ লীগ, আওয়ামী রিকশা মালিক-শ্রমিক ঐক্য লীগ, আওয়ামী যুব হকার্স লীগ, আওয়ামী মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগ, আওয়ামী পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা লীগ, আওয়ামী পরিবহন শ্রমিক লীগ, আওয়ামী নৌকার মাঝি শ্রমিক লীগ, আওয়ামী ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী লীগ, আওয়ামী যুব সাংস্কৃতিক জোট, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও চেতনা গবেষণা পরিষদ, বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগ, বঙ্গবন্ধু একাডেমি, বঙ্গবন্ধু নাগরিক সংহতি পরিষদ, বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন, বঙ্গবন্ধু লেখক লীগ, বঙ্গবন্ধু প্রজন্ম লীগ, বঙ্গবন্ধু যুব পরিষদ, বঙ্গবন্ধু ছাত্র পরিষদ, বঙ্গবন্ধু স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদ, বঙ্গবন্ধু বাস্তুহারা লীগ, বঙ্গবন্ধু আওয়ামী হকার্স ফেডারেশন, বঙ্গবন্ধুর চিন্তাধারা বাস্তবায়ন পরিষদ, বঙ্গবন্ধু ডিপ্লোমা প্রকৌশলী পরিষদ, বঙ্গবন্ধু গ্রাম ডাক্তার পরিষদ, বঙ্গবন্ধু নাগরিক সংহতি পরিষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক লীগ, বঙ্গবন্ধু গবেষণা পরিষদ, বঙ্গবন্ধু আদর্শ পরিষদ, আমরা মুজিব সেনা, মুজিব হব, চেতনায় মুজিব, বঙ্গবন্ধুর সৈনিক, বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগ, মুক্তিযোদ্ধা তরুণ লীগ, নৌকার সমর্থক গোষ্ঠী, দেশীয় চিকিৎসক লীগ, ছিন্নমূল মৎস্যজীবী লীগ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী লীগ, নৌকার নতুন প্রজন্ম, ডিজিটাল ছাত্রলীগ, ডিজিটাল আওয়ামী প্রজন্ম লীগ, ডিজিটাল আওয়ামী ওলামা লীগ, বাংলাদেশ আওয়ামী পর্যটন লীগ, ঠিকানা বাংলাদেশ, জনতার প্রত্যাশা, রাসেল মেমোরিয়াল একাডেমি, জননেত্রী পরিষদ, দেশরত্ন পরিষদ, বঙ্গমাতা পরিষদ, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব পরিষদ, আমরা নৌকার প্রজন্ম, আওয়ামী শিশু যুবক সাংস্কৃতিক জোট, তৃণমূল লীগ, একুশে আগস্ট ঘাতক নির্মূল কমিটি, আওয়ামী প্রচার লীগ, শিশু লীগ, বঙ্গবন্ধু লেখক লীগ, সজীব ওয়াজেদ জয় লীগ, দেশরত্ন সেবক সংঘ, দেশরত্ন সেবক পরিষদ, সজীব ওয়াজেদ জয় ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ আওয়ামী মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগ। এ ছাড়া নতুন করে আলোচনায় রয়েছে জাতীয় উদ্ধারকারী লীগ, আওয়ামী এফবি লীগ, বঙ্গবন্ধু আওয়ামী পরিবার লীগ, আওয়ামী মিডিয়া লীগ, আল্লাহ ওয়ালা লীগ, আওয়ামী তরুণ জনতা লীগসহ তিন শতাধিক দোকান রয়েছে।

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
 
    সব মন্তব্য

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    এলাকার খবর

    মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগের অনুষ্ঠান বন্ধ করলেন ওবায়দুল কাদের

    মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগের অনুষ্ঠান বন্ধ করলেন ওবায়দুল কাদের

    হেফাজত নেতা মুফতি রিজওয়ান গ্রেপ্তার

    হেফাজত নেতা মুফতি রিজওয়ান গ্রেপ্তার

    প্রতিক্রিয়া দেখতে জিয়ার লাশ নিয়ে বিতর্ক

    প্রতিক্রিয়া দেখতে জিয়ার লাশ নিয়ে বিতর্ক

    দীর্ঘ বৈঠকের পরও প্রত্যাশা অপূর্ণ

    দীর্ঘ বৈঠকের পরও প্রত্যাশা অপূর্ণ

    শিক্ষা দিবসে ছাত্রসংগঠনের কর্মসূচি না থাকায় কাদেরের দুঃখপ্রকাশ  

    শিক্ষা দিবসে ছাত্রসংগঠনের কর্মসূচি না থাকায় কাদেরের দুঃখপ্রকাশ  

    আলজেরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্টের মৃত্যু

    আলজেরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্টের মৃত্যু

    ফ্রান্সের নজিরবিহীন প্রতিক্রিয়া

    ফ্রান্সের নজিরবিহীন প্রতিক্রিয়া

    আফগানিস্তানে জাতিসংঘ মিশনের মেয়াদ বাড়ল

    আফগানিস্তানে জাতিসংঘ মিশনের মেয়াদ বাড়ল

    কোণঠাসা পুতিনের বিরোধীরা

    কোণঠাসা পুতিনের বিরোধীরা

    ভারতে বিরোধী মুখ নিয়েই বিরোধিতা তুঙ্গে

    ভারতে বিরোধী মুখ নিয়েই বিরোধিতা তুঙ্গে

    মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকা পুলিশ সদস্যের ওপর প্রতিপক্ষের হামলায়

    মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকা পুলিশ সদস্যের ওপর প্রতিপক্ষের হামলায়