বিশ্ব পর্যটক তানভীর অপু। ছবি : সংগৃহীত

ভ্রমণ করতে কে না ভালোবাসে! আমাদের জীবনে মানসিক এবং শারীরিক পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে ভ্রমণ কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা আমরা নিঃসন্দেহে অনুমান করতে পারি। তাছাড়া শুধু মানসিক পরিবর্তন নয়, ভ্রমণ মানুষের জ্ঞানের দরোজাকে উন্মুক্ত করার একটি শক্তিশালী মাধ্যমও বটে। মনিষীদের মতে, হাজারবার শোনার চেয়ে একবার দেখা উত্তম। এই ‘দেখা’ শব্দটির সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে একজন ভ্রমণশিল্পী, একজন পরিব্রাজক। যার মাথা যেন পৃথিবীর ম্যাপ। যে ম্যাপ দেখে তারা পথ হাঁটছেন অবিরত।

ভ্রমণ কারও কারও কাছে শখের বিষয়, কারও কাছে অকৃত্তিম আনন্দের উৎস, আর গুটিকয়েক মানুষের কাছে ভ্রমণ মানে প্যাশন, সর্বোত্তম আবেগ ও ভালোবাসার জায়গা। তানভীর অপু সেই গুটিকয়েক মানুষদের মধ্যে অন্যতম, যিনি দীর্ঘদিন ধরে মরক্কোর ইবনে বতুতা কিংবা ভেনিস পর্যটক মার্কো পোলোর মতোই এই বিশ্বের আনাচে কানাচে, সুন্দরতম, সমৃদ্ধ শহর ও দেশগুলি চষে বেড়িয়েছেন।

তানভীর অপু। ছবি : সংগৃহীত

এখন পর্যন্ত ৬৮ দেশের ৭১৫ এর অধিক শহরে ভ্রমণ করেছেন এই বিশ্ব ভ্রমণকারী। এই পরিব্রাজকের কাছ থেকে তার জীবনের বিচিত্র সব ভ্রমণ অভিজ্ঞতার গল্প শুনলে যেকেউ অভিভূত হবেন। আজকের পত্রিকার পাঠকদের জন্য এই প্রতিবেদনে থাকছে বিশ্ব পর্যটক তানভীর অপুর সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকার এবং ভ্রাম্যমান জীবনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থান দর্শনের অভিজ্ঞতা।

আপনার শৈশব এবং বেড়ে ওঠা নিয়ে কিছু বলুন

জন্ম ১৯৮০ সাল আমার শৈশব ও বেড়ে ওঠা রাজশাহীতে। আমার মা রাজশাহী ইউনিভার্সিটিতে কর্মরত ছিলেন ও বাবা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-নির্বাহী পরিচালক ছিলেন। বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিকেএসপিতে হকির উপর পড়াশোনা শেষ করে ঢাকা ওন্ডার্স ক্লাবে ৪ বছর খেলেছি। তারপর রাজশাহী ইউনিভার্সিটিতে পড়ালেখা শেষ না করেই চলে যাই ফিনল্যন্ডে।

পৃথিবীতে এতকিছু থাকতে একজন পর্যটকের ভূমিকায় জীবন যাপন কেন বেছে নিলেন?

ফিনল্যান্ডে যাওয়ার পর থেকে মূলত ভ্রমণকে প্রাধান্য দেই। পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক অনুপ্রেণায় ভ্রমণের প্রতি আগ্রহটা বেড়ে যায়। ভ্রমণের মাধ্যমে নতুন কিছু দেখা ও নতুন কিছু জানার জন্যই ভ্রমণ করা। একমাত্র ভ্রমণ পারে মানুষের জীবনকে গোছাতে ও নতুন করে সাজাতে। এই জন্যই পর্যটকের ভূমিকায় জীবন বেছে নেওয়া।

বিশ্ব ভ্রমণের আগ্রহের জায়গাটা কখন এবং কীভাবে তৈরি হলো?

বাংলাদেশ ছেড়ে যখন ফিনল্যন্ডে পাড়ি জামায় তখন দেশের বাইরের সংস্কৃতি ও তাদের আচার আচরণ আমাকে আকৃষ্ট করে। পূর্বে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা শহর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকেই এই নেশা পেয়ে বসে। সেই সাথে আগ্রহ জাগে পৃথিবীটা ঘুরে দেখার। পৃথিবীর নানান দেশের সুন্দর ও মনোরম দৃশ্য বারবার হাতছানি দিয়ে ডাকে। এক সময় ভ্রমণ নেশায় পরিণত হয়। ইউরো ট্রিপে বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করার মাধ্যমে বিশ্ব ভ্রমণের আগ্রহটা তৈরি হয়।

বিশ্ব ভ্রমণকারী হিসেবে আপনার ভবিষ্যত পরিকল্পনাগুলো কী?

বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে ভ্রমণ সম্পর্কে সচেতন করা। এ জন্য ফেইসবুক পেইজ (Travel With Tanvir Opu) নিয়মিত লেখা ও ইউটিউব ব্লগ (Travel With Tanvir Opu) নিয়মিত ভিডিও আপলোড করার মাধ্যমে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। সেই সাথে স্কুলের বাচ্চাদের ভ্রমণ সম্পর্কে জানানোর জন্য ওদের নিয়ে সেমিনার করছি। আমি মনে করি, একমাত্র ভ্রমণের মাধ্যমে প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করা ও সৃজনশীল প্রতিভার বিকাশ ঘটানো সম্ভব। স্বপ্ন দেখি, তরুণ প্রজন্মের ১০ টি ছেলে/মেয়েকে ভ্রমণের জন্য তৈরি করবো। তারা ভ্রমণ করবে সেই সাথে অন্যদের ও সচেতন করবে। এমনি করে একদিন আগামী প্রজন্ম ভ্রমণের প্রতি মনমানসিকতা তৈরি হবে।

আমাদের দেশকে কীভাবে বিশ্ব পর্যটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে গড়ে তোলা যায় বলে আপনি মনে করেন?

বাংলাদেশ প্রধানত নদী ও পানির দেশ । এখানে রয়েছে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র ছাড়াও অনেক ছোট ছোট নদ-নদী। এগুলো আমাদের পর্যটনের অনেক বড় সম্পদ। যেমন ঢাকার শীতলক্ষা, নেত্রকোনার সোমেশ্বরী, চট্রগ্রামের কর্ণফুলী, বান্দরবনের সাঙ্গু নদী, কিংবা যশোরের চিত্রা নদী এখনো পর্যটকদের আকর্ষণ করে। এছাড়াও আমাদের বাংলাদেশর দক্ষিণ ভাগে সমুদ্র তীর রয়েছে। এত বিশাল সমুদ্রতীর সঠিক ব্যাবস্থাপনা ও প্রচারের আওতায় আনতে পারলে আমাদের পর্যটনের নিজস্ব অবয়ব সৃষ্টি করা সম্ভব। সব থেকে মজার ব্যাপার হল, আমাদের রয়েছে হাওর। এই হাওর একটি ব্যতিক্রমধর্মী পর্যটন সম্পদ। এছাড়া নদী-নালা সমুদ্র বেষ্টিত সুন্দরবন তো আছে যদিও বর্তমানে এটি হুমকির মুখে সুন্দরবনকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব সবার। সবাইকে এই সম্পর্কে সচেতন হওয়া উচিত। এছাড়া, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ, সোমপুর মহাবিহার, ষাট গম্ভুজ মসজিদ, মহাস্থানগড়, কান্তাজিউ মন্দির, লালবাগ দুর্গ, ঢাকেশ্বরী মন্দির, আহসান মঞ্জিল প্রাসাদ, উয়ারী-বটেশ্বর ও ভিতর গড় ইত্যাদি। আমাদের পর্যটনের সম্পদ রয়েছে কিন্তু শুধু মাত্র সঠিক ব্যবস্থাপনা ও প্রচারের আওতায় আনলেই আমাদের দেশকে বিশ্ব পর্যটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।

ভ্রমণ এবং শিল্প এই দুটি বিষয়ের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে আপনার অভিমত কী?

ভ্রমণ ও শিল্প দুইটি বিষয়ের পারস্পারিক সম্পর্ক রয়েছে। আমি যেহেতু ভ্রমণ প্রিয় মানুষ তাই ভ্রমণের প্রতি আমার গুরুত্বটা বেশি। আমি মনে করি, ভ্রমণের মাধ্যমে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটে। তবে একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি কল্পনা করা যায় না।

কোনো দর্শনীয় স্থান ভ্রমণের ক্ষেত্রে কোন ভূমিকায় নিজেকে রাখতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন? দর্শক নাকি পর্যবেক্ষক?

নিজেকে দর্শক হিসেবে রাখতেই পছন্দ করি। আমি কোন দর্শনীয় স্থানকে দেখতে চাই, স্থানীয় মানুষদের মতো। তারা যেভাবে দেখে ঠিক ঐ ভাবে দেখতে চাই। কখনো কোন কিছু পর্যালোচনা করে আলাদা দৃষ্টিতে দেখতে চাই না। আমি পর্যবেক্ষক নই, একজন দর্শক হিসেবে দেখতে সাচ্ছন্দ বোধ করি।

তানভীর অপুর দেখা ৭টি স্থান 

হিল অব ক্রসেস, লিথুনিয়া

হিল অব ক্রসেস। ছবি : তানভীর অপু

সিয়াউলিয়াই শহরের উত্তর লিথুনিয়ায় ১১ কিলোমিটার দূরে একটি দ্বীপ। যেখানে মাটির ঢিবির ওপর হাজারও ক্রসের ভার। বাতাসের বায়ু প্রবাহে সাথে ধাতুর ক্রসের ঝংকার বেজে ওঠে রুরাল সিয়াউলিয়াইর পাহাড়ে। হিল অব ক্রসেস নামক এই জায়গাটিতে রয়েছে প্রায় লাখ খানেক ক্রস। ক্রসেস বলতে বুঝানো হয়েছে খ্রিস্টানদের ব্যবহৃত ক্রুশ চিহ্ন।

হিল অব ক্রসেস। ছবি : তানভীর অপু

জায়গাটিতে স্তূপাকারে এই ক্রুশ চিহ্ন রাখা হয়েছে। আপনি পৃথিবীর আর কোথাও এমন ক্রুশ চিহ্নের পাহাড় খুঁজে পাবেন না। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ অনেকবার চেষ্ট করেছেন এ ক্রুশ চিহ্নগুলো সরিয়ে ফেলতে। সরিয়ে ফেলার কিছুদিন পরই আবার জায়গাটি ক্রুশ চিহ্নে ভরে যায়।

আইসল্যান্ড 

আইসল্যান্ড। ছবি : তানভীর অপু

পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরতম দেশগুলোর মধ্যে আইসল্যান্ড একটি। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এর রাজধানীর নাম রেইকিয়াভিক।

আইসল্যান্ডে তানভীর অপু। ছবি : সংগৃহীত

দেশটি উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে গ্রীনল্যান্ড, নরওয়ে, স্কটল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, এবং ফারো দ্বীপপুঞ্জের মধ্যে, উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের সদাসক্রিয় ভূ-গাঠনিক প্লেটগুলির সীমারেখার ঠিক উপরে অবস্থিত একটি আগ্নেয় দ্বীপ।

আইসল্যান্ড। ছবি : তানভীর অপু

মার্শাল টিটোর বাড়ি ও তার সমাধি 

মার্শাল টিটোর প্রতিকৃতির সামনে। ছবি : সংগৃহীত

সাবেক যুগোস্লাভিয়ার অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিত্ব। একাধারে তিনি যুগোস্লাভিয়ার প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি ছিলেন। ১৯৪৫ থেকে মৃত্যু-পূর্ব পর্যন্ত দুর্দণ্ড প্রতাপে দেশ পরিচালনা করেন। কমিউনিস্ট নামীয় রাজনৈতিক দলের তিনি সদস্য ছিলেন।

মার্শাল টিটোর বাড়িতে। ছবি : সংগৃহীত

তার অন্যতম কৃতিত্ব হচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের বলয়ে অবস্থান করে যুগোস্লাভিয়া সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র গঠন করা। পরবর্তীতে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনে নেতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া।

মিতিওরা, গ্রীস 

মিতিওরা গ্রীসে তানভীর অপু। ছবি : সংগৃহীত

গ্রীসের এই অঞ্চলের প্রায় হাজার বছর আগের সুউচ্চ খাড়া খাড়া ২৪টি পর্বতচূড়ায় নির্মাণ করা হয়েছিল ২৪টি মনেস্ট্রি। কালের আবর্তে টিকে আছে মাত্র ৬ টি, আর তাদের কারণেই মিতিওরাকে বলা হয় বিশ্বের ৮ম আশ্চর্য।

মিতিওরা। ছবি : তানভীর অপু

মিতিওরা হচ্ছে অ্যাভাটার চলচ্চিত্রে হালেলুইয়াহ পর্বত নামে যে শূন্য ভাসমান পরাবাস্তব পর্বতশ্রেনী দেখানো হয়েছে ঠিক তাঁর মর্তীয় রূপ! কুয়াশাময় ভোরে ছবি তুললে এমনি ভাসমান দেখাবে সবগুলি উপাসনালয়।

দ্বিতীয় রামিসেস

দ্বিতীয় রামিসেস, মিশর। ছবি : তানভীর অপু 

দ্বিতীয় রামিসেস, রামিসেস দ্য গ্রেট বা মহান রামিসেস হিসেবেও পরিচিত, ছিলেন মিশরের উনবিংশতম রাজবংশের তৃতীয় ফারাও রাজা। প্রায়শই তাকে মিশরীয় সাম্রাজ্যের সবচেয়ে মহান, সবচেয়ে উদযাপিত ও সবচেয়ে শক্তিশালী ফারাও হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার উত্তরসূরিগণ এবং পরবর্তী মিশরীয়রা তাকে “মহান পূর্বপুরুষ” বলে সম্বোধন করতেন।

দ্য লিটল মারমেইড, ডেনমার্ক 

দ্যা লিটল মারমেইড। ছবি : তানভীর অপু

লিটল মারমেইড হচ্ছে ব্রোঞ্চের তৈরি শত বছরের পুরনো একটি বহুল জনপ্রিয় ভাস্কর্য। পাথরের উপর বসে থাকা এক নারী যে কিনা এক প্রিন্সের প্রেমে মজেছে! হাজারো মানুষ এখানে আসে আর ছবি তোলে, সেটা না দেখলে বিশ্বাস করা কষ্টকর।

ফেজ, মরক্কো 

মরক্কোর ফেজ শহরে। ছবি : সংগৃহীত

মরক্কোর দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর ফেজ, যা বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে তালিকাভুক্ত। এটি প্রাচীন স্থাপত্য ও ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে সুপরিচিত। এর উচ্চতা ৪১০ মিটার।

ফেজ, মরক্কো। ছবি : সংগৃহীত

ফেজ ১৯১২ সাল পর্যন্ত আধুনিক মরক্কোর রাজধানী ছিল।বর্তমানে ফেস-মেকনেস প্রশাসনিক অঞ্চলের রাজধানী। ইদ্রিসিস রাজবংশের শাসনকালে শহরটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়।এর মধ্যে বড়টি হল ফেস এলবালি।

ফেজ, মরক্কো। ছবি : তানভীর অপু

এই মধ্যযুগীয় পরিকল্পিত শহরটির বাড়িঘর, রাস্তা, হাটবাজার আপনার ইন্দ্রিয়কে উজ্জ্বল করে তুলবে। ঐতিহাসিক সাইটগুলি মুহূর্তে আপনাকে নিয়ে যাবে তখনকার দিনে।যখন পৃথিবীর অনেক অঞ্চল অন্ধকারে নিমজ্জিত, অথচ এখানকার একজন প্রাচীন রাজার পরিকল্পনায় টালি, মোজাইক, মার্বেলে খোদাই করে গড়ে উঠছে আধূনিক বাড়িঘর।

আজকের পত্রিকা/কেএইচআর/