কুড়িখাই মেলাতে উঠা মাছ। ছবি : প্রতিনিধি

৮০০ বছরের প্রাচীন দেশের অন্যতম গ্রামীণ মেলা কুড়িখাই মেলা শুরু হয়েছে। ১১ ফেব্রুয়ারি বিশাল তামার পাতিলে তবারক রান্না আর বাউল-ফকিরের আসরের মধ্য দিয়ে এ মেলা শুরু হয়। সপ্তাহব্যাপী এই মেলা চলবে আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।
কটিয়াদী উপজেলার কুড়িখাই এলাকার এ মেলাটি কিশোরগঞ্জ জেলার সবচেয়ে বড় গ্রামীণ মেলা হিসেবে পরিচিত। এ মেলাকে ঘিরে উৎসবে মেতে ওঠেছে আশেপাশের সব এলাকা।

কুড়িখাই এলাকায় হজরত শাহজালাল (রহ.) এর বংশধর হজরত শাহ সামছুদ্দীন (রহ.) এর মাজার এলাকায় প্রতি বছরের মাঘ মাসের শেষ সোমবার মেলা শুরু হয়। সপ্তাহব্যাপী মেলায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সার্কাস, মৃত্যুকূপ, নাগরদোলা, পুতুল খেলাসহ রকমারি পসরা নিয়ে আসেন ব্যবসায়ীরা। বসে বিন্নি ধানের খই, কদমা, বাতাসা, গুড়, জিলাপির দোকান। এই মেলায় পাওয়া যায় বিশাল বিশাল মাছ, কাঠের আসবাবপত্র। পার্শ্ববর্তী কৃষি জমিসহ বিশাল চত্বরে বসে এই মেলা।

তবে ১১ ফেব্রুয়ারি সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে এ মেলা শুরু হলেও এর এক সপ্তাহ আগেই গত ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে এবার এই মেলার আয়োজন শুরু হয়। ফলে মেলা শুরুর দিনেই মানুষের উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে।

হজরত শাহ সামছুদ্দীনের পুরো নাম হজরত শাহ সামছুদ্দীন আউলিয়া সুলতানুল বোখারী (রহ.)। কথিত আছে, ইসলাম ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে বার আউলিয়ার অন্যতম শাহ সামছুদ্দীন (রহ.) প্রায় ৯০০ বছর আগে তার তিন সহচর শাহ কলন্দর, শাহ নাছির ও শাহ কবীরকে নিয়ে কুড়িখাই এলাকায় আস্তানা স্থাপন করেন। তিনি ইহলোক ত্যাগ করলে এখানেই তার মাজার গড়ে ওঠে। তার মাজারকে কেন্দ্র করে ১২২৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ওরস ও গ্রামীণ মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে বলে জানা যায়।

কুড়িখাই মেলাতে নাগরদোলা। ফাইল ছবি

আশপাশের সমস্ত এলাকায় বছরের প্রধান উৎসব হয়ে ওঠে প্রায় ৮০০ বছরের প্রাচীন কুড়িখাই মেলা। মেলাকে কেন্দ্র করে এলাকার পরিবারগুলো আগে থেকেই টাকা জমিয়ে রাখতে থাকে মেলায় খরচ করবে বলে। দূরবর্তী আত্মীয়স্বজনকে মেলার বিশেষ দাওয়াত দেয়া হয়। চারদিক থেকে এলাকার ছেলে-বুড়ো থেকে শুরু করে নানা বয়সের মানুষের সপ্তাহব্যাপী দীর্ঘ লাইন থাকে মেলার দিকে।

এই মেলায় সবচেয়ে বড় আকর্ষণ মাছের হাট। মেলায় বিশাল এলাকাজুড়ে বসে মাছের হাট। এই হাটে বোয়াল, চিতল, আইড়, রুই, কাতল, সিলভার কার্পস, পাঙ্গাস, মাগুর, বাঘাইরসহ নানা ধরনের অন্তত চার শতাধিক মাছের দোকান বসে। মাছ বিক্রেতারা কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা সুনামগঞ্জের হাওর ও নদী থেকে এক সপ্তাহ পূর্ব থেকে এসব মাছ সংগ্রহ করে মেলায় বিক্রির জন্য নিয়ে আসেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ধনাঢ্য ব্যক্তিসহ সর্বস্তরের লোকজন এই মেলা থেকে মাছ কিনে নিয়ে যান। এ ছাড়া মেলায় হাজারো দর্শক আসেন মাছ দেখতে।

এলাকায় প্রবাদ রয়েছে, কুড়িখাই মেলার মাছ খেলে সকল বালা মুসিবত দূর হয়। মেলার পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে প্রতিবাড়িতে মেলা উপলক্ষে নতুন জামাই ও আত্মীয় স্বজনদের দাওয়াতের রীতি রয়েছে।

শাহ সামছুদ্দীন আউলিয়ার আরেক সহোদর শাহ মিয়াচাঁন (রহ.) এর মাজার রয়েছে কুড়িখাই থেকে তিন কিলোমিটার উত্তর-পূর্বদিকে শেখেরপাড়া এলাকায়। এলাকার লোকজন জানান, এই মাজারে এ ধরনের কোনো মেলা হয় না। কারণ মেলাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন এলাকার বাউল আর ফকিররা যে নাচানাচি করেন, গাঁজার আসর বসান, শাহ মিয়াচাঁন (রহ.) তা পছন্দ করেন না। একবার নাকি এ ধরনের মেলার আয়োজন করা হয়েছিল। সেই বছর কলেরায় পুরো এলাকার মানুষ মরে গ্রাম উজাড় হয়ে গিয়েছিল। পরে শাহ মিয়াচাঁন (রহ.) মাজারের খাদেমকে স্বপ্নে মেলার আয়োজন করতে বারণ করে দেন। এরপর থেকে এখানে কোন মেলা হয় না। তবে শাহ সামছুদ্দীন (রহ.) বাউল আর ফকিরদের এসব নাচানাচির আসর পছন্দ করতেন বলে তার ওরস ও মেলাকে কেন্দ্র করে দেশের নানাপ্রান্ত থেকে শত শত সংসার বিরাগী ফকিরের সমাবেশ ঘটে। যতদিন মেলা চলবে, গাঁজা-কলকি নিয়ে ফকিররাও ততদিন অবস্থান করবেন।

কটিয়াদী থানার ওসি মোহাম্মদ সামসুদ্দীন জানান, মেলার পরিবেশ সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ রাখার জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন ছাড়াও সার্বক্ষণিক গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।

সিম্মী আহাম্মেদ/কিশোরগঞ্জ